তিনি লেখাপড়া শুরু করেন বাড়িতেই। তাঁর বাবাই তাকে বাড়িতে প্রথম লিখতে পড়তে শেখান। প্রাথমিক জ্ঞান তিনি অর্জন করেন ১৯৫১ বা ১৯৫২ সালে। বাড়িতেই তিনি বাংলা ইংরেজি, ১, ২, ৩... লেখা শিখে ফেলেন। শ্লেটেই লেখা শুরু করেন। কঞ্চি কেটে তৈরি কলম ও বানানো কালি দিয়ে কাগজেও লিখতেন। তবে তাঁর হাতেখড়ি বিষয়ে একটি মজার গল্প আছে। তাঁর দাদি বলে গিয়েছিলেন হুমায়ুন আজাদকে হাতেখড়ি দেয়াতে হবে পরিবাগের শাহসাহেবকে দিয়ে। কিন্তু সেটা ঠিক সময়ে হয়ে ওঠে নি। তিনি যখন পঞ্চম বা ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়েন তখন মায়ের চাপে বাবা তাঁকে হাতেখড়ি দেয়ার জন্যে ঢাকা নিয়ে যান। ততদিনে তিনি ইংরেজি, বাংলা আরবি লিখতে শিখে গেছেন। থুরথুরে শাহ সাহেব তাকে একটি বড়ো কাচের প্লেটে আলিফ বে তে ছে লেখানোর চেষ্টা করেছিলেন।
হুমায়ুন আজাদ পিতার স্কুলেই সবচেয়ে নিচের ক্লাস ইনফ্যান্ট শ্রেণীতে ভর্তি হন। বিদ্যালয়টির নাম ছিল, 'দক্ষিণ রাড়িখাল প্রাথমিক বিদ্যালয়'। এখানেই ঘটে তার মৌলিক জ্ঞান অর্জন। এই স্কুলের শিক্ষক ছিলেন দুজন; তাঁদের একজন তাঁর বাবা অন্যজন চান্দু মাস্টার ছিলেন প্রধান শিক্ষক। ক্লাস শুরু হওয়ার কথা ছিল এগারোটায় তারা আসতেন বারটায়। তারা দুজনই ছাত্র-ছাত্রীদের পিটাতে পছন্দ করতেন ছিটকির ডাল দিয়ে। এখানে তাদের প্রথম বই ছিল আদর্শলিপি। এই বইটিতে লাইন লাইন ছড়ানো ছিলো আদর্শ- নীতিকথা ও সত্যকথা। এই বইয়ের নীতি কথাগুলো বুঝার চেষ্টা করেছেন তখনই। যেমন: ই- তে ইক্ষুরস অতি মিষ্ট। তা আগে থেকেই জানতেন, হলদে গ্যাণ্ডারি আখ কত খেয়েছেন। ঈ-তে ঈশ্বরকে বন্দনা কর। তাঁর টাকা নেই, তাঁর ঈশ্বরও নেই, আছে নারায়ণের; নারায়ণ তার ঈশ্বরকে বন্দনা করবে। ঊ-তে ঊর্ধ্বমুখে পথ চলিও না। ঠিক কথা, ওপরের দিকে তাকিয়ে হাঁটলে হোঁচট খেতেই হবে, আর তাদের রাস্তা যেমন উঁচুনিচু। ঘ-তে ঘনাগমে বৃষ্টি হয়। এর অর্থ কী? এ নিয়ে তাঁর অনেক বছর ধাঁধায় কেটেছে। ঘনা কেমন গম যে বৃষ্টি হয়? চান্দু স্যারকে জিজ্ঞাসা করেছেন, তাঁর পিতাকে জিজ্ঞাসা করেছেন; তাঁরা দুজনেই বলেছেন, মোখস্ত কইর্যা থো, তাইলেই অইব। সব কতা বোজনের দরকার নাই। পরে তিনি এর অর্থ একদিন বুঝেছেন নিজে নিজেই: ঘন (মেঘ) + আগমে বৃষ্টি হয়, অর্থাৎ মেঘের আগমনে বৃষ্টি হয়। যখন তিনি নিজে নিজে এটার অর্থ বুঝতে পেরেছিলেন, তখন তাঁর সুখের কোনো শেষ ছিলো না। দ্বিতীয় শ্রেণী পর্যন্ত এখানেই পড়েন। তাঁর বাবা তাকে শুধু একটা কথাই বলতেন, পড়, পড়, পড়।
তৃতীয় শ্রেণীতে না পড়ে তিনি রাড়িখাল স্যার জগদীশচন্দ্র বসু ইনস্টিটিউশনে (তখন শুধু হাই স্কুল ছিল, বর্তমানে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়ানো হয়) চতুর্থ শ্রেণীতে ভর্তি হন। বিখ্যাত বিজ্ঞানী স্যার জগদীশচন্দ্র বসুর পৈত্রিক বাড়িও রাড়িখালে। তাঁর নামেই বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। তৃতীয় শ্রেণীতে না পড়ার বিষয়ে একটি মজার ঘটনা রয়েছে। তাঁর প্রতিবেশি এক ছাত্র চতুর্থ শ্রেণীতে পড়তো। ছেলেটির বাবা গাইবান্ধায় দর্জির কাজ করতো, ও নতুন নতুন জামা পরে আর কাঁধে ছিট কাপড়ের ব্যাগে বই ঝুলিয়ে তাঁদের প্রাইমারি স্কুল পেরিয়ে হাই স্কুলে চলে যেতো। সে লেখাপড়া পারতো না; কিন্তু সে এমন ভাব দেখাতো যে ও হাই স্কুলের ছাত্র, আর তাঁর ওপরে পড়ে। হুমায়ুন আজাদের প্রতি এই ছাত্রটির তাচ্ছিল্য মনোভাবই তাকে চতুর্থ শ্রেণীতে পড়তে উদ্বুদ্ধ করে। তাঁর পিতাকে বললেন, ভর্তি হলে আমি চতুর্থ শ্রেণীতেই হবো। পিতা বাধ্য হয়ে চতুর্থ শ্রেণীতে ভর্তি করাতে নিয়ে যান। বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ পরীক্ষা নেন। অংক করতে দেন; মিশ্র গুণ ও ভাগের অংক । তাঁরা হুমায়ুন আজাদকে চতুর্থ শ্রেণীতে ভর্তি করেন। চতুর্থ শ্রেণী থেকেই ধীরে ধীরে তাঁর পরীক্ষা ভালো হতে থাকে। সেভেন পর্যন্ত তিনি হতেন থার্ড, অস্টম ও নবম শ্রেণীতে তিনি দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। এর আগে মোটামুটি ভালছাত্র হলেও প্রথম দিকে রোল নম্বর আসেনি। এসময় তিনি লেখাপড়াকে খুব ভালবাসতে থাকেন। দিন রাত পড়তে থাকেন। ফাস্ট বয় ছিলেন সিরাজ। হুমায়ুন আজাদের ভাষায় সিরাজ ছিল খুবই স্মার্ট, ইংরেজিতে কথা বলতে পারতো, সুন্দর বক্তব্য রাখতো। সিরাজ ফাস্ট হবে না এটা ভাবা যেতো না। কিন্তু টেস্ট পরীক্ষার সময় তিনি সমস্ত হিসাব বদলে দিয়ে প্রথম হন। এবং শেষে যা ছিলো তাঁর স্বপ্ন, সেটা বাস্তব হয়। ওটা ছিলো তাদের স্কুলের এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা, কেন না সবাই মনে করতো তাদের সেভেন এইটের ফার্স্টবয় চিরকালের ফার্স্টবয়। এরপর তিনি অনেকবার ফার্স্ট হয়েছেন, কিন্তু ক্লাস টেনে ওঠার সুখ আর কখনো পান নি। তাঁদের প্রধান শিক্ষক ছিলেন আব্দুল আজিজ, তাঁর সঙ্গে হুমায়ুন আজাদের দ্বন্দ্ব মধুর সম্পর্ক ছিল। তাঁর সাথে অভিমান করে পনের বিশ দিন পেছনের বেঞ্চে বসেন। একদিন স্যার পড়াতে পড়াতে গ্যাঞ্জেটিককে বলেন জাইগানটিক। এরপরই তাঁর দিকে তাকিয়ে বলেন, কি আপনে কি আর কথা কইবেন না? হুমায়ন আজাদ স্যারকে একটু বিব্রত করতে ধীরে ধীরে দাঁড়িয়ে বলেন, স্যার শব্দটি হচ্ছে গ্যাঞ্জেটিক। স্যার হঠাৎ ¯স্তব্ধ হয়ে যান, তারপর আস্তে আস্তে এসে জড়িয়ে ধরে প্রথম বেঞ্চে নিয়ে যান। যখন তিনি নাইনে পড়তেন, তখনো সেকেন্ড বয়, কিন্তু প্রধান শিক্ষক কেনো যেনো তাঁকেই মনে করতেন ফার্স্টবয়। একবার ক্লাশ টেনের ছেলেরা অ্যাক্টিভ-প্যাসিভ ভয়েসে ভুল করে, স্যার তঁকে ডেকে নেন ক্লাশ টেনের ছাত্রদের অ্যাক্টিভ থেকে প্যাসিভ ভয়েস করা শেখানোর জন্যে। তিনও মজা পান, সুযোগটির সদ্ব্যবহার করেন; ঘণ্টা বাজা পর্যন্ত ঠিকঠাক মতো তাদের ইংরেজি ব্যাকরণ শেখান। তার একটি কারণও ছিল, ক্লাশ টেনের ফার্স্টবয় একবার তাকে একটু অন্যায় কষ্ট দিয়েছিলো; তিনি তাকে ৩০ মিনিট ধরে এবং তাদের ক্লাশের ফার্স্টবয়কে সারাজীবনের জন্যে একটু শিক্ষা দিতে চেয়েছিলেন। বিদ্যালয়ে তাঁদের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ছিলেন সহকারী প্রধান শিক্ষক বিষ্ণুপদ সেন। তাঁর নামে তিনি 'শুভব্রত, তার স¤ক্সর্কিত সুসমাচার' নামক উপন্যাসটি উৎসর্গ করেছিলেন। তিনি ছোটোখাটো ও খুবই কালো ছিলেন; পড়াতেন ইংরেজি, বাংলা, গণিত, আর তাঁর ভয়ে স্কুল কাঁপতো। তাঁদের আরেকজন শিক্ষক ছিলেন ন–র উল হোসেন। পরে তিনি অবশ্য পরবর্তীতে ভাগ্যকুল হাইস্কুলে যোগদান করেন। তিনি বেশ কয়েকটি বইও লিখেছেন। শান্তিনিকেতনে পড়াশোনা করেছেন। হুমায়ুন আজাদ তাঁকে পছন্দ করতেন। তিনি ছিলেন ভিন্ন ধরনের মানুষ, কবিতা শোনাতে পছন্দ করতেন, ধর্মের বিরুদ্ধেও বলতেন। একবার তাদের দ্বিতীয় মাওলানা ইসহাক এজন্য তাকে বাঁশ দিয়ে মারতে গিয়েছিলেন। এই মাওলানা আইন করেছিলেন পরীক্ষার জন্য ৯০ নম্বর আর নামাজের জন্য ১০ নম্বর। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে খদ্দরের দুটি পাঞ্জাবি একসাথে গায়ে দিতেন। ঘামে ভিজে ঠাণ্ডা হয়ে থাকতো। দুর্গন্ধে তাঁর সামনে থাকা যেতো না। তাদের প্রধান মৌলবি তাজুল ইসলাম ছিলেন অত্যন্ত ভালো ও মিষ্টভাষী মানুষ। তাঁদের স্কুলে কয়েক মাসের জন্য এসেছিলেন শামসুল ইস্যাম নামে একজন শিক্ষক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে এম.এ পরীক্ষা দিয়েই এই স্কুলে যোগ দেন। তখন তিনি এইটে পড়েন। প্রথম দিন থেকেই তাকে ভালোবেসে ফেলেন। দেখতে খুব সুন্দর, ইন করে চমৎকার শার্ট আর সাদা প্যান্ট পরতেন। হুমায়ুন আজাদ তাঁকে আমৃত্যু খুঁজেছেন, কিন্তু দেখা পান নি। এই বিদ্যালয়টি তাঁর অত্যন্ত প্রিয় বিদ্যাপীঠ ছিল। স্কুলে যাওয়ার জন্য সদা চঞ্চল হয়ে থাকতেন। স্কুল বসতো এগারো টায়, তিনি ১০ টার আগেই গিয়ে হাজির থাকতেন। অধিকাংশ দিন তিনিই প্রথম হাজির হতেন স্কুলে। ঝড়েবৃষ্টিতেও তিনি স্কুলে যেতেন। তিনি বলেছেন, রাড়িখাল প্রাইমারী স্কুল আমাকে মৌলিক জ্ঞান দিয়েছিল এবং রাড়িখাল হাইস্কুল আমার প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়। এই হাইস্কুল সে সময়েও অসাধারণ কোন উচ্চ বিদ্যালয় ছিল না। এই বিদ্যালয় থেকেই অনেক বছরই কেউ পাশ করতো না। অনেক ফাস্ট বয় তৃতীয় শ্রেণী পেয়েছে। হুমায়ুন আজাদ যে বছর ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা দেন তার আগের বছরও ফাস্ট বয় তৃতীয় শ্রেণী পেয়েছিল।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

