আল-কোরআনে আল্লাহতায়ালা কখনো কখনো সরাসরি তাঁর বক্তব্য (Active terms or directly) পেশ করেছেন , যেমন- সূরা হূদ -আয়াত নং:-১৪, সূরা নিসা -আয়াত নং-৮২, সূরা হজ্জ-আয়াত নং-৮, সূরা হা মীম সজিদাহ-আয়াত-৪২।
আবার কখনো কখনো সরাসরি বক্তব্য পেশ না কোরে তাঁর পক্ষে অন্যকে (ফেরশেতা জীবরিল-আঃ এবং রাসূলুল্লাহ-সাঃ) দিয়ে (passive terms or indirectly) বক্তব্য পেশ করিয়েছেন যেমন- সূরা হজির -আয়াত নং-৯।
এ বিষয়টি নিয়ে অনেকেই দ্বিধায় ভোগেন এবং তাদের মনে অহেতুক এ ধরনের প্রশ্নের সৃষ্টি হয়:- আল্লাহতায়ালা তাঁর বক্তব্য সবসময় সরাসরি পেশ না কোরে কেন মাঝে মাঝে অন্যের মাধ্যমে অর্থাৎ কর্মবাচ্য রূপে (passive terms or indirectly) পেশ করলেন?
সাধারনত ইমানের কমতি এবং ভালভাবে জানতে ও বুঝতে না পারার কারণে এ ধরনের সন্দেহ বা প্রশ্নের সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু যখন কোন মানুষ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করবে যে, আল-কোরআন স্বয়ং আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে প্রেরিত ঐশীবাণী এবং সেইসাথে এটাও বিশ্বাস করবে যে, এ বাণী ফেরেশতা জীবরিল (আঃ) মারফত রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর উপর নাযিল করা হয়েছে- তখন তার মনে এরূপ অহেতুক সন্দেহ বা প্রশ্নের উদ্ভব হবে না। আর এ অবস্থায় আল-কোরআনে আল্লাহতায়ালার বক্তব্যকে কর্তৃবাচ্য (Active terms) কিংবা কর্মবাচ্য (passive terms) অর্থাৎ directly or indirectly যে রূপেই উপস্থাপন করা হোক না কেন- সবই যে আল্লাহর বাণী তা বুঝতে ও মানতে মোটেই অসুবিধা হবে না। একটু ভেবে দেখুন তো, সম্পূর্ণ গ্রন্থখানার ভাব যদি শুধু কর্তৃবাচ্য কিংবা কর্মবাচ্য, অর্থাৎ যে কোন একাটি রূপে প্রকাশ করা হত- তাহলে কি একঘেয়েমী মনে হত না? আল-কোরআনের বাণীগুলো কর্তৃবাচ্য ও কর্মবাচ্য (Active terms & passive terms) এই দুই রূপেই প্রকাশ করার ফলে একদিকে যেমন এটির সাহিত্যিক ঢং ও ভাবের পরিচয় ফুটে উঠেছে, অপরদিকে তেমনি ভাব প্রকাশের ক্ষেত্রে একঘেয়েমীতা থেকে মুক্ত থেকেছে। এ ধরনের বিষয়গুলোকে পরিষ্কারভাবে বুঝতে হলে ধৈর্যের সাথে এবং নির্ভরযোগ্য তফসির (ব্যাখ্যা) সহ এই মহাগ্রন্থের প্রতিটি সূরা একে একে পাঠে মনোনিবেশ করতে হবে। তখন দেখা যাবে আস্তে আস্তে সব বিষয় পরিষ্কার হয়ে আসছে।
অনেকে কিয়ামত সম্পর্কে সন্দেহে ভোগে এবং বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন করে, যেমন- (My question is why this confusion in dialect? Then being rhetorical in some cases is also very confusing for me. I mean if I was God and writing something to my disciples. I would have wrote,”Day X is the judgment day.”….not “Undoubtedly, the Day of Judgment has an appointed time”. Why question or doubt my own scheduled time?)
এ ধরনের প্রশ্নের উত্তরে প্রথমত আমি বলতে চাই- (“Surely Allah is beyond all kinds of doubt.” Actually this “Undoubtedly” word is used for those, who are in doubt about judgment day & these type of people always questioned our Prophet (sw) about judgment day with fun & doubt.) কিয়ামত তথা বিচার দিবস যে আল্লাহতায়ালার নির্ধারিত নির্দিষ্ট ক্ষণেই ঘটবে- এটি বিশ্বাস করা ইমানের অংশ। যেহেতু মহান স্রষ্টা সন্দেহাতিতভাবে এটি ঘোষণা করেছেন, সুতরাং এই বিষয়ে সন্দেহ করার কোন অবকাশ নেই। কিয়ামত ঠিক কোন নির্দিষ্ট ক্ষণটিতে অনুষ্ঠিত হবে- তা একমাত্র আল্লহতায়ালাই ভাল জানেন। নাস্তিকেরা এখন যেমন এ বিষয়ে সব সময়েই সন্দেহে ভোগে এবং দন্দ সৃষ্টি করে। তেমনি যদি আল্লাহতায়ালা কেয়ামতের নির্দিষ্ট দিন-ক্ষণ প্রকাশ করে দিতেন, তখনও দেখা যেত তারা একই রকম আচরণ করছে। তাদের সন্দেহ প্রকাশের ভঙ্গিমা ও প্রশ্ন করার ঢং এই আয়াতগুলোর মাধ্যমে আমাদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। আমরা যারা নাস্তিকদের এসব প্রশ্নের সম্মুখিন হই, তারা যেন দৃঢ়ভাবে এর জবাব দিতে পারি- সেই প্রস্তুতি এবং শিক্ষাই এখানে দেয়া হয়েছে। এভাবেই তিনি আমাদেরকে পরীক্ষা করেন।
অনেকে আবার ২৯ নং সূরা আনকাবুত-আয়াত নং-৬৪ এর এই বক্তব্যে (এ দুনিয়ার অর্থাৎ পার্থিব জীবন তো খেলা তামাশা ছাড়া আর কিছু নয়; নিশ্চয়ই পরকালের জীবনটা হচ্ছে আসল জীবন, কত ভাল হত যদি তারা জানত!) হতাশায় ভোগেন, তারা প্রশ্ন করেন- এই পার্থিব জীবনটা যদি খেলা তামাশাই হয়, তাহলে এটাকে এত গুরুত্ব দেয়ার কি প্রয়োজন? বরং এ পার্থিব জীবন থেকে দ্রুত প্রস্থান করাই কি ভাল নয়?
এই প্রশ্নের উত্তর দেবার আগে তাদের কাছে আমি একটি প্রশ্ন করতে চাই- ‘ যে কোন খেলার মাঠে যখন খেলোয়াড়রা খেলতে নামে, তখন তারা যদি না খেলে হাহুতাশ করে এবং খেলাকে গুরুত্ব না দিয়ে তা শেষ হবার পূর্বেই মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে আসে- তবে কি তাতে পরাজয় ছাড়া ভাল কোন ফল আশা করা যায়?’
আমাদের জন্য পৃথিবীটা খেলার মাঠই তো বটে। এ খেলাতে দল প্রধানত দু’টি। একটি দল হলো খাঁটি ইমানদার, আর বিপক্ষের দলটি হলো বেইমান অর্থাৎ অবিশ্বাসীর দল। এর মাঝে যারা আছে তারা মূলত সুযোগসন্ধানী মোনাফেক। যখন যে দল ভারি হয়, তারা সে দলের পেছনে ছোটে। তবে অবিশ্বাসীদের সাথে থাকতে ও তাদের পথ ও মতে চলতে এরা স্বাচ্ছন্দ বোধ করে এবং গোপনে বিশ্বাসীদের ক্ষতি করার পায়তারা করে।
অবিশ্বাসী ও মোনাফেকদের জন্য এই পৃথিবীটা তো খেল-তামাশারই জায়গা। তাদের খনিকের এই খেলার গুরু হলো শয়তান। আইন-কানুন হলো শয়তান ও তার দোসরদের কুমন্ত্রণা প্রসূত খেয়ালী রীতি-নীতি। উদ্দেশ্য হলো শয়তানের সন্তুষ্টি অর্জন ও আল্লাহর দেয়া বিধানের বিরোধিতা করা। আর এর ফলাফল হলো ইহকালে শান্তির নামে লাগামহীন বিলাসিতা ও অশান্তি ছড়িয়ে দেয়া এবং পরকালে চরম অশান্তি ভোগ অর্থাৎ দোজখ বাসি হওয়া।
বিশ্বাসীদের জন্য এই শাশ্বত খেলার শিক্ষক অর্থাৎ গুরু হলেন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এবং তাঁর খাঁটি অনুসারিগণ, আইন-কানুন হলো আল-কোরআন এবং উদ্দেশ্য হলো একমাত্র আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন। আর এর ফলাফল হলো ইহকালে সরল ও শান্তির পথ প্রাপ্তি এবং পরকালে পরম শান্তি অর্থাৎ অনন্তকাল বেহেশত লাভ করা।
অনেকে আবার বলেন- দুষ্টুমি বা অপরাধ করলে আমাদের পিতামাতা আমাদেরকে অনেক সময়ই শাস্তি ও বকুনি দিতেন। কিন্তু এমন কোন কঠিন কথা তো তারা বলতেন না বা এত ভীতিকর ও কঠিনতম শাস্তিও তো তারা দিতেন না, যে ধরনের ভয়ংকর শাস্তির কথা আল্লাহতায়ালা মানুষকে দেবেন বলে আল-কোরআনে ব্যক্ত করেছেন, [যেমন- ৪৪ নং সূরা দুখান- ৪৩ থেকে ৫০ নং আয়াতে বলা হয়েছে- নিঃসন্দেহে যাক্কুম বৃক্ষ, পাপীদের খাদ্য,- গলিত তামার মত- পেটের ভেতরে, ফুটন্ত পানির টগ্ বগ্ করার মত (ফুটবে)! (আদেশ দেয়া হবে) “ধরো একে- তারপর টেনে-হেঁচড়ে নিয়ে যাও ভয়ংকর আগুনের মাঝখানে। “তারপর তার মাথার উপরে ফুটন্ত পানির শাস্তি ঢেলে দাও;” (বলা হবে) “স্বাদ আস্বাদন কর; তুমি না ছিলে (দুনিয়ার বুকে) একজন শক্তিশালী ও অভিজাত মানুষ। “অবশ্যই এটা হচ্ছে (সেই শাস্তি) যা সম্পর্কে তোমরা সন্দেহ করতে।”] এই কঠিন আযাবের সংবাদ শুনে তারা প্রশ্ন করে- আমরা তো তাঁরই সন্তান, তবে কেন আল্লাহতায়ালা তাঁর সন্তানদের প্রতি এরূপ তীব্র বিরাগ প্রদর্শন করেছেন?
দয়া করে কিছু মনে করবেন না। এই প্রশ্নের উত্তর দেবার আগে যার মনে এরূপ প্রশ্নের উদ্রেগ হয়েছে তার উদ্দেশ্যে আমি আবারও কিছু প্রশ্ন করতে চাই- ‘আপনি কি আপনার পিতা-মাতাকে কখনও অস্বীকার করেছেন? তাদের সমস্ত কথার বিরোধিতা করেছেন? সেইসাথে আপনার অন্যান্য ভাই ও বোনদেরকেও কি পিতা-মাতার কথা না শোনার জন্য এবং তাদের অস্বীকার করার জন্য সব সময় কুবুদ্ধি দিয়েছেন বা মৃত্যু ভয় দেখিয়েছেন? জন্মদাতা পিতা-মাতাকে ছেড়ে অন্য কাউকে কি সেই আসনে বসিয়েছেন?’ আমার দৃঢ় বিশ্বাস এমনটি আপনি করতেই পারেন না। যদি আপনার কোন সন্তান আপনার সাথে এরূপ আচরণ করে- তবে আপনার মনের অবস্থা কেমন হবে? যাই হোক, এগুলো তো মানব মনের কথা।
এবার আসল কথায় আসা যাক। মহান স্রষ্টা মানুষকে সর্বশ্রেষ্ঠ হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। আর এই সৃষ্টি জগতের সবকিছু তিনি তাদের জন্য নিয়োজিত রেখেছেন। আমারা যে পিতা-মাতার সন্তান, তাদেরকেও তিনিই সৃষ্টি করেছেন। আমরা সবাই তাঁর সন্তান নই, বরং বান্দা (খৃষ্টানরা নিজেদেরকে যীষু-খৃষ্টের সন্তান ভাবে)। এই বান্দাদের মধ্যে যারা বিশ্বাসী কিংবা অবিশ্বাসী কারো ক্ষেত্রেই তো তিনি তাঁর নিয়ামতের কমতি করেন না। কিন্তু তিনি ইচ্ছা করলে তো বায়ুমন্ডলের অক্সিজেনকে উধাও করে দিতে পারেন, ভূগর্ভস্থ পানির স্তরকে আমাদের নাগালের বাইরে নিয়ে যেতে পারেন। কিন্তু রহমানুর রহিম তো কারো জন্য এরূপ পক্ষপাতিত্ব করেন না। তাঁর সৃষ্ট বান্দারা যেন ইহকালে শান্তি পায় ও পরকালে সফলকাম হতে পারে সে জন্য তিনি বিধি-বিধান প্রেরণ করেন। যারা তাঁর প্রেরীত এই বিধানকে ভ্রুক্ষেপ তো করেই না, বরং সরাসরি স্রষ্টাকেই অস্বীকার করে কিংবা তাঁর শরিক করে, যারা সরল পথে চলতে চায় তাদেরকে শুধু কটাক্ষই করেনা বরং সুযোগ পেলে স্বমূলে নির্মূল করতে চায়, স্রষ্টার দান করা মন ও মগজকে সব সময় বাঁকা পথে ব্যবহার করে, এমনকি মহান আল্লাহতায়ালাকে সরাসরি অস্বীকার করতেও ছাড়ে না- এত কিছুর পরও এই সব অহংকারী ও জেদি লোকগুলোকে পরম করুণাময় আল্লাহ্ তওবা করার সুযোগ দেন। বিভিন্নভাবে তিনি তাদেরকে সৎ পথে ফিরে আসার জন্য সচেতন ও সাবধান করার ব্যবস্থা করেন। কিন্তু এরপরও যারা ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করতেই থাকে এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত স্রষ্টাকে অস্বীকার করতেই থাকে, তাদের জন্য তো পরকালে চরম সাজাই প্রাপ্য। কিন্তু যারা অজ্ঞতা বশত ছোটখাট ভুল- ত্রুটি কোরে ফেলে এবং পরবর্তীতে সেই ভুল বুঝতে পারলে অবনত মস্তকে স্রষ্টার কাছে নতী স্বীকার করে। তাদেরকে রহমানুর রহিম মহান স্রষ্টা অবশ্যই একদিন ক্ষমা করে দেবেন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

