somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

0: একটি স্বর্গীয় পরিভ্রমণের গল্প (২)

১১ ই মার্চ, ২০০৯ সকাল ১১:১৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


0: একটি স্বর্গীয় পরিভ্রমণের গল্প (১): Click This Link

শূন্যের শৈশব
পবিত্র নবী ঈসা মসীহের (Jesus Christ) জন্মের প্রায় ৩০০০ বছর আগের কথা--মেসোপটেমিয়া অঞ্চলের সুমেরীয়্গণ (Sumerian) স্থানীয়্মান ভিত্তিক সূক্ষ্ম এক সংখ্যাপদ্ধতি গড়ে তোলে। সুমেরীয়দের কাছে সংখ্যা ছিল স্বর্গীয়, সংখ্যার মধ্য দিয়ে তারা প্রকাশ করত তাদের দেব-দেবীদের। তাদের কাছে ৬০ ছিল একটি পরিপূর্ণ সংখ্যা, তাই সকল দেব-দেবীর পিতা আনু'র সংখ্যা ছিল ৬০। অন্যান্য দেব-দেবীরা ছিল আনুর ভগ্নাংশ, যেমন চন্দ্রদেবতা নানা'র সংখ্যা ৩০, আর নানার মেয়ে দেবী ইশতার, যাকে গ্রিকরা আফ্রোদিতি এবং রোমানরা ভেনাস নামে অভিহিত করে, এর সংখ্যা ১৫।

তো সুমেরীয়দের সংখ্যাপদ্ধতি ছিল ৬০-ভিত্তিক, আমাদের মত ১০-ভিত্তিক না। তাই আমরা যদি ১৭ লিখি এর মানে হচ্ছে ১-দশ ৭-এক। কিন্তু সুমেরীয়রা যদি ১৭ লিখত তার মানে হত ১-ষাট ৭-এক বা আমাদের বর্তমান ৬৭-এর সমান। তবে তাদের তো আর আমাদের ১, ২, ৩ এর মত চিহ্ন ছিলনা; তারা মাত্র দুটি চিহ্ন ব্যবহার করত: Y-আকৃতির ১ ও কোণ আকৃতির ১০:


খ্রিস্টপূর্ব ১৭৫০ সালের দিকে সুমেরীয় সভ্যতার পতন ঘটে উত্তর থেকে আসা এক জাতির কাছে। এদের রাজার নাম হাম্মুরাবি (Hammurabi) আর এরা মহাপ্লাবনের নবী পবিত্র নূহের (Noah) বড় পুত্র সেম'র বংশধর, তাই এদেরকে বলা হ্য় সেমেটিক (Semitic) জাতি। আবার মূল এলাকার নামানুসারে এদেরকে ব্যাবিলনীয়ও বলা হ্য়। এই ব্যাবিলনীয়রা (Babylonian) সুমেরীয়দের কাছ থেকে সংখ্যাপদ্ধতিসহ নানা জ্ঞান লাভ করে। সংখ্যা নিয়ে কাজ করতে করতে এরা একসময় দেখল কিছু স্থানে কোন অংক রাখা যায় না। যেমন আমরা ১০৫ লেখি ১, ০, ৫ দিয়ে যার মানে ১-শত, কোন দশ নেই, ৫-এক। তেমনি ব্যাবিলনীয়রা তাদের ১০৫ লিখত এভাবেঃ

মাঝখানে ফাঁকা জায়্গা মানে হচ্ছে 'কোন অংক এখানে বসবে না'। কিন্তু এতে সমস্যা, পরে যারা পড়ত কেউ ভাবত ১০৫, কেউ ১৫। ফলে তারা ফাঁকা জায়গার পরিবর্তে দুটি তীর্যক গদার মত চিহ্ণ ব্যবহার করা শুরু করল।

মেসোপটেমিয়ার কীশ নগরে পাওয়া মৃত্তিকালিপি (৭০০ খ্রিস্টপূর্ব) থেকে দেখা যায় বেল-বান-আপলু (Bel-ban-Aplu) নামে একজন লেখক তিনটি হুকের মাধ্যমে লিখতেন। এভাবেই প্রথম শূন্যের প্রচলন ঘটে।

অবশ্য ব্যাবিলনীয় এই শূন্য পরিপূর্ণ শূন্য ছিলনা কারণ এটি কখনো স্বতন্ত্র সংখ্যা হিসেবে ব্যবহৃ্ত হতো না, কিংবা কখনো সংখ্যার ডানে বসত না, মাঝে বসত।
"তাহলে তারা আট এবং আটশ'র মধ্যে কিভাবে পার্থক্য করত?" জেরীনের চিন্তায় চমৎকৃত হই।
কোন প্রসংগে সংখ্যা আলোচনা করছে তা দেখে। ধরো, ফারিনের কাঠপেন্সিলটার দাম যদি বলি আট, আবার এবার ঈদে আম্মু ফারিনকে যে ড্রেসটা দিয়েছেন তার দামও আট, তুমি কি বুঝবে?
"বুঝেছি বাবা, আট টাকা আর আটশ টাকা।"

মিশরীয়দের হায়ারোগ্লিফ (Hieroglyph) বা পবিত্রলিপিতেও সংখ্যাচিহ্নের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। তবে মিশরীয়দের সংখ্যা ১০-ভিত্তিক হলেও আমাদের মত স্থানীয়মান ভিত্তিক ছিলনা; বড় বড় সংখ্যার জন্য তাদের আলাদা প্রতীক ছিল।


মিশরীয়্গণও সংখ্যাকে মনে করত স্বর্গীয়। তারা মনে করত নীলনদের দেবতা ওসিরিস (Osiris) ও উর্বরতার দেবী আইসিসের (Isis) পুত্র আকাশদেবতা হোরাসের (Horus) চোখ স্বর্গীয় ভগ্নাংশে গঠিত, তাই ভগ্নাংশের প্রতীক হিসেবে তারা বেছে নেয় হোরাসের চোখের বিভিন্ন অংশ। মিশরীয়দের হিসাবরক্ষণে দুই-ঘরা নগদান বইতে ন-ফ-র (nfr)নামে একটি চিহ্ন লক্ষ্য করা যায়-অনেকের মতে এটিই তাদের শূন্য।


গ্রিকরা ছিল মিশরীয়দের ছাত্র; বিভিন্নমাত্রার সংখ্যার জন্য তাদেরও ছিল নানা প্রতীক। অবশ্য ততদিনে ফিনিশীয়দের (Phoenician) বর্ণমালা পেয়ে যায় গ্রিকরা, গড়ে উঠে গ্রিক বর্ণমালা। সংখ্যাপ্রতীক হিসেবে হায়ারোগ্লিফ চিহ্নের পরিবর্তে গ্রিকরা তাই তাদের বর্ণ ব্যবহার শুরু করে।


গ্রিকরা সংখ্যা নিয়ে গবেষণা করেছে বহু, কিন্তু দৈনন্দিন বাস্তবজীবনে এর প্রয়োগ নিয়ে ভাবেনি তেমন। ঋণাত্মক সংখ্যারও যে অস্তিত্ম থাকতে পারে তা তারা বিশ্বাস করত না। তাদের যুক্তি ছিল যা কিছুই না তা আবার কি ধরনের সংখ্যা, আর এর চেয়ে ছোট কী-ই বা হতে পারে! তারা বলত, ex nihilo nihil fit--যা কিছুই না, তা থেকে যা আসে তাও কিছুই না। আর এর ফলে গ্রিকদের শূন্য বলে কোন সংখ্যা ছিলনা।
"আহারে বেচারা গ্রিক!" সহমর্মিতা ঝরে জেরীনের কন্ঠে।

তোমরা যখন বড় হবে, তখন দক্ষিণ ইটালির এলিয়া শহরের এক প্রাচীন গ্রিক দার্শনিকের কথা শুনবে, তার নাম জেনো (Zeno)। কিছু অদ্ভুত, অবাস্তব কথা বলে গিয়েছেন তিনি। যেমন তিনি একবার বলেছিলেন, গ্রিক বীর একিলিস পেছন থেকে দৌঁড়ে কখনো একটি কচ্ছপকে ধরতে পারবে না, তা একিলিস যত জোরেই দৌঁড়াক না কেন। তার এই অদ্ভুত কথাগুলিকে বলা হয় জেনো'র প্যারাডক্স
"কিন্তু বাবা, বাস্তবে তো এটি সত্যি নয়!"
হ্যাঁ, কিন্তু জেনো যেহেতু শূন্য চিনতে পারেন নি, তাই এই বিভ্রান্তিগুলি সৃষ্টি হয়েছিল।
[চলবে]
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই মার্চ, ২০০৯ সকাল ১১:৪২
৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×