উত্তর প্রদেশের একটি প্রাচীন গ্রাম । তখন উত্তর প্রদেশে বিদেশীদের জন্য কিছুটা রেসস্ট্রেকশন ছিলো আমি ইন্ডিয়ান বাংঙালী ভাব করে চলে আসছি । দিল্লি থেকে ট্রেনে দুই দিন লাগে আসতে । অন্যান্য ইস্টেশনের মত কোন ভিড় নাই । ভিড় নাই মানে আমি একাই ঐ ইশ্টেশনের যাত্রী ছিলাম।
কোন তাড়াহুড়া নাই নিরব এক ইস্টেশন কিন্তূ সমস্যা হছে আমার বিরাট এক খানা লাগেজ । বিশাল একটা লাগেজ একজন মানুয কোন ভাবেই উহা বহন করতে পারেনা । দিল্লি বড় বাজার থেকে কিনে ছিলাম সবচেয়ে বড় সইজ ৫২'' ইন্চি উদ্দেশ্য ভারত বর্ষের সকল মুল্যবান সম্পদ বাংলাদেশে নিয়ে যাওয়া । লাগেজের ভাড় নিতে পারছিলাম না কুলি ও ছিল না ঐ ইস্সটিশনে । একা আমি উইত্থ মাই বিগেস্ট লাগেজ । পুরাতন রেল ইস্টেশন , ওভার ব্রিজে কাঠের শিড়ি বেয়ে বিশাল ছুটকেস্টা টেনে উপরে তুলছি । এর মধ্যে এক জন মানুষ মধ্য বয়সি আমার দিকে এগিয়ে আসছে । আমাকে দেখতেই বললোঃ আসসালামুআলাইকুম ভাইসাব কাঁহা যানা হেয় আপকো রামপুর মে ? উর্দু ভাষায় একটা ব্যাপার আছে "তেহ্জিব " তেহ্জিব মানে সম্মান । ভদ্যলোক আমার কাছে জানতে চাইলো রামপুরে আপনি কোথায় যাবেন ?
রামপুরে আমি আসেছিলাম একটি ওপেন ইনভাইটেশন নিয়ে আর ইনভাইটেশন টা ছিল একটি বইয়ে । বইটি আমার হাতে বইটির শেষ পৃষ্টায় ঐ ইনভাইটেশন টি ছাপা ছিল ঠিকানা ওখানে আছে । আমার পকেটে ইন্ডিয়ান রুপি বলতে কাঁনা কঁড়িও নেই । ভিন্ন একটা দেশে অজপাড়া গাঁও ডলার কই ভাংগাই খুব চিন্তায় পড়ে গেলাম ছিনতাই হওয়ার ভয় আছে বাংলাদেশ হলে তো ২০০% ।
হিন্দুস্থান ঘুরতে এসে নিজের কিছু বিষয় জানলাম ভাল যেমন আমি মানুষ কে খুব বিস্ষাস করি আর মানুষ ও আমার বিস্সাস রাখে প্রায় প্রতিবার ।
ভদ্যলোকের একঘোড়া ওয়ালা একটা টমটম গাড়ি আছে । ইস্টিশন থেকে রামপুরে যাত্রী আনা নেয়া করে আমি বিরক্তকর সুটকেশ্টা নিয়ে ভাইজানের টমটম গাড়িতে উঠে পড়লাম খুবই প্রাকৃতিক মনে হলো সব কিছু বিষয়টা ।
ভাইসাব মেরে কো ডলার একচেণ্জ কারনা হ্যয় ? ই-ধার মানি একচেন্জ অফিস কাহা হ্যয় ? পেহলে মুজে উ-ধার লে চালিয়ে ,উছকে বাদ মুঝে ইছ পাতে ম্যেয় যানা হ্যেয় ।
ঘোড়ার গাড়ি ছুটে চলছে চারশত বছর পুড়ানো এক নগরীর দিকে ,বোঝা যায় এক কালে এ নগর কোন রাজা মহারাজারাই তৈরি করছে । বিশাল বিশাল অট্টালিকা কিন্তূ জড়াজির্ন ভাংগাচুড়া বাট্ এনটি্ক আই লাভ এনটি্ক , এনি ওয়ে বিশাল বিশাল অট্টালিকা মুসলিম আদি সভ্যতার নিদর্শন মিনার গুমবোজ একটু পর পর । আমি বিস্শয়ে অভিভুত , অসাধারন কেবল চেয়েই থাকতে ইচ্ছা করে ( আমার একটু সমস্যা আছে এই ব্যাপারে ) পুরাতন সব কিছু আমাকে খুব টানে একটু আবেগপ্রবন হয়ে যাই এনি ওয়ে ,,
টমটম আমাকে নিয়ে গেল এক পুরানো কেল্লার ভিতর দিয়ে এক বাজারে 'মকামে '। রামপুর বাজার , রামপুরের টুপি আর রামপুরের চাঁকু বিশ্ব বিক্ষাত টমটম ওয়ালা ভাই একজন ভদ্যলোক কে নিয়ে আসলো আমার কাছে তিনি ডলার ব্যাবসা করেন । ৪৭ রূপি হারে ১০০ ডলার একচেন্জ করলাম। বাজার থেকেই একখানা রামপুরি টুপি কিনলাম ৪০ রূপি দিয়ে , রামপুরি চাঁকু কিনা উচিত ছিল কিন্তূ নিরাপত্তা জনিত কারনে কেনা হয় নাই ,তারপর আবার ছুটলাম টমটমে। টমটম গাড়িটায় চলা কালিন কখন টমটম কোন আওয়াজ হয় নাই তবু কেন এর নাম টমটম বুঝতে পারছি না । টগবগ হওয়া উচিত ছিল কারন ঘোড়াঁ তো টগবঘ টগবগ করে ।
ঢাকায় নবাব বাড়ি গুলোর মত এখান কার বাড়ি ঘর দালান কোঠা গুলো চমৎকার । কিণ্তূ এখানকার মানুষ গুলো অতিদরিদ্র এ কারনে বড় বে মানান লাগছে । অভাব অনটন মাখা আজকের সভ্যতার কাছে লজ্জায় লাল হয়ে আছে প্রাচীন নবাবি সভ্যতা ।
টমটম গাড়ি ওয়ালা ভাই বেশ কিছু খান্কায় গিয়ে জানতে চেষ্টা করলো আমার ঠিকানার সন্ধান কিন্তূ ঠিকানা সন্ধান মিলছিল না , বড় মুশকিলে পড়লাম পাথরের রাস্তা দিয়ে টমটম চলছে মাকাম থেকে মাকামে , খান্কা থেকে খান্কায় ঠিকানা সন্ধান মিলছে না ....অবশেষে
ওবাইদুল্লাহ খাঁন এর বড় ছেলে জুনাইদুল্লাহ খাঁন তার মাকামে (বাজারে) একটা ট্রাভেল এজেন্সি আছে খুজতে খুজতে অবশেষে পাওয়া গেল ।
অতি প্রাচীন নক্শার কারূকাজ করা খন্কার কাঠের দরজা , টোকা দিতে ই বাংলাদেশি এক তরূন বেরিয়ে এলো খুব হাশি খুশি । পরিচিত মনে হলো ,অতপর পরিচয় হলো ও আমার দূরের সম্পর্কে আত্বিয় হন এখানে পড়াশুনা করেন । 'আলহামদুলিল্লাহ ' অনেক দিন পর দেশের মানুষ আবার দুরের সম্পর্কে আত্বিয় মনটা ভরে গেলো ।
পিরসাহেব হুজুর জাইফ হয়ে গেছেন "হযরত মুহাম্মদউল্লাহ খাঁন "বয়স ৯০ এর কাছা কাছি এত সুদর্শন ! মাঁশা-আল্লাহ ! নুরানি চেহারা কি সুন্দর তিনি সুবহান-আল্লাহ ! মন টা ভরে গেল তাঁর এই আলোকিত চেহারা দেখে । আফগানিস্তানের পাঠ্ঠান বংশের অতি উচ্চ শিক্ষিত আলেমে দীন , ভারত বর্ষে তত কালিন সবচেয়ে বুজুর্গ ব্যাক্তি । বয়সের ভার তাকে একটুও কমজোড় করতে পারে নাই । মনের শক্তির কাছে বয়স কিচ্ছূনা । এত দুর্দান্ত এত শক্তিমান মানুষ আমি জিবনে দেখি নাই তার ব্যাক্তিত্য এতোটাই নিখুত ছিল যে যা দেখে সম্মানে মাথা নিচু হয়ে আসে । সাদা ধবল দাড়ি মোবারক এতো সুন্দর রেশমের তৈরি মনে হয় , চুল গুলো এতো সুন্দর করে কাটা চিন্তাই করা যায় না চশমার ভাড়ি লেন্ছের কাচের ভিতর থেকে দেখা যায় তাঁর উজ্বল চোখ জ্বল জ্বল করছে , এই চোখে কি আছে !!
আমি কথা বলতে পারছিলাম না বাংলা ইংরেজি আরবি উর্দু ফার্সি সব ভুলে গেছি জাস্ট ইসপিচ ল্যেছ । বোকা বোবা একটা মানুষ , সর্বশক্তি প্রয়োগ করেও একটি শব্দ উচ্চারন করতে পারছি না । কি আস্চয্য !! ভয়ে স্রধ্ধায় আমি মরতে বসে ছিলাম ।
হযরত জিঁ ( হযরত মুহাম্মদউল্লাহ খাঁনকে সবাই হাযরত জিঁ ও হযরত সাব বলে সম্মধন করে থাকে ) হায়রান পেরেশাঁন হয়ে গেছেন ! কি আস্চয্য ! আমি কিচ্ছু বলতে পারছি না বাংলাদেশ থেকে আসছি , কি আষয় ? কি বিষয় ? আঁ করে দাড়িঁয়ে আছি । বাংঙালি যে ছেলেটা আমার দুরসম্পর্কের আত্বিয় ওকে দিয়ে তিনি জানতে চেস্টা করলেন আমি একটি শব্দও বলতে পারলাম না আমি আরো ভয়ে জবুসবু হয়ে "থ " হয়ে রইলাম .... অনেকক্ষন । আজও এই বিষয়টা নিয়ে আমি চিন্তা করি কি হয়েছিল আমার ? হযরত জিঁ আমাকে নাস্তার হুকুম দিয়ে ঘরে চলে গেলেন তার পর আমি আছতে আছতে স্বাভাবিক হতে লাগলাম ।
খান্কার সামনে হযরত জিঁ র বসবার জায়গা ছিলো তার ঠিক পাশে একটি ঘরে আমাকে থাকবার অনুমতি দিলেন । হযরত জিঁর রূচিবোধ ছিল উচ্চমানের ম্ছরিন পাতলা সাদা পানজাবি নবাবি কাট পায়জামা পায়ে নাগড়াঁ বাদশাহি হাতে অপুর্ব একটা লাঠি দুজন খাদেম দূপাশ দিয়ে তাকে আগলে রাখতো আর একটা সাদা রুমাল কাধেঁ থাকতো । রাজা বাদশা সম্পর্কে শুনেছি কিন্ত চোখে সামনে যাকে দেখছি মানুষের মধ্যে সেই তো রাজা । বাদশাহ হবার সকল যোগ্যতা কেবল তারঁ ই তো আছে ।
নামাজের আজান হলো আমি অজু করে খানঁকা থেকে একটু দুরে একটি প্রাচিন মসজিদে নামাজ পড়তে গেলাম ,হজরত জিঁ নিজে ইমামতি করলেন ।
হজরত জিঁর জালালী তাবিয়াত , জামালী মেজাজ , বাদশাহি আদা ,আমাকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখতো ।
মাগরিবের নামাজের পর হজরত জিঁ তার বিশেষ খান্কায় তাসবিহ খতম পরিচালনা করতেন , হজরত জিঁ তাঁর গদিতে (মখমলের গদি কোলবালিশ বেস্টিত সাদা ) বসে আছেন বেশ কিছু তার অনুশারিরা গোল হয়ে এক সাথে বসে হজরত জিঁ যে দোয়া তিলাওয়াত করছেন তারা ঐ দোয়া মনে মনে তছবিহ ( বেশ কিছু দানা সম্ভবত কোন ফলের বিচি ) গুনে গুনে অতান্ত আদব ও মোহাবতের সাথে পাঠ করছে । এতো মিশ্টি ( দরাজ ) হজরত জিঁ কন্ঠ ! আল্লাহ কতই না সুন্দর সৃষ্টিকারি ।
হযরত জিঁ দরাজ কন্ঠে খত্মে খাজেগান এর দোয়া সমুহ এক এক করে তিলাওয়াত করছেন আর সকল মুরিদান আশেকান মুহিব্বিন সেই তছবির দানা গুনে গুনে তা মনে মনে পাঠ করছেন । একট ঘন্টা সময় কখন যে পার হয়ে গেল .... খত্ম শেষে মোরাকাবা " সুফী মেডিটেশন " হজরত সাব তাঁর সাদা রূমাল খানা দিয়ে তাঁর মাথা মোবারক ডেকে দিলেন ঘরে কোন আলো নাই শুধু এক কোনায় একটা মোম বাতি জ্বলছে । কিছুক্ষনের মধ্যে তাকিয়ে দেখি হজরত জিঁ এতো অন্ধকারে ও জ্বল জ্বল করছেন তাঁর সাদা কাপরে আবৃত আবয়ের উজ্বলতা আসাভাবিক বেশি . আলোর রৌশনী ছড়াচ্ছে যেন আসমানি থেকে এক নুঁর ( আলো ) তাকে ছায়া দিচ্ছে । আমি নিঃস্চিত তাঁর প্রভু তাঁর প্রতি খুশি হয়ে তাঁর সম্মানে এ কাজ টি করেছেন ।
.....আমি স্রিষ্টিকর্তার এতো প্রিয় এক বান্দার এতো কাছে অবস্থান করছিলাম বিস্শাস হচ্ছিল না . আমি এই আলো আধারের খেলায় কোথায় যেন স্রিষ্টিকর্তাকে অনুভব করলাম ,মনের অজান্তে বিরবির করছি ...হে আল্লাহ পরম দয়ালু নেহায়েত মেহেরবান তুমি আমাকে ক্ষমা করো তোমার প্রিয় বান্দার উছিলায় আমি তোমার স্রষ্টির সবচেয়ে নিঃকৃষ্ট অতান্ত সিমালংঘন কারি . তোমার নিয়মের সিমা লংঘন করে নিজেকে ফেলেছি লজ্জায় . হে আল্লাহ আমি লজ্জিত্ তোমার কাছে ... প্রিয় প্রভু আমার তুমি যদি ক্ষমা না কর আর কোন প্রভু নাই যে ক্ষমা করবে আমায় ,তুমি যদি কবুল না করো আর কোন সযোগ নাই আমার দোওয়া কবুল হওয়ার ।
নরাধম পাপি এতো
ঘৃনা করে সকলে তো
সবার হইতে মন্দ কত
জান পরওয়ার
মউত আসিয়া গেল
দাড়ি চুল ধলা হলো
কিন্তূ মুখ কালা রইলো
গুনাহ তে আমার ।
যামানার শ্রেষ্ট সাধক কে কিছুদিন খুব কাছ থেকে দেখবার গৌরবময় সৌভাগ্য হয়েছিল আমার । আমি যে উদ্দেশ্য নিয়ে ভারত সফর করছিলাম আমার উদ্দেশ্য সফল হয়েছিল হযরত জিঁ কে দেখার পর আমার এ জিবন সার্থক হয়েছিল হযরত জিঁ কে দেখার পর ... .আলহামদুলিল্লাহ ।
করুনাময়ের করুন ধাঁরা আমার এবং আমার ভালোবার মানষদের উপর যেন চির দিন প্রবাহিত হয় এই প্রত্যাশায়.........

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

