হারারে শহরের ইস্টগেইট সেন্টার (Eastgate Centre), জিম্বাবুয়ের সর্ববৃহৎ দফতর ভবন ও বিপণি বিতান। বিস্ময়কর এক স্থাপত্য নিদর্শন ভবনটি, তবে ব্যাপকতার জন্য নয়, বরং এর নির্মাণ শৈলীতে জৈব-অনুকরণ (biomimicry) নীতি প্রয়োগের কারণে। সবুজ স্থাপত্য এবং বাস্তুসংস্থানগত অভিযোজনের প্রকৃষ্ট উদাহরণ এটি। গতানুগতিক কোনো শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেই ভবনটিতে, নেই কোনো উত্তাপ ব্যবস্থা। কিন্তু সারাবছরই এটি থাকে তাপীয় নিয়ন্ত্রিত, বিস্ময়করভাবে কম শক্তি খরচ করে।
ভবনটির নকশার অনুপ্রেরণা এসেছে উইপোকার (termite) কাছ থেকে। আফ্রিকার তৃণভূমিতে (savannah) দৈত্যাকার ঢিবি বানিয়ে তার ভেতর ছত্রাকের চাষ করে উইপোকা—ছত্রাক এদের প্রধান খাবার। ছত্রাকের সুষ্ঠু জীবন বিকাশের জন্য ৮৭ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রা প্রয়োজন, কিন্তু জিম্বাবুয়ের রাতগুলি হয়ে থাকে বরফশীতল, ৩৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট, আর দিনগুলি ছড়ায় ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইটের উত্তাপ।
এরকম বৈরী পরিবেশেও চমৎকারভাবে সঠিক তাপমাত্রাটি বজায় রাখে উইপোকারা, দিনের বিভিন্ন সময়ে ঢিবির গায়ে উষ্ণ এবং শীতল রন্ধ্রপথ (vent) ক্রমাগত খুলে দিয়ে। তাপের পরিচলন প্রক্রিয়া (convection) ব্যবহার করে, ঢিবির নিচের রন্ধ্রপথগুলি দিয়ে বাতাস টেনে ভেতরে নিয়ে যায় উইপোকা; তারপর মাটির দেয়ালের ভেতর বানানো নিঃসরণ পথের মধ্য দিয়ে তা প্রবাহিত করে দেয় উপরের দিকে। ঢিবির বিভিন্ন প্রকোষ্ঠ থেকে তাপ গ্রহণ করে ধীরে ধীরে উষ্ণ হয়ে উঠে বাতাস, এবং এক সময় বেরিয়ে যায় চূড়ার উষ্ণ রন্ধ্রের ভেতর দিয়ে। আবহাওয়া পরিবর্তনের সাথে সাথে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে, পরিশ্রমী উইপোকা প্রতিনিয়ত খুঁড়ে চলে নতুন নতুন রন্ধ্রপথ, আর বুঁজে দেয় পুরাতন পথ।
ইস্টগেইট সেন্টার, যা মূলত কংক্রিট দিয়ে তৈরি, কাজ করে উইপোকার মতো। ভবনটির নিচতলার পাখাগুলি বাতাস চুষে নিয়ে উপরের তলার দিকে ছুঁড়ে দেয়, মেঝের ভেতরের ফাঁপা জায়গার সাহায্যে। সেখান থেকে বেসবোর্ড ফোকরের মধ্য দিয়ে তা ছড়িয়ে পড়ে প্রতি তলায়। সবশেষে বেরিয়ে যায় ছাদের চিমনির মধ্য দিয়ে। ঋতুর পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে ভবনটিতে বায়ুপ্রবাহের হারেরও তারতম্য করা হয়।
গতানুগতিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আমদানি না করার দরুন, ৩৬ মিলিয়ন ডলার খরচে তৈরি ভবনটিতে প্রথমেই সাশ্রয় হয় ৩.৫ মিলিয়ন ডলার। এছাড়া সমান আকারের একটি গতানুগতিক ভবনের চেয়ে ইস্টগেইট সেন্টার মাত্র ১০ শতাংশ শক্তি ব্যয় করে। সাশ্রয়ের কারণে, এর ভাড়াটেরা আশেপাশের ভবনের ভাড়াটেদের চেয়ে ২০ শতাংশ কম ভাড়া দিয়ে থাকে।
একটু গাণিতিক আলোচনা
উইপোকা যত সহজে তার ঢিবিকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রাখে, মানুষের ক্ষেত্রে অতটা সহজ নয় ব্যাপারটি। ইস্টগেইট ভবনটি নির্মাণ করতে গণিতবিদগণ নির্দিষ্ট সুচনাবিন্দু এবং সীমার মধ্যে বেশ অনেকগুলি আংশিক ব্যবকলন সমীকরণ (partial differential equation) সমাধান করেন। প্রয়োজন হয় নিউমেরিক্যাল অ্যানালাইসিস, জেনেটিক এলগোরিদম এবং আর্টিফিসিয়াল নিউরাল নেটওয়ার্কের। কাজেই আমার ধারণা, উইপোকা, যা জন্মান্ধ, গণিতের জ্ঞান রাখে বিস্ময়কর।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই মে, ২০০৯ সকাল ১০:৪৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


