Click This Link
সত্যান্বেষী লিখেছেন: "একজন ধার্মিক মুসলমান কি বিধর্মীদেরকে অন্তরের অন্তস্থল থেকে শ্রদ্ধা, সম্মানের চোখে দেখতে পারেন? খোদ কোরানেই বিধর্মীদের (কোরানের ভাষায় কাফের) সুতীব্র ঘৃণার বিষ ছড়ানো আছে। তারা মরলে মগজ টগবগ করে ফুটতে থাকবে, বিকট বিকট সাজা পাবে ইত্যাদি ইত্যাদি। এই কথাগুলো মুসলমানদের মনে প্রভাব ফেলবে এটাই স্বাভাবিক, এবং তাই একজন ধার্মিক মুসলমান বিধর্মীদেরকে ঘৃণার চোখেই দেখবে।"
প্রথমে হচ্ছে কোরানে সকল অমুসলিমকে কাফির বলা হয়নি। হয়ত আপনি জানেননা (না জেনে কথা বলাটা অন্যায়) আর জেনেও ইচ্ছে করেই ভুল করছেন (সেটা আরো বড় অন্যায়)।কোরনে কাফির বলতে "deniers of truth" কে বুঝানো হয়েছে, যাদেরকে যথেষ্ঠ পরিমাণ প্রমাণসহকারে বুঝানো বা তাদের সামনে সত্য হাজির করা স্বত্ত্বেও এবং তাদের বুঝার ইন্টেলিজেন্স থাকা স্বত্বেও বিভিন্ন কারনে (সম্পদ, মর্যাদা, প্রতিপত্তি হারাবে ভয়ে বা অহংকারের জন্য বা অন্যকোন কারনে) ইসলাম গ্রহণ করেনা এবং অন্যদেরকেও ডিসকারেজ করে তাদেরকেই কাফির বলা হয়েছে। তাদেরকে জ্ঞানপাপী বলা যায়।
কাফির ছাড়াও মুশরিক (যারা আল্লাহ্র উপর পার্টনারশিপ আরোপ করে), আহলে কিতাব ( people of the book - Jews, Christians), মুনাফিক ইত্যাদি ক্যাটাগরিতে আছে ননমুসলিমরা। তাই আপনি যে বললেন কাফির মানে ননমুসলিম সেটা মিথ্যা।
আমার জানামতে শুধুমাত্র কোরাণেই ননমুসলিম হওয়া স্বত্ত্বেও পরকালে মুক্তির কথা বলা হয়েছে, সেখানে মুসলমান হওয়ার শর্তটা রাখা হয়নি।(অনেক স্কলারদের মতে বিশেষ করে যাদের কাছে কোনদিন ইসলামের দাওয়াত পোঁছেনি বা নিজস্ব ইন্টেলিজেন্স খাটিয়ে হয়ত সত্যের দিকে আসতে পারেনি তাদের জন্য হয়ত প্রভিশনটা। আল্লাহই ভাল জানেন।)
আপনি বলেছেন একজন ধার্মিক বিধর্মীদেরকে ঘৃণা করবেই। আমি জানি আপনার অবশ্যই অনেক ধার্মিক মুসলমানদের সাথে দেখা হয়েছে যারা বিধর্মীকে কোনমতেই ঘৃণা করেনা। জেনেশুনেও এরকম বলতেছেন কেন সেটা আপনার সিনসিয়ারিটি নিয়ে প্রশ্ন তুলে। আপনার বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে কি একজনও ধার্মিক মুসলিম নাই যে আপনাকে ঘৃণা করেনা? ভারতীয় উপমহাদেশে যত আউলিয়া ছিলেন তাদের কাছে হিন্দু-মুসলিম সবাই যেত। বিশ্বের ইতিহাসে মুসলমানদের শাসনামলে যে সহনশীলতার নজির পাওয়া যায় সেটা অন্য কোন আমলেই পাওয়া যায়না। পড়ুন ক্যারেন আর্মস্টংয়ের ইসলাম, মুহাম্মদ বইগুলা যদি আমার কথা বিশ্বাস না হয়। আমি নিজে ধার্মিক এবং আমাকে পাঁচজন পছন্দের ব্যক্তির কথা জিজ্ঞেস করলে ৩ জন অন্তত থাকবে নন-মুসলিম। উগ্র মুসলমানদের সংখ্যা অন্য যেকোন মতাদর্শ বা ধর্মের একই পার্সেন্টেজই হবে। আপনার যুক্তি অনুসারে যদি কোরানে তথাকথিত ঘৃণার বিষ ছড়ানো হয়েছে সেজন্যই যদি মুসলমানরা বিধর্মীদেরকে ঘৃণা করবে মনে করেন তাহলে বাইবেল-এ কোরআন থেকে অনেকগুন বেশি বিষ ছড়ানো হয়েছে, তারা সবাইও অন্যধর্মের লোকজনকে আরো অনেক বেশী ঘৃণা করার কথা (রিচার্ড ডকিনস যেরকম ধার্মিকদেরকে ঘৃণা করেন!)। সেটা সত্যি না, তাই আপনার যুক্তি খুবই খেলো। আর কোরাণে ঘৃণার বিষ ছড়ানো হয়েছে যেসব বললেন তা সেই আয়াতে কনটেক্স্টে না দেখে বিচ্ছিন্নভাবে দেখছেন বলেই মনে হচ্ছে। যেসব আয়াতের কথা মনে করতেছেন তার উপরে নীচে কয়েকটা আয়াত পড়ুন, আয়াত নাজিলের শানে নুজুল জানুন, দেখবেন পারফেক্টলি লজিকাল এন্ড নরমাল।
সত্যান্বেষী বলেছেন: "আবার দেখুন ইয়োরোপ আমেরিকায় মুসলমানগন ধর্ম-প্রচারের যে সুযোগ পান সৌদি আরব ইরান পাকিস্তান সহ মুসলিম রাষ্ট্রগুলোতে কি বিধর্মীদেরকে সেই সুযোগ দেয়া হচ্ছে? আপনার পাশের বাড়ির এক মুসলমান ভদ্রলোক যদি আগামীকাল নিজেকে খৃষ্টান ঘোষনা করে চার্চে যাওয়া শুরু করে তাহলে তার সামাজিক দশাটা কি হবে? অথচ সেইসব দেশে খৃষ্টান থেকে মুসলমান হয়ে অনেকেই অবাধে চলাফেরা করছে।"
সৌদীআরবে ধর্মপ্রচারের সুযোগের কথার উত্তরে কয়েকজনই ভ্যাটিকান সিটির কথা বলেছে, তাই সে পয়েন্টে আর যাচ্ছিনা।
কেউ খ্রীস্টান হয়ে গেলে তার সামাজিক দশা অবশ্যই করুন হবে, তাকে অনেক ঝামেলার মধ্যে দিয়ে যেতে হবে, ক্ষেত্রবিশেষে তাকে হয়ত জীবনও দিতে হতে পারে যদি খুবই তালিবানী-টাইপ কোন সমাজে বসবাস করে। কিন্তু এই সমস্যা শুধু মুসলমানদের না, সব ধর্মেই। হয়ত ইউরোপে না, কিন্তু ইথিওপিয়া বা এরকম পশ্চাদপদ খ্রীস্টান দেশেও খ্রীস্টান থেকে মুসলমান হলে একই সমস্যা অতিক্রম করতে হয়। এটা যতটা না ধর্মের জন্য, তার চেয়ে বেশি শিক্ষা বা কালচারের জন্য। এমনকি যুক্তরাষ্ঠ্রেও যারা খ্রীস্টান থেকে মুসলমান হয় তাদের অনেককেই তার পারিবারি-সামাজিক পরিমন্ডলের ধার্মিকতার উপর নির্ভর করে অনেক সামাজিক সমস্যার ভিতর দিয়ে যেতে হয়। কয়েকজন খ্রীস্টান থেকে মুসলমান হওয়া লোকের বই পড়লেই সেটা পরিষ্কার হবে। তাই এখানে ইসলামকে আলাদাভাবে সর্ট আউট করে বাঁশ দেওয়াটা ঠিক হবে বলে মনে হয়না!!
সত্যান্বেষী বলেছেন: "এবার ভাবুন - ইয়োরোপ আমেরিকায়ও তাদের ধর্মের খোমেনী তালেবান বাংলাভাই সৃষ্টি হলো। মুসলমানরা মরলে নিকৃষ্টতম নরকে অনন্তকাল জ্বলতে থাকবে - গীর্জায় গীর্জায় মন্দিরে মন্দিরে এসব প্রচার শুরু হলো এবং মুসলমানদেরকে এমনি তীব্র ঘৃণার চোখে দেখা শুরু হলো! তাহলে এই মুসলমানদের দশাটা কি হবে?
সব গীর্জায় এরকম সারমন চালু আছে হাজার বছর ধরে, আপনার হয়ত জানা না থাকতে পারে। খ্রীস্টান ধর্মে সালভেশান শুধু জিসাসকে যারা সেভিয়ার মনে করবে তাদের জন্য, অন্য কারো জন্য নয়। মুসলমানদের প্রতি ইউরোপীয়ানদের ইনহেরেন্ট ঘৃণা এবং ভয় হাজার বছর পুরোনো, সেটা ক্রুসেডের আগে থেকে শুরু। অপরপক্ষে ইহুদী-খ্রীস্টানদেরকে মুসলমানরা সাধারণভাবে ঘৃণা করা শুরু করেছে অনেক সাম্প্রতিক সময় থেকে, বিশেষ করে কলোনাইজেশানের পর এবং সেটা চরম আকার ধারণ করেছে ইসরাইল নামক সন্ত্রাসী রাষ্ঠ্রের প্রতিষ্ঠার পর। এই ঘৃণাটা যতটা না ধর্মীয় তার চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিক, তেমনিভাবে খ্রীস্টানদের ঘৃণাটাও রাজনৈতিক কারনে শুরু হয়েছিল, মুসলমানদের কাছে সিরিয়া, বাইজেনটিন সাম্রাজ্যের আরো অনেক অংশ হারানোর পর। (অরিয়েন্টালিজম - এডওয়ার্ড সাইদ, আর ক্যারেন আর্মস্টংয়ের "মুহাম্মদ" বইয়ের প্রথম চাপ্টার - মুহাম্মদ - দ্যা এনিমি।)
সত্যান্বেষী বলেছেন: "কেবল বিধর্মীদের কাছ থেকেই উদার গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি আশা করব আর আমরা কায়েম করব মুসলিম রাষ্ট্র - এটা কি দ্বিমুখি নীতি হয়ে গেল না?"
মুসলিম রাষ্ঠ্র কোথায় কায়েম হয়েছে জানা নেই, তালিবানরা ভুলভালভাবে চালু করতে চেয়েছিল, টেকেনি। এটা ঠিক যে মুসলমান দেশেগুলোতে উদার গণতন্ত্রের চর্চা নেই। কিন্তু এটা ধর্মের জন্য না, ১৫০০ শতকের পর মুসলমানদের ক্রমান্বয়ে শিক্ষা-দীক্ষায় পিছিয়ে পড়া এবং পরবর্তীতে মুসলিম দেশগুলোর ইউরোপীয়ানদের হাতে কলোনাইজড হওয়া এবং পোস্ট-কলোনিয়াজম পিরিয়ডে বিশ্বরাজনীতির ঠেলায় পড়ে গণতন্ত্রের চর্চা সম্ভব হয়নি। (ইরানের কথা ভেবে দেখুন - পশ্চিমাদের ঠেলায় তাদের গণতন্ত্রের কি হয়েছিল বিপ্লব-পূর্ববর্তী কালে)। মুসলমান দেশগুলো স্বাধীনতা পাওয়া শুরু করেছে মাত্র ৫০ বছর হচ্ছে, এর মধ্যেই অশিক্ষিত বিশাল জনগোষ্ঠী নিয়ে গণতন্ত্র কায়েম করবে সেটা ভাবা ঠিক না। দুষ্টচক্র থেকে পরিত্রাণ পেতে অনেক সময় লাগে, ইউরোপীয়ানদের তো ১০০০ বছর লেগেছিল। তবে মুসলমানদের অত লাগবে বলে মনে হয়না, নেক্সট ১০০ বছরের মধ্যেই মোটামোটি রেস্সপেক্টেবল জায়গায় চলে যাবে। নেক্সট ৫০ বছরে ইউরোপীয়ানদের তথাকথিত সহনশীলতা সব পালাবে, যখন ইউরোপে মুসলমানরা ক্রমান্বয়ে ইউরোপে সংখ্যায় বাড়বে। সেই ঘৃণার শুরু হয়ে গেছে, ইউরোপে সাধারণ মানুষ মুসলমানদেকে অনেক বেশি ঘৃণা করে এখন। সুইজারল্যান্ডের মত দেশে মিনারেট বানানো আইন করে বন্ধ করা হয়েছে। সহনশীলতা ততক্ষণ থাকে যতক্ষন নিজের পাতে ভাতের টান পড়বেনা, টান পড়লেই সহনশীলতা পালাবে, এটা মানুষ মাত্রই সত্যি, ইউরোপীয়ান-এশিয়ান-আফ্রিকান-মুসলিম-ননমুসলিম সবার জন্য।
তাছাড়া সবাই তো তাদের মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে চায়, মুসলমানরা চাইলে সমস্যা কেন হবে? কমিউনিস্টরা তাদের মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে চায়, খ্রিস্টান ইভানজেলিস্টরা সারা বিশ্বে খ্রিস্টিয়ানিটি প্রতিষ্ঠা করতে চায়, বিজেপি হিন্দুরাষ্ঠ্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়। সেভাবে মুসলমানদের মধ্যেও একটা অংশ ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চাইবেই! তাছাড়া বর্তমানবিশ্বে যে ফর্মের গণতন্ত্র চালু আছে সেটাও তো গ্রীক ফিলসফির থেকে রোমানদের হয়ে রেনেশাঁস এর সময় খ্রীস্টিয়ানিটির অনেক আইডিয়া নিয়ে এডাপটেড হয়ে এসেছে, সেজন্য খ্রিস্টিয়ান ক্লের্জীরা এই ফরমের গণতন্ত্র এবং পুঁজিবাদের বিরাট ভক্ত। ওরা যদি পুঁজিবাদ প্রতিষ্ঠা করতে চাই (এবং সারাবিশ্বে এপার্যান্টলি ছড়িয়ে দিতে চায় এবং দিয়েছে), তাহলে মুসলমানরা ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চাইলেই সমস্যা হয়ে গেল?
সবকিছুকে ধর্মের দৃষ্টিভংগি থেকে না দেখে আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে দেখলে অনেক সহজ হয়ে যায়। নাস্তিকদের সমস্যা হচ্ছে তারা ধরে নিয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমস্যা ধর্ম, এজন্যই ধর্ম ছাড়া আর কোনকিছুই তারা দেখেনা। প্রকৃতপক্ষে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমস্যা ইনজাস্টিস আর পভার্টি, ধর্ম না। আস্তিকরা নাস্তিকদের মত ধর্ম ধর্ম নিয়ে মনে হয় চিৎকার চেঁচামেচী করলে বিশ্বে মানুষ থাকতে অনেক কষ্ট হত!
সর্বশেষ, যেকোন গণতান্ত্রিক আর ধর্মনিরপেক্ষ দাবি করে এরকম দেশেই যার যেরকম ভাল লাগে সেরকম পোশাক পড়তে দেয়া আবশ্যক। তালিবানদের মত বোরকা চাপিয়ে দেওয়া যেমন মানবাধিকার পরিপন্থী তেমনি তুরষ্ক-ফ্রান্সে হিজাব নিষিদ্ধ করা জাতিসংঘের সার্বজনীন মানবাধিকারের পরিপন্থী। বিশেষ করে ফ্রান্সের মত দেশ যারা নিজেদেরকে মানবাধিকারের চ্যাম্পিয়ন মনে করে এবং সাংবিধানিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ, সেসব দেশে তো এটা চরমভাবে ডাবলস্ট্যান্ডার্ড।তাছাড়া মুসলমান দেশগুলো কাউকে গণতন্ত্রের সবক দিতে যায়না, কিন্তু ফ্রান্স তো যায়। তাই তারা নিজেরা যা বলে সেটা তাদের কাছ থেকে আশা করতেই পারে মুসলমানরা।
এই বিষয়টাকে এভাবে না দেখে আপনি মুসলমানদের প্রতিবাদটাকেই বড় করে দেখলেন, সেটা যে মুসলমানদের প্রতি আপনার তীব্র ঘৃণা সেটা থেকেই উৎপত্তি কিনা চিন্তা করে দেখেছেন? মুসলমানদেরকে ঘৃণার দায়ে অভিযুক্ত করে নিজেই ঘৃণা বুকে বয়ে বেড়াচ্ছেন না তো?
বিঃ দ্রঃ - পোস্টটা সত্যান্বেষীর পোস্টের জবাবে আমার করা কমেন্টের সমন্বয়। লম্বা কমেন্ট করার পর মনে হল সেটাকে পোস্ট আকারে রাখি, অনেকদিন পোস্ট দিইনা, তাই আরেকটা পোস্ট জমা হল!! যেহেতু তাৎক্ষণিকভাবে লেখা তাই পোস্টের কোহিয়ারেন্সের অভাব রয়েছে।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে জানুয়ারি, ২০১০ সকাল ৮:৫২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


