somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

যন্ত্রণা-১৬ (শেষ পর্ব)

১৭ ই এপ্রিল, ২০১০ রাত ১০:২২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

তমা শুনল মারুফ ডা. মাহতাবকে বলছে, ‘স্যার আমি ম্যাডামের সাথে একটু আলাদা কথা বলতে চাই।’
ডাক্তার ব্যস্ত হয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ নিশ্চয়ই। মা, আপনি এখানে বসুন।’ দেখিয়ে দেয়া সোফাটায় যন্ত্রের মত গিয়ে বসল তমা। সামনের বেডে তমার মুখোমুখি মারুফ। মারুফ কখনোই দেখতে খারাপ ছিল না। কিন্তু ওর মধ্যে কি যেন একটা ভীষণ ব্যাপার ছিল। কেমন সাপের মত, গা গুলানো। তমা একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল মারুফের দিকে।
মারুফ হাসির একটা ভঙ্গি করল, ‘তুমি বদলাওনি। আগের মতই আছো?’
‘কি চাও তুমি?’ দাঁতে দাঁত চেপে প্রশ্ন করল তমা।
অসহ্য যন্ত্রণায় মারুফের মুখটা কেমন কুকড়ে গেল। অনেকক্ষণ মাথা নিচু করে বসে থেকে উত্তর দিল, ‘তমা, আমাকে ক্ষমা করো।’
‘ক্ষমা! ক্ষমা চাইছো তুমি! তুমি জানো ওইদিন আমি তোমাকে খুন করতে চেয়েছিলাম। জানি না, জানি না কেন পারিনি।’ হিসহিসে স্বর বেরুলো তমার গলা থেকে।
‘কেন করলা না তমা? আমি বেঁচে যেতাম তাহলে।’ করুণ আর্তি মারুফের গলায়। ‘তমা, তোমাকে কিছু কথা বলার জন্য আমি ছুটে আসছি দেশে। আমার সময় শেষ হয়ে আসছে। চিকিৎসা করার কিছু নাই। তারপরও ওইখানে থাকলে আমি হয়তো আরেকটু ভাল থাকতাম। কিন্তু আমি আসছি তোমার কাছে।’
‘তোমার কথা শোনার সময় আমার নাই। আমি যাবো এখন।’
‘তমা, প্লীজ তমা, শোনো। তারপর তুমি যা খুশি করো। আমাকে খুন করো, চলে যাও, যা খুশি।’
তমা ঠোঁট কামড়ে বসে থাকে। ও এর শেষ দেখতে চায়।

মারুফ কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে বসে থাকে। তারপর শুরু করে, ‘ওইদিন আমি যা করছিলাম, তার পুরাটাই ছিল ঝোঁকের মাথায়। আমি তোমাকে অতিমাত্রায় পছন্দ করতাম। কিন্তু তুমি যখন আমাকে মানা করলা আমার সহ্য হইল না। আমি জীবনে কখনো না শুনি নাই। আমি ধরে নিয়ে গেলাম তোমাকে।’ উঠে গিয়ে এক গ্লাস পানি খায় মারুফ, আবার এসে বসে। একবার তমার দিকে তাকায়। কিন্তু তমার তীক্ষ্ম দৃষ্টি সহ্য করতে পারে না। মুখ নামিয়ে নেয়। আবার বলতে শুরু করে, ‘ওইদিন আমি তোমাকে তুলে নিয়ে যাই শুধু ভয় দেখানোর জন্য। কিন্তু অজ্ঞান তোমার মুখটা এত অসাধারণ লাগছিল, একবার তোমাকে দেখার লোভটা সামলাতে পারছিলাম না। বের করে দিলাম সবাইকে। তারপর দেখলাম তোমাকে। তুমি এত সুন্দর তমা, এত সুন্দর......আমি সহ্য করতে পারছিলাম না। মাথা কেমন ঘুরে উঠল। সেই আচ্ছন্নতা কাটাতে মাতাল হলাম। চিন্তা-ভাবনা লোপ পেল, কুমন্ত্রণা দিল বাকিরাও। আর তারপরতো.........’ কেশে উঠল মারুফ। অনেকক্ষণ কাশল, হাফাল হাপরের মত। আর তমা যেন পাথরের মূর্তি, স্থির, চোখ ছাড়া আর কিছুরই প্রাণ নেই।
‘ঘুম ভেঙে যখন দেখলাম তুমি নেই, খুব ভয় পেয়ে গেলাম। বাসায়ই ফিরি নাই আর, চলে গেলাম খালার বাসায়। বাবাকে বলে দুইদিনের মধ্যে ব্যবস্থা করে সোজা আমেরিকায়। ওখানে গিয়ে কাটাতে লাগলাম ভয়ংকর উশৃঙ্খল একটা জীবন। কলেজে ভর্তি হলাম, নামমাত্র পড়ালেখা। ভাইয়ার কাছে হাতখরচ পেতাম না বলে একটা নাইট ক্লাবে কাজ জুটিয়ে নিলাম। মদ খাওয়া আর নিত্য-নতুন মেয়ে নিয়ে আনন্দ করা একটা সাধারণ ব্যাপার হয়ে গেছিল তখন। আমি কোন কিছুতেই স্থির হতে পারতাম না। তোমাকে নিয়ে ভাবিনি, কোন অপরাধবোধ কাজ করতো এমনও না। কিন্তু মনে হতো কি যেন আমাকে সারাক্ষণ তাড়া করে ফিরছে। আমি থামলেই আমাকে গ্রাস করে নিবে। এই ভয়েই অস্থির হয়ে শুধু ছুটতাম।’ মারুফ থামে, অস্থিরভাবে চক্কর দেয় পুরো ঘর। পানি খায়, মুখ মোছে। কিন্তু তমা স্থির। তারপর আবার এসে বসে, ‘দুই বছর আগে এক রাতে নাইট ক্লাবে ডিউটি শেষে ফিরছি। ভোর হয়ে গেছে প্রায়। আমি কিছুটা টালমাটাল। একটা অন্ধকার গলির মাথায় আসতেই হঠাৎ করে একটা মেয়ে গায়ের ওপর এসে পড়ল। হাহ্ আমিতো জানিই এসব। মেয়েটাকে টেনে নিয়ে গেলাম গলির ভেতর। ওই সময়গুলোয় কোন কিছুই আমাকে ঠেকাতে পারে না। তখনো পারতো না, যদি না হাল্কা একটা আলো মেয়েটার মুখে এসে পড়তো। বাচ্চা একটা মুখ, ভয়ে কাঁপছে থরথর করে। চোখ বন্ধ। আমি বুঝতে পারলাম ও এই প্রথম এসেছে। আমার কি যে হয়ে গেল! যা কখনো মনে পড়েনি, তাই মনে পড়ল। তোমার মুখটা মনে পড়ল। মনে পড়ল তোমার সেই কাকুতি, সেই কান্না ভেজা চোখ। আমি থমকে গেলাম।
মেয়েটার নাম লিন্ডা। অসুস্থ মায়ের জন্য একটু খাবার যোগাড় করতে ও পথে নেমেছে। একটা আন্ডার কন্সট্রাকশন বিল্ডিং এ পলিথিনের ছাপড়া তুলে ওরা থাকে। হ্যাঁ তমা, ওদেশেও আছে এমন, আমাদের মতই।
আমি ওর সাথে গেলাম। জানি না কত, পকেটে যা ছিল ওর হাতে গুঁজে দিয়ে বেরিয়ে আসলাম। হাঁটতে লাগলাম উদভ্রান্তের মত। দিক-বিদিক হাঁটতে গিয়েই এ্যাক্সিডেন্ট হল। ব্যথা পেলাম মাথায়, ফ্র্যাকচার হল হাঁটুতে। প্রচুর ব্লিডিং হল। ওই সময় ব্লাড টেস্টে ধরা পড়ল আমার এইচ আই ভি পজিটিভ। ভাইয়া খুব অস্থির হয়ে গেল কি করবে ভেবে। কিন্তু আমার কেমন যেন একটা শান্তি লাগল জানো?
বহুদিন লাগল সুস্থ হতে। আমি শুয়ে শুয়ে শুধু ভাবতাম তোমার কথা। ছয় বছরে যা হয়নি, তাই হল তখন। তীব্র অপরাধবোধ আমাকে কুড়ে কুড়ে খেতে লাগল। আমার শুধু মনে হতে লাগল একবার তোমার কাছে আসতে হবে। ক্ষমা চাইতে হবে। তুমি ক্ষমা কর, শাস্তি দাও.....যা কিছু কর। আমার শেষটুকু তোমার কাছেই হোক।
ঘর থেকে যেদিন প্রথম বেরুলাম লিন্ডাকে খুঁজতে গিয়েছিলাম। পাইনি, ওরা অন্য কোথাও চলে গেছিল। আমি ওখানে বসেই তোমাকে খুঁজে বের করলাম। অসুস্থতা, হাসপাতালের ঝামেলা সবকিছু কাটিয়ে ফিরে আসতে আমার লেগে গেল আরো একটা বছর।
কোন রাতে আমার ঘুম হয় না তমা। লিন্ডার সেই ভীত মুখটার পাশে আমি আট বছর আগেকার তোমার মুখটা দেখি। আর পাগলের মত চিৎকার করি।’
তমার পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল মারুফ। দেহটা কেমন ভেঙে-চুড়ে যাচ্ছে যেন। দুহাত জোড় করে করুণ গলায় কাকুতি করতে লাগল, ‘তুমি খুন করতে চেয়েছিলে আমাকে। খুন করো তমা। আমিতো মরেই গেছি। কিন্তু গত দুবছরের নরক যন্ত্রণা থেকে আমাকে রেহাই দাও। আমি আর বয়ে বেড়াতে পারছি না।’

‘মাত্র দুবছর মারুফ! মাত্র দুবছর! আটটা বছর ধরে এই নরক যন্ত্রণা ভোগ করছি আমি। আমিতো মুক্তি পাইনি। তুমি কেন পাওয়ার কথা ভাবছো? তোমাকেতো সহ্য করতেই হবে।’ বরফের মত শীতল গলায় ফিসফিস করল তমা। ধীরে ধীরে বের হয়ে এর হাসপাতাল থেকে।

সন্ধ্যা হয়ে গেছে। হাসপাতালের সামনেই রাস্তার ধারে একটা লেক। রাস্তার সোডিয়াম বাতির আলো পড়ে লেকের পানি চিকচিক করছে। তমা গিয়ে বসল একটা বেঞ্চিতে। কোমল একটা বাতাম এসে জড়িয়ে ধরল তমাকে। সাত সমুদ্র তের নদীর পারের বাচ্চা একটা মেয়ে লিন্ডা ওকে এইভাবে হারিয়ে দিয়ে জিতিয়ে দিয়ে গেল! বহু বহুদিন পরে তমার চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল ঊষ্ণ অশ্রু। মনে মনে প্রিয়ন্তীকে ডাকল তমা, “দ্যাখ প্রিয়ন্তী, লিন্ডা আমাদের জিতিয়ে দিয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত আমার জিতেছি প্রিয়ন্তী। আমি, তুই, লিন্ডা.....
আজরাতে আমি ঘুমাবো, শান্তির ঘুম.....”


................. ......................... ......................................

যখন লিখতে শুরু করি ভাবিনি এটা এতদূর যাবে। কিন্তু এগুনোর পর সেই কলেজে পড়ার সময়ে কল্পনা করা প্লটটাকেই এগিয়ে নিয়ে গেছি। যদিও সেই কাহিনীতে একটা happy ending ছিল। এতদিন পর, জীবনকে অনেক দেখার পর আমি জানি real life এ happy ending হয় না। তাই হল না। যা হল, তাই বা কম কিসে!

অনেক অনেক ধন্যবাদ তাদের, যারা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সাথে ছিলেন। আর উৎসাহ দিয়ে গেছেন।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা আগস্ট, ২০১১ বিকাল ৩:৪০
২৭টি মন্তব্য ২৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×