(ভূমিকার পরিবর্তে কৈফত: এই লেখাটা এখনো অসমাপ্ত। আগেই যারা পড়েছেন তারা কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ করবেন। আরো যোগ করার আছে। তা, সময় পেলে যোগ করার ইচ্ছা পোষণ করছি। যারা পড়বেন তারাও যদি মতামত দেন তাহলে আমার 'বুঝ' এর জায়গাটা হয়তো আমি চিহ্নিত করতে পারবো। সবাইকে নববর্ষের শুভেচ্ছা।)
আমি, রাজধানী শহরে ৯০-এর উত্তাল হাওয়া স্তিমিত হয়ে আসার পরে ১৯৯৪ সালের দিকে, প্রথম আসি। উঠি বন্ধুদের সঙ্গে রামপুরায়। বন্ধুরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভরতি যুদ্ধে অংশ নেবার জন্য কোচিং করে। আর আমি সারা দিন তাদের ছোট খুপরির মধ্যে থাকি কোথাও বের হই না। বন্ধুরা খুপরিতে ফিরলে তারা একে অপরে কী কী শিখলো তা নিয়ে আলোচনা করে। আমি তাদের আলোচনা শুনি। কোন কথা বলিনা। চুপচাপ হয়ে তাদের কথা শুনি। ওই সময়ে ওরা সবাই কোচিং এ গেলে আমি লেখার চেষ্টা করি। মনে যা আসে তাই টুকে রাখি। একমাস ওদের সাথে থাকি আর ওদের কোচিং ক্লাস থেকে শিখে আসা বিষয়গুলার আলোচনা মনোযোগ দিয়ে শুনি চুপচাপ। একা কোথাও বের হইনা। ভয় লাগে। মনে হয় খুপরি থেকে বের হলে যদি হারিয়ে যায়! এই ভয়ে বের হইনা। আগেই ভরতি ফর্ম পূরণ করে এসেছিলাম বন্ধুদের সঙ্গে। ওদের সঙ্গে ভরতি পরীক্ষায় অংশ নিই এবং ঢাবিতে সমাজবিজ্ঞানে ভর্তি হই ১৯৯৪-৯৫ বর্ষে। আমি গ্রাম থেকে এসেছি, দেহ-মনে গ্রামের সাধারণ দৃশ্যাবলী জড়াজড়ি করে আছে। মানে দেশের একদম প্রান্ত থেকে এসেছি, সেখানকার মানুষের আচার-আচরণ, রীতিনীতি সেই প্রান্তের সহজ-সরল মানুষদের জীবনবোধ তখন আমার ভেতরও গভীরভাবে লেপটানো, যে ধরণের মানুষকে শহরের মানুষেরা 'গেঁয়ো' হিসেবে চিহ্নিত করে থাকেন, ঠাট্টা-তামাশাও করেন (পরবর্তীতে এটা আমি দেখেছি)। নতুন এই পরিমণ্ডলে পদার্পণ করার পর এইখানকার সব কিছুতেই কেমন যেন নতুন নতুন লাগে, অচেনা-অজানা, দূরের মনে হয়। দূরের বা অচেনা মনে হয় এ কারণে যে, এই নতুন পরিসরের মধ্যে আমি কোন কিছুর সাথেই নিজেকে মেলাতে পারিনা, খাপ খাওয়াতে পারিনা। যা পর্যবেক্ষণ করে এসেছি নিজ পরিমণ্ডলে এখানে তার কোন দিকচিহ্ন যেন ঠিক পূর্বের পর্যবেক্ষণকৃত দৃশ্যের সাথে মেলেনা। এরকম অনেক 'বিষয়' আছে, এখনো মন ও মননের তলে সেগুলা নিবু নিবু হয়েও জেগে আছে, সক্রিয় হয়ে আছে। এটা যেন আমার অন্তর্গত মননের নিচে আলোর উত্তাপের মতো। আমাকে কোমর সোজা হয়ে দাঁড়ানোর শক্তি যোগায়। প্রেরণা দেয়। এসব বিষয়গুলাকে এখানে আলোচনা করতে গেলে অনেকেরই ধৈর্ষ্যচ্যুতি ঘটতে পারে, তাই কোন একসময় হয়তো তা আলোচনা করাবো।
শহরে আসার পর থেকেই আমি লক্ষ করতে থাকি পয়লা বৈশাখ এলেই পান্তাভাতের উতসবে চৌদিকে হৈ হৈ রৈ রৈ পড়ে যায়। আমার কাছে এইটা শুধু হৈ হৈ রৈ রৈ মনে হয় নাই। আমার কাছে মনে হয়েছে এটার ভেতর রাজনীতি আছে। অনেক দিন থেকেই এই নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করছি। এখানে আমি সেই চিন্তা-ভাবনাজাত 'পান্তাভাতের রাজনীতি' টা নিয়ে আমার পর্যবেক্ষণের কিছু কথা শেয়ার করবো। এই ‘পান্তাভাতের রাজনীতি’ কীরকম তা বোঝার চেষ্টা করবো। আপনাদের মতামতও আপনারা দিয়েন। আমার পর্যবেক্ষণটা এখানে শেয়ার করতে চাই একারণে যে আমার মতো অনেকই আছেন, তারাও হয়তো এই বিষয়টা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করছে। তাদের কাউকে কাউকে চিনি, অনেকেরই হয়তো চিনিনা, সেকারণে তাদের সাথে একধরণের কমিউনিকেট করতে চাই, রাজনীতিটা বুঝতে চাই। ভাবের আদান প্রদান করা এবং নিজের বুঝটাকে আরো শাণিতকরণ করে তোলাও আরো একটা কারণ, একই সাথে না-বুঝের জায়গাগুলাও দেখে নেওয়া যেন যায়।
'পান্তাভাত' আমার কাছে খুব সাধারণ একটি বিষয়। আমার মতো দেশের একদম প্রান্ত থেকে যারা এই রাজধানীতে যারা এসেছে 'সাধারণ পরিবার' মানে নিম্নমধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্ত, কৃষক বা অকৃষক পরিবার থেকে, তাদের কাছে এই 'পান্তাভাত' অতি পরিচিত একটি বিষয়। বলা যায় কৃষক সমাজের খুব সাদামাটা একটি বিষয়। যা কৃষক সংস্কৃতির একটি উপাদানও বটে। তা কৃষক সমাজের মধ্যকার মানুষজনের জীবনাচরণের স্ফূরণও লেগে থাকে শুধু না, তাদের চৈতন্যের স্রোতও এর ভেতর প্রোথিত।
কিন্তু রাজধানীতে আসার পর, এখানে বিভিন্ন ধরণের প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তির ভেতর বিশেষ করে বাঙলা সনের প্রথম দিবসে 'পান্তাভাত' অসাধারণ একটি বিষয় হয়ে ওঠে। শহুরী অভিজাত ও শিক্ষিত অ-অভিজাত শ্রেণির কাছে এইটা একটা অতি কর্তব্য পালনীয় বিষয় হয়ে ওঠে। তারা এইটা প্রতি বছর খুব তাজিমের সাথে পালন করেন। এবঙ এর ফলে উক্ত শ্রেণির মধ্যকার সম্পর্কও এই পান্তাভাত উৎসবকে কেন্দ্র করে দেখা-সাক্ষাতের ভেতর দিয়ে একটা পাটাতনের দিকে নিয়ে যায়, যায় নাকি? নিজেদের ভেতর এই যে 'কৃষক সমাজের সাদামাটা পান্তাভাত' কে নিয়ে নিজের যোগাযোগ ঘটিয়ে যাচ্ছে, একটা সংস্কৃতি তৈরি করছে। যে বিষয়কে কেন্দ্র করে তারা উৎসব পালন করছে, সেখানে সেই বিষয়ের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত, তাদের দেখা নাই, তাদের অংশগ্রহণ নাই, এর কারণ কী?
এই পান্তাভাত তো আমার কাছে খুব সস্তা, আমার কাছে কেনো অসাধারণ হয়ে ওঠেনা? আমিও চেষ্টা করি, পারছিনা, আমার কাছে এইটাকে ভড়ং মনে হচ্ছে। সুন্দর পরিপাটি হয়ে, নতুন সাজগোজ করে, গাড়ি হাকিয়ে, প্রচুর মানুষ - এরা সবাই শিক্ষিত, ঝকঝকে, ঝলমলে 'পান্তাভাত' খায়। আমার মন চাইনা কেনো? এই শহরের আরো কতশত গরিব মানুষ আছে, জীবনের সাথে লড়াই করে তারা বেঁচে-বর্তে আছে, তারা ঘটা করে 'পান্তা' খায় না কেনো, কেন তারা এইসব পান্তা উৎসবে যোগ দেয়না? আমি বুঝতে চাই।
পান্তাভাত আমার পরিবারে আমি প্রচুর খাইছি। এটা রাতের খাবার শেষে যে ভাত থেকে যেত মা সেই বেচে যাওয়া ভাতে পানি দিয়ে রাখতো। সকালেও রান্না হতো, কিন্তু ওই বেচে যাওয়া ভাত মানে পান্তা আমরা খেতাম খুব সকালে। বাবাও হয়তো খুব সকালে কোথাও কাজে যাবে তো ওই পান্তা খেয়ে চলে যেতেন। গরম ভাত রান্না শেষ হলে আবার আমরা খেতাম। মূলত রান্না হতো দুইবার সকালে এবং রাতে। কখনো কখনো দুপুরেও রান্না হতো। এই পান্তাভাত গ্রাম এলাকার মানুষের কাছে সাধারণ একটি ঘটনা। জীবন-যাপনের একটি অংশ। পান্তা ভাতে ইলিশও খেয়েছি, কাঁচামরিচ বা পেঁয়াজ দিয়েও খেয়েছি আবার শুকনা মরিচ পোড়া দিয়েও খেয়েছি। খারাপ লাগতো না।
শহরে এই 'পান্তাভাত' খাবার উৎসব যারা করতেছেন এইটা কী তাদের জীবন যাপনের অংশ? তারা তো সারা বছর খায় না, কেন এই সময় খায়? এর রাজনীতিটা কী?
যারা এখনও পান্তাভাত খায়, তারা তো এই উৎসবে যোগ দেয়না, কেন তারা যোগ দেয়না? তারা তো আমাদের আশেপাশেই থাকে। তাদের কাছে যে বিষয়টা অতি সাধারণ একটি ঘটনা, সেই বিষয়টারে শহুরতলির শিক্ষিত মানুষেরা কেন ঘটা করে উৎসবে পরিণত করেন?
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই এপ্রিল, ২০০৯ দুপুর ২:১৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



