somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

প্রিয় হুমায়ুন আজাদ: আজ যাকে খুব বেশি মনে পড়ে

২৭ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ রাত ৯:৪৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ক.
'আব্বুকে মনে পড়ে' সে কবে কৈশরে পড়ে ছিলাম। শিশু-কিশোরদের জন্য হুমায়ুন আজাদের লেখা মুক্তযুদ্ধভিত্তিক বইটি। আজ সকালে দৈনিক ভোরের কাগজ এ হুমায়ুন আজাদের ছেলে অনন্য আজাদের লেখা 'শুধু দুর্নীতিবাজ নয় হত্যাকারীদেরও ধরুন' লেখাটির শিরোনাম দেখে খুব দ্রুত মনে পড়ে গেল সে কৈশরে পড়া 'আব্বুকে মনে পড়ে' বইটির কথা। অনন্য আজাদ, মৌলি আজাদ এদের নিশ্চই খুব বেশি মনে পড়ে তাদের 'আব্বু' হুমায়ুন আজাদ কে। স্বাভাবিকভাবে। প্রতিদিন-প্রতিমুহূর্তে। সকাল-দুপুর-সন্ধা-রাতে। ঘুমে, জাগরণে এবং স্পপ্নেও। আমাদেরও মনে পড়ে। খুব বেশি করে মনে পড়ে। ফেব্রুয়ারি এলে, বইমেলা এলে আরও বেশি করে, মনের গভীরে নাড়া দিয়ে যায় হুমায়ুন আজাদের স্মৃতি। হুমায়ুন আজাদের কথা।
খ.
আজ ২৭ ফেব্রুয়ারি। ২০০৪ সালের এ ভয়াল দিনে হুমায়ুন আজাদ তার প্রিয় বইমেলা থেকে বাড়ি ফেরার পথে মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির নগ্ন পৈশাচিক হামলার শিকার হয়েছিলেন। হুমায়ুন আজাদের এ হত্যা চেষ্টায় তিনি মৃত্যুর কাছ থেকে ফিরে এলেও শেষ পর্যন্ত আমরা তাঁকে বাঁচাতে পারিনি। অল্প কিছুদিন পরে জার্মানীতে তার রহস্যজনক মৃত্যু হয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে গভীরভাবে বিশ্বাস করি, ৭১ এর পরাজিত শক্তি, মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি সেদিন হুমায়ুন আজাদকে বইমেলায় হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণ না করলে তিনি আরও অনেক দিন আমাদের মাঝে বেঁচে থাকতেন। তিনি আরও দীর্ঘ সময় ধরে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে যেতে পারতেন তার অনবদ্য লেখনি ও সৃষ্টিশীলতা দিয়ে। আমাদের দুর্ভাগ্য। আমরা হুমায়ুন আজাদ কে বাঁচাতে পারিনি। দিতে পারিনি একটি স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারন্টি। যে সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদী-প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিকে পরাজিত করে স্বাধীন হয়েছিল বাংলাদেশ সে বাংলাদেশেই পরাজিত শক্তি বাঁচতে দেয়নি হুমায়ুন আজাদকে। আমাদের হুমায়ুন আজাদকে। মুক্তিচিন্তার হুমায়ুন আজাদকে।
গ.
আজ খুব মনে পড়ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেলে আসা সে দিনগুলোর কথা। এস এম হলের আবাসিক ছাত্র হিসেবে কলাভবনে আমার যাতায়াত ছিল প্রায়শ ফুলার রোড় হয়ে। বেশির ভাগ সময় পায়ে হেটে আসতাম। আমার আসা-যাবার পথে বলা যায় প্রতি সপ্তাহেই দেখা পেতাম হুমায়ুন আজাদের। জিন্স, কেডস আর গেঞ্জি পরে, অত্যন্ত ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে তিনি হয় কলাভবন যাচ্ছেন অথবা ফিরে আসছেন তার ফুলার রোডস্থ বাসায়। কখনো বিকেল অথবা সকালে দেখেছি হুমায়ুন আজাদ, বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক, বাইসাইকেলে করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সে একই ফুলার রোড হয়ে টিএসসি-কলাভবন, তারপর আবার ফুলার রোডের দিকে। তাঁকে কখনো দেখেছি আজিজ সুপার মার্কেটে। তাঁকে যখনই দেখেছি থমকে দাঁড়িয়েছি। দৃষ্টি স্থির হয়ে এসেছে তাঁর দিকে। অপলক চোখে চেয়ে শুধু দেখেছি বাংলা সাহিত্যের অমিত সম্ভাবনার মহিরূহকে। শ্রদ্ধায় প্রতিবারই মাথা নুয়ে এসেছে তার প্রতি। তার সৃজনশীলতার প্রতি। তাঁর সাহসের প্রতি। সত্য ও সুন্দরের প্রতি তার নিরবিচ্ছিন্ন ভালবাসা, আদর্শের প্রতি তাঁর দৃঢ মনোবল কেবলই অভিভূত হতে বাধ্য করতো আমাকে, আমাদেরকে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাম্পাসে এলে আমার চোখের সামনে এখনও ভেসে ওঠে সেসব স্মৃতি ও দৃশ্যমান জীবন্ত ছবি। আমার মনে হয় এ বুঝি হুমায়ুন আজাদ আসছেন। ঠিক আগের মতো। জিন্স, ক্যাডস আর গেঞ্জি পরে। ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে। অথবা সাইকেলে চড়ে। হুমায়ুন আজাদ নেই-এ কথা ভাবতে আমার বুক ভারি হয়ে আসে। বুক ফেটে কান্না আসে। না আমি হুমায়ুন আজাদের সরাসরি ছাত্র ছিলাম না। তবু আমি বিশ্বাস করি, তিনি আমার শিক্ষক ছিলেন, একবোরে আক্ষরিক অর্থে। পিতৃতন্ত্র, মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, নারীর সামাজিক অবস্থা, তার পরিপ্রেক্ষিত এ সব বিষয়ে বিদ্যাজাগতিক ধারণার প্রাথমিক সূত্রগুলো আমি হুমায়ুন আজাদের বই পড়েই জেনেছি। তাঁর 'নারী' বইটির প্রায় প্রতিটি পৃষ্ঠা আমি নানা রঙ্গ আর দাগে পরিপূর্ণ করে তুলেছিলাম এ জন্য যে, পড়তে গিয়ে তার প্রতিটি লাইন আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে।
ঘ.
হুমায়ুন আজাদকে কেন খুন করা হলো! হ্যা খুনইতো। কারণ এটাতে সত্য যে, বাংলা একাডেমির বই মেলায় তিনি ৭১ এর পরাজিত শক্তি ঘাতক-খুনি দ্বারা আক্রান্ত না হলে তাঁর এ অস্বাভাবিক মৃত্যু হতো না। হুমায়ুন আজাদের মৃত্যুর কারণ তার অসীম সাহস। সত্য উচ্চারণের সাহস। তাঁর মতো আর কয়জন এভাবে সত্যকে উচ্চারণ করতে পেরেছেন অসীম সাহসের সাথে? হুমায়ুন আজাদের মৃত্যুর কারণ-মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্ভাসিত মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত বাংলাদেশ চাওয়া। হুমায়ুন আজাদের মৃত্যুর কারণ, তাঁর সদাসর্বদা সত্য বলার দুরন্ত সাহস। হুমায়ুন আজাদের মৃত্যুর কারণ তার সৃজনশীলতা, তার লেখনি শক্তি, তাঁর প্রতিভা। যে সৃজনশীলতা, যে প্রতিভাকে শিল্প-সাহিত্যের মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ করার মতো মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িক-প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর হাতে ছিল না। হুমায়ুন আজাদ সরাসরি কোন রাজনৈতিক দলের সদস্য ছিলেন না। বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীক শিক্ষক রাজনীতিতেও তার সরাসরি সম্পৃক্তার কথা শিক্ষার্থী হিসেবে আমাদের চোখে পড়ে নি। তবুও মৌলবাদী-সাম্প্রদায়িক শক্তি তাকে টার্গেট করেছিল। কারণ তারা বুঝতে পেরেছিল, হুমায়ুন আজাদের লেখনি, সৃজনীশক্তি প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক আন্দোলনের চেয়েও ধারালো ছিল। তাঁর লেখনি হাজারো মানুষকে মৌলবাদের বিরুদ্ধে, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সচেতন ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস-লড়াই এ উদ্বুদ্ধ করবে, যক্তিবাদী করে তুলবে। এটা জেনেই তারা হুমায়ুন আজাদকে বাঁচতে দেয় নি। সুতরাং ৭১ এ বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ড আর হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলা এবং তার মৃত্যু সেই একই সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী মনোজাগতিক ও পৈশাচিক সূত্রে বাঁধা এবং সে সূত্র সংশ্লিষ্ট পিশাচদেরই পরিকল্পনা এবং তার বাস্তবায়ন।

ঙ.
মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, প্রতিক্রিয়াশীলতা আজও আমাদের ভাবিত করছে প্রতিনিয়ত। আজও আমরা সাম্প্রদায়িকা, মৌলবাদমুক্ত একটি রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। এইতো মাত্র কয়দিন আগেও নিজামী-মুজাহিদ আমাদের পূর্বপ্রজন্মের রক্তে অর্জিত পতাকা নিয়ে মন্ত্রী হয়ে গাড়িতে ঘুরে বেড়িয়েছেন। তাদেরই আরেকজন আবার আমাদের জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জন মুক্তিযুদ্ধকে গৃহযুদ্ধ বলে আখ্যায়িত করেছেন। দেশে কোন যুদ্ধাপরাধী নেই বলে ৭১ এর সে ভয়ানক হাসি হাসছে। সাম্প্রদায়িক শক্তির হিংস্র থাবায় আবারও নতুনভাবে রক্তাক্ত হচ্ছে লাল-সবুজের পতাকা। তবে ৭১ এর পরাজিত শক্তির বিচারের দাবিতে আজ সারা বাংলাদেশ ঐক্যবদ্ধ হতে যাচ্ছে। দিকে দিকে রাজাকার-আলবদরের বিচারের দাবিতে জনমত গড়ে উঠেছে এবং উঠছে। ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা আজ জনদাবিতে পরিণত হয়েছে এবং হচ্ছে। আজকের এ দিনে একটি মৌলবাদ-সাম্প্রদায়িকতা ও রাজাকারমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার আন্দোলনে বিদ্যাজাগতিক ও মনোজাগতিক সাহস, শক্তি ও দিকনির্দেশনা দানের জন্য হুমায়ুন আজাদকে খুব বেশি প্রয়োজন ছিল। প্রিয় হুমায়ুন আজাদ, আজ আপনাকে আমাদের বড় বেশি প্রয়োজন।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ রাত ১১:২৫
৩৬টি মন্তব্য ৩৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকাল

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৭ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:৫১



আজকাল আমার মনে হয় -
আমাকে কেউ পছন্দ করে না,
কারো কাছে গেলে, সে বিরক্ত হয়।
পোশাক অগোছালো, এলোমেলো চুল,
চোখের দৃষ্টি কেমন ঘোলাটে!
বীরত্ব দেখানোর কিছু নেই।
চতুর পুরুষ স্ত্রীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে ৯টি বছরঃ একজন লিলিপুটিয়ান থেকে সত্যিকার ব্লগার হয়ে উঠার গল্প

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২৮

আজ আমার ৩য় বইয়ের জন্য চুক্তি করতে প্রকাশক আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। প্রকাশনা সংস্থা 'উত্তরণ'-এর মাসুদ ভাইয়ের বাংলাবাজারের অফিসে ঘণ্টাখানেক ছিলাম। তাঁর সাথে কথা বলতে বলতেই আমার মনে একটি বোধোদয় আসে! আমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×