সামাজিক জনবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী হিসেবে কিছুদিন ফার্টিলিটি বা জন্মশীলতা নিয়ে পড়তে হয়েছে। ওখানে কতগুলো টার্মিনিওলোজি ব্যবহৃত হয়। যেমন, ইনফ্যাকান্ড, ইনফার্টল, স্টেরালাইজেশন, ইত্যাদি ইত্যাদি। এ শব্দগুলোর একটি কাছাকাছি মানে দাঁড় করলে বলতে হয়, মানুষের বংশপরস্পরাকে টিকিয়ে রাখা ও গতিশীল রাখার ক্ষেত্রে নর-নারীর যে জৈবিক সৃজনশীল প্রজনন ক্ষমতা তা না থাকা বা তার বিনাশ সাধন। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে চিরপ্রতিদ্বন্ধীতাপুর্ণ এবং সর্বদা অযাচিত-অপ্রয়োজনীয় কাদাছোড়াছুড়িতে লিপ্ত সকল রাজনৈতিক দলের অভূতপূর্ব ঐক্যমত্যের মধ্যে দিয়ে উপজেলা পরিষদ বিলটি পাশ হওয়ার পর আমার মতো অমনোযোগী শিক্ষার্থীরও অনেক আগে পঠিত সামাজিক জনবিজ্ঞানের সেসব টার্মিওনোলজিগুলো বারবার মনে পড়ছে। এবং মনে হচ্ছে এ টার্মিওনোলজিগুলোর প্রত্যেকটিই নয়া উপজেলা পরিষদ সম্পর্কে প্রযোজ্য। উপজেলা পরিষদের বিল সম্পর্কে পত্রিকায় যতটুকু পড়েছি তাতে বারবার মনে হচ্ছে একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সদ্য গঠিত সম্ভাবনাময় উপজেলা পরিষদের 'পলিটিক্যাল লাইগেশন বা ভেসকটমি' সম্পাদন করা হয়েছে। আর এ লাইগেশন বা ভেসকটমির অপারেশন প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছেন সদ্য নির্বাচিত সাংসদরা। তারা আওয়ামী লীগের। তারা বিএনপির। তারা জামাতের। তারা জাতীয় পার্টির। রাজপথে এত আদর্শের তফাৎ আর সংগ্রামের কথা উচ্চারিত হলেও ক্ষমতার ভাগাভাগিতে কতখানি ঐক্য থাকতে পারে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তার নজিরবিহীন নজির স্থাপিত হয়েছে এ বিলটিকে নিয়ে। ফলে কেন্দ্রীয় ক্ষমতার কাছে সমর্পিত এ উপজেলা পরিষদ কার্যত যে স্বাধীনভাবে তেমন কিছুই সৃষ্টি করতে পারবে না তা মোটামুটি নিশ্চিত। একই সাথে একটি শক্তিশালী স্থানীয় সরকার পরিষদ গঠনের যে সাংবিধানিক অঙ্গীকার সে অঙ্গীকার থেকেও রাষ্ট্র পিছিয়ে পড়লো।
এর আগের একটি পোস্টে লিখেছিলাম যে, বিএনপি-আ'লীগের মধ্যে স্থানীয় সরকার প্রশ্নে যে সাদৃশ্যতাটি বহুদিন ধরে তৈরি হয়েছে তা হচ্ছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সবসময় দলের সাধারণ সম্পাদকের হাতে রেখে দেওয়া। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, এটি যতখানি স্থানীয় সরকারের ওপর ইতিবাচক ভূমিকা রাখার উদ্দেশ্যে তার চেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণের জন্য। নতুন গঠিত আলীগ সরকারও তার বাইরে আসতে পারলো না। দলের সাধারণ সম্পাদকের কাছেই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণায় রেখে দিল।
এটি বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আমাদের দেশের ক্ষমতা কাঠামে একটি কেন্দ্রীভূত শক্তির কাছে ন্যস্ত। আবার তা গণতান্ত্রিক লেবাসে। ফলে কেন্দ্র-প্রান্ত যে ক্ষমতা কাঠামোটি গড়ে উঠেছে সেখানে স্থানীয় সরকারগুলোর অবস্থান সব সময় প্রান্তে। ইউনিযন পরিষদগুলোর জরাজীর্ণ চেহারা দেখলে তা আঁচ করা যায়। তবুও এবার একটি জনপ্রত্যাশা ছিল উপজেলা পরিষদকে ঘিরে। আমরা বোধহয় অপেক্ষাকৃত স্বাধীন একটি স্থানীয় সরকার পরিষদ পেতে যাচ্ছি এ রকম ভাবনায় বেশির ভাগ মানুষের মনে ছিল। কারণ শুরুতে উপজেলা পরিষদকে স্থানীয় সাংসদদের নিয়ন্ত্রণমুক্ত রাখা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান আইনে উপজেলা পরিষদ শুধু স্থানীয় সাংসদের নিয়ন্ত্রণেই আনা হয়নি। তাদের শুধু উপদেষ্টা করাই হয়নি। উপদেশ শুনতে বাধ্যবাধকতাও রাখা হয়েছে। এখানেই শেষ নয়। স্থানীয় সাংসদদের সাথে যোগাযোগ বা পূর্ব অনুমতি ছাড়া উপজেলা পরিষদ সরকারের সাথে যোগাযোগেব ব্যাপারেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। নিয়ন্ত্রণের এমন নজির কীভাবে তৃণমূল পর্যায়ে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিকতা দিবে এটি আমাদের আইন প্রণেতারাই ভাল বলতে পারবেন। কিন্তু জনগণ হিসেবে আমরা এমন উপজেলা পরিষদ কিছুতেই চাই না, যেটি উৎপাদন-সৃজনশীল প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়ার আগেই পলিটেক্যাল লাইগেশন বা ভেসকটমির শিকার হয়েছে..।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই এপ্রিল, ২০০৯ সকাল ১০:২৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


