তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অভিন্ন রূপরেখা ঘোষণা আ'লীগ জাপা জামায়াতের
জাকির হোসেন
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি প্রথবারের মতো সামনে নিয়ে আসেন ১৯৯৩ সালের শেষ দিকে। ’৯০-এর গণআন্দোলনে সামরিক স্বৈরাচারী এরশাদের পতন এবং পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয়ের পটভূমিতে এ পরাজয়ের গ্লানি এবং ভবিষ্যতে ক্ষমতায় যাওয়ার বাসনাকে ধারণ করে তিনি এ দাবি উত্থাপন করেন। পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াত এ দাবিতে আন্দোলন শুরু করে এবং তত্কালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অভিন্ন রূপরেখা ঘোষণা করে। বিএনপি চেয়ারপার্সন এবং তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বিরোধী দলগুলোর এ দাবিকে নানাভাবে সমালোচনা করলেও তিনি বরাবরই সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মধ্যে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব বলে আশা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তিনি বিরোধী দলগুলোকে সংসদে এসে সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানান। অন্যদিকে বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট নেতা ও ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান মেনন এমপি জামায়াত, জাপা ও আওয়ামী লীগের দেয়া তত্ত্বাবধায়ক ফর্মুলা মেনে নেয়ার চেয়ে আত্মহত্যাই শ্রেয় বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ’৯০-এর গণআন্দোলনে এরশাদের পতনের পর তার দল উত্থাপিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিকে আওয়ামী লীগ একটি অসভ্য প্রস্তাব হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল। এরশাদের পতনের ৬ ঘণ্টা আগে মওদুদ আহমদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে অসংবিধানিক আখ্যা দিয়েছিলেন। তিনি আরও বলেন, জামায়াত চায় মধ্যযুগীয় ব্লাসফেমি আইন। জাতীয় পার্টি চায় এরশাদের মুক্তি। আর আওয়ামী লীগ চায় যে কোনোভাবে ক্ষমতায় যেতে।
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি প্রথমবারের মতো প্রকাশ্য জনসভায় উত্থাপন করেন
১৯৯৩ সালের ৬ ডিসেম্বর ‘স্বৈরাচারের পতন ও গণতন্ত্র দিবস’ উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায়। এদিন তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য আওয়ামী লীগ জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধীন বিল আনবে। বিএনপি যাতে এই বিল পাস করতে বাধ্য হয় এজন্য তিনি আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
এরপর আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরাকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে অভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণে সংসদের সব বিরোধী দলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করে। ১৯৯৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার শেখ হাসিনার আহ্বানে সংসদের সব বিরোধী দল ও গ্রুপের নেতাদের এক যৌথ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় ওই বছর ২৬ এপ্রিল থেকে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামী যৌথভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে হরতাল, অবরোধ, মশাল মিছিল, পদযাত্রাসহ নানা কর্মসূচি পালন করে। ’৯৪ সালের ২৭ জুন আওয়ামী লীগ, জাপা এবং জামায়াতে ইসলামী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অভিন্ন রূপরেখা ঘোষণা করে এবং সংসদ ভেঙে দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারে অধীনে নির্বাচনের দাবিতে ১৯৯৪ সালে ২৮ ডিসেম্বর পঞ্চম জাতীয় সংসদের ১৪৭ জন বিরোধী দলীয় সদস্য একযোগে পদত্যাগ করেন। এদিন আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী ও এনডিপি’র সদস্যরা স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন।
এসব ঘটনা ওই সময়ের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করে। ওই সময় দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত কয়েকটি প্রতিবেদন তুলে ধরা হলো :
আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েও ফল
ভোগ করতে পারিনি : হাসিনা
স্টাফ রিপোর্টার
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, সব আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েও ষড়যন্ত্রের কারণে তার দল ফল ভোগ করতে পারেনি। তিনি দাবি করেন, তার আন্দোলনের ফলেই এরশাদের পতন ঘটেছে। কিন্তু ক্ষমতায় গেছে বিএনপি। তারপরও আমরা বিএনপিকে সহযোগিতা করতে চেয়েছিলাম সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ধারা প্রতিষ্ঠার আশা নিয়ে। কিন্তু বিএনপি তা করতে ব্যর্থ হয়েছে। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী রোববার দলীয় কার্যালয়ে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ৩০তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তৃতা করছিলেন। আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ সাজেদা চৌধুরী, জিলুর রহমান, আমির হোসেন আমু, ব্যারিস্টার কে এস নবী, ওবায়দুল কাদের, অধ্যাপক আবু সাইয়িদ, আইভি রহমান, ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, মোহাম্মদ হানিফ এবং মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া আলোচনায় অংশ নেন। (দৈনিক বাংলা : ৬ ডিসেম্বর ১৯৯৩)
আওয়ামী লীগের জনসভায় ভাষণ
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন চাই : শেখ হাসিনা
স্টাফ রিপোর্টার
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচন দাবি করেছেন। তিনি বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য আওয়ামী লীগ জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধনী বিল আনবে। বিএনপি যাতে এই বিল পাস করতে বাধ্য হয় এজন্য তিনি আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান। স্বৈরাচারের পতন ও গণতন্ত্র দিবস উপলক্ষে সোমবার বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগ আয়োজিত এক জনসভায় তিনি বক্তৃতা করছিলেন। (দৈনিক বাংলা : ৭ ডিসেম্বর ১৯৯৩)
আওয়ামী লীগ জাপা জামায়াতের প্রেস ব্রিফিং
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা ঘোষণা
স্টাফ রিপোর্টার
আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামীসহ সংসদের পাঁচটি বিরোধী দল সোমবার সংসদ ভবনে বিরোধীদলীয় নেত্রীর সম্মেলনকক্ষে রাত পৌনে দশটায় নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা ঘোষণা করেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এই রূপ রেখায় বলা হয়েছে যে, সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি সংসদ ভেঙে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করবেন। রাষ্ট্রপতি এই অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার পরিচালনার জন্য জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী আন্দোলনরত রাজনৈতিক দলসমূহের পরামর্শক্রমে একজন নির্দলীয় গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করবেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী নিজে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হবে না এবং কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য নন এবং নির্বাচনের প্রার্থী হবে না এমন ব্যক্তিদের নিয়ে একটি মন্ত্রিসভা গঠন করবেন। নির্বাচনের পর নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের সঙ্গে সঙ্গে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অবলুপ্ত হবে। এছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদের নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করার জন্য নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করার কথা রূপরেখায় বলা হয়।
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী এবং সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এই রূপরেখা ঘোষণা করেন। এ সময় সংসদে তিনটি বিরোধী দলের সঙ্গে গণতন্ত্রী পার্টি এবং এনডিপি উপস্থিত ছিল। গণফোরাম, ওয়ার্কার্স পার্টি ও ইসলামী ঐক্যজোটের কোনো প্রতিনিধি এতে উপস্থিত ছিলেন না। এই রূপরেখা ঘোষণার সময় দাবি করা হয়েছে, রূপরেখা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সব বিরোধী দল ঐক্যবদ্ধ রয়েছে। এই রূপরেখা বাস্তবায়নের জন্য বৃহত্তর আন্দোলন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে। গতকালের প্রেস ব্রিফিংয়ে জামায়াতে ইসলামী সেক্রেটারি জেনারেল ও সংসদীয় দলের নেতা মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে এই প্রথম উপস্থিত থাকতে দেখা গেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা ঘোষণাকালে শেখ হাসিনা বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম লক্ষ্য ছিল একটি অবাধ, সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েম করা। এ লক্ষ্য অর্জন করার জন্য দেশের আপামর জনসাধারণ বারবার বিভিন্ন পর্যায়ে আন্দোলন করে অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছে। গণতন্ত্রকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার একটি অন্যতম পূর্বশর্ত হলো অবাধ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করা এবং প্রতিনিধিত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক একটি সংসদ ও সরকার প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু আমাদের দেশে গণতন্ত্র এবং গণতান্ত্রিক চর্চা যেহেতু এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে সেহেতু গণতন্ত্রকে সুসংহত এবং সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য একটি সাংবিধানিক ব্যবস্থা প্রণয়ন করার তাগিদ এখন একটি জাতীয় দাবিতে পরিণত হয়েছে।
এই লক্ষ্য অর্জনে বিরোধী দলসমূহ সংসদে তিনটি বিলও পেশ করে এবং ওই বিলসমূহ আলোচনার জন্য দাবি জানান। কিন্তু সরকার তাতে কোনো সাড়া দেননি। এরপর বিরোধী দলসমূহ ২৬ জুনের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনকল্পে সংবিধান সংশোধনীর একটি বিল আনার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে একটি সময়সীমা নির্ধারণ করে দেন। কিন্তু সরকার সেই বিল না এনে সংসদকে আরও অকার্যকর করে দেন এবং অগণতান্ত্রিক ও একগুঁয়েমি মনোভাব নিয়ে আজ জাতিকে গভীর সঙ্কটে নিমজ্জিত করেছেন। উপরোক্ত প্রেক্ষাপটে জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে গণতন্ত্রকে সুসংহত এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার স্বার্থে আমাদের বাস্তবিক রূপরেখা নিম্নরূপ :
একটি নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি সংসদ ভেঙে দেয়ার সাথে সাথে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করবেন।
রাষ্ট্রপতি এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পরিচালনা করার জন্য জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী আন্দোলনরত রাজনৈতিক রাজনৈতিক দলসমূহের পরামর্শক্রমে একজন নির্দলীয়, গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করবেন এবং সেই প্রধানমন্ত্রী সংবিধানের ৫৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সরকারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে তার কার্য পরিচালনা করবেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী নিজে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হবে না এবং কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য নন এবং নির্বাচনে প্রার্থী হবে না এমন ব্যক্তিদের নিয়ে একটি মন্ত্রিসভা গঠন করবেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মূল দায়িত্ব হবে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ সংসদ নির্বাচন নিশ্চিত করা এবং সংবিধানে প্রদত্ত সাধারণ দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন ছাড়া শুধুমাত্র জরুরি রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম পরিচালনা করা। রাষ্ট্রপতি কর্তৃক সংসদ ভেঙে দেয়ার ৯০ দিনের মধ্যে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সংসদ নির্বাচনের পর সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদের ৩ দফা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করার সাথে সাথে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অবলুপ্ত হবে।
এছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু করার জন্য নিম্নোক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
নির্বাচন কমিশনকে পুনর্গঠিত করতে হবে এবং নির্বাচন কমিশন যাতে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারে তার জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ আচরণবিধি প্রণয়নও নিশ্চিত করতে হবে।
শেখ হাসিনা বলেন, এই রূপরেখা বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় সংসদের সব বিরোধী দল আজ ঐক্যবদ্ধ। সরকার যেহেতু সংবিধান সংশোধনী বিল আনতে ব্যর্থ হয়েছেন এবং সব বিরোধী দলকেও সংসদের বাইরে আসতে বাধ্য করেছেন সেহেতু আজকে এই রূপরেখা বাস্তবায়ন করার জন্য একটি বৃহত্তর গণআন্দোলন ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া কোনো দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচনে আমাদের অংশগ্রহণ করা সম্ভব হবে না এবং এই রূপরেখা বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত জনগণের এ আন্দোলন চলবে। আজ আমরা সব রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী সংগঠন, শ্রমিক, ছাত্র এবং সব শ্রেণীর জনগণকে এ আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে শরিক হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। এই প্রেস ব্রিফিংয়ে উদ্বোধনী বক্তব্য দেন বেগম সাজেদা চৌধুরী। রূপরেখা ঘোষণার পূর্বে বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ভোটাধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নির্বাচনকে সন্ত্রাস, কালো টাকা ও প্রশাসনকে প্রভাবমুক্ত করার লক্ষ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখার ব্যাপারে সব বিরোধী দল একমত হয়েছে। তিনি বলেন, আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সুষ্ঠু সুন্দর নির্বাচনী প্রক্রিয়া উপহার দেয়ার জন্য তারা সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল পাস করার দাবি জানিয়েছেন। শেখ হাসিনা বলেন, সরকার বিরোধী দলের দেয়া সময়সীমার মধ্যে সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল না আনায় বিরোধী দল এই রূপরেখার ঘোষণা দিচ্ছে।
ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, ইতিহাসে এই প্রথম সব বিরোধী দল এক হয়েছে। তিনি বলেন, বিরোধী দল ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের কর্মসূচি নিয়েছে।
মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী বলেন, রাজনীতিতে শেষ কথা বলতে কিছুই নেই। তিনি বলেন, কেয়ারটেকার বিল পাসের ব্যাপারে সরকার এখনও উদ্যোগ নিলে এতে জাতির উপকার হবে।
সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেছেন, সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারকে যেভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে অনুরূপভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকরের বিল পাসের জন্য এবারের আন্দোলন শুরু হয়েছে।
সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এই রূপরেখাকে ‘দুর্লভ ও অনন্য অবিহিত করে বলেন, এই রূপরেখার জন্য জাতি অপেক্ষা করছিল। প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের কোনোরকম প্রশ্ন করার সুযোগ দেয়া হয়নি। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ‘জয়বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানের মাধ্যমে ব্রিফিংয়ের সমাপ্তি ঘোষণা করেন। ( দৈনিক বাংলা : ২৮ জুন, ১৯৯৪)
সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে সমস্যার
সমাধান চাই : খালেদা জিয়া
শামসুর রহমান : হাট গোপালপুর ঝিনাইদহ ২৫ অক্টোবর। —প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ধ্বংসাত্মক ধারার রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করে উন্নয়নের ধারার রাজনীতি গ্রহণের জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি মঙ্গলবার বিকালে ঝিনাইদহের হাট গোপালপুর মাঠে এক বিশাল জনসভায় বক্তৃতা করছিলেন। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, আমরা সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মধ্যে সমস্ত সমস্যার সমাধান চাই। (দৈনিক বাংলা : ২৬ অক্টোবর ১৯৯৪)
সংসদেই সব ইস্যুর নিষ্পত্তি
সম্ভব : খালেদা জিয়া
প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বলেছেন, জনগণের বহু ত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং সেই সঙ্গে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা সকলেরই দায়িত্ব। খবর বাসস’র।
সোমবার রাতে প্রধানমন্ত্রীর ৩০নং হেয়ার রোডস্থ দফতরে এক সমাবেশে তিনি ভাষণ দিচ্ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের সরকার পরিচালিত আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বাধা সৃষ্টি করা কারও জন্যই শোভন নয়। জাতীয় সংসদকে সব রাজনৈতিক কর্মতত্পরতার কেন্দ্রবিন্দু অবিহিত করে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বলেন, সংসদে বিরোধী দলের সদস্যদের দায়িত্ব জনগণের সমস্যা উত্থাপন এবং তার সমাধানের পথ বের করার জন্য আলোচনা করা। তিনি বলেন, সংসদের সব ইস্যুর নিষ্পত্তি সম্ভব। (দৈনিক বাংলা : ৪ অক্টোবর ১৯৯৪)
ত্রিদলীয় তত্ত্বাবধায়ক ফর্মুলা
আত্মহত্যার শামিল : মেনন
নিজস্ব সংবাদতাতা : সাতক্ষীরা, ১৯ সেপ্টেম্বর— ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট নেতা রাশেদ খান মেনন এমপি বলেন, আওয়ামী লীগ সংসদে জামায়াত শিবির নিষিদ্ধকরণ বিল উত্থাপন না করে তাদের দেয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করছে। তিনি বলেন, চট্টগ্রামের জনসভায় এরশাদ সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারীদের জাতীয় বেঈমান আখ্যায়িত করার পরও শেখ হাসিনা ও তার দল ’৮৬-এর ভাগাভাগির নির্বাচনে অংশ নিয়ে জাতির সঙ্গে বেঈমানী করেছেন। আজ সেই আওয়ামী লীগ জামায়াত ও জাপার সাথে আঁতাত করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন করছে। তিনি আরও বলেন, শেখ মুজিব ঘৃণায় যাদের নাম উচ্চারণ করতেন না, তার কন্যা শেখ হাসিনা তাদের সঙ্গে এক হয়ে রাজনীতি করছেন। তিনি প্রশ্ন করেন, গোলাম আজম আর এরশাদকে নিয়ে শেখ হাসিনার এ কেমন তত্ত্বাবধায়ক আন্দোলন।
জনাব মেনন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির কর্মীদের হাতে নিহত সাতক্ষীরার সন্তান শহীদ জুবায়ের চৌধুরী রিমুর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত স্মরণসভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় এসব কথা বলেন। সাতক্ষীরা পৌর মিলনায়তনে রিমু ফাউন্ডেশন ও ছাত্র মৈত্রী যৌথ উদ্যোগে সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ অসিত কুমার মজুমদারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় আরও বক্তৃতা করেন ছাত্রনেতা আবুল কালাম আজাদ, ফোরার ’৮৭ নেতা কাজী আবদুল মতিন, অ্যাডভোকেট শাহ আলম, জাসদ (ইনু) সভাপতি গোলাম রসুল, অ্যাডভোকেট মোস্তফা লুত্ফুল্লাহ ও রিমুর মাতা জেলা জাতীয়তাবাদী দলের সভাপতি মিসেস জেলেনা চৌধুরী।
মেনন বলেন, ’৯০-এর গণআন্দোলনে এরশাদের পতনের পর তার দল উত্থাপিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিকে আওয়ামী লীগ একটি অসভ্য প্রস্তাব হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল। এরশাদের পতনের ৬ ঘণ্টা আগে মওদুদ আহমদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে অসংবিধানিক আখ্যা দিয়েছিলেন। তিনি আরও বলেন, জামায়াত চায় মধ্যযুগীয় ব্লাসফেমি আইন। জাতীয় পার্টি চায় এরশাদের মুক্তি। আর আওয়ামী লীগ চায় যে কোনোভাবে ক্ষমতায় যেতে। এই ত্রিমুখী শক্তির কাছে গণতন্ত্র নিরাপদ নয় মন্তব্য করে তিনি ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগের ভোট ডাকাতির কথা উল্লেখ করেন।
জামায়াত শিবিরের হাতে নিহত হওয়ার পরও তাদের বিরুদ্ধে মামলা না করে প্রতিরোধকারীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জামায়াত সংঘটিত কোনো হত্যা মামলার বিচার হয়নি। জামায়াত, জাপা ও আওয়ামী লীগের দেয়া তত্ত্বাবধায়ক ফর্মুলা মেনে নেয়ার চেয়ে আত্মহত্যাই শ্রেয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, সংবিধান ধ্বংস করে নির্বাচন প্রক্রিয়া শেষ করে ক্ষমতা দখলের পরও বিএনপি সরকার এরশাদের বিচার করছে না।
সুত্র: আমার দেশ
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



