আলোচনা করছিলাম বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলির শিক্ষার মান উন্নয়ন প্রসঙ্গে। এর আগের পর্বে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার মান উন্নয়নে প্রস্তাবিত বিষয়গুলি ছিল বিশ্ববিদ্যালয়গুলির সাথে ইন্ডাষ্ট্রীর যোগসূত্র স্থাপন এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলির জন্য সমন্বিতভাবে কেন্দ্রীয় সেন্টার অব এক্সেলেন্স গঠন। এই পর্বে বর্তমান ধারার ছাত্র রাজনীতির সংস্কার প্রসংগে আলোচনা করছি।
# বর্তমান ধারার ছাত্র রাজনীতির সংস্কার
-------------------------------------------------
বিশ্ববিদ্যালয়গুলির শিক্ষার মানের অবনতির অন্যতম একটি প্রধান কারণ হচ্ছে বর্তমান ধারার ছাত্র-রাজনীতি। আদর্শ বিহীন, রাজনৈতিক দলের লেজুরবৃত্তির এ রাজনীতির ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ মারাত্বক ভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে, সৃষ্টি হচ্ছে সেশন জটের, বিশ্ববিদ্যালয়গুলি অনির্দিষ্ট ভাবে বন্ধ থাকছে মাসের পর মাস এবং এর ফলে সৃষ্টি হচ্ছে সেশন জটের। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া শিক্ষা ও ছাত্রের সাথে সম্পর্কহীন এ রাজনীতি সৃষ্টি করছে কিছু ভবিষ্যত দুবৃত্ত যারা ছাত্র-রাজনীতিকে আশ্রয় করে চাদাবাজী ও দূর্নীতির মহোত্সব করছে। আর এর মুল্য দিতে হচ্ছে সাধারন ছাত্র-ছাত্রীদের। চর দখলের মত হল দখল, সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের রাজনৈতিক কর্মসূচীতে যোগদানে বাধ্য করে এই সকল ছাত্র নামধারী দুবৃত্তরা শিক্ষাঙ্গনে ও ছাত্রাবাসে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করছে।
ছাত্র-রাজনীতির বর্তমান রূপ বহাল রেখে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার মান উন্নয়নে গৃহীত কোন পদক্ষেপেই সফলতা আসার সম্ভাবনা ক্ষীন। তাই সুষ্ঠু ধারার ছাত্র-রাজনীতি, যেটি ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষা ও গবেষণায় সহায়ক শক্তি হিসাবে কাজ করবে, প্রতিষ্ঠার স্বার্থে বর্তমান ধারার ছাত্র-রাজনীতির সংস্কার একটি সময়ের দাবী।
বর্তমান বিদ্যমান পরিস্থিতির কারনে বিভিন্ন মহল থেকে ছাত্র-রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবী উঠলেও প্রয়োজনীয় সংস্কারের উদ্যোগ না নিয়েই এটি নিষিদ্ধ করা কাংখিত ফলাফল বয়ে আনবে না। আর সেজন্য বর্তমানে অসুস্থ ছাত্র রাজনীতিকে সুস্থতার পথে ফেরাতে বিশ্ববিদ্যালয় মন্জুরী কমিশন ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের যৌথ উদ্যোগে নিম্নোক্ত সংস্কারগুলি বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলিকে সম্পৃক্ত করতে হবে এবং এটিকে প্রায়োরিটি ভিত্তিতে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।
১। কেবলমাত্র নিয়মিত ছাত্ররাই কোন ছাত্র-সংগঠনের সাথে যুক্ত হতে পারবে। এক্ষেত্রে নিয়মিত ছাত্র হিসাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ছাত্রদের বোঝানো হচ্ছে। মাস্টার্স বা গবেষণার (এম ফিল, পি এইচ ডি) সাথে যুক্ত কোন ছাত্র কোন ছাত্র-সংগঠনের সাথে যুক্ত হতে পারবেনা। গ্র্যাজুয়েশনের সাথে সাথেই তার সংগঠনের সদস্য পদ বিলুপ্ত হবে।
এর ফলে বিভিন্ন প্রতিনিধিত্বশীল কমিটিতে (ছাত্র সংসদ এবং অন্যান্য) শুধুমাত্র নিয়মিত ছাত্ররাই অন্তর্ভূক্ত হবে এবং শিক্ষা ও ছাত্র স্বার্থ সম্পর্কিত বিষয়ে তাদের মতামত প্রদানের সুযোগ পাবে।
২। কোন ছাত্র যে কোন প্রতিনিধিত্বশীল কমিটিতে নির্বাচনের জন্য (ছাত্র সংসদ এবং অন্যান্য) দুইবারের বেশী প্রতিদ্বন্দিতা করতে পারবেনা।
৩। কোন কমিটিতে (ছাত্র সংসদ এবং অন্যান্য) প্রতিনিধিত্বশীল কোন ছাত্র নেতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে ব্যর্থ হলে তাত্ক্ষনিকভাবে সংশ্লিষ্ট কমিটি হতে তার সদস্যপদ বাতিল বলে গন্য হবে এবং নির্বাচনে ২য় সর্বোচ্চ ভোট লাভকারী ছাত্র বাকী মেয়াদের জন্য কমিটিতে তার স্থলাভিষিক্ত হবে।
৪। বর্তমান হল ভিত্তিক ছাত্র সংসদ এর পরিবর্তে অনুষদ ভিত্তিক ছাত্র সংসদ চালু করতে হবে। এর ফলে হলকেন্দ্রিক সহিংসতা, চর দখলের মত হল দখল বা সিট দখল, জোর জবরদস্তি করে ছাত্র-ছাত্রীদের রাজনৈতিক কর্মসূচীতে অংশ নিতে বাধ্য করা ইত্যাদি প্রবণতা হ্রাস পাবে।
অনুষদভিত্তিক ছাত্র সংসদ নিম্নরূপে নির্বাচিত হবে।
- অনুষদের প্রতিটি বিভাগ থেকে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের ভোটে সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে দুইজন করে ছাত্র/ছাত্রী প্রতিনিধি নির্বাচিত হবে। তারা সবাই অনুষদের ছাত্র সংসদের সদস্য হবেন। এই সদস্যদের মধ্য থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠদের মতামত অনুযায়ী একজন সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হবেন। অনুষদের ডীন পদাধিকার বলে ছাত্র সংসদের সভাপতি হবেন এবং তিনি সাধারণ সম্পাদকের সাথে পরামর্শক্রমে বাকী নির্বাচিত সদস্যদের দপ্তর বন্টন করবেন।
এর ফলে ছাত্র সংসদে প্রতিটি বিভাগের ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হবে এবং তাদের সমস্যা তুলে ধরা ও সমাধানের পথ প্রশস্ত হবে।
৫। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে প্রতিটি বিভাগ হতে নির্বাচিত ছাত্র/ছাত্রী প্রতিনিধিরাই (৪ নং দেখুন)কেবলমাত্র অংশ নিতে পারবে। এই সকল প্রতিনিধিদের মধ্য থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে নির্বাচনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ গঠিত হবে।
৬। সকল প্রতিনিধিত্বশীল কমিটি (ছাত্র সংসদ এবং অন্যান্য) মেয়াদ হবে সর্বোচ্চ এক বছর এবং মেয়াদ পূর্তির ৩০ দিনের মধ্যেই পরবর্তী নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে।
৭। বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীক ছাত্র সংগঠন সমূহের অনুষদ ও বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রীক নেতা/নেত্রী নির্বাচনে জাতীয় রাজনৈতিক দল কোন প্রভাব রাখতে পারবেনা। সংশ্লিষ্ট ছাত্র সংগঠনের অনুসারী ছাত্রগণ নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের নেতা নির্বাচন করবেন এবং কোন ছাত্র দুই বছরের অধিককাল কোন ছাত্র সংগঠনের কমিটিতে থাকতে পারবেনা।
৮। কোন জাতীয় রাজনৈতিক নেতা কোন অবস্থাতেই ছাত্র সংসদ বা সংশ্লিষ্ট ছাত্র সংগঠনের কমিটি নির্বাচনকালীন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন কর্মসূচীতে অংশ গ্রহণ করতে পারবে না। কোন জাতীয় রাজনৈতিক দল কোন ছাত্র সংগঠনের কমিটি নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করলে সংশ্লিষ্ট ছাত্র সংগঠনটি ওই মেয়াদের জন্য সকল প্রকার নির্বাচনে অংশ নেয়ার বৈধতা হারাবে।
৯। কোন ছাত্র কোন প্রতিনিধিত্বশীল কমিটিতে নির্বাচন করতে চাইলে (ছাত্র সংসদ, সংশ্লিষ্ট ছাত্র সংগঠনের অনুষদ বা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি) তাকে তার অভিভাবকের লিখিত সম্মতিপত্র প্রদান করতে হবে। একজন ছাত্রের যেমন অধিকার আছে রাজনীতি করার তেমনি তার লেখাপড়ার ব্যয় বহনকারী অভিভাবকেরও জানার অধিকার আছে তার সন্তান এর রাজনৈতিক কর্মকান্ড সম্পর্কে।
১০। যে কোন কমিটিতে প্রতিনিধিত্বশীল ছাত্র নেতা কোন অপরাধের (চাদাবাজী, দুর্নীতি, সহিংসতা ইত্যাদি) সাথে যুক্ত থাকার ব্যাপারে অভিযোগ উত্থাপনের সাথে সাথে সংশ্লিষ্ট কমিটি থেকে তার সদস্যপদ স্থগিত করা হবে এবং তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে সকল কমিটি থেকে সদস্যপদ বাতিল হবে এবং সে ভবিষ্যতেও কোন কমিটিতে (সংশ্লিষ্ট ছাত্র সংগঠনের কমিটিসহ) নির্বাচনের যোগ্যতা হারাবে।
১১। হলে সিট বন্টনের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার ফরাফল/ বছর ভিত্তিক ফলাফল এবং অভিভাবকের আর্থিক সংগতিকে ভিত্তি হিসাবে ধরতে হবে। এ প্রক্রিয়ায় কোন ছাত্র/ছাত্র নেতার অংশগ্রহণ সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ থাকবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টতার কোন অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার ছাত্রত্ব একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য বাতিল করা যেতে পারে।
১২। হলসমূহে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও অন্যান্য মননশীল কর্মকান্ড পরিচালনার জন্য হল প্রশাসন বিভাগ ভিত্তিক নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধিদের সাহায্য গ্রহন করবেন। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যে সমন্বয় সাধন করবে।
এই সংস্কার প্রস্তাবগুলি বাস্তবায়ন করার জন্য সকল মহলের সদিচ্ছা ছাড়া আর কোন কিছুই প্রয়োজন নেই। ছাত্র-রাজনীতির সুস্থ এবং গণতান্ত্রিক চর্চার মাধ্যমে দেশকে সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য দক্ষ ভবিষ্যত নেতৃত্ব বের হয়ে আসবে এবং এই ধরণের ছাত্র রাজনীতি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার মান উন্নয়নে প্রভূত ভুমিকা রাখতে পারবে।
প্রস্তাবগুলির বাস্তবায়নে স্বার্থান্বেষী মহল থেকে বিশেষ করে বর্তমান অসুস্থ ছাত্র রাজনীতির সুবিধাভোগী মহল থেকে বাধা আসতে পারে কিন্তু দেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ও ছাত্র রাজনীতিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার স্বার্থে আমাদের এই বাধা অতিক্রম করার সত সাহস থাকতে হবে।
(চলবে)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


