একদিন ATN বাংলায় ইভা রহমান এর গলায় রবীন্দ্র সংগীত শুনে এবং তার সাথে কিমভূতকিমাকার ভিডিও দেখে, একজন রবীন্দ্র অন্তপ্রান শ্রোতা হিসাবে যার পর নাই দুঃখ পেয়েছি। বেক্তিগত ভাবে আমি কাওকে আঘাত করছি না। ভদ্রমহিলা একা নন, ইদানিং অনেক কেই বেসুরা, ভুল উচ্চারণ, কোনো কোনো জায়গায় শব্দ বিকৃত করেও রবীন্দ্র সঙ্গীত, নজরুল গীতি ইত্যাদি গাইতে দেখা যায়। শুধু বলতে চাই, বিশ্বায়নের নাম করে কেন্দ্রচ্যুতি ঘটানোর কোনো মানে হয়না। যে জিনিসটি যেভাবে গাওয়া উচিত, যে আবেদনে উপস্থাপন করা উচিত, তা ওভাবেই মানানসই এবং সুন্দর। অনেকটা ‘’ বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃকোঁড়ে।‘’
রবীন্দ্র, নজরুল, হাসন, কিংবা লালন সংগীত; এগুলো আমাদের অহঙ্কার। আমাদের উচিত এদের লালন করা, সঠিকভাবে বহন করা। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম সুন্দর এবং সঠিক ভাবে ছড়িয়ে দেবার দায়িত্ব তো আমাদেরই। আমি নিজে আধুনিকতায় বিশ্বাস করি। সব ধরনের গানই আমি শুনি। লালন আমার যেমন পছন্দ, তেমনি লেডী গাগা-র গানও ভাল লাগে। এটা তার সৃষ্টি, সে এভাবেই এই উন্মত্ত শিল্প সৃষ্টি করেছে। প্রতিটি শিল্প ই আলাদা ভাব, আবেদন, জগত সৃষ্টি করে। সবার ই একটা আলাদা আলাদা শ্রোতা আছে। একটি অপরটি থেকে আলাদা এবং স্বতন্ত্র। যে শিল্প টি যেভাবে সৃষ্টি হয়েছে, যারা এটি বহন করেন তাদের উচিত তার আদি এবং শাশ্বত রূপটির দিকে খেয়াল রাখা।
মিডিয়ার পৃষ্টপোষকতায় যারা আছেন, তারা আধুনিকতার নামে যাচ্ছেতাই ভাবে এসব সম্প্রচার করছে। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, কি মানদণ্ডে এগুলো সম্প্রসারিত হয়। এই হিসাবে তো আমিও গাইতে পারি। সব ধরণেরই গাইতে পারি !! আজকাল অনেক জাত শিল্পীই, যারা সত্যিকার অর্থেই রবিন্দ্র,নজরুল সঠিক ভাবে গান, তারাও দেখি এই রকম গোঁজামিল সুর দিয়ে গান গাওয়াটা দোষের কিছু মনে করেন না ! বড়ই দুঃখ ! আমি নিশ্চিত মনে পাথর চেপে এসব কথা তারা বলে থাকেন। পাছে তার চেহারা দর্শনই বন্ধ হয়ে যাবে দূরদর্শনে!
প্রতিটি শিল্পকর্ম-ই শিল্পকর্তার কাছে সন্তানতুল্য। কেওই চায়না তার সন্তানটিকে কেউ বিকৃত করুক। তাকে এমনই খণ্ড-বিখণ্ড রূপ দিক যে কিনা তার পিতৃ পরিচয়ই ভুলে যাক। এই অধিকার আমাদের কারুই নাই। তথাকথিত আধুনিকতারও নাই। বিশ্বায়নের নাম করে আমরা কি মূল সুরের, লয়ের গলা চেপে ধরছি না ? সবার মাঝে ছড়িয়ে দেবার নাম করে আমরা কিন্তু মূলোৎপাটন ই করছি। ধীরে ধীরে মূল সুরটাই তো হারিয়ে যেতে বসেছে। ফিউশন এর নাম দিয়ে বিকৃত করে চলেছি সুর, তাল, লয়। তরুণ সমাজকে আকৃষ্ট কারার দোহাই দিয়ে, আমরা কি বরং ওদেরকে বিরাট এক ভুলের রাজ্যে পাঠিয়ে দিচ্ছি না ?
আমি প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসের সাথেই বলতে চাই, মূল শিল্পগুলো এতই শক্তিশালী যে সেগুলোর জনপ্রিয়তায় কখনও এতটুকু ভাটা পড়বে না। নিজস্ব সত্তাতেই-গুণেই, তাদের গ্রহণযোগ্যতা থাকবে চিরদিন। যুগে যুগে এদের আবেদন। সত্যিটাই সুন্দর। কৃত্রিম পোশাক পরিয়ে, হ-য-ব-র-ল ভাব এনে মডার্ন লুক দেয়া নিতান্তই বেহামিপনা ! সত্যিকারের গায়ক-শ্রোতা ঠিক ই চিনে নেন এদের। জোর করে কাওকে কিছু ভালো লাগানো যায় না। বরং বিচ্যুতি-ই এদেরকে হুমকির মুখে ঠেলে দেয়! অতি বোকা শিল্প সমজদার এবং মুনাফালোভীরাই এটা মানতে নারায। যদিও আমি ঠিক বুঝিনা, লাভটা ঠিক কোথায় !
আমি ক্ষুদ্র একজন শ্রোতা। গান শুনতে খুব ভালবাসি। রবীন্দ্র, নজরুল, হাসন, লালন এরা আমায় বাঁচিয়ে রাখে। তাই ওদের এতটুকু অবজ্ঞা, বিচ্যুতি আমাকে বেথিত করে। আরও অনেককেই নিশ্চয় করে। তাই একজন অনুরাগী শ্রোতা, একজন শিল্পপ্রেমিক হিসাবে শুধু এতটুকুই বলি, ‘’ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি!’’ ঠিক করে গাইতে জানলে তবেই মাধ্যমগুলোতে নিজেদের চেহারা দেখানোর সাহস করুন ! অন্যথায় আমার মত শুধু গুনগুনিয়ে অথবা বাথরুম সিঙ্গার হয়েই খুশী থাকুন !!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


