বিশ্বখ্যাত আইটি রিসার্চ প্রতিষ্ঠান গার্টনার প্রতিবছর বিভিন্ন ধরণের প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তার মধ্যে একটি হলো বিশ্বের ৩০টি দেশকে চিহ্নিত করা যেখানে আউটসোর্সিং ভাল। মানে ৩০টি আউটসোর্সিং গন্তব্য। এবারের প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে এ সম্ভাবনার মধ্যে রাখা হয়েছে। বলা যায়, গত দুবছরে যে সব কাজ হয়েছে তার একটি স্বীকৃতি।
এ নিয়ে আজ বেসিস একটি সংবাদ সম্মেলন করেছে। সেখানে প্রতিবেদনের বাংলাদেশ অংশের একটি লিখিত কপি সবাইকে দেওয়া হয়েছে। মূল প্রতিবেদনটি কিনতে হয়। কাজে সবার পক্ষে এটিযোগাড় করা সম্ভব নয়। আমি যে কাগজটি এতক্ষণ পড়লাম তার মর্মার্থটি বোঝার চেষ্টা করছি।
মূল প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে আউটসোর্সিং গন্তব্য হিসাবে বিবেচনার জন্য মোট ১০টি বিষয়কে বিবেচনা করা হয়েছে ভাষা, সরকারি সহায়তা, কর্মী প্রাপ্যতা, অবকাঠামো, শিক্ষা ব্যবস্থা, খরচ, রাজণেতিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশ, সাংস্কৃতিক কম্প্যটাবিলিটি, বৈশ্বিক ও আইনি ম্যাচুরিটি, ডেটা ও মেধাসম্পদের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা।
তাদের মূল পর্যবেক্ষণ
* বাংলাদেশ এখনো জনপ্রিয় আউটসোর্সিং গন্তব্য হওয়ার মতো ম্যাচুরিটি অর্জন করেনি
* বাংলাদেশে খরচ খুবই কম তবে সামগ্রিক আইটি ইকোসিস্টেম এখন অউন্নত (Underdeveloped)।
যারা আউটসোর্সিং করতে চায় তাদের জন্য গার্টনারের সুপারিশ
• বাংলাদেশকে লো-রিস্ক আর পণ্য ভিত্তিক (? Commoditized) আউটসোর্সিং এর জন্য কেবল বিবেচনা করা যাবে যাতে কম খরচের সুফল নেওয়া যায় (Consider Bangladesh only in scenarios in which the work to be outsourced offshore is of commoditized and a low-risk type that can take advantage of its low-cost proposition)
• বাংলাদেশকে উচ্চ মানের আউটসোর্সিং যেখানে উপাত্তের নিরাপত্তা ও মেধা সম্পদ মুখ্য (Do not consider Bangladesh for high-end work that requires scale and high data security and intellectual property norms.)
প্রতিটি বিষয়ে গার্টনারের একটি রেটিং আছে যা এক্সসেলেন্ট, খুব ভাল, ভাল, চলে (Fair) ও দুর্বলের একটি হতে পারে।
১০টি ক্ষেত্রের জন্য তাদের রেটিং
ভাষা - দুর্বল
সরকারি সহায়তা - চলে
কর্মী প্রাপ্যতা - চলে
অবকাঠামো - দুর্বল
শিক্ষা ব্যবস্থা - চলে
খরচ - খুব ভাল
রাজণেতিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশ - চলে
বৈশ্বিক ও আইনি ম্যাচুরিটি - চলে
সাংস্কৃতিক কম্প্যটাবিলিটি - চলে
ডেটা ও মেধাসম্পদের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা- দুর্বল।
প্রত্যেকটি বিষয়ে তাদের চূড়ান্তরেটিং-এর পক্ষে বিশ্লেষনগুলো তুলে ধরা হয়েছে। ভাষার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে যেমন প্রয়োজনীয় দক্ষতা নেই তেমনি শিক্ষকরা যথেষ্ঠ উপকরণ সমৃদ্ধ ও প্রশিক্ষিত নন। সরকারি সহায়তার ক্ষেত্রে ডিজিটাল বাংলাদেশের কারণে সরকারের নজর বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। সরকার নিজে এবং অন্যদের সহায়তা নিয়ে চেষ্টা করছে বলে তাদের ধারণা। কর্মী প্রাপ্যতার সময় তারা লক্ষ্য করেছে দেশে আইটি দক্ষতা প্রশিক্ষণের বিষয়টি মোটামুটি অবহেলিত। অন্যদিকে কম টাকায় যে প্রকর্মী পাওয়া যায় তাদের আইটি দক্ষতা ভাল যা দৃষ্টি আকর্ষণী। টেলি ও পিসি ঘনত্ব কম, ইন্টারনেটের আর যোগাযোগের ব্যাপার খুবই খারাপ ধরনের। টেলিকম সামগ্রীর ওপর চড়া শুল্ক যে এর বিকাশের জন্য ভাল নয় সেটির আভাসও আছে। ভাল বলেছে যে, সরকার এ খাতে নজর দিচ্ছে যা ভবিষ্যতে ভাল ফল দিতে পারে।
শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রতিবছর ৫০০০ আইটি গ্রাজুয়েট, ৫৫% শিক্ষার হার আর নতুন শিক্ষানীতিতে তথ্যপ্রযুক্তির সম্প্রসারণের উল্লেখ রয়েছে। বিদ্যালয়গুলোতে কম্পিউটার ল্যাব গড়ে তোলার সরকারি চেষ্টার প্রশংসা করা হয়েছে। তবে, এসব থেকে দৃশ্যমান সুবিধা পেতে কয়েকবছর লাগবে। বলা হয়েছে শিক্ষা খাতে দক্ষ শিক্ষক এবং উন্নত শিক্ষা পরিবেশের অভাব রয়েছে। খরচের বেলায় বলা হয়েছে বাংলাদেশে কমটাকায় ভাল মানের আইটির লোক পাওয়া যায়। রাজনীতি ও অর্থণীতির ব্যাপারে দুর্নীতির বিষয়টি মুখ্য হয়েছে প্রতিবেদনে। দেশটি যে অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল(Financially Weak) এটা বলা হয়েছে ভাল ভাবেই। বাংলাদেশ স্কলার/একাডেমিশিয়ান বিনিময়ে আগ্রহী এটি তার সাংস্কৃতিক সম্প্রসারণের একটি ভাল দিক। তবে, বিশ্বব্যাংকের ব্যবসা করার পরিবে সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান (১৫০ এ ১১৯) যে ভাল নয় সেটির ওপর যথেষ্ঠ জোর দেওয়া হয়েছে যেমনটি হাইলাইট করা হয়েছে বাংলাদেশের পাইরেসি হার। সাইবার অপরাধযে এখনো তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না সেটির উল্লেখ রয়েছে।
রিপোর্টের বাংলাদেশ অংশ পড়ে আমার মনে হয়েছে কেন গার্টনার আসলে গার্টনার। ওদের হোমওয়ার্ক ভাল। আমাদের দেশে অনেকে মনে করে আমরা আউটসোর্সিং-এর জন্য ভাল কারণ আমাদের শিক্ষার মধ্যে ইংরেজি রয়েছ!!! অথচ এটি যে একটি মন্তবড় ভুল ধারণা তা অনেকে বলে না। ১৬ বছর ইংরেজি পড়ে আমাদের শিক্ষার্থীদের ইংরেজি কমিউনিকেশনের যে অবস্থা হয় তা বলা বাহুল্য। ইংরেজী নিয়ে এখানে আমি কিছু লিখেছি এবং একটি ইংরেজী অলিম্পিয়াড শুরু করার চেষ্টাও করছি। ইংরেজি যে আজ একটি টুল সেটি অনেকে বুঝতে চান না। আশাকরি, গার্টনারের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়াটা অনেকের ঘুম ভাঙ্গাতে সাহায্য করবে। অন্যদিকে সারাদেশে আইটি, কম্পিউটার শিক্ষা ছড়িয়ে দোএয়ার জন্য কম্পিউটার ল্যাব তৈরি যে, শেষ বিচারে দেশের সক্ষমতা বাড়ায় সেটিও এখানে উল্লেখ করা হয়েছে।
এখন দেখা যাক, আমাদের দুর্বলতা বলে চিহ্নিত অংশগুলো আমরা উন্নতি করতে পারি কী না। বলে রাখা ভাল, এটি এমন একটি তালিকা যেখানে প্রতিবছর থাকতে হলে থেমে থাকা যায় না। কারণ অন্যরা এগিয়ে আসে। কাজে, শ্রীলংকা গতবছরের আগের বছর ছিল, গত বছর ছিল না, এবছর আবার ফিরে এসেছে। কাজে আমাদেরকে এটিও মাথায় রাখতে হবে।
তবে, আগামি কয়েকদিন এটিই মনে রাখা দরকার যে, তালিকায় ঢুকতে পারাটাই আমাদের জন্য অনেক বড় অর্জন। আর সে অর্জনই আগামীতে সামনে যাওয়ার প্রেরণা যোগাবে।
সবার সেকেন্ড ডিফারেন্সিয়াল নেগেটিভ হোক।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



