somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শিশুদের স্কুল বাসে চড়তে না পারা এবং রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কিত চিরায়ত জননিয়তি!!!

০২ রা নভেম্বর, ২০০৯ দুপুর ১২:০৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

এক.
আমাদের ছয় বছরের একমাত্র কন্যা শিশুটি এতদিন স্কুল বাসে করেই স্কুলে যেত। এখন বাসে যায় না। যায় না বললে ভুল হবে। বলা যায় যেতে পারে না। কারণ স্কুল কর্তৃপক্ষ হঠাৎ করেই বাচ্ছাদের ডায়েরীতে ছোট্র একটি নোট লিখেই তাদের সকল স্কুল বাস বন্ধ করে দিয়েছে। ডায়েরীতে লেখা নোটে কোন ব্যাখ্যা নেই। শুধু লিখা আছে অনিবার্য কারণে আগামীকাল থেকে আমরা আর বাস সার্ভিস চালু রাখতে পারছি না। নোটিশটি পেয়ে অনেক মা-বাবার মতো আমিও ছুটে যাই। আলাপ করি স্কুলের নির্বাহী প্রধানের সাথে। তিনি সবিনয়ে অনেকটা চুপিচুপি স্বরে জানান যে, স্কুলের শিক্ষার্থী আনা-নেয়া করা হয় এমন কোন এলাকা থেকে তাঁর ভাষায় সন্ত্রাসীরা চাঁদা চেয়েছে। হুমকি দিয়েছে। বাসে যেহেতু ছোট ছোট শিশুরা থাকে, চাঁদার দাবিতে তাদের ওপর যদি হামলা করা হয়, অথবা জিম্মি করা হয়, সে ভয়ে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা হিসেবে তারা বাস বন্ধ করে দিয়েছেন। আমি নির্বাহী প্রধানকে পরামর্শ হিসেবে বলেছিলাম স্থানীয় সাংসদের সাথে কথা বলতে। বিদ্যালয়টি এলাকায় যেহেতু স্বনামধন্য, পরিচিত, সেহেতু স্থানীয় সাংসদের কাছে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের অতীত অভিজ্ঞতালব্দ প্রতিক্রিয়ায় সাংসদ পর্যায়ের জাতীয় রাজনীতিবিদদের ওপর গভীর অনাস্থা ও অবিশ্বাসই প্রকাশ করলেন। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আজ পর্যন্ত বিষয়টির সুরাহা করতে পারে নি। অতএব আমাদের কোমলমতি শিশুরাও বাসে চড়ে, হৈচৈ করে তাদের প্রিয় বিদ্যালয়ে যেতে পারছে না।
আমি জানি না, এ রকম হঠাৎ বাস বন্ধ করে দিতে বাধ্য হওয়ায় অন্য অভিভাবক, বাবা-মারা কী রকম বিড়ম্বনার মুখোমুখি হচ্ছেন। কতখানি কষ্ট তাদের সহ্য করতে হচ্ছে। তবে আমার স্ত্রীর একজন নারী সহকর্মী শুধু বাসের সুবিধা থাকার কারণে তার শিশুটিকে এ বিদ্যালয়ে দিয়েছিল। বাস বন্ধ করে দেওয়ায় এখন তিনি তার বাচ্ছার স্কুল আপাত: বন্ধ করে দিয়েছে। তার কাছে এটিই আপাত একমাত্র বিকল্প।
আমাদের শিশুটিকে স্কুলে পাঠাবার সন্তোষজনক বিকল্প পারিবারিক ব্যবস্থা থাকলেও আমি ইচ্ছে করেই স্কুল বাসে দিয়েছিলাম। অন্য ভাবনা থেকে। ঘরের বাইরের জগতে স্বনির্ভর আত্ম-বিশ্বাসী হয়ে বেড়ে উঠার প্রক্রিয়া হিসেবে। বাসে অপেক্ষাকৃত বেশি সময় ধরে থাকবে। নিজ সহপাঠি ছাড়াও অন্য শিশু-কিশোরদের সাথে মিথস্ক্রিয়ার একটা সুযোগ তৈরি হবে। হৈচৈ করবে। সহযাত্রীদের সাথে ছোটখাট ঝগড়াঝাটি, বিবাদে লিপ্ত হবে। নিজেরাই আবার মিটিয়ে নিবে। শুরু থেকেই যেন জানা-অজানা-প্রত্যাশিত-অপ্রত্যাশিত বিষয়ের মুখোমুখি হওয়ার একটি সামাজিকায়ন শুরু হয়। একটি মেয়ে শিশু হিসেবে এ সামাজিকায়ন অনেক বেশি জরুরি। কিন্তু এখন আমাদের সে প্রত্যাশারই আপাত: যবনিকা ঘটেছে চাঁদাবাজি আর সন্ত্রাসের হুমকির কাছে।

দুই.
সামষ্টিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিবেচনায় ওপরের ঘটনাটি হয়তো খুবই তুচ্ছ। খুবই ছোট। সংবাদপত্রের কাছেও হয়তো এটি বিক্রয়যোগ্য সংবাদ নয়। কোন পত্রিকায় এ সংবাদ ছাপা হয়েছে বলেও জানা নেই। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এতটাই অনিরাপদবোধ করছেন যে, এটি নিয়ে তেমন কোন কথাই বলতে চাইছেন না। কিন্তু সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদের ব্যক্তি জীবনে এর প্রভাব অনেক বেশি। আমরা অনেক বেশি ভুক্তভূগী। অনেক বেশি অসহায়। সাধারণ নাগরিকদের এ চলমান অসহায়ত্ব সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির গতি-প্রকৃতির চিত্রটাই তুলে ধরছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষকারী বাহিনী গণমাধ্যমের কাছে পরিস্থিতি যত স্বাভাবিক হিসেবে দাবি করুন না কেন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমরা যে ভাল নেই এটি তার একটি সংকেত। লাল সংকেত। এ লাল সংকেত শুধু নাগরিকদের জন্য নয়, রাজনৈতিক সরকারের জন্য, রাজনীতিবিদদের জন্যও। দেশের জন্যতো বটেই।

তিন.
বিগত দু’টি সাধারণ নির্বাচন নিয়ে বিজিত প্রধান দু’টি দলের একই সুরে একই রকম দু’টি প্রতিক্রিয়া আছে। ২০০১ সালের নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে আওয়ামী লীগ বলেছে, বিএনপি কারচুপি করেছে। আর ২০০৮ সালের ফলাফল নিয়ে বিএনপি বলেছে, আওয়ামী লীগ কারচুপি করেছে। ভোটনির্ভর ক্ষমতাহস্তান্তরের প্রচলিত গণতন্ত্র ও জনরায়ের প্রতি দু’টি দলই হেরে যাবার পর বরাবরই শ্রদ্ধা প্রদর্শনে ব্যর্থতার উদাহরণ বজায় রেখেছে। শুধু তাই নয়, দু’দলের বর্ণনায় ’কারচুপি’ শব্দটিও নানা বিশেষণে বিশেষায়িত হয়েছে। কিন্তু রাজনীতি বিশ্লেষক ও সাধারণ নাগরিকদের ধারণা ও বিশ্বাস, প্রত্যেকবারই সংশ্লিষ্ট দল হেরেছে তাদের সরকারে থাকার সময়ের ব্যর্থতা বিশেষ করে জনশৃঙ্খলা রক্ষা ও জননিরাপত্তা বিধানে আকষচুম্বী ব্যর্থতার জন্য। এবারের নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে এমন বিশ্লেষণও রয়েছে যে, জনগণ বিপুলভাবে আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়নি, ভোট দিয়েছে বিএনপি-জামাত জোট সরকারের দুর্নীতি, সন্ত্রাস আর অব্যবস্থার বিরুদ্ধে। তারা একধাপ এগিয়ে গিয়ে এটিও বলছেন যে, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার জনরায়ের এ প্রবণতাটি যদি উপলব্দী করতে না পারে, তবে পরবর্তী নির্বাচনে একই সূত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। তার মানে হচ্ছে পরবর্তী নির্বাচনে শুধু সরকার নয়, সরকারি দলেরও পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে। নব্বই পরবর্তীতে অনুষ্ঠিত বিগত নির্বাচনগুলোতে সে প্রবণতাটাই পরিলক্ষিত।

চার.
একজন বন্ধু-সহকর্মীর একটি মন্তব্য বোধহয় এখানে উল্লেখ করাটা অপ্রাসঙ্গিক হবে না। সম্প্রতি বাৎসরিক আয়কর বিবরণ জমা দেয়ার সময় ক্ষোভ-অভিমান আর আবেগ মিশ্রিত কন্ঠে তিনি বলেছিলেন যে, এ রাষ্ট্রে আমার আয়কর দিতে কষ্ট হয়। কারণ নাগরিক হিসেবে এ রাষ্ট্রের কাছে আর কিছু না হোক অন্তত জীবন যাপনের নিরাপত্তা চাই। এটি হলফ করে বলা যায় নাগরিক হিসেবে নিরাপত্তার বিষয়টি শুধু তার চাওয়া নয়, এটি সবার চাওয়া। সকল নাগরিকের ন্যুনতম চাওয়া। অথচ এ ন্যুনতম চাওয়াটাই বরাবর অধরা থেকে যাচ্ছে। সরকার যায়, সরকার আসে। কিন্তু ব্যবস্থার কোন পরিবর্তন হয় না। ফলে পরিস্থিতি কেবল অবনতিই হতে থাকে। তবে এ ক্রমাগত অবনতি দেখতে থাকাই কি আমাদের চিরায়ত জননিয়তি?
আমরা আমাদের, আমাদের সন্তানদের ভয়ভীতিহীন নিরাপদ পরিবেশে জীবনের স্বাভাবিক সচলতা চাই। আমরা পথ চলতে চাই, বাইরে বেরুতে চাই আমাদের মতো করে। ভয়শূণ্য হয়ে। আমাদের হৃদয়-মন ও প্রাত্যহিক জীবনকে ভয়শূণ্য করার দায়িত্বটা অবশ্যই সরকারের। অবশ্যই রাষ্ট্রের।
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই ডিসেম্বর, ২০০৯ দুপুর ১২:০৭
৮টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪

আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬

লিখেছেন আঘাত প্রাপ্ত একজন, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:২৬

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬

[সম্ভাবনার ক্রমানুসারে নয়ঃ]

আর্জেন্টিনা: আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ তার ডিফেন্স আর ইনজুরি । ৩৮ বছরের তরুণ(!) সেন্টারব্যাক ওতামেন্দি আর কমপক্ষে এক হালি হাফ-ফিট ফুটবলার নিয়ে ১৯ জুলাই পর্যন্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলা সাহিত্যে জায়গা পাচ্ছেন ওসমান হাদী

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১২ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:১৭


সংবাদপত্র যা বলছে
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ জুন ২০২৬ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই পরিমার্জন-সংক্রান্ত কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকসহ... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

×