somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কাদের সিদ্দিকীর বজ্রকথন ও বিবিধ প্রসঙ্গ

১৮ ই মে, ২০১১ দুপুর ১:০৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


কাদের সিদ্দিকীর বজ্রকথন ও বিবিধ প্রসঙ্গ
প্র ফে স র আ ব দু ন নূ র


সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি
বাংলাদেশের একটি জাতীয় দৈনিকের উপসম্পাদকীয়তে প্রকাশিত বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তমের লেখা, ‘একজন প্রবীণ নেতার মহাপ্রয়াণ’ কলামটি আমার মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।
কাদের সিদ্দিকী বিএনপির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের বিদেহী আত্মার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে তার লেখাটি শুরু করেছেন। মৃত্যুর পর মরহুমের মরদেহের পাশে তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোগী ও প্রতিদ্বন্দ্বীদের একত্র সমাবেশ, তার দৃষ্টিতে খুবই হৃদ্যতাপূর্ণ ও প্রশংসিত মনে হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী শাহ আজিজুর রহমানের জেলখানায় থাকা অবস্থায় তার বাড়ি ভাড়া পরিশোধ করা এবং সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বাবা মরহুম ফজলুল কাদের চৌধুরী জেলে থাকা অবস্থায় তার কাছে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি থেকে খাওয়া পাঠানো, আলাউদ্দিন-মতিন-হক-তোহাদের পালানো অবস্থায় তাদের কাছে গোপনে টাকা পাঠানো ইত্যাদি রাজনৈতিক সহমর্মিতার বহু উদাহরণ তুলে ধরেছেন। বাংলাদেশের ইদানীংকালের রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে এ ধরনের সহমর্মিতা বিলুপ্তপ্রায়। শুনেছি যেদিন ফজলুল কাদের চৌধুরী মৃত্যুবরণ করেন, সেদিন বঙ্গবন্ধু খুবই অস্থিরতায় কাটিয়েছিলেন। এ কথা বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত চিকিত্সক জাতীয় অধ্যাপক ড. নূরুল ইসলাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সিনেট অধিবেশনে দেয়া ভাষণে উল্লেখ করেছেন। শুনেছি বঙ্গবন্ধু নাকি চট্টগ্রামে এলে মরহুম ফজলুল কাদের চৌধুরীর বাসায় দুপুরে লাঞ্চ সেরে বিকেলে লালদীঘির ময়দানে পাকিস্তানের মুসলিম লীগ সরকারের সমালোচনায় মুখর হতেন। ফজলুল কাদের চৌধুরীও নাকি ঢাকায় গেলে বঙ্গবন্ধুর বাসায় দুপুরের খাওয়া খেয়ে বিকেলে পল্টন ময়দানে মুসলিম লীগ সরকারের বিরোধিতাকারীদের তুলাধোনা করতেন। বঙ্গবন্ধুকে যখন আগড়তলা ষড়যন্ত্র মামলায় আসামি করা হলো, তখন চট্টগ্রাম থেকে ফজলুল কাদের চৌধুরীই প্রথমে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে উকিল হওয়ার সাহস দেখিয়েছিলেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলার সময়ে বেগম মুজিব ও শেখ হাসিনা যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক গৃহবন্দি অবস্থায় ছিলেন, তখন নাকি তাদের মাসের খরচ চালানোর জন্য ফজলুল কাদের চৌধুরীর পক্ষ থেকে টাকার প্যাকেটটি তাদের ধানমণ্ডির বাসায় নিয়মিত পৌঁছে দেয়া হতো। শুনেছি একাত্তরের নভেম্বর অবধি এ সাহায্য অব্যাহত ছিল। স্বাধীনতার পর ফজলুল কাদের চৌধুরীর সন্তানদের বাংলাদেশে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠিত করার ব্যাপারে বঙ্গবন্ধুর সহায়তার কথা ফজলুল কাদের চৌধুরীর সন্তানদের কেউ লেখকের কাছে স্বীকার করেছেন।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার
সে সময়কার রাজনৈতিক নেতাদের সহমর্মিতার কথা শেখ হাসিনার অজানা নন; তিনি ও তাঁর নব্য উপদেষ্টা গওহর রিজভীর এও জানা যে, চট্টগ্রামের রাউজানে নতুন চন্দ্র সিংহের নিহত হওয়ার সময় (১৩ এপ্রিল, ১৯৭১) সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী কোথায় ছিলেন। স্বাধীনতার পর তদানীন্তন আওয়ামী লীগ সরকার থানায় থানায় (বর্তমানে উপজেলা) একটি করে ‘ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ কমিটি’ গঠন করেছিল। রাউজান থানার জন্য গঠিত কমিটি কর্তৃক প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার এটিএম নুরুল আমিন চৌধুরীকে মুক্তিযুদ্ধ চলার সময় গহিরা ইউনিয়নের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। এটিএম নূরুল আমিন চৌধুরী সরেজমিনে তদন্ত করে প্রিন্টেট ফর্মে যে রিপোর্টটি দাখিল করেছেন, সেখানে কুণ্ডেশ্বরীর বাবু নতুন চন্দ্র সিংহের মৃত্যু সম্পর্কে বলা হয়েছিল, ‘বাবু নতুন চন্দ্র সিংহ পাক আর্মি কর্তৃক নিহত হয়েছেন’। সেই রিপোর্টটি বাবু নতুন চন্দ্র সিংহের নিহত হওয়া সম্পর্কিত প্রাথমিক রিপোর্ট এবং সরকারের সংগ্রহেই আছে। এটিএম নুরুল আমিন চৌধুরী আওয়ামী লীগের একজন সমর্থক এবং এখনও বেঁচে আছেন (অবসরপ্রাপ্ত ডেপুটি রেজিস্ট্রার, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়)। সংবিধানের ৭নং ধারায় উল্লিখিত সার্বভৌম জনতার প্রতিনিধি হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে গ্রেফতার করা হলো? বিনা ওয়ারেন্টে এবং স্পিকারের অনুমোদন ছাড়াই বেআইনিভাবে একজন সংসদ সদস্যকে এভাবে গ্রেফতার করা এবং রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করা, কোনো সভ্য সমাজে অকল্পনীয়! যুদ্ধাপরাধীদের বিচারসংক্রান্ত ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক গঠিত তদন্ত টিম গোপনে কতগুলো রাজনৈতিক ক্যাডার পরিবেষ্টিত অবস্থায় এ পর্যন্ত তিনবার চট্টগ্রামের রাউজান এবং গুডস হিলের বাসা পরিদর্শন করেছে, কিন্তু সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে মহল বিশেষের উত্থাপিত অভিযোগের কোনো সত্যতা পায়নি বলে জেনেছি। এখনও তাঁর বিরুদ্ধে কোনো চার্জ ফ্রেম করাও সম্ভবপর হয়নি! সাক্ষীদের সবাই ‘শুনেছেন’ বলে বলেছেন, কিন্তু ঘটনাস্থলে থেকে কেউ খুনের দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেননি! সে সময় পাক আর্মির কাছাকাছি যাওয়া কারও পক্ষে সম্ভব ছিল না।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ঘোষক প্রসঙ্গ
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর বক্তব্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক বিষয়টি উঠে এসেছে। কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে জিয়ার বলিষ্ঠ কণ্ঠে উচ্চারিত স্বাধীনতার ঘোষণাটি শুনেছেন, এমন লাখ লাখ মানুষ এখনও বেঁচে আছেন। জিয়া এমন এক সঙ্কটপূর্ণ মুহূর্তে এ কাজটি করেছেন, যখন তার স্ত্রী এবং দুই অবুজ ছেলে ক্যান্টনমেন্টে পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে বন্দি অবস্থায় মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন। দেশ স্বাধীন না হলে ফায়ারিং স্কোয়াডে জিয়ার মৃত্যু অবধারিত ছিল। জিয়া শুধু ঘোষণাই দেননি, যুদ্ধ পরিচালনায় নেতৃত্ব দিয়ে দেশকে স্বাধীন করেছেন। জিয়ার সাহসিকতা এবং বীরত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আওয়ামী লীগ সরকারই স্বাধীনতার পর জিয়াকে বীর উত্তম উপাধিতে ভূষিত করেছে। অথচ কি আশ্চর্য! আজ আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারাই জিয়ার অবদানকে খাটো করার জন্য বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন!
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে লেখকের অভিজ্ঞতা
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর মতো একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্রভাবে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর মোকাবিলায় দেশের অভ্যন্তরে থেকে যারা ভূমিকা পালন করেছিলেন, আমিও তাদের মধ্যে একজন ছিলাম। ১৯৭১ সালে আমি ছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং ইস্ট পাকিস্তান স্টুডেন্টস লীগের কর্মী (স্বাধীনতার পর বালাদেশ ছাত্রলীগ সূর্যসেন হল শাখার সভাপতি)। বাবা-চাচা-মামাদের সৃষ্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার জন্য সামরিক প্রশিক্ষণও নিয়েছিলাম ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর। ১৯৭১ সালে যখন অস্ত্র ব্যবহারের সুযোগ এলো, তখন সেই সামরিক প্রশিক্ষণ কাজে লাগিয়েছিলাম পাকিস্তান ভেঙে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টির কাজে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক রাজারবাগ পুলিশ লাইন ও পিলখানা ইপিআর ক্যাম্প এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গুলিবর্ষণের সঙ্গে সঙ্গেই পাকিস্তান রাষ্ট্রের মৃত্যু ঘটেছিল। সেই রাজারবাগ ও পিলখানা থেকে প্রথমে প্রতিরোধ লড়াই এবং সে প্রতিরোধ লড়াই ক্রমান্বয়ে ছাত্র-জনতার অংশগ্রহণের মাধ্যমে জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের রূপ লাভ করেছিল। ২৫ মার্চ রাতের গভীরে ‘বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন’ শুনে বাবার কর্মস্থল কাপ্তাইয়ে অবস্থানরত সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মিলিটারি মুজাহিদদের সঙ্গে আমিও ৩০৩ রাইফেল কাঁধে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ি এবং কাপ্তাই-বান্দরবান জঙ্গল হয়ে কালুরঘাট ব্রিজের গোড়ায় অবস্থানরত অষ্টম বেঙ্গল, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সঙ্গে যোগ দিই, যার কমান্ডে ছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান, মেজর মীর শওকত আলী, ক্যাপ্টেন খালিকুজ্জামান ও লেফটেন্যান্ট সামসুল মোবিন শমশের। ১২ এপ্রিল ১৯৭১ পাকিস্তানি সেনারা আক্রমণ চালিয়ে কালুরঘাট দখল করে নেয়। এতে বেশ কিছু মুক্তিযোদ্ধা শাহাদাত বরণ করেন ক্যাপ্টেন হারুণ গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন, লে. সামসুল মোমিন শমশের আহত অবস্থায় পাকিস্তানি সেনাদের হাতে বন্দি হন। পরদিন ২৬ মার্চ পাকিস্তান বেতারে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের ভাষণে বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতারের কথা শুনে বোঝা গেল, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বা প্রস্তুতির মাধ্যমে শুরু হয়নি। পাকিস্তান ভাঙার প্রক্রিয়াটা শুরু হয়েছিল মূলত পাকিস্তানের তদানিন্তন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান কর্তৃক ১ মার্চের ভাষণে ৩ মার্চ থেকে ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদের অধিবেশন স্থগিতকরণ এবং রাজারবাগ ও পিলখানায় ২৫ মার্চের রাতে পাকিস্তানি সৈন্যদের অতর্কিত গুলিবর্ষণের মাধ্যমে। সেই অরাজক পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম বেতার থেকে মেজর জিয়ার ঘোষণাই আমাদের বিদ্যুত্তরঙ্গের মতো অনুপ্রাণিত করেছিল এবং দ্রুত একত্রিত হওয়ার ও মুক্তিসংগ্রামের জন্য সংগঠিত হওয়ার প্রেরণা ও সাহস যুগিয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত বিতর্কিত বিষয়াবলী
আমাদের বাংলাদেশই সম্ভবত পৃথিবীর একমাত্র দেশ, যার নামের শেষে ‘দেশ’ না লিখলে পৃথক রাষ্ট্র বুঝায় না। আমার অভিজ্ঞতা বলছে, বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীরা নিজেদের অযোগ্যতায় তিনটি ফলস (ভ্রান্ত বা তথ্যসমর্থিত নয়) পিলারের ওপর বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, যেগুলো বালির বাঁধের মতো ক্ষণভঙ্গুর। এর একটি হচ্ছে বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীনতার ঘোষক বলা। কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গে আমিও একমত যে বাংলাদেশের স্থপতি হিসেবে বঙ্গবন্ধুকে অহেতুক বিতর্কে জড়ানো ঠিক হচ্ছে না। দ্বিতীয় ভ্রান্ত পিলার হচ্ছে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ লোক শহীদ হয়েছে বলে প্রচার করা এবং তৃতীয় পিলারটি হচ্ছে বীর বাঙালি মুক্তিযুদ্ধ করে ৯ মাসে দেশকে স্বাধীন করেছে! স্বাধীনতার ঘোষক বিষয়টি আগেই আলোচিত হয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার ৪০ বছরেও আমাদের মধ্যে কতজন মুক্তিযুদ্ধ করতে গিয়ে শহীদ হয়েছেন, সেই তালিকা প্রণয়ন করতে ব্যর্থ হয়েছি! আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য মরহুম মোহাইমেন সাহেব তাঁর বইতে গ্রাম সার্ভে করে দেখিয়েছেন যে ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধা, রাজাকার এবং নিরীহ মানুষ মিলে ৫০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার লোক নিহত হয়েছে। আজও আমরা মুক্তিযুদ্ধে নিহত হওয়া এক লাখ লোকের হিসাব মেলাতে পারিনি। ১৯৮১ সালে অনুষ্ঠিত ব্যাংককে এক সেমিনারে বাংলাদেশ প্ল্যানিং কমিশনের জনৈক বিদেশি কনসালটেম্লট (নাম প্রকাশ করা হলো না) আমাকে ৯ মাসে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার বিষয়টি ননসেন্স (বাজে কথা) বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তার মতে, বাংলাদেশ এত অল্প সময়ে স্বাধীন হতে পেরেছে যেহেতু ভারতীয় বাহিনী বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছিল। ফলে সরবরাহ ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন পাকিসত্মানী বাহিনী ভারতীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পন করতে বাধ্য হয়েছে। তা না হলে আমরা যে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করেছিলাম, তাতে আমাদের স্বাধীন হতে ভিয়েতনামের মতো এগার না হলেও ৯ বছরের কম সময় লাগত না। আমাদের দুর্ভাগ্য যে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গেরিলারা যখন দখলদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনীদের বাংকারের ভেতর অবরুদ্ধ করে ফেলেছিল এবং ডিসেম্বরের মধ্যে সর্বাত্মক হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখনই ভারতীয় সেনাবাহিনী পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ল এবং মুক্তিযুদ্ধে আমাদের এককভাবে বিজয় গৌরবের সুযোগটা ছিনিয়ে নিল। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে আমরা যে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করেছিলাম, সে প্রতিরোধ যুদ্ধ জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের রূপ লাভ করেছিল। কিন্তু ভারতীয় বাহিনী জড়িত হয়ে সেই মুক্তিযুদ্ধে আমরা এককভাবে বিজয় গৌরব অর্জনে বঞ্চিত হলাম। অতএব, বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হলে সব বিভ্রান্তি ও মিথ্যাচারের অবসান হওয়া উচিত। এ বিষয়ে বাঘা সিদ্দিকীর মতামত জানার আগ্রহ প্রকাশ করছি।
বাংলাদেশের উন্নয়ন
স্বাধীনতার পর গত ৪০ বছরে দেশ গড়ার কাজে ২৫ বছরের পূর্ব পাকিস্তানের অভিজ্ঞতার তুলনায় আমরা খুব একটা সফলতা দেখাতে পারিনি। বরং পাকিস্তানের গড়ে তোলা এশিয়ার বৃহত্তম পাটকল—আদমজী জুট মিলস লিমিটেড চালাতে না পেরে বন্ধ করে দিয়েছি। উপমহাদেশের একটি বৃহত্ কাগজ তৈরির কারখানা—কর্ণফুলী পেপার মিলস লিমিটেড ও পাশাপাশি প্রতিষ্ঠিত কর্ণফুলী রেয়ন মিলস লিমিটেড এবং চট্টগ্রামে দেশের একমাত্র ইস্পাত কারখানাটি চালাতে ব্যর্থ হয়েছি। আমাদের পাটকলগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে অথচ আজও সীমান্তের ওপারে নতুন নতুন পাটকল তৈরি হচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী আমাদের গার্মেন্ট কারখানাগুলোয় শ্রমিক অসন্তোষ লাগিয়ে অন্য দেশের কোম্পানিগুলো এসবের মালিক হয়ে বসছেন। বাংলাদেশের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশলীরা তাদের মেধা প্রয়োগ করে ‘মিশুক’ নামে একটি ত্রি-হুইলার যান্ত্রিক যান উদ্ভাবন করেছিলেন। দেশের ৬৪টি জেলা এবং ৪৮০টি উপজেলার প্রয়োজন মেটাতে অনেক মিশুকের উত্পাদন প্রয়োজন। এতে দেশের অভ্যন্তরে অনেক কর্মসংস্থান হতো। ‘মিশুকের’ গুণগত মান উন্নত করে আমরা এত দিনে মিশুক রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হতে পারতাম। কিন্তু ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে রাজনৈতিক নেতারা দেশকে শিল্পে সমৃদ্ধ না করে, বিদেশি যান আমদানি করে কমিশন খাওয়াকে গুরুত্ব দিয়ে দেশটাকে পর নির্ভর করে তুলেছেন। আমাদের দেশটি ১৫ কোটি মানুষের দেশ। মাত্র একটি গাড়ি নির্মাণের কারখানা চট্টগ্রামের বারবকুণ্ডে অবস্থিত পাকিস্তানিদের গড়ে তোলা প্রগতি ইন্ডাস্টিজ লিমিটেড। এ প্রগতির তৈরি ‘ট্রাক’ সামরিক যান হিসেবে ব্যবহৃত হতো। প্রগতির তৈরি ‘বাস’ শহরে চলাচল করত এবং প্রগতির তৈরি ‘মোটরগাড়ি’ বিত্তবানরা নগরীর রাস্তায় ব্যবহার করতেন। ১৯৭৩ সালে এই প্রগতির তৈরি একটি সুন্দর ‘কার’ তত্কালীন বাণিজ্যমন্ত্রী এমআর সিদ্দিকী ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে উপহার দেয়ার জন্য দিল্লিতে নিয়ে গিয়েছিলেন। এর ১০ বছর পর ভারতের তৈরি ‘মারুতি’ গাড়ি বাজারে আসে। আজ আমাদের অবস্থা এরূপ যে, একমাত্র গাড়ির কারখানাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। ষাটের দশকে এ দেশে যে মেধার বিকাশ ঘটেছিল, স্বাধীনতার ৪০ বছরে তা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ল! সর্বত্র চাকরিতে কোটা সিস্টেম চালু করে এবং অনুপযুক্ত লোকদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে দেশে মেধা বিকাশের পথকে রুদ্ধ করে দেয়া হয়েছে! আজ সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান-সন্ততি এবং নাতি-নাতনিদের জন্য চাকরি ও শিক্ষা ক্ষেত্রে কোটা নির্ধারণ করে দিয়েছে। এতে জাতি তিনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে : এক. মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা সীমান্ত অতিক্রম করতে পারেননি এবং দেশের অভ্যন্তরে থেকে বিভিন্নভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন, তাদের অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে, দুই. এই দ্বৈত ব্যবস্থা জাতিকে বিভক্ত রাখছে এবং ঐক্যবদ্ধভাবে জাতিগঠন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তিন. কোটা ব্যবস্থার ফলে দেশজুড়ে মেধাবীরা তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং জাতিও মেধাবীদের সেবা থেকে উপকৃত হতে পারছে না। একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের উপযোগী হয়ে গড়ে তুলতে হলে স্বাধীনতার ৪০ বছর পর আর কোনো ধরনের কোটা রাখার যৌক্তিকতা নেই। ষাটের দশকে সৃষ্ট কবি-সাহিত্যিক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সিভিল সার্জেন্টরা যে প্রতিভার স্বাক্ষর দেখিয়েছেন, সমতুল্য প্রতিভা বিগত ৪০ বছরে কেন আমাদের সৃষ্টি হলো না? জাতীয় নীতি-নির্ধারকরা পরস্পরের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানো ছাড়া এসব বিষয়ে ভাবেন বলে মনে হয় না। দেশের জন্মহার কমানো এবং আগামী দশকের মধ্যে দেশ থেকে ৫-৭ কোটি মানুষ পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে বিদেশে প্রেরণের কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সরকারের আছে বলে মনে হয় না! এই প্রেক্ষাপটে যেটি আজ বেশি দরকার সেটি হলো, সেই সরল বালকটির মতো শেখ হাসিনার সামনে আসল সত্যটি উচ্চারণ করা, যেটি কাদের সিদ্দিকী শুরু করেছেন। তিনি তার লেখার মাধ্যমে আবারও প্রমাণ করলেন যে তাকে দেয়া বাঘা উপাধিটি যথার্থ। একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং একজন প্রবীণ সংসদীয় রাজনৈতিক নেতার লেখা ‘একজন প্রবীণ নেতার মহাপ্রয়াণ’ নিবন্ধনটি জাতিকে সত্য বলার সাহস জোগাবে। লেখককে অভিনন্দন।
সুত্র: আমার দেশ
Click This Link
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র - ভ্রাম্যমান লাইব্রেরী ভাবনা

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:৪৬


শ্রদ্ধেয় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যাররে হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তার জন্মলগ্ন ১৯৭৮ সাল থেকে অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে। আমার মনে পড়ে, আমি স্কুলে পড়াকালীন সময়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে স্কুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

=একান্ত নিজস্ব জিনিসগুলো পর হয়ে যাচ্ছে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৫



যে চোখ দিয়ে দেখেছি ধরার আলো, সে চোখও দিচ্ছে ফাঁকি,
যে চোখের আলোয় দেখেছি পুকুর নদী, শুকনো উঠোন;
বৃষ্টি ভেজা দিন, দেখেছি ময়না শালিক, ঘুঘু ডাকা দুপুর
সে চোখ পর হয়ে যাচ্ছে অল্প... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:২৩


Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪

আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×