পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র অর্ধশত বছর কেটে গেছে।
বৈঠকের পর বৈঠক হয়েছে।
কিন্তু এখনো শুরু হয়নি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ কাজ।
কেন্দ্রের মালিকানাও নির্ধারণ হয়নি।
হয়নি অর্থের সংস্থান
পঞ্চাশ বছর কেটে গেছে। বৈঠকের পর বৈঠক হয়েছে। কিন্তু রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জায়গা ফাঁকা পড়ে আছে। কারণ এ প্রকল্পের কাজ চলছে ঢিমেতালে। এছাড়া এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকানা কার হাতে থাকবে এখনো সে সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি সরকার। একই সঙ্গে প্রকল্পের অর্থ সংস্থানে সরকারের কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। পরমাণু ব্যবহারে বৈধতা ও নিরাপত্তা সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক আইন অনুমোদনের ব্যবস্থাও হয়নি এখনো। সান্ত¡না শুধু প্রকল্প বাস্তবায়নকারী দেশ হিসেবে রাশিয়ার সঙ্গে আপাতত লিয়াজোঁ চালিয়ে যাচ্ছে সরকার।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ২০১৭ সালের মধ্যে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ১০০০ মেগাওয়াট এবং ২০১৮ সালে আরো ১০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সংযোজনের কথা বলা হচ্ছে। এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সরকারের মালিকানায় স্থাপন করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন দায়িত্ব পালন করতে পারে। বিজ্ঞান এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় প্রশাসনিক মন্ত্রণালয় হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জনবল রাজস্ব খাতে সৃজনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতেও পরামর্শ দিয়েছে তারা। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে গঠিত কারিগরি কমিটির সভায় এসব বিষয়ে আলোচনা হয় বলে জানায় সূত্র।
সূত্রে আরো জানা গেছে, বাংলাদেশ এটমিক এনার্জি রেগুলেটরি এ্যাক্ট-২০১০ শীর্ষক আইনের খসড়া এবং ভিয়েনা কনভেনশন অন সিভিল লাইবিলিটি ফর নিউক্লিয়ার ড্যামিজ-১৯৬৩-এ বাংলাদেশ অ্যাকসেশনের বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতামত নিয়ে এর সুবিধা অসুবিধা উল্লেখ করে মন্ত্রিসভার নীতিগত অনুমোদনের জন্য বিজ্ঞান এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে।
জানা গেছে, টানকি পদ্ধতিতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হতে পারে। এখানে ১০০০ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতাস¤ম্পন্ন একই ধরনের ২টি পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিট নির্মাণ করা হবে। এজন্য দেশের প্রচলিত আইন এবং আন্তর্জাতিক রীতিনীতি অনুসারে সরকার টু সরকার পর্যায়ে একটি দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা চুক্তির আওতায় প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে। একই সঙ্গে প্রকল্পের সাইটনিরাপত্তা প্রতিবেদনও চূড়ান্ত করা হবে। এসব কাজের সমন্বয়ের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি সেল গঠন করা হবে।
এ ব্যাপারে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখনো পর্যন্ত প্রকল্পের ইঞ্জিনিয়ারিং ডাটার কাজই সম্পন্ন করা হয়নি। কি পদ্ধতিতে প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে তা এখনো স্পষ্ট হয়নি। তবে তারা জানিয়েছে, প্রকল্প নির্মাণের জন্য যত ধরনের সাপোর্ট দেয়ার কাজ আছে তা ২০১২ সালের মধ্যে সরকারকে দেয়া হবে। এসব সাপোর্টের ভিত্তিতেই সরকার বাস্তবায়নকারী দেশের সঙ্গে চুক্তি করবে। বর্তমানে অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করার কাজ চলছে। তারা জানান, ইঞ্জিনিয়ারিং ডাটা হাতে পেলেই সরকার টু সরকার অ্যাগ্রিমেন্ট হবে। এরপর ইঞ্জিনিয়ারিং প্রকিউরম্যান কন্ট্রাকশন অ্যান্ড প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট চুক্তি করবে। এই চুক্তিতেই উল্লেখ থাকবে প্রকল্পের মালিকানায় কোন প্রতিষ্ঠান থাকবে। এটা কি পদ্ধতিতে বাস্তবায়ন করা হবে। এছাড়া প্রকল্পের কারিগরিসহ সব ধরনের বিষয় এখানেই উল্লেখ করা হবে।
বিজ্ঞান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান বলেন, এ বিষয়ে গঠিত বিভিন্ন উপ-কমিটি কাজ করছে। এরই মধ্যে রাশিয়ার সঙ্গে সমঝোতা স্মারক এবং ফ্রেম ওয়ার্ক চুক্তি হয়েছে। এখন সরকার টু সরকার চুক্তির প্রক্রিয়া চলছে। এটিও হয়ে যাবে বলে তিনি আশা করেন।
প্রকল্পের বিনিয়োগ : পাবনার রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য রাশিয়া রোসাটম বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সঙ্গে যৌথ অংশীদারির প্রস্তাব দেয়। কিন্তু বাংলাদেশ তহবিল সঙ্কটের বিষয় উল্লেখ করে প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি। বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো এ ধরনের প্রকল্প হাতে নিতে যা”েছ বলে রাশিয়ার সঙ্গে যৌথ অংশীদারির প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে চায় না।
এ বিষয়ে ইয়াফেস ওসমান বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের টাকার সংস্থান এখনো হয়নি। তবে রাশিয়া এ খাতে যাতে বিনিয়োগ করে সে জন্য লিয়াজোঁ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আশা করা হচ্ছে তারা বিনিয়োগ করবে।
কারিগরি দলের সর্বশেষ সফর : এরই মধ্যে রাশিয়ার আট সদস্যের একটি কারিগরি দল বাংলাদেশ সফর করেছে। দলটি ঢাকায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার পাশাপাশি রূপপুর ঘুরে দেখেছেন। গত ৩০ জুন বিজ্ঞান এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত আলোচনার সময় রুশ প্রতিনিধিদল প্রকল্পের আশপাশের লোকজনকে প্রকল্পের ব্যাপারে সচেতন করে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন।
উল্লেখ্য, ভারতসহ বিশ্বের ১৪টি দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ¯’াপন করেছে রাশিয়া। আর এ ধরনের বিদ্যুৎ প্রকল্পের মূল উপাদান ইউরেনিয়াম। রাশিয়া বিশ্ববাজারে ইউরেনিয়ামের ৪০ শতাংশ সরবরাহ করে থাকে।
দীর্ঘসূত্রতা ও সম্ভাবনার হাতছানি : নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর আলোর মুখ দেখবে পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে রাশিয়া আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এরই মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ের দাপ্তরিক কিছু কাজকর্মও শেষ হয়েছে।
সূত্র মতে, ১৯৬১ সালে প্রকল্পটি শুরুর উদ্যোগ নিলেও আন্তর্জাতিক নানা জটিলতায় তা চালু করা সম্ভব হয়নি। ৫০ বছরে প্রকল্পটি নিয়ে আলোচনা হয়েছে কানাডা, সুইডেন, নরওয়ে, রাশিয়া, ফ্রান্স, ব্রিটেন, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে। এরপরও রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়নি। বর্তমান মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এসে প্রকল্পটি চালুর নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়। এ প্রকল্প অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে হাতে নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিলেও নানা অসুবিধা ও প্রতিবন্ধকতার কারণে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হয়নি। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে এ প্রকল্পের কোনো গতি হয়নি। গত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আবারো উদ্যোগ নেয় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের।
পূর্বকথা : মূলত ১৯৬১ সালে এ প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। ঈশ্বরদী উপজেলার পদ্মা নদীর তীরে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের প্রায় এক হাজার মিটার পূর্ব-দক্ষিণ কোণে এ প্রকল্প স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়। এজন্য তৎকালীন সরকার ২৫৯ দশমিক ৯০ একর জমি হুকুম দখল করে। ওই সময় দিয়ার রূপপুর ও চর রূপপুর মৌজায় বসবাসরত ৪০৪টি পরিবারকে ক্ষতিপূরণ বাবদ ৩৬ লাখ ৩৮ হাজার ৮৬৩ টাকা দেয়া হয়। প্রকল্প এলাকা থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার উত্তরে হাউজিং কলোনি নির্মাণ করতে ৩১ দশমিক ৫৫ একর জমি কেনা হয়। এজন্য ১৩৮টি পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিয়ে ১ লাখ ১৬ হাজার টাকায় এ জমি কেনে সরকার। পরে নতুন রূপপুরে ২ লাখ ৭১ হাজার ৭৮২ টাকায় ৮৮ দশমিক ৪৫ একর জমি ক্রয় করা হয় পুনর্বাসনের জন্য।
প্রকল্পের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ে সাহাপুরে ৪০টি গ্রেড থ্রি, ১২টি গ্রেড ফোর ও ২০টি ফিফথ গ্রেডসহ ৭২টি বাসা বা কোয়ার্টার নির্মাণ করা হয়। একই সঙ্গে অফিস ভবন, অতিথি ভবন ও সম্মেলন কক্ষ নির্মাণ করা হয়। একই সময়ে প্রকল্পের জন্য ২২ লাখ ইটও কেনা হয়। বর্তমানে ৭২টি কোয়ার্টারের মধ্যে ৭টি ব্যবহার করছেন কর্মচারীরা। অবশিষ্ট ৬৫টি কোয়ার্টারের অব¯’া এখন জীর্ণদশা। দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত থাকায় ঝোপ-জঙ্গলে ভরে গেছে কোয়ার্টার ও ইটগুলো। প্রকল্পের প্রশাসনিক কর্মকর্তা, নিরাপত্তারক্ষী ও অন্যান্য কর্মচারীসহ ১৭ জন স্টাফ বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন এখানে।
দফায় দফায় আলোচনা : প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য ৪৯ বছর ধরে অনেক দেশের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু চুল্লি স্থাপনের জন্য মেগাওয়াট পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত ছাড়া বাস্তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের কোনো অগ্রগতি হয়নি। ১৯৬৩ সালে ৭০ মেগাওয়াট পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়। ১৯৬৪ সালে কানাডা সরকারের সঙ্গে চুক্তির ব্যাপারে আলোচনা হয়। ১৯৬৬ সালে কানাডা, সুইডেন ও নরওয়ের সঙ্গে আলোচনা হয় ১৪০ মেগাওয়াট পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের। ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু সরকার ২০০ মেগাওয়াট পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের জন্য রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনা করে। ১৯৭৯ সালে ৩০০ মেগাওয়াটে উন্নীত করতে ফ্রান্স, ব্রিটেন ও কানাডার সঙ্গে আলোচনা হয়। ১৯৮০ সালে ফ্রান্সের নকশায় ও কারিগরি সহায়তায় ৩০০ মেগাওয়াট চুল্লি ¯’াপনের কাজ চূড়ান্ত হয়। ১৯৮১ সালে ব্রিটেন ১৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩০০ মেগাওয়াট চুল্লি ¯’াপনের জন্য প্রকল্প দাখিল করে। কিš‘ অজ্ঞাত কারণে তা বাতিল হয়ে যায়। ১৯৮৮ সালে জার্মানি ৩৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন চুল্লি ¯’াপনে আগ্রহ দেখায় ও প্রকল্প ব্যয় প্রাক্কলন ধরা হয় ২ হাজার কোটি টাকা।
ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদার কথা মাথায় রেখে ১৯৯৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে আবার উদ্যোগ নেয়। প্রাথমিক পর্যায়ে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য চুল্লি ¯’াপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নে আনুমানিক ব্যয় ধরা হয় ১ মিলিয়ন ডলার।
প্রাক্কলিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রকল্পের প্রাথমিক খরচ বেশি হলেও পরবর্তীতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে ব্যয় অনেক কমে যাবে। প্রকল্প এলাকার পরিবেশগত নিরাপত্তা বজায় রাখার ব্যবস্থাও করা হয়।
প্লান্ট থেকে ধোঁয়া নির্গত হবে না, শব্দও থাকবে না। চওড়া দেয়ালের মধ্যে ৮০ টনের রি-অ্যাক্টর বসবে। একবার রি-এ্যাক্টরে জ্বালানি ভরলে চলবে অনেক বছর। ফলে পরিবেশের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই এ প্রকল্পে, এমন কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে জানুয়ারি, ২০১১ বিকাল ৩:১৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





