ছোটবেলা থেকেই হুমায়ুন আজাদের কবিতা ভাল লাগতো। ইচ্ছে করতো কবিতা লিখতে। কিন্তু জানতেন না কিভাবে কবিতা লিখতে হয় বা কবিতায় কী থাকতে হয়। তাঁর এক বন্ধু, যাকে তিনি বলেছেন তাঁর বাৎসায়ন, তারও কবিতা লিখতে ইচ্ছে হতো। তাঁরা দুজনে কবিতা লিখতেন, কিন্তু বুঝতে পারতেন কিছুই হচ্ছে না। সেভেনে ওঠার পর থেকেই তিনি 'রবীন্দ্রজয়ন্তী', 'নজরুলজয়ন্তী', '১৪ই আগস্ট (পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস)'- এর অনুষ্ঠানে প্রবন্ধ পড়তেন। তাঁর পড়ার ঘরের সামনেই ছিল একটি কদম গাছ। বর্ষায় ফুল ফুটে ওটি অপরূপ রূপসী হয়ে উঠতো। এইট-নাইনে পড়ার সময়ই তিনি ওটিকে নিয়ে একটি উপন্যাস লিখতে শুরু করেছিলেন, একশো পাতার মতো লিখেছিলেন, তাতে কোনো কাহিনী ছিলো না। শুধু গাছটির রূপের বর্ণনা ছিলো, কিন্তু শেষ করতে পারেন নি; বুঝতেই পারেন নি তিনি কী লিখেছেন। নাইনে ওঠার পর ইত্তেফাকের 'কচিকাঁচার আসর' আর আজাদের 'মুকুলের মাহফিল' পড়তে ভাল লাগে। নিজের নাম ছাপা দেখতে ইচ্ছে হয়। একদিন 'কচিকাঁর আসর' এর সদস্য হওয়ার কুপন পুরণ করে পাঠয়ে দেন; দু-তিন সপ্তাহ পর দেখেন তাঁর নাম ছাপা হয়েছে। নিজের নাম ছাপা দেখে সুখে মন ভরে যায়। নবম শ্রেণীতে পড়ার সময় প্রথম কবিতা লিখেছিলেন। লিখে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন 'কচিকাচার আসর'-এ ছাপানোর জন্য। কয়েকটি কবিতা পাঠালেও তা ছাপা না হওয়ায়; গদ্য লিখেন। 'ঘড়ি চলে টিক টিক' শীর্ষক একটি প্রবন্ধ পাঠিয়ে দিলে তা ছাপা হয়। পরে তাঁর অনেক প্রবন্ধ ছাপা হয় কচিকাঁচার আসরে। উচ্চ মাধ্যমিক পড়ার সময়ও তিনি অনেক প্রবন্ধ লিখেছেন কচিকাচাঁর আসরে ও মুকুলের মাহফিলে। উচ্চ মাধ্যমিক পড়ার শেষ দিকে ওদুটোকে তিনি ছেড়ে দেন। কেননা তখন বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, শওকত ওসমান, শামসুর রাহমানের লেখা পড়তে শুরু করেছেন, এলিয়ট-পাউন্ডের নাম শুনতে শুরু করেছেন, বুঝতে শুরু করেছেন যে উৎকৃস্ট সাহিত্য অন্য রকম। এমএ পড়ার সময় অনেক কবিতা লিখেছেন, প্রবন্ধ লিখেছেন। এমএ পরীক্ষা দেয়ার পর বৃত্তি বন্ধ হয়ে যাওয়াতে, টাকা পয়সার দরকার হলে ইত্তেফাকের দাদাভাইকে ব্যাপারটি বললেন। তিনি তখন তাকে সাহিত্যের পাতায় প্রতি সংখ্যায় কিছু লিখতে বললেন; তিনি 'জর্নাল' নামে একটি কলাম লেখা শুরু করলেন। ওটি ছিল পুরোপুরি সাহিত্য নিয়ে লেখা কলাম, খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল, শত্রুও সৃষ্টি হয়েছিল অনেক। এখানেই প্রথম ষাটের কবিদের কবিতা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছিলো, ওই প্রথম তাদের নাম কোনো গদ্য রচনায় ছাপা হয়; শুধু তাঁর নিজের নাম ছাড়া। এতে তাঁর ক্ষতি হয়েছে। এখানে যাদের তিনি কবি বলেছেন, তারাই কবি; নিজের নাম যেহেতু লিখেননি তাই তিনি কবি নন, এমন অনেকে মনে করেন। জর্নাল তিনি লিখতেন আর্থিক কারণে তবে এতে তাঁর তীব্র সাহিত্যিক মতামত থাকতো। দু-বছরের মতো লিখেছিলেন। চট্টগ্রাম কলেজে থাকার সময় 'ব্লাড ব্যাংক' নামের কবিতাটি লিখেছিলেন ছাত্রদের একটি সাময়িকীর জন্যে। এখানে পড়াতে গিয়েই তাঁর মনে 'লাল নীল দীপাবলি বা বাঙলা সাহিত্যের জীবনী' বইটি লেখার কথা মনে আসে; তবে লিখেন জাহাঙ্গিরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেয়ার পরে। স্বাধীনতার পরে তিনি দৈনিক বাংলার সাহিত্যের পাতায় 'এক একর সবুজ জমি' নামে একটি কলাম লিখেছিলেন কিছুদিন। ১৯৭৩ সালে তাঁর প্রথম কবিতার বই 'অলৌকিক ইস্টিমার' প্রকাশিত হয়।
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে এপ্রিল, ২০১০ সকাল ১০:৪৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



