যুদ্ধে জয় কিংবা পরাজয় যেকোনো একটা হয়। যাপিত জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ের সঙ্গে যুদ্ধের একটি নিবিড় সম্পর্ক আছে। যুদ্ধের টানাপোড়েনে কারও হয় জয় এবং কারও বা জয় নয়। যুদ্ধ তাই অনবরত জয়-পরাজয়ের সাঁকোতে দাঁড়িয়ে থাকা একটি পালাক্রম।
আমি যুদ্ধের কথা এতভাবে ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে এবং সরাসরি বলতে চেয়েছি—কারণ যুদ্ধের কোনো বিকল্প পন্থা আমি খুঁজে পাইনি। ১৮ বছর ধরে ক্যানসারের সঙ্গে বসবাস করছি শত্রুকে পরাস্ত করে। কখনো কখনো একটু দুর্বলতা, একটু বিমর্ষতা, একটু বিরহ-ব্যথা আমাকে যে আহত করে না, তা নয়। তবে নির্মমভাবে কাবু করতে পারে না। আমি বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে আবার সক্রিয় হয়ে উঠি এবং চলমান জীবনের সঙ্গে যুক্ত হই।
এই যে চলমান জীবনের কথা বললাম, সেখানে সুষ্ঠু সুন্দর জীবনপ্রবাহ ধরে রাখার জন্য কয়েকটি বিষয়ের প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্ব আমি দিয়ে থাকি।
এক. ব্যস্ত থাকা। দুই. প্রসন্ন থাকা, তিন. খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারে নিজস্ব রুচি তৈরি করা। চার. শরীরের ঝিমিয়ে পড়া ভাবকে অবহেলা করা।
পাঁচ. শারীরিক দুর্বলতাকে প্রশ্রয় না দেওয়া। ছয়. আপনজনের সঙ্গে প্রিয় বিষয়গুলো নিয়ে ভাব বিনিময় করা। সাত. বিনোদনের প্রতি ঝোঁক একটু বাড়িয়ে দেওয়া।
আট. শরীরচর্চা বা ব্যায়ামের প্রতি কিছুটা নিয়মানুবর্তিতা অনুসরণ করা। নয়. সম্ভব হলে বই পড়া এবং গান শোনার প্রতি আগ্রহ বাড়িয়ে তোলা।
দশ. নির্দিষ্ট ডাক্তারের সঙ্গে সমৃদ্ধ যোগাযোগ রাখা।
এর বাইরেও আরও অনেক বিষয় থাকতে পারে; একজন ক্যানসার আক্রান্ত মানুষ, যা নিজেই তৈরি করতে পারেন। তবে আমি মূলত ব্যস্ত এবং পরিশ্রমকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকি। যাঁরা আমার কাছে ক্যানসার-বিষয়ক বিভিন্ন কথা জানতে চান তাঁদের আমি এই ধরনের কথাই বলে থাকি। সাহস ও মনোবল দিয়ে কাউন্সেলিং করে থাকি। কারণ ক্যানসারের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য সাহস ও মনোবলই বেশি প্রয়োজন।
আমার মতো দীর্ঘবছর কাল ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে আছেন—চিকিৎসার আশ্রয়ে আছেন, কিংবা যাঁরা খুব কাছাকাছি সময়ের মধ্যে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন সবার জন্য আমি যে কথাটি বলতে চাই, ক্যানসার শব্দটি ভয়াবহ ভয়ংকর। কিন্তু ভয় পাওয়ার মতো কিছু নয়। বিভিন্ন কার্যক্রমকে প্রাধান্য দিয়ে ক্যানসারকে ভুলে থাকতে হবে। এর জন্য পরিবারের সবার সহযোগিতা বিশেষভাবে কাম্য। ডাক্তার, পরিবার এবং নিজস্ব মানসিকতা দারুণভাবে ক্যানসারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য সহযোগিতা করতে পারে।
আমরা জানি, দিনে দিনে ক্যানসারে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্র এই দুরূহ রোগটির নিরাময়ের জন্য সর্বাত্মক বিশেষজ্ঞতা আরোপের মাধ্যমে জনমনে সাহস ও স্বস্তি বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা আমাকে ক্ষমা করবেন। আমার মনে হয়, ক্যানসার সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা যায় না। তবে অবশ্যই উপশম করা যায়। এবং সে উপশমের সীমা দীর্ঘস্থায়ী করা যায়। এর জন্য অবশ্য দারুণ সচেতনতা ও নিয়মানুবর্তিতা মেনে চলতে হয়।
ক্যানসার একটি জটিল রোগ। কঠিন রোগ। অন্যান্য জটিল ও কঠিন ব্যাধিগুলোর মতোই চিকিৎসা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ, ওষুধ, পথ্য সবই ক্যানসারের জন্য প্রয়োজন। কেমোথেরাপি, অপারেশন, ওষুধ-পথ্য সবই ক্যানসারে অসুস্থ মানুষের জন্য প্রয়োজন। অবশ্য ডাক্তারের পরামর্শ সে ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ডাক্তার যেভাবে বলেন সেভাবেই চিকিৎসার প্রতিটি ধাপের সঙ্গে আমাদের জড়িয়ে থাকতে হয়—মেনে নিতে হয়, সঙ্গে রাখতে হয় সাহস, মনোবল ও সাহসিক ব্যস্ততা।
নিজের ভেতরে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে নিজের অবস্থা এবং অবস্থানকে মূল্যায়নের মাধ্যমে ক্যানসারকে দূরে রাখতে হয়।
আমি আঠারো বছর বেঁচে আছি। নারী শক্তি সম্মাননা পেয়েছি। আমি প্রমাণ করেছি, ক্যানসারের চেয়ে আমি অধিক শক্তিশালী। নিয়মিত ওষুধ খাই। ডাক্তারের পরামর্শ নিই, সময়ে সময়ে চেকআপ করি এবং বিভিন্ন কৌশলের আশ্রয় নিয়ে সুস্থ থাকি। আমি চাই, আপনারা যাঁরা ক্যানসারে আক্রান্ত, প্রচণ্ড বিশ্বাস ও ভালোবাসা দিয়ে নিজেকে জয় করবেন এবং আঠারো নয়, অনেক অনেক আঠারো বছর পেরিয়ে নিজেকে একজন যোদ্ধা সৈনিক হিসেবে তৈরি করবেন। সবার সুস্থতা ও মঙ্গল কামনা করছি। ক্যানসার আপনি দূরে থাকুন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


