ক্ষুদ্র জীবনে হলে গিয়ে ছবি দেখেছি কম। আর কোয়ালিটি ছবিতো দেখিইনি। তবে প্রায়ই মনে করি স্মৃতিগুলো...
আগুন জ্বলে
সাল ১৯৯৪... হলে গিয়ে দেখা আমার প্রথম ছবিটি একটি ক্লাসিক প্রেমের বাংলা ছবি। নাম ছিলো - "আগুন জ্বলে"। শাবনাজ আর নাঈম ছিলো ছবির নায়ক-নায়িকা। ছবির কাহিনীর ব্যাপারে তেমন কিছু মনে থাকলেও নায়িকার বাবার সাথে নায়কের বিরোধের কথা হালকা মনে পড়ে। আর মনে পড়ে ছবিতে শাবনাজের ভাঙা কাঁচের ওপর রক্তাক্ত অবস্থায় নাচার দৃশ্য। আসলে তখন এতোই ছোট ছিলাম যে এর বাদে কিছু মনে রাখাটা অস্বাভাবিকই বলতে হবে। তবে পরে মায়ের কাছ থেকে শুনেছি, ছবি শুরুর আগে যখন পর্দা ফালানো থাকে সে সময়টায় নাকি আমি মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম - "মা, হানিফ সংকেত কখন আসবে?" ছোটবেলায় অসংখ্যবার ইত্যাদির শ্যুটিং দেখে অভ্যস্ত হওয়া আমি তখনও সিনেমা আর টেলিভিশনের পার্থক্যটা বুঝিনি।
টাইটানিক
হলে গিয়ে দেখা আমার এর পরের ছবিটির নাম সেই অতি বিখ্যাত টাইটানিক। আমাদের দেশের মানুষের মাঝে একটা মজার বৈশিষ্ট্য আছে। আমরা খুব সহজে কোন একটা নির্দিষ্ট জিনিসকে ঐ গোষ্ঠীর ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর বানিয়ে ফেলি। যেমন, দীর্ঘদিন পর্যন্ত মাইকেল জ্যাকসন ইংরেজী গানের আর "কুছ কুছ হোতা হ্যায়" ছিলো আমাদের হিন্দি ছবির ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর। ঠিক তেমনি করে টাইটানিক পরবর্তীতে পরিণত হয়েছিলো আমাদের দেশের ইংরেজী ছবির ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডরে।
টাইটানিক দেখার কয়েকদিন আগে যখন টিকেট এনে বাসায় রাখা হলো তখনও অব্দি আমার ধারণা ছিলো আমাকে ফেলেই ওরা ছবি দেখতে চলে যাবে। কারণটা হলো আমি টিকেটের ওপরে লেখা দেখেছিলাম ১২ বছর বা তদুর্ধ্ব।
যাই হোক শেষ অব্দি ওরা আমাকে সাথেই নিয়ে গিয়েছিলো। ছবি দেখে বুঝতে কোন সমস্যা হয়নি। রোমান্টিক দৃশ্যতো আরও নয়। গাড়ির ভেতরে জ্যাক আর রোজের চুম্বন ও মেক-আউট সিন দেখে আমি যারপরনাই এক্সাইটেড। যদিও অনেক কিছুই তখনও জানা নেই এসব ব্যাপারে।
গোল বেঁধেছিলো তার আগের একটা দৃশ্য নিয়ে - যেখানে জ্যাক রোজের পোর্ট্রেইট আঁকে এবং রোজ তার সকল বসন ভূপাতিত করে সোফায় শায়িত হয়... সাথে ফুল ফ্যামিলি একটু অড লাগাটাই স্বাভাবিক। আমাদের সেন্সর কর্তৃপক্ষের জানিনা কি হয়েছিলো তারা সেন্সরিংয়ের জন্য একটা আজব পন্থা বেছে নিয়েছিলেন। ব্যাপারটা আমার চাইতেও ভালো করে বলেছেন ক্যাডেট কলেজ ব্লগের "তারেক"
সূত্র: View this link
এই একটি দৃশ্য এতো বেশি আলোচিত হয়েছিলো যে এখনও এটা নিয়ে আলোচনা হয়। ছবি হলে দেখার বেশ ক' মাস পরে আমি দৃশ্যটা আবারও প্রাণ ভরে উপভোগ করেছিলাম বাসার তৎকালীন ভিএইচএস সেটে। বলাই বাহুল্য - এবার আর তেলাপোকার উতপাৎ ছিলো না।
সবচেয়ে মেজাজ খারাপ হয়েছিলো টাইটানিক মুক্তির পর আমাদের দেশে টাইটানিকের বিভিন্ন গুফ (ছবির বিভিন্ন কাহিনী/অবস্থান/ইতিহাস গত ভুল/ত্রুটি) নিয়ে স্থানীয় পত্রিকাগুলোয় বাড়াবাড়ি। এরকম কিছু ছোট ছোট ঘটনা দিয়ে একটা পুরো জাতির বেসিক আইডিয়া লাভ সম্ভব।
জুরাসিক পার্ক:
ছবি ভালো হলেও হলে গিয়ে দেখার তেমন কোন বিশেষ অনুভূতি মনে অবশিষ্ট নেই। শুধু এটুকু মনে আছে মধুমিতার ডলবি-ডিজিটাল সাউন্ড আমার কান ঝালাপালা করেছিলো। পুরো ছবির প্রায় অর্ধেক সময়ই হাত ছিলো কানে। ছোটবেলায় আমাদের ফ্যামিলির খুব পরিচিত এক আঙ্কেলের ফ্যামিলির সাথে গিয়েছিলাম ছবিটা দেখতে। ওই আঙ্কেল ছিলেন আবার এলআরবি'র ড্রামার। অনেকদিন পর সেদিন আবার তাদের সাথে দেখা হয়েছে।
ভালো থেকো:
এই ছবিটা আমার দেশের বাইরে দেখা একমাত্র ছবি। দেখেছিলাম কোলকাতার নন্দনে। পুরোদস্তুর আর্ট ফিল্ম বরা যায় (অথবা প্যারালাল ধারার ম্যুভি)। এই ছবিটি বিদ্যা বালানের করা একমাত্র বাংলা ছবি। চমৎকার কিছু সংলাপ ছাড়াও ছবিতে কোলকাতার চিরাচরিত অতি-অভিনয় বিদ্যমান ছিলো। ছবির নামটা নেয়া হয়েছিলো হুমায়ূন আজাদের 'শুভেচ্ছা' কবিতা থেকে। ছবির শেষে কবিতাটার অংশবিশেষ বিদ্যা বালান পাঠ করেন, বেশ সুন্দর করেই করেন বলতে হবে।
আর্ট ছবি বিধায় ডায়লগও সেইরকম উচ্চমার্গের। তারপরও বয়সের আন্দাজে একটা লাইন ধরতে পেরেছি। ডায়লগটা আবছা মনে আছে, হলভর্তি একগাদা মানুষের সামনে শুনে তখন গাল লাল হয়েছিলো, আর এখন ভাবলে হাসি পায়:
"প্রতিদিন আমার শরীর থেকে ডাবের পানির মতো কি যেন বেড়িয়ে যাচ্ছে... একেই কি যৌবন বলে?"
আপনারাই বলুন, একেই কি যৌবন বলে?
মনের মাঝে তুমি:
ভারত-বাংলাদেশ যৌথ প্রযোজনা, চমৎকার মিউজিক এই ছবিটি দেখতে হলে যাওয়ার জন্য যথেষ্টই ছিলো বলতে হবে। দেখতে গিয়েছিলাম আমার ফ্যামিলি + চাচার ফ্যামিলি + ফুফাদের ফ্যামিলি। ছবির কাহিনী খারাপ লাগেনি। তবে পড়ে জেনেছি 'জিনা সির্ফ মেরে লিয়ে' আর এই ছবির কাহিনী একই। ছবির কমেডিটা তখন ভালো লাগলেও এখন বড় হওয়ার পর ছ্যাবলামি মনে হয়।
থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার:
দীর্ঘ বিরতির পর আবারও হল যাত্রা। এবার থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার দেখতে। হল ছিলো বলাকা - ২। এর কারণ ছিলো সিনেপ্লেক্সের টিকেটের অপ্রাপ্যতা এবং 'আমার কাজিন ও ভাবী বাসায় থাকায় ফুল ফ্যামিলির ঐদিনই দেখতে হবে...' টাইপের মানসিকতার মিশেল। থার্ড পারসন দেখে আমার মনে আলাদা কোন অনুভূতি জন্মায়নি, ছবিটি আমাকে ভাবায়ওনি। হল থেকে বেরিয়ে আমার খালি মনে হয়েছে যখন ফারুকী এই ছবি বানাচ্ছিলেন তিনি কি চিন্তা করে বানাচ্ছিলেন। আমার মনে হয়েছে তিনি চেয়েছিলেন আমাদের বর্তমান তরুণ সমাজের কাছে চটকদার মনে হয় এমন কিছু ইস্যু (কন্ডম, তপু, লিভ টুগেদার, মোবাইল প্রেম সংস্কৃতি, পরকীয়া, নাস্তিকতা) ছবিতে তুলে আনতে। সেগুলোর ব্যাপারে বিস্তারিততে যাওয়া তার উদ্দেশ্য ছিলো না। ছবির আর কোন দিক ছিলোও না যেটা আমাকে আকৃষ্ট করবে - শুধু লিমনের জেলখানার চিঠি গানটা বাদে।
তবে ছবি নয় ঐদিন আমার সবচেয়ে বড় হতাশা ছিলো - বাসা থেকে আমার 'এক্স'কে ছবি দেখতে ইনভাইট করা সত্ত্বেও শেষ অব্দি ওর পরীক্ষার কারণে ওকে না নিয়ে যেতে পারাটা।
থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার পার্ট টু:
থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার আমি পরে আবার একবার দেখেছিলাম (না ২ বার দেখার মতো কোন ম্যুভি এটা নয়, হেল নো!)। দেখার কারণটা ছিলো উপরোল্লিখিত হতাশা। এবার সিনেপ্লেক্সে গিয়েই দেখেছিলাম। এটা আমার সিনেপ্লেক্সে দেখা প্রথম ম্যুভিও বটে। ছবি কতোটা দেখেছিলাম মনে নেই। একেই দেখা ছবি, তার উপরে পাশে ও... ছবি না দেখার যথেষ্ট কারণ ছিলো বৈকি!
খোঁজ - দ্য সার্চ:
সিনেপ্লেক্সে দেখা আমার দ্বিতীয় ছবি। বন্ধুদের কাছে চরম আশাবাদী সব মন্তব্য শুনেই মূলতঃ ছবিটা দেখতে যাওয়া। এবং ট্রাস্ট মি - খোঁজ দ্য সার্চ আমাদের হতাশ করেনি। ৩০/৪০ বছর পর যদি আমি আমার ছেলেদের হলে গিয়ে কোন ছবি দেখার স্মৃতির কথা বলি তাহলে অবশ্যই সেই ছবিটি হবে খোঁজ - দ্য সার্চ! শালার! কি ম্যুভি একটা! টোটাল কমেডি! ছবিতে নায়কের মায়ের মৃত্যু সিন থেকে শুরু করে নায়কের অ্যাকশন সিন - পুরা ছবি একটা স্ট্যান্ড আপ কমেডি শো।
এই ছবি দেখে আমি যতোটা হেসেছি বহুদিন এতো হাসিনি। দেখতে গিয়েছিলাম আমরা ৩ বেস্ট ফ্রেন্ড মিলে (also known as 'The Circle')। কুটিকুটি হয়েছি... না না... গড়াগড়ি দিয়েছি। ছবিতে একটা ডায়লগ বলে... আর আমি, আমার ২ বন্ধু ও হলভর্তি অধিকাংশ দর্শক পাল্টা ১০টা ডায়লগ ছুঁড়ে দেই। আমি এই শো দেখার পর পরের শো-তে ঢুকেছিলো আমার কাজিন ও ভাবী এবং আমার বাবা। ছবির নায়কের একটা ডায়লগ কিংবদন্তি মর্যাদা লাভ করার মতো ছিলো -
"ইউ ডিস্টয় মাই কান্টি, আই উইল ডিস্টয় ইউ..."
* শুধুমাত্র যেগুলো উল্লেখ করা আছে সেগুলো বাদে বাকি সব ছবি 'মধুমিতা' সিনেমা হলে দেখা।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে জানুয়ারি, ২০১২ দুপুর ১২:২০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



