somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সাংস্কৃতিক পুরুষতন্ত্রের হাতে কিশোরী মেয়েদের অনবরত খুন হয়ে যাওয়া!!!

০৬ ই এপ্রিল, ২০০৯ বিকাল ৩:০৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

এক.
পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই এ দরিদ্র নারীটিকে আমি গত চার বছর ধরে চিনি। সামান্য জীবিকার তাগিদে যারা গ্রামীণ শেকড় পেছনে ফেলে দিয়ে ছুটে এসেছে অনেকটা অনুভূতিশূণ্য এ নাগরিক ঢাকায় তিনি তাদের একজন। বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে কাজ করে অর্থহীন জীবন যাপন করেন। কিছু অর্থের জন্য। যে অর্থ তাদের কখনও অর্থপূর্ণ জীবন দেয় না। কেবল বেঁচে থাকার শক্তিটা জোগায়। বছর দু'এক আগে তার প্রতিদিনের তিন শিফট কাজের এক শিফট কাজ ছিল আমার বাসায়। সে সুবাধে পরিচয়। কেন জানি একটা সম্পর্কের টানে এ বৃদ্ধ মানুষটি মাঝে মাঝেই আমার বাসায় আসে। আমাদের খোঁজখবর নেয়। অল্প-বিস্তর সময় কাটায়। আমাদের একমাত্র কন্যা অরিত্রীর সাথে।
এইতো সেদিনও এলেন। তবে অনেক দিন পর। দীর্ঘ-বিরতির পর তাঁর আসা দেখে অনেকটা আনুষ্ঠানিকতা হিসেবেই জানতে চাওয়া
খালা, এতদিন পরে? কোন অসুখ বিসুখ করেনি তো?
না, তো বাড়ি গিয়েছিলাম
তারপর চুপচাপ। তেমন কথাবার্তা নেই। সাধারণত এমনটি হয় না। এ অসাধারণ আচরণে আবারও উৎসূক্য জেগে উঠা এবং যথারীতি আমার জিজ্ঞাস্য-
বেড়াতে গিয়েছিলেন?
-না, ছোট্র উত্তর
তাহলে?
-আমার বউ মারা গেছে?
কোন ছেলের?
-ছোট ছেলের
ছেলের বয়স কত?
-১৮-১৯
বউযের বয়স?
-১৩-১৪ হবে
কী হয়েছিল? কীভাবে মারা গেলো-
-পোয়াতী ছিল। বাচ্ছা হওনের সময়।

আমি আর কিছু জানতে চাই না। জানার ইচ্ছেও হয় না। আমার শুধুই মনে হয় কিশোরী মেয়েটি মরেনি। তাকে মেরে ফেলা হয়েছে। তাকে খুন করা হয়েছে। না, তাকে কোন ব্যক্তি মানুষ খুন করেনি। তাকে খুন করেছে একটি ব্যবস্থা। কতগুলো সম্মিলিত মূল্যবোধ। প্রধানত: সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ। যার একটি অর্থনৈতিক ভিতও আছে। বড় শক্ত ভিত। যে ভিতের উপরিভাগে তার অবস্থান নয়, অনেক অনেক নিচে। আর নিচে বলেই সাংস্কৃতিক পুরুষতান্ত্রিক মূল্যবোধগুলো অনেক বেশি কার্যকর থেকেছে। তার ক্ষেত্রে। তার বাবার পরিবারের ক্ষেত্রে। এমনকি শশুর বাড়ির পরিবারের ক্ষেত্রেও। আর সে সাংস্কৃতিক পুরুষতন্ত্রের দেখানে পথেই একটি জৈবিক প্রক্রিয়া হিসেবে খুনের শিকার হয়েছে এক কিশোরী মায়ের। যে বয়সে মেয়টির নিজের শরীরের সবটুকু বুঝে উঠার কথা নয়, সে বয়সে তাকে আপন বাবা-মা-ভাই-বোন ছেড়ে শুধু পরের বাড়িতে যেতে হয়নি। সে সংসারের অনেক দায়িত্বও নিতে হয়েছে। গর্ভে ধারণ করতে হয়েছে সন্তান। কিন্তু তার শরীরতো সেভাবে প্রস্তুত হয়নি। পরিণাম? একটি নয়, দু’টি জীবনের অকাল মৃত্যু।

দুই.
এখন ওপরের ঘটনাটির ভেতরে যাওয়া যাক। বাংলাদেশের আইনী কাঠামোতে এটি ছিল একটি বাল্যবিয়ে। পাত্রের বয়স ২১ এর নিচে এবং পাত্রীর বয়স ১৮ এর কম। তার মানে সুস্পষ্টভাবে আইনের লঙ্ঘন। তাহলে আইন কী করতে পারতো? আইনকি বিয়েটি ভেঙ্গে দিতে পারতো? অবশ্যই না। আইনের ভাষায় এটিকে বলা হয় অনিয়মিত বিয়ে। যার মানে আইনের যে প্রক্রিয়া তা যথাযথভাবে অনুসৃত হয়নি। কিন্তু বিয়েটা ভেঙে দেয়ার কোন বিধান নেই এ আইনে। শুধু শাস্তির বিধান আছে। তাও নগন্য। এক মাসের জেল অথবা একহাজার টাকা জরিমানা ইত্যাদি ইত্যাদি। তাও কেউ যদি সংক্ষুব্ধ হয়। বিচার প্রার্থনা করে। এখন বিচার প্রার্থনাটা কে করবে? কেন করবে? অথবা কেন করবে না। এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলেই অত্যাবশকভাবে এসে পড়ে সাংস্কৃতিক পুরুষতন্ত্রের। প্রসঙ্গত: বলা দরকার যে, ১৯২৯ সালে বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন প্রণীত হয়েছে। ১৯৩০ সালের এপ্রিল থেকে এটি কার্যকর। কিন্তু বাল্যবিয়ের পরিস্থিতির কতখানি উন্নতি ঘটেছে? বিশেষ করে গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মাঝে এর প্রভাব কতখানি? এর গতিটি যে, ঋণাত্বক নয়, ধনাত্বক এটি হয়তো অবলীলায় বলা যায়। কিন্তু এর মাত্রা যে, অতি সামান্য সেটি অস্বীকারের কোন উপায় নেই এবং একটি আইনী কাঠামো থাকার পরও পুনপৌনিক বাল্যবিয়ে সংঘটনের বড় কারণটি সাংস্কৃতিক, বাকিটুকু অর্থনৈতিক। ১৯৮০ সালের যৌতুক নিরোধ আইনে যৌতুক নিষিদ্ধ ঘোষিত হলেও এটি টিকে আছে প্রথার জোরে। এক দিকে কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা? অপরদিকে পুত্র সন্তানের গর্বিত জনক। পুত্র সন্তানের জনকের জন্য যৌতুক গ্রহণ আইনে মানা থাকলেও সংস্কৃতিতে মানা নেই। কনের পিতা-মাতাও প্রথাগতভাবে যৌতুক দেয়ার জন্যই প্রস্তুত হতে থাকে। যৌতুক প্রাপ্তির সম্ভাবনা পুত্রের পরিবারকে, বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারগুলোকে অল্প বয়সে পুত্রের বিয়ে দেয়ার প্রেষণা হিসেবে সক্রিয় থাকে। অপরদিকে ‘কুড়ি’তে ’বুড়ী’ হয়ে যাবার সামাজিক কথন কনের বাবা-মার ওপর সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করে। তারাও বাধ্য হন অল্প বয়সে অতি আদরের কিশোরী মেয়েটিকে বিয়ে নামক একটি পুরুষতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অন্য বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে। পুরনো, প্রবল সাংস্কৃতিক প্রথা ও যৌতুকের অর্থনীতির কাছে পরাভূত হয় রাষ্ট্রের আইনী কাঠামো-আইনী ব্যবস্থা। আর এভাবেই একের পর এক খুন হতে থাকে কিশোরী মেয়েরা। কারও গল্প আমরা শুনি। কারওটা না। হারিয়ে যায় দরিদ্র কিশোরীদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা. . । যতদিন এ কাঠামোটি ভাঙা না যাবে, ততদিন এ সব দরিদ্র কিশোরীদেরও অকাল মৃত্যুর আশংকা থেকে মুক্তি নেই।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই এপ্রিল, ২০০৯ সকাল ৯:৫৭
২২টি মন্তব্য ২১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র - ভ্রাম্যমান লাইব্রেরী ভাবনা

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:৪৬


শ্রদ্ধেয় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যাররে হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তার জন্মলগ্ন ১৯৭৮ সাল থেকে অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে। আমার মনে পড়ে, আমি স্কুলে পড়াকালীন সময়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে স্কুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

=একান্ত নিজস্ব জিনিসগুলো পর হয়ে যাচ্ছে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৫



যে চোখ দিয়ে দেখেছি ধরার আলো, সে চোখও দিচ্ছে ফাঁকি,
যে চোখের আলোয় দেখেছি পুকুর নদী, শুকনো উঠোন;
বৃষ্টি ভেজা দিন, দেখেছি ময়না শালিক, ঘুঘু ডাকা দুপুর
সে চোখ পর হয়ে যাচ্ছে অল্প... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:২৩


Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪

আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×