আগে কী সুন্দর খেইড় খেলাইতাম
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
নাজমুল ইসলাম মকবুল
গ্রামীণ খেলাধুলা আমাদের গ্রাম বাংলার একটি প্রাচীণ ঐতিহ্য যার সাথে এক সময় ছিল শিশু কিশোর কচি কাচা থেকে শুরু করে তরুন যোবাদের নাড়ির সম্পর্ক। এসব দেশীয় খেলাধুলা বয়স্ক ও প্রবীণরাও উপভোগ করে পেতেন দারুন মজা। ছেলেবেলায় স্কুল শুরু হওয়ার পূর্বে, মধ্যাহ্ন বিরতির সময়ে এবং বিকেলে খেলাধুলা করা প্রায় সকলেরই ছিল সহজাত নেশা। সে সময়ে মনে হতো একদিন খেলাধুলা মিস করা মানে বিশাল কিছু মিস করা। তবে প্রায় সকল খেলাধুলাই ছিল দেশিয়। শুধুমাত্র ফুটবল ও ব্যডমিন্টন ছিল বিদেশি খেলা। তাও আবার ছিটেফোটা। দেশিয় খেলাধুলার তালিকায় ছিল হাডুডুডু, গোল্লাছুট, তুকুত খেইড় (লুকুচুরি), ঠালিঘটি, ডাংগুটি, তাড়াগুটি, ঝান্ডা খেলা, চল কুত কুত (বন্ডিল খেইড়), লাই খেইড়, টুপা খাওয়া, মইন চুর, রেডি খেলা, ইছইন বিছইন, কানামাছি, রুমাল চুর, পাথর দিয়ে ফুল খেইড়, সেল খেইড়, ধপ্পা খেইড়, ষোল গুটি, তিন গুটি, গাতুয়া খেলা, চোর পুলিশ, মুরগার মাইর, মারগুল্লি, তাক্কা খেইড়, দাড়িয়াবান্দা, লুডু খেইড়, বউ শ্বাশুড়ি, কদু খেলা, খেলুয়া দৌড় সহ আরও অনেক ধরনের সুন্দর সুন্দর ও অভিনব পদ্ধতির দেশিয় খেলা। কিন্তু বর্তমানে ক্রিকেটের জয় জয়কারে দেশিয় প্রায় সকল খেলা একে একে হাওয়া হয়ে যাচ্ছে। এমনকি জনপ্রিয় ফুটবল খেলার গুরুত্বও এখন আর আগের মতো নেই।
খেলা শুরু হওয়ার পুর্বে যারা খেলার জন্য আগ্রহী হতো প্রায় সমবয়েসী ও সমআয়তনের গ্র“পভিত্তিক সকলেই নির্দিষ্ট সময়ে সমবেত হতো মাঠে। উপস্থিত সকলের মতামতের ভিত্তিতে পারদর্শী ও মেধাবী কিছুটা বড়োসড়ো দুজনকে মনোনিত করা হতো অধিনায়ক। আঞ্চলিক ভাষায় তাদেরকে বলা হতো রাজা বা রাইচ্ছল। সাথে সাথে সমসাময়িক ছামের দুজন দুজন করে ছল ধরে আসতেন দুদলে বিভক্ত হওয়ার বা দুভাগ হয়ে পে বিপে খেলায় উঠার জন্য। দুজন দুজন করে জুটি বেধে একটু দুরে গিয়ে গলায় গলায় জড়িয়ে ধরে গোপনে দুজন দুটি ছদ্দনাম ধারন করে রাইচ্ছলের (অধিনায়ক) কাছে আসতেন। যেমন ইসকুল না মছিদ, সন্দুক না বন্দুক, আসমান না জমিন, পানি না বাতাস, ছল না বল ইত্যাদি। প্রতারনার ভয় থাকলে উভয়ের একজন মুষ্টিতে নিতো ঘাস অন্যজন মুষ্টিতে নিতো মাটি। এসে বলতো ঘাস না মটি। তখন রাজা বলতো আইয়ও আমার মাটি। সাথে সাথে মাটি যার হাতে আছে সে মুষ্টি খুলে মাটি প্রদর্শন করে সে পে যেতো অপরজন ঘাস প্রদর্শন করে অপর পে যেতো এভাবে বিভিন্ন ছদ্দনাম ধারন করে ছল ধরে ধরে উভয় পে সমান সমান হিসেবে প্লেয়ার দুভাগ হতো দুপে লড়ার জন্য। পরনে শুরু হয়ে যেতো কাঙ্খিত খেলা। অধিকাংশ খেলাতেই কোন রেফারী থাকতোনা বরং পরস্পর সমঝোতার ভিত্তিতেই খেলা পরিচালিত হতো। কারণ রেফারী যারা হবেন তারাও বড়দের আলাদা গ্র“পে খেলতেন। তবে পুরস্কারভিত্তিক (দাওয়াতী) প্রতিযোগিতা হলে রেফারীর বিশেষ ব্যবস্থা করা হতো।
হাডুডুডুঃ এ খেলা হচ্ছে বাংলাদেশের জাতীয় খেলা। এক সময় এ খেলা ছিল খুবই জনপ্রিয়। মাঠে দুটি বক্স আকৃতির নির্দিষ্ট মাপের কোটা থাকে এবং দুটি কোটায় দুপরে খেলোয়াড় থাকেন। মাঝখানে একটি রেখা থাকে। এই রেখা অতিক্রম করে একজন গিয়ে বিভিন্ন উত্তেজক ভাষায় ডাক দিতে হয়। যেমন চল দাগা দাগা .................. চল কাবাডি কাবাডি .............. উরি পাতা খেরাইয়া বেটা অছতে ধর আইয়া ......... উরি পাতা খেত কুত বাপর লগে আয়রে পুত ............. চল দাগা বড়ো ভাই, ভশিরিংয়ে আল বাই, ভশিরিং তেড়া, মাছ খাই ভেড়া ............... চল দাগা উথিয়া, মুখো যাই মুথিয়া। এক থলা (ম্যাচ) জেতার পর বিজয়ী পরে খাতায় যোগ হতো এক গুট্টা বা এক থলা। তখন বিজয়ী প ডাক নিয়ে আসতো গুট্টার ডাক লইয়া আইছি, দুধদি ভাতদি খাইয়া আইছি, দুধদি ভাতর তেলে, রং বাত্তি জলে জলে জলে ...........। ধরে আটকাতে পারলে সবাই উপরে উঠে দিতো আচ্ছামতো চাপ (জাতা)। আর ছুটে যেতে পারলে প্রতিপরে যাকে সর্বপ্রথম ছোয়া হয়েছে তিনি হয়ে যেতেন ম্যচ থেকে আউট অর্থাৎ এক উইকেট পড়ে যেত। সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় বলা হয় মরা যাওয়া বা মাইর খাওয়া। কিন্তু প্রতিপরে একজন মরা খেলে তার পরিবর্তে আবার অপর পরে একজন উঠতে পারতো খেলায়। ধাওয়া খেয়ে থলা থেকে বের হলে বলা হতো পচা তাকেও ম্যাচ থেকে করা হতো আউট। এভাবে খেলা চলার পর যে পরে সকলেই মাইর খায় তারা পরাজিত বলে গণ্য হয় এবং অপর প বিজয়ী হয়ে এক গুট্টা (পয়েন্ট) লাভ করার মহাগৌরব অর্জন করে আনন্দে নাচানাচি করে বিজয়সূচক বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি করে নানান শ্লোগানও দেয়। এসব নিয়ে কোন কোন সময় মারামারি ঝগড়াঝাটি হতেও দেখা যায়।
গোল্লাছুটঃ ক্রিকেটের টচের আদলে টচ দেওয়া হয় যাকে আঞ্চলিক ভাষায় বলা হতো ছিটফট। একটি পাতা বা কাগজের এক সাইটে মুখের ভেতর থেকে থুথু (ছেফ) দিয়ে বলা হয় ছেফ না লেফ। এক প চায় ছেফ অপর প চায় লেফ। উপর দিকে নিপে করার পরে ঘুরে ঘুরে মাটিতে পড়ার পর যে প টসে জিতে সে প্রথমে পায় গোল্লার স্থান। অপর প ফিল্ডিং করার জন্য মাঠের সুবিধাজনক স্থানে নেয় শক্ত অবস্থান। চিহ্নিত একটি স্থান বা গর্তকেই নির্ধারন করা হয় গোল্লার স্থান। সেখানে দাড়িয়ে থাকা দলিয় অধিনায়কের হাত ধরে এক এক করে পরস্পরের হাত ধরে ধরে লম্বা হয়ে গোল্লার চারদিকে সকলেই ঘুরতে থাকে। এবং বলে গুল্লা ঘুর ঘুর ছুড়ানি, হাত বেটি পিরানী অথবা গুল্লা ছাঙ্গে না ভাঙ্গে। তখন প্রতিপ হতে ভাঙ্গে বলা হলেই শুরু হয় সুযোগমতো ভাঙ্গনের পালা। সেফাকে গুল্লার সাথে হাত ধরাধরি থাকাবস্থায় প্রতিপরে কাউকে ছুইতে পারলে সে খেলা থেকে হয়ে যায় আউট আবার বিচ্ছিহ্ন অবস্থায় গোল্লার পরে কাউকে ছুইতে পারলে সেও হয়ে যায় ম্যাচ থেকে আউট। পরনেই প্রতিপরে প্লেয়ারকে পাশ কাটিয়ে প্রবল বেগে দৌড়ে পাড়ি দিতে হয় মাঠ। প্রতিপরে প্লেয়ার না ছুইতে পারলে এবং মাঠ পাড়ি দিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে পৌছে যেতে পারলে সে পরবর্তী ধাপের ম্যাচের জন্য মনোনিত হয় এবং অধিনায়ক নির্দিষ্ট স্থান থেকে বেরিয়ে না গেলে গোল্লার থু বলে বেরিয়ে পড়ে বিজয়ীদের প্রত্যেকে একটি করে লাফ দিয়ে দিয়ে সামনে যতটুকু এগিয়ে যাবে সেখানে আবার স্থাপন করা হবে গুল্লা । সেভাবে কয়েক শিফটের মাধ্যমে সিমানা অতিক্রম করতে পারলে হয়ে যায় সাত গুট্টা বা সাতদুন। কিন্তু গোল্লার সহপাঠি সকলেই মাইর খেলে বেরিয়ে পড়তে হয় গুল্লাকে এবং প্রতিপ সকলেই তাকে একসাথে ধাওয়া করে। ধাওয়া অতিক্রম করে সবাইকে পাশ কাটিয়ে মাঠ পাড়ি দিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে পৌছতে পারলে লাগে এক গুট্টা আর না পৌছতে পারলে বা প্রতিপরে হাতের থাপ্পড় খেলে সকলেই মারা গেছে বলে ধরে নেয়া হয় এবং প্রতিপ পেয়ে যায় গুট্টা লাগানোর সুযোগ।
তুকুত খেইড় (লুকুচুরি)ঃ এক প নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করে অপর পকে তুকুত দেওয়ার জন্য পাঠায়। অপর পরে সকলেই বিভিন্ন স্থানে ইচ্ছেমতো লুকায়। প্রতিপ বলে তুকুত নিবা ওরা যখন লুকানোর পরে বলে তুকুত তখন শুরু হয় খোজার পালা। খুজে বের করতে না পারলে গুট্টা দিতে হয় চাহিদামতো।
ঠালিঘটিঃ এ খেলা সাধারণত ছোট ছোট শিশু কিশোররা খেলে। নারিকেলের ঠালি ও বিভিন্ন ছোট ছোট পাত্রে ধুলা বালি বিভিন্ন গাছের পাতা ইটের গুড়া ইত্যাদি দিয়ে কৃত্রিম রান্না করে বিয়েশাদী থেকে শুরু করে সংসার পরিচালনার অভিনয় করে একে অন্যের কাছে পুতুল বিয়েও দেয়। বেলাশেষে চলে যায় নিজ নিজ ঘরে। এ দৃশ্যকে স্মরণ করে সিলেটের বিখ্যাত বাউল শিল্পি আব্দুল করিম গেয়েছেন ‘‘ধুলা বালি আনিয়া, বিরইন ভাত রান্দিয়া আমরা খেইড় খেলাইতাম, আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’’।
ডাংগুটি, তাড়াগুটি, ঝান্ডাখেলাঃ ক্রীড়া বিশেষজ্ঞ অনেকেরই মতে এই খেলার আধুনিক সংস্করণই হচ্ছে ক্রিকেট। এ খেলা দিনে দিনে ও সময়ের প্রয়োজনে পরিবর্তিত হয়ে ক্রিকেটে রূপ নিয়েছে। ক্রিকেটের অনেক নিয়ম কানুন এই খেলার মধ্যে পাওয়া যায়।
চল কুত কুত (বন্ডিল খেইড়)ঃ চল কুত কুত আনাইয়া, নৌকা দিমু বানাইয়া, যদি নৌকা উড়ে .............. সহ এক নিঃশ্বাসে বিভিন্ন ধরনের হাইর বলে বলে প্রতিপকে দৌড়াতে থাকে সে ফাকে প্রতিপকে পাশ কাটিয়ে বন্ডিল চলে আসতে পারলে প্রতিপরে ঘাড়ে লাগে এক গুট্টা।
লাই খেইড়ঃ পানিতে অথবা ডাঙ্গায় নির্দিষ্ট স্থানকে প্রতিক (লাই) হিসেবে চিহ্নিত করে এক প দুরে গিয়ে লাই দেয়। অপর প ধাওয়া করে ছুতে যায়। পকে ধাওয়া করে ছুতে পারলে সে মরা যাবে আর সে যদি পাশ কাটিয়ে এসে লাই ছুইতে পারে তবে প্রতিপরে ঘাড়ে লাগবে এক গুট্টা। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে লাইদাতাকে যে প্রথমে ছুইবে তার কাছে লাই চলে যাবে এবং তাকে ছোয়ার জন্য সবাই ধাওয়া করে ছোয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করে।
টুপা খাওয়া (চড়–ইবাতি)ঃ কয়েক ঘরের কিশোর কিশোরিরা কেহ চাল কেহ লাকড়ি কেহ ডিম কেহ মুরগী কেহ মশলাপাতি ইত্যাদি জড়ো করে সম্মিলিতভাবে কাজ করে পাক করে একসাথে বসে মজা করে খাওয়ার খেলাকেই টুপা খাওয়া (চড়–ইবাতি) বলে। টুপা খাওয়ার আধুনিক সংস্করন হচ্ছে বনভোজন। তাই টুপার আধুনিকায়ন হয়ে এখন রূপ নিয়েছে বনভোজনে আর ভোজন রসিকদের মধ্যে এসেছে আধুনিকতার ছোয়া। পার্থক্য হলো টুপা খাওয়া হতো বাড়িতে আর বনভোজন বনের ভিতরে ভোজন না হয়ে কিন্তু হয় বিভিন্ন ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান বা পিকনিক স্পটে। নবদম্পতি, বন্ধুবান্ধব বা সহপাঠিদের নিয়ে বনভোজনের মজাই আলাদা।
মইন চুরঃ ‘‘মইন গেল দুর বিক্কম পুর’’ বলে দুর্বাঘাস দিয়ে তৈরি মইন ছুড়ে মারা হতো দুরে। সকলে দৌড়ে গিয়ে শুরু করতো কাড়াকাড়ি কুস্তাকুস্তি। এসব প্রতিকুলতা ডিঙ্গিয়ে যে মইন এনে নিপেকারীর কাছে দিতে পারবে তার লাগে এক গুট্টা।
রেডি খেলাঃ উভয় পে সমান সংখ্যক খেলোয়াড় থাকে। নির্দিষ্ট রেখাসহকারে তৈরি করা নির্দিষ্ট ফিল্ডে প্রতিপদের পাশ কাটিয়ে গিয়ে আবার ফিরে আসতে পারলে লাগে এক গুট্টা। এ খেলার প্রচলন কিছুদিন পূর্বেও খুব বেশি ছিল গ্রামাঞ্চলে।
ইছইন বিছইনঃ একজনের হাত আরেকজনের হাতের বুড়ো আঙুলের উপর রাখে। এরপর হাইর বলে ‘‘তালগাছ কাটি তালগাছ কাটি তালর উপরে বাসা, ইলকায় নাছে বিলকায় নাছে তালগাছ কাটিয়া ফালা’’ এসব বলে প্রত্যেকের হাত ছুটানো হতো যার হাত অবশিষ্ট থাকতো সে হতো রাজা। এর পর প্রত্যেকের হাত উপুড় করে রাখা হয় মাটিতে। রাজা হাইর বলা আরম্ভ করে ‘‘ইছইন বিছইন, লাকড়া বিছইন, গাইলে লড়ে ছিয়ায় লড়ে, বাবুর বেটিয়ে চাউল কুড়ে, চাউল কুড়–নি মাইগো, এগু চাউল দেওগো, চাউলর মাঝে উকুরা, বেল পালাইলাম তুকুরা, শাম সিক্কম, বড় বুয়াই ডিক্কম’’। যার হাতে ডিক্কম পড়বে সে হাত লুকিয়ে নেয়। এভাবে সবার হাত একে একে লুকিয়ে নেয়। পরণে বিভিন্ন ধরনের আবদার করে হাত দেখতে হয় ..........।
কানামাছিঃ উভয়পে সমান সংখ্যক প্লেয়ার নির্দিষ্ট দুরত্বে লাইন ধরে বসে থাকতো এবং মাছ ফুল পাখি ইত্যাদির ছদ্দনাম থাকতো উভয়ের প্লেয়ারের। প্রতিপরে অধিনায়ক গিয়ে একজনের উভয় চোখে চাপ দিয়ে ধরে ডাকতো আইয়ও আমার গোয়াল মাছ। তখন গোয়াল মাছ ছদ্দনামের প্লেয়ার প্রতিপরে ওই প্লেয়ারের নিকট গিয়ে সন্তর্পনে কপালে একটি চিমটি কেটে আসতো। পরে চোখ ছেড়ে কে চিমটি দিয়েছে তার নাম বলার জন্য পাঠানো হতো। শিকার ধরতে পারলে সে মরা খেত না ধরতে পারলে যাকে পাঠানো হতো সে উল্টো মরা খেত।
রুমাল চুরঃ সবাই গোল হয়ে বসে একটি রুমাল একজনের পেছনে নিপে করা হতো। যার পেছনে রুমাল নিপে করা হবে সে উঠে গিয়ে আবার রুমাল হাতে নিয়ে সবার পেছনে ঘুরতে থাকবে। যার পেছনে নিপে করা হবে সে যদি না দেখে তখন ঘুরে এসে তার পিটে দেওয়া হতো অব্যাহতভাবে গুম গুম শব্দের কিল আর সবাই হাসতো খিলখিলিয়ে। কিল খেয়ে সেও এভাবে রুমাল নিয়ে উঠে লাগাতো চক্কর।
ফুল খেইড়, সেল খেইড়, ধপ্পা খেইড়ঃ খেলাটি কিশোরিরা সাধারণত বেশি খেলতো। বাছাইকৃত একই সাইজের সুন্দর পাচটি পাথর কুড়িয়ে এনে শুরু হতো দুজন বা চারজনের খেলা। ‘‘ফুল ফুল ফুলটি, একে দুলটি, তেলটি, জাম জাম জামটি, একে দুর্জামটি, বকুল বকুল বকুল টি, শোষম শোষম শোষমটি, তার্জম তার্জম তার্জমটি, একে দুত্তার্জম, ছাক্কট একটা ছাক্কট দুইটা, শাড়ি গুটির আচলে, গুটি একা বসলে, গুটির নাম চন্দন, যাইতো গুটি লন্ডন, নুন্ট মুড়ির ঘন্ট ইত্যাদি বলে বলে পাথর দিয়ে বিভিন্নভাবে হাতের কসরত প্রদর্শন করা হয়। শেষে হাতের মুষ্টি থেকে পাথর উপর দিকে ছুড়ে হাত ঘুরিয়ে উল্টো দিকে যতটি পাথর তুলা যাবে তত গুট্টা প্রতিপরে ঘাড়ে লাগবে যাকে বলা হয় বেত।
সেল খেইড় হচ্ছে এক পাথর দিয়ে অপর পাথর হাতের তর্জনী আঙুল দিয়ে ঠুকতে হবে। এবাবে বিশবার হওয়ার পর এক গুট্টা।
ধপ্পা খেলায় ‘‘ধপ্পা এক, ধপ্পা দুই .......... ধপ্পা ছয়, ছয় ছয় ছকিনা আলো বয় দুলো বয় কুয়ার মাটি চাক চাক নয়া মাটি নয়া পাক একটা গুট্টা ঘাড়ো লাগ’’ এ পর্যন্ত পাথর দিয়ে কসরত দেখাতে পারলে এক গুট্টা।
ষোল গুটি, তিন গুটি, গাতুয়া খেলাঃ সাদা কচু ও কালো কচু দিয়ে ষোলটা করে গুটি তৈরি করে নির্দিষ্ট কোটা একে ষোলগুটির ব্রেনখাটানো খেলা খুবই মজার। প্রতিপরে গুটি একে একে খেয়ে নিঃশ্বেষ করতে পারলেই বিজয় সুনিশ্চিত। এ খেলা কিছুটা দাবাখেলার আদলে। এছাড়া তিন গুটি দিয়ে খেলাতে তিনটি গুটি ব্রেন খাটিয়ে প্রতিপরে বাধা উপো করে সমান্তরাল করতে পারলে এক গুট্টা। দু লাইনের সমান্তরাল কয়েকটি গর্তের মধ্যে নির্দিষ্ট সংখ্যক ছোট শামুক বা পাথর দিয়ে যে খেলা হয় তাকে বলে গাতুয়া খেলা।
চোর পুলিশঃ চারজন প্লেয়ারের জন্য সমান চারটি কাগজ যাতে লেখা থাকে হাকিম দারোগা পুলিশ চোর। লটারির মতো ছাড়ার পর একেকজন একেকটি কাগজ কুড়িয়ে নিয়ে হাকিম যার ভাগ্যে পড়বে সে বলবে হাকিম কে হুকুম করো পুলিশ কে চোর ধরো। তখন পুলিশ লেখা কাগজ যে পাবে সে চোর ধরতে হবে। সঠিক চোর ধরতে পারলে পয়েন্ট পাবে বেটিক হলে উল্টো পয়েন্ট পাবে চোর।
এসব খেলাধুলা ছাড়া আরও অনেক ধরনের মজার মজার দেশিয় খেলা ছিল এবং কোন কোন খেলা এলাকাভেদে ছিটেফোটা এখনও আছে। তবে খেলাগুলি এলাকাভেদে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের ও ভিন্ন ষ্টাইলের হয়ে থাকে। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ক্রিকেটের জয় জয়কারে ক্রমান্বয়ে হারিয়ে যাচ্ছে দেশিয় খেলা। একেবারে ছোট শিশুর হাতেও দেখা যায় এখন ক্রিকেটের মিনি ব্যাট। গ্রাম বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে যে সব মাঠে দেশিয় খেলা চলতো দাপটের সাথে, সেসব মাঠে রাস্তার উপর এমনকি বাড়ির আঙিনায় এখন দেখা যায় ক্রিকেট খেলা চলছে মহা ধুমধামে। সেফাকে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের অতীতের ঐতিহ্যবাহী দেশিয় সুন্দর সুন্দর খেলা। বর্তমান প্রজন্ম ভুলে যাচ্ছে সেসব খেলার ধরন এমনকি খেলার নামও। তাই হয়তো বাউল কবি আেেপর সুরে সুর ধরে গেয়েছেন ‘‘আগে কী সুন্দর খেইড় খেলাইতাম’’।
লেখকঃ সভাপতি, সিলেট লেখক ফোরাম।
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র - ভ্রাম্যমান লাইব্রেরী ভাবনা

শ্রদ্ধেয় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যাররে হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তার জন্মলগ্ন ১৯৭৮ সাল থেকে অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে। আমার মনে পড়ে, আমি স্কুলে পড়াকালীন সময়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে স্কুল... ...বাকিটুকু পড়ুন
=একান্ত নিজস্ব জিনিসগুলো পর হয়ে যাচ্ছে=

যে চোখ দিয়ে দেখেছি ধরার আলো, সে চোখও দিচ্ছে ফাঁকি,
যে চোখের আলোয় দেখেছি পুকুর নদী, শুকনো উঠোন;
বৃষ্টি ভেজা দিন, দেখেছি ময়না শালিক, ঘুঘু ডাকা দুপুর
সে চোখ পর হয়ে যাচ্ছে অল্প... ...বাকিটুকু পড়ুন
রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন
দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল
আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।