somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ভালবাসা দিবসে একটি সত্যিকারের ভালবাসার গল্প ।

১৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১০ রাত ১২:০৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

চার বছর বয়সে গুটিবসন্ত ও প্রচণ্ড জ্বরে বাকশক্তি হারিয়ে ফেলে মেয়েটি। ডান পা-টাও হয়ে পড়ে অবশ। ক্র্যাচে ভর দিয়ে হাঁটে মেয়েটি, আলুথালু বেশ। ১৫ বছর ধরে সবাই তাকে মানসিক প্রতিবন্ধী বলেই জানত।
একদিন ম্যাজবানিতে পরিচয় হয় এক রিকশাচালকের সঙ্গে। মেয়েটিকে রিকশায় বাড়ি পৌঁছে দেন তিনি। এরপর থেকে কি জানি কিসের টানে প্রায়ই ওই বাড়িতে চলে যেতেন রিকশাচালক। মেয়েটির সামনে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বকবক করতেন। কয়েক দিনেই মেয়েটির মাঝে পরিবর্তন আসে। সবাইকে চমকে দিয়ে একদিন কথা বলে ওঠে সে। রিকশাচালক তাঁর মনের কথা জানান। সাড়া দেয় মেয়েটিও। তারপর বিয়ে, সংসার। চিকিত্সা করানোর পাশাপাশি স্ত্রীকে এখন বর্ণমালা শেখাচ্ছেন দরিদ্র ওই রিকশাচালক।
প্রতিবন্ধীর সঙ্গে প্রেম, অতঃপর বিয়ের এই ঘটনাটি চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার। রিকশাচালক নুরুল আবছারের (৩১) বাড়ি কক্সবাজারের রামু উপজেলার বড়বিল গ্রামে। জীবিকার তাগিদে বছর পাঁচেক আগে রাঙ্গুনিয়ায় আসেন।
আর হাছিনা বেগম (২২) রাঙ্গুনিয়া উপজেলার ইছামতি গ্রামের মৃত শাহ আলমের মেয়ে। হাছিনা যে বছর গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয়, তার পরের বছর তাঁর বাবা মারা যান। তিন মেয়েকে নিয়ে মা হালিমা বেগম পড়েন অথই সাগরে। বিভিন্ন বাড়িতে ঝিয়ের কাজ শুরু করেন। তাতে হাছিনার চিকিত্সা তো দূরে থাক, তিন বেলা সবার খাবারই হতো না। অনাদর, অবহেলায় বেড়ে ওঠে হাছিনা।
২০০৭ সালে বড়বিল গ্রামে ম্যাজবানির অনুষ্ঠানে নুরুল আবছার ও হাছিনা বেগমের দেখা। তখন হাছিনার বয়স ১৯। লাঠিতে ভর দিয়ে ম্যাজবান খাওয়ার আশায় গিয়েছিলেন সেদিন। আর রিকশাচালক নুরুল ভাড়া নিয়ে গিয়েছিলেন অনুষ্ঠানে। খাবারদাবারের আয়োজন দেখে এক কোণে বসে পড়েন। থালা সামনে নিয়েছেন, এমন সময় আলুথালু বেশে কোত্থেকে এক তরুণী এসে তাঁর সামনে দাঁড়ান। একটু চিন্তা করে নিজের থালাটা তাঁর হাতে তুলে দেন। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন তরুণীটি। খাওয়ার পর তাঁকে রিকশায় করে বাড়ি পৌঁছে দিলেন। সেই থেকে শুরু।
নুরুল বলেন, ‘ম্যাজবানিতে প্রথম ওকে দেখে মনে কেমন একটা ধাক্কা লাগে। সেই থেকে হাছিনার টানে প্রতিদিন ওদের বাড়ি যেতাম। সঙ্গ দিতাম ওকে। এতে হাছিনার মাঝে পরিবর্তন দেখা দেয়। নির্বাক হাছিনা তোতলাতে তোতলাতে একদিন কথা বলে আমার সাথে।’
হাছিনার মা হালিমা বেগম জানান, মেয়ে কথা বলছে দেখে নুরুল তাঁকে একদিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলেন। ওষুধে মাত্র ১০ দিনেই হাছিনার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়। এর কিছু দিন পরই নুরুল বিয়ের প্রস্তাব দেন। মেয়ের প্রতি ছেলেটার দরদ দেখে রাজি হয়ে যান তিনি। ২০০৮ সালের জানুয়ারিতে বিয়ে হয় নুরুল ও হাছিনার। তখন থেকে দুজন ইছামতী গ্রামেই আছেন।
নুরুল আবছার বলেন, ‘বিয়ের পর হাছিনার খাওয়াদাওয়া, কাপড়চোপড় পরিষ্কারপরিচ্ছন্ন রাখার কাজ করেছি। আমি নিজে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছি। প্রতিদিন রিকশা চালানো শেষে রাতে ওকে নিয়ে বসি। অ আ ক খ শিখাই।’
স্ত্রীর প্রতি নুরুলের এমন দরদ দেখে প্রতিবেশীরা তাঁকে স্থানীয় সামাজিক সংগঠন এওয়াকের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেয়। সংগঠনটি তার চিকিত্সায় অর্থসহায়তা দেয়। গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর নুরুল-হাছিনা দম্পতির ঘরে একটি ছেলে জন্মায়। শিশুটি সুস্থ আছে।
এওয়াকের সভাপতি নির্মল কুমার বড়ুয়া বলেন, ‘মেয়েটিকে ভালোবেসে বিয়ে করে নুরুল বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ভালোবাসা দিয়ে সে শুধু হাছিনার মুখে ভাষা ফুটায়নি, তাকে অক্ষরজ্ঞানও দিচ্ছে।’ ইছামতী গ্রামের করিম উদ্দিন বলেন, ‘হাছিনারা আমার প্রতিবেশী। সেই ছোটবেলা থেকে মেয়েটাকে দেখছি। একটু বড় হওয়ার পর মেয়েটার কথা বলা বন্ধ হয়ে যায়। এখন ভাঙা ভাঙা ভাষায় কথা বলতে পারে।’
রাঙ্গুনিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কর্মকর্তা বিজন কান্তি বিশ্বাস বলেন, ‘এমন রোগে চিকিত্সার অভাবে মানুষ বিকলাঙ্গ এমনকি বাকশক্তি হারিয়ে ফেলতে পারে। তবে প্রয়োজনীয় চিকিত্সা দিলে আবার সুস্থ জীবনে ফিরে আসতে পারে।’ তিনি জানান, হাছিনা বেগম ইতিমধ্যে ৫০ ভাগ সুস্থ হয়ে উঠেছেন। সুচিকিত্সা পেলে ধীরে ধীরে তাঁর পা-টাও ভালো হয়ে উঠবে বলে তিনি আশাবাদী।
হাছিনা বলেন, ‘আঁই দুই বছর আগেও জীবন লই এত সচেতন ন ছিলাম। হনদিন (কোনো দিন) ন ভাবি আঁই সংসার গইজুম (হব), কেউ আঁরে বিয়ে গরিবো। কিন্তু জামাইর ভালোবাসায় আঁই বাঁচি থাগনোর শক্তি পাই। এখন জীবনকে নতুন করি গড়নের স্বপ্ন দেখতেছি। মনে স্বাদ জাগে জামাইর জন্য কিছু গরি। কারণ ওই মানুষ্য আঁরে ভালোবাসি নিজের বিয়াককিছু (সবকিছু) জলাঞ্জলি দিয়ি (দিল)।’(সংবাদটি দৈনিক প্রথম আলো থেকে নেওয়া)
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১০ রাত ১২:০৭
৪টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×