হুমায়ুন আজাদ নিজেকে প্রথাবিরোধী হিসাবেই উপস্থাপন করতেন। তাঁর অনুরাগীরাও প্রথাবিরোধী হিসাবেই দেখতেন। প্রথাবিরোধী বলতে দেশের মানুষও হুমায়ুন আজাদকেই বুঝতো। তাঁর জীবন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় তিনি স্কুল জীবন থেকেই প্রথাবিরোধী। তিনি বলেছেন, নবম দশম শ্রেণী থেকেই আমি পুরোনো বাজে কথা বাদ দিতে শুরু করি, অতীতের দিকে তাকাতে থাকি গভীর সন্দেহে, ধর্মে কোনো মহিমা খুঁজে পাই না, প্রথা থেকে দূরে সরিয়ে রাখি নিজেকে; মনে হতে থাকে অতীতের থেকে ভবিষ্যত অনেক গুরুত্বপূর্ণ, অতীতের সবকিছুই মহৎ নয়। আমার ভেতর এক মুর্তিবিনাশী জন্ম নিতে থাকে; তখন থেকেই পুরোনোকে, অতীতকে আমি ছেড়ে দিতে থাকি। আমার জীবনে মরে যেতে থাকে প্রথা, বিশ্বাস, আর নিরর্থক নির্দেশগুলো। পরে তাই আমাকে আকৃষ্ট করে, যা অভিনব সৌন্দর্যমন্ডিত, যাতে রয়েছে অভিনব চিন্তা, যা প্রথাবিরোধী।
তিনি বলেছেন, আমি যে দেশে জন্মেছি সে দেশে বাস করতেই ভালবাসি, ইচ্ছে করলে আমি বিদেশে থেকে যেতে পারতাম, কিন্তু থাকি নি; দেশের জন্যে নয়, ভাষার জন্যে; বাঙলা আমার জন্যে শুধু ভাষা নয়, দেশও; আমি বাঙলা ভাষার ভেতরে বাস করি। মানসিকতায় আমি আন্তর্জাতিক, বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ভাবনাগুলোকে আমি নিজের মধ্যে ধারণ করতে চাই। তিনি আক্ষেপ করে বলেছেন, আমার দুঃখ হয়- বাঙালি মুসলমান, তোমার যে কী হবে! এদেশে নন্দিত মহৎ হওয়ার জন্যে অধীনতা মেনে নিতে হয়; আমি কারো অধীনতা মানি নি, তাই নন্দিত হওয়া হাস্যকর আমার কাছে। বন্দী হয়ে আমি অমর মহাপুরষ হতে চাই নি। নিয়ন্ত্রণকে আমি গ্রহণ করি নি, কিন্তু চারদিকে দেখতে পাই নিয়ন্ত্রণ, আর আমার সমস্ত লেখা নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে। আমি বিশুদ্ধ জ্ঞান আর বিশুদ্ধ শিল্পকলার অনুরাগী, আমি তাই করতে চেয়েছি। আমি মানুষকে দেখতে চেয়েছি মুক্ত; সমাজ, রাষ্ট্র, ধর্মের অধীনতা থেকে মুক্ত; আমার সমস্ত লেখা মানুষের মুক্তির জন্য ব্যাকুল।
বাঙ্গালিকে তিনি আক্রমণ করতেন বাঙ্গালিকে ভালবাসতেন বলে, আর তিনি নিজে ঐ গোত্রের বলেই। বাঙ্গালীর কাছে তার অশেষ প্রত্যাশা, কিন্তু দেখেছেন বাঙ্গালি শুধু পতনকেই বেছে নেয়, উৎকর্ষ অর্জন করতে চায় না। তিনি বলেছেন, বাঙ্গালি সংগ্রাম করেছে, একান্ত বাঙালির বৈশিষ্ট্য নয়; বিশ্বের পীড়িতরা সংগ্রাম করেছে চিরকালই। বাঙালি যদি তার সংগ্রামকে সফল করতে পারতো, তাহলেই তা হতো ইতিবাচক। বাঙালি এখন কার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে? বাঙালির বিরুদ্ধেই। অর্থাৎ সব বাঙালি এক নয়, বাঙালির একটি ক্ষুদ্র গোত্র শোষক পীড়ক, আর বড় গোত্রটি শোষিত পীড়িত। বাঙালি আজো প্রথাগতভাবে সভ্য একটি সমাজ রাষ্ট্রও প্রতিষ্ঠা করতে পারে নি, উন্নত বা শোষণহীন সমাজতো অনেক দূরে। বাঙালিকে আক্রমণ করার আমার অধিকার আছে, আর কোনে জাতিকে আক্রমণ কারার অধিকার আমার নেই, আমি আক্রমণ করি বাঙালিকেই।
এখানে রাষ্ট্র যারা নিয়ন্ত্রণ করে তারা সমস্ত অর্থেই মানুষের বিরুদ্ধে। এদেশে এমন কোনো রাজনৈতিক দল নেই- যাকে মানুষের পক্ষে বলা যায়। একই দল ভিন্ন নামে ভিন্ন মঞ্চ থেকে কথা বলে। কেউ বেশি, কেউ কম রক্ষণশীল। কেউ মধ্যযুগে বেশি থাকে কেউ কম থাকে। জাতীয়তাবাদী শ্লোগান দেয়, কেউ ইসলামি শ্লোগান দেয় কিন্তু মূলত স্বার্থে এদের ভিন্নতা নেই। ফলে এমন কোনো দল রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসে সারাদেশকে স্বচ্ছল এবং শিক্ষিত করবে এমন আশা নেই।
তাঁর নেতিবাচকতা মূলত গভীর ইতিবাচকতা। অন্যরা যাতে খুব পরিতৃপ্তি বোধ করে, তাঁর কাছে তাকেই যথেষ্ট মনে হয় না। তাই তিনি হতাশার কথা বলেছেন। তিনি বলতেন, আমি বিশ্বাস করি মানুষের আসলে আশা করার কিছু নেই; কেন না তার পরিণতি হচ্ছে বিনাশ। প্রত্যেকের মুখে আর সৌন্দর্যে আমি অবশ্যম্ভাবী বিনাশের দাগ দেখতে পাই। লোকজন আমাকে বলে আপনি খুব সাহসী; অবাক কান্ড, আমি একদম সাহসী নই। যখন গুলি হয় আমি সামনে গিয়ে হাজির হই না। আমি কখনো সতেরো তলা দালান থেকে লাফ দেবো না। আমার একদম সাহস নেই। আমি সত্যকথা বলি, আর যে দেশে সত্য কথা বললেই শত্রু বাড়তে থাকে। যে দেশে সত্য বলাকে সাহস বোঝায় সে দেশ যে কী শোচনীয় দেশ।
হুমায়ুন আজাদ নিজে বাকপটু ছিলেন, কথা বলতে পছন্দ করতেন, আবার প্রচুর সাক্ষাৎকার দিতেন। তাঁর বক্তৃতা ছিল আকর্ষণীয়, সাক্ষাৎকারগুলো ছিল চমৎকৃত এবং বহুল পঠিত। তাঁর প্রদত্ত সাক্ষাৎকার নিয়ে একটি বই বের হয়েছে, আততায়ীদের সাথে কথোপকথন। তিনি নিজে চারজন বিশিষ্ট ব্যক্তির সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছিলেন। এঁরা হলেন, আহমদ শরীফ, শওকত ওসমান, আব্দুর রাজ্জাক ও শামসুর রাহমান। এ সাক্ষাৎকারগুলো প্রথমে পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, পরে বই আকারে প্রকাশিত হয়।
মানুষের যৌন সম্পর্ক বিষয়ে তাঁর চিন্তা ছিল প্রথার বিরুদ্ধে। তিনি মনে করতেন, পৃথিবীর সবদেশেই নারী পুরুষ যৌন সম্পর্ক উপভোগ করে, সামাজিক ধর্মীয় নিষেধের ফলেই তারা বিবাহপূর্ব বা বিবাহবহির্ভূত যৌনসম্পর্কে অবাধে মিলিত হতে পারে না। সুযোগ পেলে তারা মিলিত হতে দ্বিধা করে না। আমাদের দেশের অধিকাংশ পুরুষ বিয়ের আগেই কোনো না কোনোভাবে যৌন অভিজ্ঞতা অর্জন করে, শুধু মেয়েরাই অনেকটা বাধ্য হয়ে ওই অভিজ্ঞতা থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করে। বিয়ের একটি শর্ত যৌননিষ্ঠা, কিন্তু অবিবাহিতরা অমন কোনো শর্তের অধীন নয়, তাই তা অনৈতিকও নয়। কিন্তু একে নৈতিক করে তোলা হয়েছে পুরুষতন্ত্রের ও বিশেষ এক ধরনের সমাজের স্বার্থে। তিনি নারীদের জন্য একটি অনন্য বই লিখেন, 'নারী'। তিনি বলতেন, বাংলাদেশে নারীবাদের কোনো জননী নেই, আমি জনক। তিনি স্কুল জীবন থেকেই নারীবাদী ছিলেন।
আগে কাননবালারা আসতো পতিতালয় থেকে আর এখন আসে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে- এ প্রবচনটিকে কেন্দ্র করে রোকেয়া-শামসুন্নহার হলের ছাত্রীদের ক্যাম্পাসে মিছিলের কথা শোনা গিয়েছিল। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কানন বালা ছিলেন এক সময়ের বিখ্যাত অভিনেত্রী; প্রখ্যাত নায়িকা। আমাদের বাঙলায় অভিনয়ের যে ইতিহাস, তাতে দেখা যায় পতিতা পল্লী থেকেই প্রথম নায়িকাদের মঞ্চে নেয়া হয়েছে। সম্ভ্রাান্ত পরিবারের মেয়েদের অভিনয় করতে দেয়া হতো না। কিন্তু আজকালতো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেয়েরা চলচিত্রে যাচ্ছে, অভিনয় করছে এবং সারাপৃথিবীতে এখন প্রায় সবাই অভিনেত্রী হওয়ার জন্য পাগল। তিনি বলেছেন, অনেকে কাননবালা কথাটির অর্থই বোঝে নি, তারা ভেবেছে কাননবালা বলতে আমি সরওয়ার্দি উদ্যানের রাতের মেয়েদের বুঝিয়েছি- মূর্খদের নিয়ে এই বিপদ। কানন বালা বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছিল, তার অর্থ যারা বিভ্রান্ত হয়েছিলেন তারা ভুল অর্থ করেছিলেন। আমি বিস্মিত হয়ে লক্ষ্য করেছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পন্ডিতেরাও কাননবালা কথাটির অর্থ বোঝেন নি। প্রবচনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণীদের সম্পর্কে ছিল না, ছিল তাদের সম্পর্কে যারা অভিনেত্রী হওয়াকেই মনে করে জীবনের স্বার্থকতা। এমন একটা সাংস্কৃতিক রোগ ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে যে অভিনেত্রী হতে না পারলে সব বৃথা। আমাদের অসুস্থ বুর্জোয়া শ্রেণীটি অর্থের মূল্যের থেকে বাহ্যিক ঝলসানোকেই বেশি দাম দেয়; মেধাবী ছাত্রীটির থেকে গুরুত্বপ–র্ণ মনে করে অভিনেত্রী ছাত্রীটিকে। আমি এর বিরুদ্ধে। অভিনেত্রী হওয়ার জন্যে বিশ^বিদ্যালয়ে পড়ার দরকার পড়ে না, যে অভিনেত্রী হতে চায় তার সরাসরি অভিনেত্রী হওয়ার চেষ্টা করাই উচিত, এতে গরীব দেশের অর্থের অপচয়ও কমে। বিশ্ববিদ্যালয় অভিনেত্রী তৈরির স্থান নয, জ্ঞানী তৈরির স্থান। অভিনেত্রী হচ্ছে পুরুষতন্ত্রের ভোগ্যপন্য, আমি চাই না আমার ছাত্রী ভোগ্যপন্য হোক। ২০০২ সালে শামসুন্নহার হলে ছাত্রীদের উপর পুলিশি হামলার পরবর্তী আন্দোলনরত ছাত্রীদের গ্রেপ্তার করে রমনা থানা হাজতে রাখলে, হুমায়ুন আজাদ গ্রেপ্তার হওয়া ছাত্রীদের হাজতখানাকে পবিত্র কারাগার বলে আখ্যায়িত করছিলেন। সেখানে ফুল দিতে গিয়েছিলেন।
তিনি বলেছিলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চিন্তার ক্ষেত্রও নয়, মুক্তচিন্তা আরো দূরের ব্যাপার। আমাদের বিশ্ব^বিদ্যালয়গুলো প্রথাগত পুরোনো চিন্তার উচ্চ বিদ্যালয়, এখানে খুব কম ব্যক্তিই মুক্ত চিন্তা করেন, খুব কম ব্যক্তিই নিজে চিন্তা করতে পারেন, আমার ছাত্রাবস্থায়ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রকৃত সাহিত্য সংস্কৃতির চর্চা হয় নি, এখনো হয় না। আমরা খুব প্রথাগতভাবে প্রথাগত বিষয় পড়াই, একই জিনিস ক্রমশ নিকৃষ্টভাবে পড়াই, তা শিক্ষার্থীদের নতুন কিছু সৃষ্টিতে অনুপ্রাণিত করে না। আমরা অনেকেই একটি কবিতা, গল্প বা উপন্যাস-এর ব্যাখ্যা বা মূল্যায়ন করতে পারি না। কিন্তু ব্যাখ্যা বা মূল্যায়নও করি অনেক বিষয় না জেনেই। আমদের অনেকেরই থাকার কথা ছিল মফস্বলের কোনো অসরকারী মহাবিদ্যালয়ে কিন্তু পড়াচ্ছি বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমরা প্রথার পুনরাবৃত্তি করে চলছি। আমাদের ছাত্ররাও অনাবাদী জমির মতো, যা বলি তাই তাদের কাছে নতুন। তৃতীয় বর্ষ অনার্সের ছাত্র জানে না সুধীন্দ্রনাথ দত্তের নাম, ‘জীবন স্মৃতি’র নাম শোনে নি এমএ‘র ছাত্র।
অবিশ্বাস এদেশে অনেকের কাছে ভীতিকর বৈকি; আবার অনেকের কাছে আকর্ষণীয়; অনেকে এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও গতিময়তায় মুগ্ধ। তাঁর 'আমার অবিশ্বাস' বইটি বার্ট্রান্ড রাসেলকে উৎসর্গ করেছেন। রাসেলের চিন্তার অনেক কিছু এই বইটিতে আছে। তিনি বলেছিলেন, আমাদের সামনে প্রথার যে বিশাল বিশাল পর্বত তৈরি করা আছে, সেগুলো মিথ্যে; আমি এটা দেখাতে চেষ্টা করেছি। আমাদের দেশে যারা চিন্তা করেন তারা বিশ্বাসী। কেউ আল্লায়, কেউ ঈশ্বরে, কেউ রাজনৈতক নেতায়। আমি বিশ্বাসী নই, বিশ্বাস শিল্প সাহিত্য, সৃষ্টিশীলতা ও জ্ঞানের জন্য ক্ষতিকর। মানুষ জন্মেছে তাঁর বিকাশ ঘটবে। অতীতকে আকড়ে থাকা ঠিক নয়। অতীতের প্রতি সারাক্ষণ নত মস্তকে থাকা মানুষের স্বভাব হওয়া উচিৎ নয়। বিশ্বাস এক বাজে জিনিশ, যা নেই তাকেই বিশ্বাস করতে হয়, কেন না তা নেই। পাঁচ হাজার বছর ধরে মানুষ জন্ম নিয়েই দেখছে তার জন্যে প্রাণপনে প্রস্তুত হয়ে আছে প–র্বনির্ধারিত বিভিন্ন বিশ্বাসের জগত। নিজের জন্যে কোনো বিশ্বাস খুঁজে বের করতে হচ্ছে না তাকে, জšে§ই দেখছে পরিবার ও সমাজ, কখনো কখনো রাষ্ট্র, তার জন্যে বিশ্বাস তৈরি করে রেখেছে, মনে করছে ওইটাই শ্রেষ্ঠ বিশ্বাস এবং তাকেও পোষণ করতে হবে ওই বিশ্বাস। মানুষ জন্ম নিচ্ছে, বেড়ে উঠছে পূর্ব প্রস্তুত বিশ¡াসের মধ্যে; তার জন্যে বিশ্বাসের জামাকাপড় শেলাই করা আছে, তার দায়িত্ব ও জামা-কাপড়ের মধ্যে ঢুকে পড়ে শান্তি পাওয়া। বিশ্বাসী হওয়া প্রশংসিত ব্যাপার; প্রথাগতভাবে ভালো মানুষ, সৎ মানুষ, মহান মানুষ বলতেই বোঝায় বিশ্বাসী মানুষ। তারা কী বিশ্বাস করছে, তা বিবেচনার বিষয় নয়, বিবেচনার বিষয় হচ্ছে তারা বিশ্বাস করছে; তাই তারা ভালো, সৎ এমন কি মহৎ। পৃথিবী জুড়ে মানুষ গড়ে তুলেছে বিচিত্র বিশ্বাসের জগৎ, বিশ্বাস দিয়ে তারা ভাগ করে ফেলেছে বিশ্বকে, তারা কাউকে বিশ্বাসের জগতের বাইরে থাকতে দিতে রাজি নয়। একটা কিছু বিশ্বাস করতে হবে মানুষকে, বিশ্বাস না করা আপত্তিকর। আপনার পাশের লোকটি স্বস্তি বোধ করবে যদি জানতে পারে আপনি বিশ্বাস করেন, তার বিশ্বাসের সাথে আপনার বিশ্বাস মিলে গেলে তো চমৎকার; আর খুবই অস্বস্তি বোধ করবে কোনো কোনো সমাজে আপনাকে মারাত্মক বিপদে ফেলবে, যদি সে জানতে পারে আপনি বিশ্বাস করেন না। বিশ্বাস কয়েক হাজার বছর ধরে দেখা দিয়েছে মহামারী রূপে; পৃথিবীর দীর্ঘস্থায়ী মহামারীর নাম বিশ্বাস।
তিনি এক সাক্ষাৎকারে বিশ্বাসের বিশ্লেষণ করে বলেছেন, বিশ্বাস কাকে বলে? আমরা কি বলি আমি পিঁপড়েয় বিশ্বাস করি, সাপে বিশ্বাস করি, জলে বিশ্বাস করি, বা বজ্রপাতে বা পদ্মা নদীতে বিশ্বাস করি, এসব এবং এমন বহু ব্যাপারে বিশ্বাসের কথা ওঠে না, কেন না এগুলো বাস্তব সত্য বা প্রমানিত। যা সত্য বা প্রমানিত, যা সম্পর্কে কোনো সন্দেহ নেই, তাতে বিশ্বাস করতে হয় না; কেউ আমরা বলি না যে আমি বিদ্যুতে বিশ্বাস করি, বা রোদে বিশ্বাস করি, বা গাড়িতে বিশ্বাস করি। কেন না সত্য বা প্রমানিত ব্যাপারে বিশ্বাস করতে হয় না, বিশ্বাস করতে হয় অসত্য, অপ্রমানিত, সন্দেহজনক বিষয়ে। অসত্য, অপ্রমানিত, কল্পিত ব্যাপারে আস্থা পোষণই হচ্ছে বিশ্বাস। বিশ্বাস নিশ্চয়তা বোঝায় না, সন্দেহই বেশি বোঝায়; তবে বিশ্বাসীদের স্বভাব ভাষার স্বভাবের বিপরীত; ভাষা যেখানে বোঝায় অনিশ্চয়তা, বিশ্বাসীরা সেখানে বোঝেন নিশ্চয়তা।
হুমায়ুন আজাদের প্রথার বিরোধীতা ও অবিশ্বাসই তাঁকে অনেকের নিকট ভয়ঙ্কর করে তুলেছে। উগ্র মৌলবাদীরা তাকে বিপদজনক মনে করতো। আমাদের পশ্চাৎপদ সমাজ তাঁকে গ্রহণ করার সামর্থ রাখে না। ভিন্নমত এখানে শত্রুতার সৃষ্টি করে। এজন্যই অনেকের কাছে তিনি শত্রু হয়ে হয়ে উঠেছিলেন। তিনি নিজে যেমন প্রথাবিরোধী ছিলেন আবার তাঁর সাহিত্যও প্রথাবিরোধী। অন্যদের মতো তিনি জীবন যাপন করেন নি। অন্যদের মতো তিনি সাহিত্য চর্চা করেন নি।
[মুজিব রহমান: সভাপতি, বিক্রমপুর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিষদ; সভাপতি- জাতীয় সাহিত্য পরিষদ, মুন্সীগঞ্জ জেলা; সভাপতি, অনুপ্রাস শ্রীনগর শাখা, সম্পাদক, ঢেউ (লিটল ম্যাগাজিন), সহ-সাধারণ সম্পাদক, অগ্রসর বিক্রমপুর শ্রীনগর কেন্দ্র]

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


