স্মরণ: হুমায়ুন আজাদ
হুমায়ুন আজাদ মুন্সীগঞ্জ-বিক্রমপুরের ভাগ্যকুল ইউনিয়নের কামারগাঁও গ্রামে নানা বাড়িতে ২৮ এপ্রিল ১৯৪৭ জš§গ্রহণ করেন। তাঁর পৈত্রিক বাড়ি রাড়িখাল গ্রামে। ১৯৬২ সালে তিনি ম্যাট্রিকিউলেশন বা প্রবেশিকা পরীক্ষা দেন। তখন ইস্ট পাকিস্তান সেকেন্ডারি এডুকেশন বোর্ড নামে একটিই বোর্ড ছিল। এই পরীক্ষায় এডিশনাল নম্বর ছাড়া তাঁর স্থান ছিল ১৮ তম; এডিশনালসহ ২১তম। মুন্সীগঞ্জের মধ্যে প্রথম। ১৯৬৪ সালে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে বি.এ (অনার্স) পরীক্ষায় ১৯৬৭ সালে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। ১৯৬৮ সালে এমএ পরীক্ষাতেও প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হন। তিনি চট্টগ্রাম কলেজ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করার পরে ১৯৭৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সহযোগী অধ্যাপক হিসাবে যোগদান করেন। ১৯৮৬ সালে তিনি অধ্যাপক হন। তিনি আমৃত্যু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন।
হুমায়ুন আজাদ একাধারে ভাষাবিজ্ঞানী, কবি, ঔপন্যাসিক, কিশোর সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক। অর্থাৎ সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে তার সুদীপ্ত পদচারণা। এজন্যই তিনি বহুমাত্রিক লেখক হিসাবে পরিচিত ছিলেন। সব ধরণের লেখাই তাঁর কাছে গুরুত্বপ–র্ণ ছিল। ফলে তিনি সব ধরনের লেখাতেই পারদর্শিতা অর্জন করেছিলেন। তিনি একাধারে সৃষ্টিশীল ও মননশীল লেখক। তাঁর সৃষ্টিশীল লেখার মধ্যে মননশীলতা রয়েছে আবার মননশীল লেখার মধ্যে সৃষ্টিশীলতা রয়েছে। তাঁর সাহিত্য, ভাষা, সমাজ, রাষ্ট্র বিশে-ষণ যেমন পাঠক দ্বারা প্রশংসিত হয়েছে আবার কবিতা এবং উপন্যাস লিখেও কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। তিনি বিভিন্ন পর্বে বিভিন্ন ধরনের লেখা লিখেছেন। প্রথম পর্বে কবিতা, সাহিত্য সমালোচনা, ভাষাবিজ্ঞান চর্চা করেছেন। তখন এবং তারপর বিশ্বের সাহিত্য, সমাজ, রাষ্ট্র নিয়েও লিখেছেন। তিনি জীবনের স¤ক্স–র্ণ রূপ, সৌন্দর্য, কদর্য-অসৌন্দর্যের রূপ চিত্রণ করতে চেয়েছিলেন। সেটা তাঁর কবিতায় রয়েছে, উপন্যাসে রয়েছে, প্রবন্ধে রয়েছে।
১৯৭৩ সালে তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘অলৌকিক ইস্টিমার’ প্রকাশিত হয়। কবিতা দিয়ে লেখালেখি শুরু করলেও তাঁর দেশব্যাপী বোদ্ধামহলে ব্যাপক পরিচিতি ঘটে ভাষাবিজ্ঞান স¤ক্সর্কে লিখে। তিনি পিএইচডি ডিগ্রী নিয়েছেন ভাষাবিজ্ঞানের উপর। গবেষণা করে লিখেছেন- প্রোনোমিনালাইজেশন ইন বেঙ্গলি(১৯৮৩)। একই বছর লিখেছেন বাঙলা ভাষার শত্রুমিত্র। ১৯৮৪ সালে লিখেন ‘বাক্যতত্ব’ এবং বাঙলা ভাষা (প্রথম খন্ড) পরের বছর লিখেন দ্বিতীয় খন্ড। ১৯৮৮ সালে লিখেন 'তুলনামূলক ও ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান এবং এর পরের বছর অর্থবিজ্ঞান। কিশোরদের উপযোগী করে তিনি ভাষাবিজ্ঞানের দুটি বই লিখেছেন। ১৯৭৬ সালে লিখেন- 'লাল নীল দীপাবলী বা বাঙলা সাহিত্যের জীবনী' এবং ১৯৮৭ সালে লিখেন- 'কতো নদী সরোবর বা বাঙলা ভাষার জীবনী'।
হুমায়ুন আজাদের কাব্যগ্রন্থ মাত্র ৭টি।'অলৌকিক ইস্টিমার' (১৯৭৩) আমাদের পরিচিত বলয় নিয়েই লিখেছেন। ১৯৮০ সালে প্রকাশ পায় 'জ্বলো চিতাবাঘ'। সমাজ ও রাজনীতির উপর তীব্র ঘৃণা প্রকাশ পায় 'সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে' (১৯৮৫) কাব্যগ্রন্থে। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত হয় কাব্যগ্রন্থ ‘যতোই গভীরে যাই মধু যতোই উপরে যাই নীল'। এখানে রয়েছে অনেক সৌন্দর্যতা। পরবর্তী কাব্যগ্রন্থ 'আমি বেঁচেছিলাম অন্যদের সময়ে'(১৯৯০)-এর রয়েছে তাঁর শ্রেষ্ঠ আবেগ উপলব্ধির প্রকাশ। তাঁর 'কাফনে মোড়া অশ্রুবিন্দু' ((১৯৮০) অনেক কোমল ও গীতিময়, অনেক স্বপ্ন ও দীর্ঘশ্বাসে প–র্ণ। তাঁর সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ 'পেরোনোর কিছু নেই' (২০০৪) অনেক বেশি পরিণত।
তাঁর 'ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল' প্রথম বড়দের জন্য উপন্যাস। এর আগে একটি কিশোর উপন্যাস লিখেছিলেন কিশোরদের জন্য উপন্যাস- 'আব্বুকে মনে পড়ে’। 'ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল(১৯৯৪) অসাধারণ সাড়া জাগিয়েছিল, এরপর বাঙলাদেশের অন্য নাম হয়ে উঠেছে 'ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল'। এটি তৃতীয় বিশ্বের সামরিক অভ্যুত্থানগ্রস্থ অবস্থা- একটি দেশের শোচনীয় অবস্থার গদ্যশিল্প। দ্বিতীয় উপন্যাস 'সব কিছু ভেঙ্গে পড়ে'। এর উৎস তাঁর শৈশব। কিভাবে একে একে ভেঙ্গে পড়ে সব। উপন্যাসে এক দার্শিনিক সত্য- 'সব কিছু ভেঙ্গে পড়ে' প্রামাণ করেছেন। 'মানুষ হিসাবে আমার অপরাধসমূহ' আবার ভিন্ন কাঠামোর। 'শুভব্রত, তার সম্পর্কিত সুসমাচার' কী করে একজন ধর্ম প্রবর্তকের আবির্ভাব ঘটে সামাজে এবং কী ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটে এর শিল্পিত উপন্যাস এটি। 'রাজনীতিবীদগণ' জনগণের মুখের ভাষায় লেখা স¤ক্স–র্ণভাবে এক রাজনৈতিক উপন্যাস। আমাদের রাজনীতিবিদদের হিংস্রতা, প্রতারণা, পাশবিকতা চিত্রিত হয়েছে এটিতে। তিনি আধুনিক কবিদের নিয়েই লিখেন- 'কবি অথবা দন্ডিত অপুরুষ'। 'নিজের সঙ্গে নিজের জীবনের মধু' উপন্যাসে আবারো আমারা রাড়িখালের এক কিশোরকে খুঁজে পাই। ‘ফালি ফালি করে কাঁটা চাঁদ' এক অধ্যাপিকার পাহাড়ী বাংলোয় এক ভদ্রলোকের সাথে দু‘রাত্রী যাপন এবং এতে তার বদলে যাওয়ার কাহিনী। এরপর তিনি লিখেছেন 'শ্রাবণের বৃষ্টি রক্তজবা' '১০০০০ এবং আরো একটি ধর্ষণ' এবং 'একটি খুনের স্বপ্ন' নামে চমৎকার তিনটি উপন্যাস। তাঁর সর্বশেষ উপন্যাস 'পাক সার জমিন সাদ বাদ(২০০৪)' পড়ে মানুষ মৌলবাদীদের ভয়াবহ জীবন বর্ণনা দেখে আঁতকে উঠেছিল। পরবর্তীতে এ উপন্যাসটি তাঁর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
২০০৪ সালের ২৭ ফেব্র“য়ারী বইমেলা থেকে বাসায় ফেরার পথে উগ্র মৌলবাদীরা চাপাতি দিয়ে আক্রমন করে। তিনি মারাÍকভাবে আহত হন। সিএমএইচ থেকে ব্যাংকক নেয়া হয় চিকিৎসার জন্য। কিছুটা সুস্থ হয়ে দেশে ফিরেন। পরবর্তীতে বিশ্বখ্যাত কবি হাইনরিশ হাইনের কবিতার উপর উচ্চতর গবেষণার জন্য জার্মানী যান। সেখানে ১২ অক্টোবর ০৪ তাঁকে তাঁর কক্ষে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তিনি তার পৈত্রিক বাড়ি রাড়িখালের জ্যোতির্ময় আঙিনায় চির নিদ্রায় শায়িত আছেন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

