somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একটি ছবি: কর্পোরেট মানবতা ও অধমের ভাবাবেগ

১০ ই এপ্রিল, ২০১১ বিকাল ৪:১২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

স্কুলে হাজী মহসিনের একটি কাহিনী পড়েছিলাম। একদিন তার কক্ষে গভীর রাতে একজন চোর ঢুকলে হাজী মহসিন তাকে হাতে নাতে ধরে ফেলেন। যথারীতি উত্তম মধ্যম না দিয়ে উল্টো দারিদ্রতার কারণে চুরি করায় চোরকে প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস আর উপদেশ দিয়ে বিদায় করেছিলেন। সম্ভবত ঘটনার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ও শিক্ষার কারণে স্কুলের গাইড বইয়ে এই ঘটনা সংযোজন করা হয়েছিল। অন্য কেউ এই ঘটনা থেকে তখন কোন শিক্ষা নিতে পেরেছিল কিনা জানি না, তবে আমি নিতে পারি নি। হয়তো ঘটনার তাৎপর্য কেউ ব্যাখ্যা না করায় আমার মত আরও অনেক অবুঝ স্কুল ছাত্র ঘটনাটি শুধুই মুখস্ত করেছিল। ঘটনাটি সত্য না মিথ্যা সেটা যাচাই করার সুযোগ অবশ্য আমার হয় নি। তবে ঘটনার শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে যে আমরা উপকৃত হতে পারি এ ব্যাপারে আমি নিঃসন্দেহ। হাজী মহসিনের এই মহতী কাজ মানবতার এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ কোন সন্দেহ নেই।

বর্তমান মানবতার ব্যাপারটাকে খুব জোরে সোরেই উচ্চারণ করা হয়। যত্র তত্র আমরা মানবতা অন্বেষণ করি। মানবতার দোয়াই দিয়ে আমরা সকলের সমান অধিকারের কথা বলি, মানবতার কথা বলে আমরা ন্যায় অন্যায়ের প্রসঙ্গ টানি, আরও অনেক কিছু। মানবতা নিয়ে গলাবাজি করা প্রচুর লোকও সমাজে বিরাজমান। এই পর্যন্ত সবই তাত্ত্বিক। সকলের চাওয়াই এক। কিন্তু মানবতার তাত্ত্বিক আর ব্যবহারিক প্রয়োগের মধ্যে বিস্তর ফারাক। তাত্ত্বিকতার দিক দিয়ে পৃথিবীর সকল মানবতা এক হলেও প্রয়োগের বেলায় মানবতা নিজেই মানবতাহীন। এই মানবতা ধারকদের অবস্থা বর্তমান এমনই বেগতিক যে পশু জবাই করা তাদের চোখে মানবতাবিরোধী কাজ, কিন্তু নিরপরাধ মানুষদের নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা তাদের মানবতার অধীন।

ধর্ম, ধার্মিকতা, ইসলাম, মুসলমান ইত্যাদি প্রসঙ্গে আজকের তথাকথিত মানবতা উহ্য। মানবতা আর ধর্ম এক সঙ্গে আসলে, ইসলামের ক্ষেত্রে তারা মানবতার কথা বেমালুম চেপে যান অথবা মানবতার নিত্য নতুন সংজ্ঞা দেওয়ার চেষ্টা করেন। যদি মানবতা আর মুসলমানদের ব্যাপারটা এক সাথে আসে, তাহলে মুসলমাদেরকে একটা কিছু হিসেবে সাব্যস্ত করে এমন একটা ভাবের উদয় করা হয় যেন মুসলমানদের বেলায় কোন মানবতা প্রযোজ্য নয়। আবার যদি ধার্মিকতা আর মানবতা এক সঙ্গে আসে, তাহলে হাসি ঠাট্টা কিংবা এড়িয়ে চলা অথবা নির্যাতনের পথ বেছে নেওয়া হয়। মানবতা সেখানে জেলখানায় বন্দী থাকে। মানবতা নিয়ে সবচেয়ে উপহাস করা হয় গরীবের বেলায়। গরীবের বেলায় মানবতার স্থান ফাঁসির মঞ্চে। গরীবের কোন মানবতা নেই। তাদের হয়ে মানবতার কথা বলার জন্য কোন মানবধিকার কর্মীও নেই। তাদের জন্য আছে শুধুই লাঞ্চনা গঞ্জনা। এখনকার মানবতা সবার জন্য নয়, শুধু কর্পোরেট লোকদের জন্য, কর্পোরেট মানবতা!

আমাদের দেশের বিত্তশালীদের অধিকাংশই চুরি বাটপারি করেই টাকার পাহাড় গড়েছে। থানার ওসির মত লোকের ছেলের পেছনেও মাসে বিশ থেকে চল্লিশ হাজার টাকা ব্যয় করা হয় শুধু মাত্র লেখাপড়ার জন্য। একজন ওসি কিভাবে এত টাকা খরচ করতে পারে সেই বিতর্কে যাওয়াটা এখন অর্থহীন। পুলিশ, প্রশাসন, আয়কর, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ প্রতিটি পেশায় এমন ঘটনা অহরহ ঘটছে। এরা সবাই মানবতার লোক। মানব সেবা করাই তাদের মুখ্য কাজ। তারা সকলে ক্ষমতাধর, উচ্চ শিক্ষিত। দেশ ও দশের চিন্তা তাদের কাছে গৌণ। বিলাসী জীবন যাপনই তাদের একমাত্র চাওয়া। বিলাসীতার জন্য তারা চুরি করার মত জঘন্য অপরাধ ও মানবতাবিরোধী কাজও হালাল করে নিয়েছে। এখন অবশ্য কোনটা চুরি আর কোনটা চুরি না সেটারও নতুন নতুন সংজ্ঞা দেওয়া হয়। দেশের বারোটা বাজিয়ে কোট টাই পরা কর্পোরেট মানবতার ধারকদের পুকুর চুরি আর এখন আমাদের চোখে পড়ে না। অথচ ক্ষুধার যন্ত্রনায় কাতর হয়ে সামান্য একটু খাদ্য দ্রব্য চুরি (?) করার কারনেও মানুষ কত হিংস্র হয়ে উঠতে পারে তা ভাবলেই গা শিউরে ওঠে।

কয়েকদিন আগে পত্রিকায় একটি ছবিতে দেখা যায় ক্ষিধে সহ্য করতে না পেরে সামান্য কিছু খাবার চুরি করার অপরাধে বিশাল একদল জনতা সাত আট বছরের দুইটি শিশুর উপর নির্দয়ভাবে হামলে পড়ার দৃশ্য। কেউ চুল ধরে টানছে, কেউ কিল-ঘুষি মারছে, যে যেভাবে পারছে সেভাবেই মারছে। ছবিটা দেখার পর নিজেকে অবশ্য ঐ অপরাধ থেকে মুক্ত বলে মনে করতে পারি নি। বরং মানুষের জন্য কিছু না করতে পারার বেদনাটা অনুভূত হয়েছে ভীষণভাবে। একজন সাত আট বছরের শিশুর কাছে অপরাধ, মানবতা সবকিছুই অর্থহীন। সে জানে না মানবতা খায় না মাথায় দেয়। অপরাধীর শাস্তি কি কিংবা অপরাধটাই বা কি সেটাও তার ধারনার বাইরে। সে জানে না বিলাসীতা কি। পেটপুরে আহার করতে পারাটাই অনেক শিশুর কাছে চরম পাওয়া আমাদের দেশে। অথচ এই অবুঝ শিশুরাই আমাদের তথাকথিত সভ্য সমাজে অসভ্যতা, বরবর্তার শিকার। পরণে পোশাক নেই, পেটে খাবার নেই, নেই তাদের জন্য কোন মানবতার বালাই। দুর্ভাগ্য এই শিশুদের এখন আর হাজী মহসিনদের দেখা মেলে না। মাথায় হাত বুলিয়ে মুখে দুমুঠো অন্ন আর কিছু সদুপদেশ দেওয়ার মত লোকও অনুপস্থিত এই সমাজে। মানবতার বিচরন এখন গুলশান বারিধারায়। শত ধিক্কার এই কর্পোরেট মানবতাকে!
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই মে, ২০১২ সন্ধ্যা ৭:০০
৫টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র - ভ্রাম্যমান লাইব্রেরী ভাবনা

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:৪৬


শ্রদ্ধেয় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যাররে হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তার জন্মলগ্ন ১৯৭৮ সাল থেকে অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে। আমার মনে পড়ে, আমি স্কুলে পড়াকালীন সময়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে স্কুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

=একান্ত নিজস্ব জিনিসগুলো পর হয়ে যাচ্ছে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৫



যে চোখ দিয়ে দেখেছি ধরার আলো, সে চোখও দিচ্ছে ফাঁকি,
যে চোখের আলোয় দেখেছি পুকুর নদী, শুকনো উঠোন;
বৃষ্টি ভেজা দিন, দেখেছি ময়না শালিক, ঘুঘু ডাকা দুপুর
সে চোখ পর হয়ে যাচ্ছে অল্প... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:২৩


Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪

আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×