রনির হাতে বড় একটি ইটের টুকরো। তার চোখ চারধার খুঁজছে ।“পেলে হয় একবার” বিড় বিড় করছে ও। হয়েছে কি,ওর মা দুধ চাপিয়ে একটু বেড়িয়েছে আর অমনি সেই চিরাচরিত ঘটনার পুনরাবৃত্তি। লোভী হোৎকা,লেজ ফোলা বেড়ালটা! যে মুখ দিয়ে ইঁদুর ধরে সে মুখ দিয়েই চুকচুক শব্দ তুলে দুধটুকু মেরে দিচ্ছিল। বুড়ো দাদুই দেখলো আগে। দেখেই চিৎকার, ‘ আমার ক্ষীর খেয়ে নিল গো।’ দাদু দুধকে ক্ষীর বলে, কেন বলে কে জানে! বুড়ো বলেই হয়তো। দাদু অদ্ভূত লোক, সে দোতলা বাস কে বলে হাতি। রনির ভীষন মজা লাগে শুনতে। সে ও দোতলা বাস কে মনে মনে হাতি বলে ডাকে। এদিকে দাদুর চিৎকারে বিড়ালটা জানলা গলে উধাও । বেড়ালটাকে কিন্তু রনির ভালো লাগে। কেমন ফুলো ফুলো চেহারার বয়সী বেড়াল। মানুষের মত করে তাকায়। কিন্তু বেড়ালের এ অকৃতজ্ঞতায় ও ভীষন অবাক হয়।ওর ভারী রাগ হতে থাকে। দুদিন আগে সে বিড়ালটাকে নিয়ে কবিতাও লিখেছিল একটা।
বেড়ালটা খুব বান্দুর
রোজ খায় ইন্দুর
কবিতায় মিলের জন্য সে বান্দর কে বান্দুর লিখেছে।অথচ সেকি জানতো কবিতার বেড়ালটাকে মারার জন্য তাকে ইট হাতে দাঁড়াতে হবে রাস্তায়।
রনি রাস্তায় ওর বন্ধুদের খুঁজতে থাকে।কয়েক জন মিলে খুঁজলে হয়তো কাজটা সহজ হয়ে যেত। আজ সে বেড়ালের ঠ্যাং ভাঙবেই,দাদুকে ও কথা দিয়েছে। রনি রাগে ফোঁস ফোঁস করতে থাকে,যেন সে নিজেই একটা রাগী বেড়াল। এ পাড়ার লোকদের জ্বালিয়ে খাচ্ছে পাজিটা। সবচে বেশি লোভ বুঝি রনিদের বাড়ির দিকেই। দাদু তো রোজ ওকে অভিশাপ দেয়। আর সে অভিশাপ মাথায় নিয়ে নবোদ্যমে বেড়ালটা ফিরে ফিরে আসে যেন। বেড়ালটাকে রনি এতকাল কি ভাবে যে সয়েছে তা ভেবে ও অবাক না হয়ে পারে না । তবে কেউ কখনো ওকে ছুঁতে পারে নি।
ও এক মহান চোর - রফিক বলেছিল কথাটা। রফিক ওর বন্ধু। চোরেরা কি ভাবে মহান হয় সে কথা রনি ভেবে পায়না । মহা চোর হলেও না হয় একটা কথা ছিল। রফিক প্রায়ই এমন ভুল বকে। ওর কথা রনি ধরে না ।
রাস্তাটা সোজা, দীর্ঘ আর একঘেয়ে।অনেকটা দুর দেখা যায়।দু পাশে এলোমেলো বাড়ি ঘর।ওদের এলাকাটা শহর থেকে বাইরে।শহরটা ক্রমশ বাড়ছে। ছড়িয়ে যাচ্ছে চারপাশ,ঠিক যেভাবে সাবানের ফেনা জলের ওপর ছড়িয়ে পড়ে। রনিদের রাস্তায় নতুন ল্যাম্পপোস্ট বসানো হয়েছে।এই মধ্যদুপুরে ল্যাম্পপোস্ট গুলোকে কি হাস্যকরই না লাগছে।
হঠাৎ হৈচৈ এর শব্দ শোনা গেল! অনেকগুলো বাচ্চা আর একটা লোক এদিকে আসছে। লোকটা ঢ্যাঙ্গা আর মাথা ভর্তি কালো চুল। চারপাশে বাচ্চা গুলো থাকাতে তাকে আরো লম্বা লাগছিল। হাঁটছিল এমনভাবে যেন সে হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা,ভুলিয়ে ভালিয়ে বাচ্চাগুলোকে নিয়ে যাচ্ছে গোপন গন্তব্যে। সবাই আনন্দে লাফাচ্ছিল । রনি দেখল ভিড়ের মাঝে ওর বন্ধুরাও আছে কয়েকজন।
ভিড়টা কাছে আসতেই রনিও আনন্দে কলকল করে উঠে।ওর হাত নিশপিশ করে। সেই বেড়ালটাই তো ।বেড়ালের গলায় দড়ি বেধে লোকটা হিড় হিড় করে টানছে । “ফাদঁ পেতে ধরেছে ওটাকে’’-বন্ধুরা জানায় ওকে ।‘‘ লোভী বেড়াল ’’ লোকটা সবার দিকে তাকিয়ে বলে-‘‘আজ এর শাস্তি হবে’।
‘শাস্তি হবে’, ‘শাস্তি হবে’ ছেলেরা আনন্দে সমস্বরে চেচায়। রনি ভেবে পায়না কি শাস্তি হবে ওর। সেও ওদের সাথে আসতে থাকে। রনির সব কিছুই কেমন যেন রোমাঞ্চকর লাগে। বেড়ালটা কে যে এভাবে পেয়ে যাবে ও ভাবেই নি! বেড়ালটাকে মনে হচ্ছিল কোন ঘাঘু চোর। হুমড়ি খেয়ে পড়ছিল সারান। গলায় শক্ত হয়ে এটে বসেছে দড়ি। অদ্ভুত ঘর ঘর শব্দ আর সীমাহীন আতঙ্ক নিয়ে তাকাচ্ছিল,দেখছিল চারপাশ।রনির দিকেও যেন তাকালো একবার। বেড়ালটাকে প্রায় ছেচড়ে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল লোকটা। অবশেষে লোকটা এক দেওয়ালের কাছে এসে থামে। দেওয়ালের কাছে একটা বড় গাছ । লোকটা গাছে ঠেস দিয়ে জিরোয়। চারপাশে গোল হয়ে থাকে ছেলেরা। ডান হাতে বেড়ালের গলার রশি ধরে লোকটা সবার দিকে তাকায়। রনি ল্য করে লোকটার চোখে কেমন একটা মায়া মায়া ভাব ।
বলোতো ছেলেরা,ওকে আমরা কি শাস্তি দেব? - লোকটা জিজ্ঞেস করে। ছেলেরাতো আসলেই জানেনা ,তারা উত্তেজনায় টগবগ করে আর রুদ্ধশ্বাসে দেখে।
“ওকে আমরা এই গাছের সাথে ফাঁসি দেব” জ্বলজ্বলে চোখে সে বলে। দুপুরের রোদ তখন মাথার উপরে। আকাশে মেঘ উড়ছে। প্রচন্ড গরম। সে গরমে রোদ মাথায় নিয়ে ছেলেরা এই প্রথম সামনাসামনি কোন ফাঁসির আসামীকে দেখে। কেমন নতজানু হয়ে পড়ে আছে। ধুলো বালি লেগে বেড়ালটা যেন এক ময়লার পোঁটলা। শুধু চোখ দুটো কি ভীষণ পরিষ্কার!
লোকটা নিপুণ হাতে দড়িটা গাছে ঝুলিয়ে দেয়। বেড়ালটাও পাক খেতে খেতে উঠে আসে শূণ্যে। পা গুলো ভীষণ ভাবে ছুড়তে থাকে। গলার ফাঁস আরো শক্ত হয়ে এঁটে বসে। গলা দিয়ে ঘর ঘর শব্দ বের হতে থাকে। হঠাৎ করে যেন শব্দহীন হয়ে পড়ে চারদিক। ছেলেরা বিস্ফোরিত চোখে দেখে,বেড়ালটা মরে যাচ্ছে।
রনি হঠাৎ চেঁচিয়ে ওঠে, ‘ওকে ছেড়ে দিন।’ সে লোকটার সামনে এগিয়ে আসে। ওর গলার আওয়াজে কি যেন একটা উঠে আসে। সেটি অনুরোধের চেয়ে তীব্র ,আদেশের চেয়ে বড়,ধমকের চেয়ে জোরালো। ওর গনগনে চোখ,মুষ্টিবদ্ধ হাত,উন্মত্ত স্বর লোকটাকে কেমন নিভিয়ে দেয়। লোকটা হয়তো আশ্রয়ের খোঁজে চারদিকে তাকায়। খানিক আগের ছেলেদের সেই কৌতুহলি চোখে হঠাৎ যেন নতুন কী এক ফুটে উঠে। মনে হয় ওরা যেন ভুল বয়সী মানুষ। লোকটাকে ওদের কাছে ছোট আর ক্ষুদ্র দেখায়।লোকটা মিনমিনে গলায় বলে,“কিন্তু ও লোভী”। ‘হোক তাও ছেড়ে দিন” ,সবাই সমস্বরে বলে ওঠে। ওরা হঠাৎ বুঝতে পারে খাবার চুরির জন্য কাউকে মেরে ফেলা যায় না।
এরপর সর্বশেষ খবর হচ্ছে এই ,মানুষ যেমন করে দত্তক নেয়,যেমন করে পুষ্যি নেয় ছোট বাচ্চাদের, তেমন করে রনিও পুষ্যি নিয়েছে বেড়ালটাকে! রনির থেকে বয়সে বড়, বুড়ো বেড়াল কে পুষ্যি নেয়ায় কোন আইনি বাধা আছে কি না কে জানে!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



