somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

প্রবাস জীবন - ৪ : প্রবাসে প্রথম দিন, লুসি, আলবানী প্রোপার্টিজ ও প্রফেশনালিজম - ১

০২ রা নভেম্বর, ২০০৭ রাত ১১:১৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্রচন্ড ব্যস্ততার মধ্যে কাটল প্রবাসে আসার আগে শেষ কয়েকটি মাস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্সগুলোর ক্লাস শেষ করা, পরীক্ষার খাতা দেখে জমা দেয়া, যে ছাত্রদের গবেষণাকাজের তত্বাবধান করছিলাম তাদের প্রজেক্ট শেষ করে দেয়া এর মাঝে কখন যে সেপ্টেম্বর মাস চলে এলো টেরই পেলাম না।

ইংল্যান্ডে আমার কোর্স শুরু হবে অক্টোবর এর ৩ তারিখ (২০০৫ সালের) থেকে, ঠিক করলাম সেপ্টেম্বর এর শেষ সপ্তাহে যাব। বউ এর কথা আগে তুমি যাও বাসাটাসা সব ঠিকঠাক করো তারপর আমরা (আমার ২ সন্তান ও বউ) যাব। কিন্তু আমি ওদেরকে ছাড়া একা একা আসতে রাজী হলাম না। এছাড়া আমার ছোট দুই বাচ্চা নিয়ে আমার বউ একা একা এতদূর প্লেনে আসবে এটাও ঠিক পছন্দ হচ্ছিল না। তাই সবাই মিলে একসাথে যাওয়াটাই ঠিক হলো।

লন্ডনে আমার ঢাকা কলেজ জীবনের কয়েকজন বন্ধু থাকে। তাদের মধ্যে একজন হল মওদুদ আহমদ। ঢাকা কলেজে পড়ার সময় বন্ধুরা সবাই তাকে মজা করে ডাকতাম ব্যারিষ্টার মওদুদ আহমদ, এখন সে সত্যি সত্যিই ব্যারিষ্টার। গত বছর বার-এট-ল শেষ করেছে। মওদুদ আমার জন্য বাসা ঠিক করার দায়িত্ব নিল। প্রথমে প্রস্তাব দিল কারো সাথে শেয়ার করে থাকবো কিনা (এখানে অধিকাংশ ষ্টুডেন্টই শেয়ার করে থাকে), কিন্ত আমি বা আমার বউ কেউই শেয়ার করে থাকতে রাজি হলাম না। মূল কারণ আমার দুই সন্তান, তখনই ওরা যে পরিমাণে খেলাধুলা করে (আসলে চিত্কার চেচামেচি আর দুষ্টুমি করে, আদর করে বললাম খেলাধুলা), তাতে দেশের এই বড় পরিবেশ থেকে এক রুমের ভিতর বন্দী জীবন ওদের জন্য বড় বেশী শক হয়ে যাবে। তাই ঠিক করলাম টাকা বেশী লাগলেও আলাদা রুম নেব, বাচ্চাদের ভালো থাকার ব্যাপারে নো কম্প্রোমাইজ।

তো মওদুদ আমাদের জন্য দুই রুমের একটা বাসা ঠিক করল ইষ্ট লন্ডনের Plaistwo আর West Ham এর মাঝামাঝি একটা বিস্তীর্ণ মাঠের পাশে। ইন্টারনেটে বাসার আশপাশের ছবি দেখে একবাক্যে রাজী হয়ে গেলাম বাসাটা ভাড়া নিতে।

২৯ সেপ্টেম্বর ২০০৫, ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ এর একটা ফ্লাইট আমাদেরকে নিয়ে উড়াল দিল অজানা অচেনা লন্ডন এর উদ্দেশ্যে। পরিবার পরিজন ছেড়ে দীর্ঘদিনের জন্য বাংলাদেশ ছেড়ে আসা যে কতটা কষ্টকর হতে পারে তা প্রথমে বুঝতে পারিনি। বুঝতে পারলাম যখন আমার ছোট্ট ছেলে নাসিফ আমার বুকে মাথা রেখে ওর মাকে বলছে, মন খারাপ করোনা, আমরা কয়েকদিন পরেই চলে আসব, আমিই তোমাদেরকে নিয়ে চলে আসব। কান্নাভেজা চোখেও আমরা হাসি, আসলেই যদি ওর মত সরল করে সব কিছু ভাবতে পারতাম!!

যাই হোক, লন্ডন সময় বেলা ৩টার কিছু পরে হিথ্রে এসে পৌছালাম। হিথ্রো এয়ারপোর্ট এর বদনাম আছে অতিরিক্ত সিকিউরিটি চেক ও ইমিগ্রেশনে কড়াকড়ি করার জন্য। ২০০৫ এর ৭ জুলাই এর প্রভাব তখনো রয়ে গেছে তাই ইমিগ্রেশনে কড়াকড়ির বাস্তব চিত্র দেখতে পেলাম। পাসপোর্ট কন্ট্রোল, হেলথ কন্ট্রোল এর সব কাজকর্ম শেষ করে এয়ারপোর্ট থেকে বের হতে বেলা গড়িয়ে বিকাল সাড়ে ৫টা। বন্ধু মওদুদ আমাদের রিসিভ করলো এয়ারপোর্টে। ওর কাছ থেকে জানলাম এয়ারপোর্ট আর আমাদের বাসা দুই বিপরীত মেরুতে। যাওয়ার উপায় টিউব অথবা কালো টেক্সী।

আমাদের সাথে ৬টি বড় বড় লাগেজ, বাচ্চাদের দিক তাকানোর উপায় নেই শ্রান্ত বি্ধস্ত । তাই ঠিক করলাম টেক্সী নিব, এত লাগেজ টানা হেচড়া করে ট্রেন চেন্জ করে টিউব এ যাওয়া সম্ভব নয়। একটা কালো টেক্সী ঠিক করে যাত্রা শুরু করার পর মওদুদ জানালো সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য। আমাদের নাকি ৬টার মধ্যে Plaistow পৌছাতে হবে, নইলে আজ বাসায় ঢোকা যাবে না। কোন হোটেলে থাকতে হবে। তখন অলরেডী বাজে সাড়ে ৫টা আর টেক্সী করে নাকি কমপক্ষে দেড় ঘন্টা লাগবে। তার মানে এত বড় একটা জার্নির পর বাসা ঠিক থাকার পরও বাসায় ঢুকতে পারব কিনা সেটা অনিশ্চিত।

মওদুদকে বললাম যাদের কাছ থেকে বাসা ভাড়া নিচ্ছি সেই আলবানী প্রোপার্টিজ এর সাথে কথা বলতে। ও ফোন করে প্রথমেই বললো যে আমাদের Plaistow পৌছাতে ৬টার বেশী বেজে যাবে, ট্রাফিক জ্যাম এর কারনে দেরী হচ্ছে, তারা যেন অফিস সাড়ে ৬টা পর্যন্ত খোলা রাখেন। ওপাশ থেকে একবাক্যে জবাব এল সম্ভব নয়, পরদিন সকাল ৯টার সময় যেন অফিসে যোগাযোগ করা হয়। আমি মওদুদ এর কাছ থেকে ফোন নিয়ে জানতে চাইলাম যে কার সাথে কথা বলছি এবং এজেন্সীর ম্যানেজার এর সাথে কথা বলতে পারি কি না। একটা মেয়ে কন্ঠ জানালো যে তার নাম লুসী এবং আমি যে বাসাটা ভাড়া নিতে যাচ্ছি তার দায়িত্বে আছে সে এবং ম্যানেজার ইতিমধ্যে অফিস থেকে চলে গিয়েছেন।

আমি লুসিকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম যে আমাদের দেরীর পিছনে আমাদের কোন দায় নেই, আমার ছোট বাচ্চারা দীর্ঘ জার্নিতে অসুস্থ হয়ে পড়েছে এবং লন্ডনে আমাদের যাবার কোন জায়গা নেই। ছোটবেলা থেকে শুনেছি মেয়েদের নাকি মন কোমল হয়, কিন্তু এত কিছু বলার পরও, এত অনুনয় বিনয় করার পরও লুসির জানালো ৬টার মধ্যে হলে যেন আমরা অফিসে আসি এর চেয়ে দেরী হলে তাকে পাওয়া যাবেনা এবং সেক্ষত্রে পরদিন সকাল ৯টার সময় যেন তার সাথে দেখা করি। আরো কিচু বলতে গিয়ে টের পেলাম ওপাশ থেকে ফোন রেখে দিয়েছে।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি বিকাল ৫টা ৫০ মিনিট আর টেক্সী চালকের কাছ থেকে জানতে পারলাম আরো ১ ঘন্টা লাগবে গন্তব্যে পৌছাতে। জীবনে নিজেকে এর চাইতে বেশী অসহায় আর কোন দিন মনে হয় নি।

প্রবাস জীবনের প্রথম দিনেই মুখোমুখি হলাম কঠিন বাস্তবতার।

(চলবে)
২০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×