ট্রেন যথা সময়ে এলো। প্লাট ফর্মে তেমন একটা যাত্রী সমাগম ছিল না। তাই কোন ঝামেলা ছাড়াই ট্রেন উঠলাম এবং নির্দিষ্ট আসনে বসলাম। কপার্টমেন্টের অধিকাংশ সীটই খালি। মাত্র কয়েক জন যাত্রী। একজন মহিলা কোলে একটি শিশু আমার সামনের সীটে বসা। হয়তো খুলনা থেকে উঠেছে। লম্বা করে পা তুলে আরাম আয়েশ করে বসে ভাবছি অনেক কিছুই। আমার গন্তব্যে পৌঁছাতে চার থেকে সাড়ে চার ঘন্টা সময় লাগবে। হাই তুলে গা এলিয়ে দিলাম। ট্রেনের ঝাকুনি আর শব্দের তালে আমার ৮ বছর বয়সী ভাতিজা ঘুমিয়ে পড়ল। ওকে সীটে শুইয়ে দিলাম। ঘুমাও বাবা, সমস্যা নাই।
হয়তো ভরা পূর্ণিমা চাঁদ আকাশে ছিল। অনেক দুর বিস্তৃত দিগন্ত দেখা যাচ্ছে। স্বচ্ছ আলোর রেখা আমাকে একটু আবেগী করে তুলল। এর মধ্যে ট্রেনের গতি বেড়েছে। ট্রেনের ভিতরের লাইট গুলো নিভে গেলো। একটা স্বপ্নময়ী আবেশ তৈরী হলো এতে। ক্যাসেটে আব্দুল আলীমের হৃদয় ছোঁয়া গান বাজছে। গানের কারণেই নাকি আমার মন কেমন উতলা হয়ে গেল। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছি। ফাকা মাঠের অনেক দুর পর্যন্ত দৃষ্টি সীমা অতিক্রম করছে। আমার ঠিক পিছনের সিটে যাত্রী ছিলেন এক বৃদ্ধ মানুষ। আব্দুল আলীমের সুরেলা গানের পরশ হয়তো তাকেও আপ্লুত করেছে। আমি সীট হতে উঠে একটু হাটা হাটি করছি। লক্ষ্য করলাম বৃদ্ধের দুচোখ বেয়ে অশ্রুধারা বইছে। অতীত কোন স্মৃতি বা ফেলে আসা জীবনের কোন ঘটনা মনে করে বৃদ্ধের এই কান্না আমাকে হতবিহ্বল করল।
সিটে গিয়ে বসলাম। ট্রেনের গতি কমে যাচ্ছে। ভাবলাম সামনে হয়তো কোন ষ্টেশন তাই চালক গতি কমিয়েছে। কিন্তু না কোন ষ্টেশন সামনে আছে বলে মনে হল না। তখন রাত প্রায় একটা বাজে। দু একটা লাইট জ্বলে উঠল। ধীরে ধীরে গতি কমে একেবারে থেমে গেল ট্রেনটি। আচ করতে পারলাম কোন ষ্টেশন নয় এটা। একটা খোলা মাঠ। চারিদিকে শূণ্য মাঠে কেন ট্রেন থামল, শুনেছি ট্রেনে ডাকাতি হয়। ভাবলাম ডাকাতি হচ্ছে না তো। সাহস করে জানালা দিয়ে মাথা বাইরে বের করে দেখি, বেশ কয়েকজন ব্যক্তির জটলা। চর্টের আলো এখানে সেখানে। আমার কম্পার্টমেন্টের কাছা কাছি একটি ২২-২৫ বছরের ছেলেকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞাসা করলাম, ভাই এই স্থানের নাম কি? সে জানাল এটা উথুলী। সামনে প্রায় ৩ কিঃ মিঃ দুরে উথুলী ষ্টেশন। চুয়াডাঙ্গার উথুলী।
ছেলেটির কাছে আবার জানতে চাইলাম, ভাই, এখানে কি হচ্ছে?
সে বলল, ট্রেনে মাল উঠছে। মাল মানে ভারতীয় অবৈধ ভাবে আসা নিষিদ্ধ ফেন্সিডিল!
একটা মেইল ট্রেন থামিয়ে অবৈধ মাদক তোলা হচ্ছে? বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল। তাই ট্রেন থেকে নামলাম। ১০-১২ জন লোক কার্টুন তুলতে ব্যস্ত। আমাকে নামতে দেখে একজন এগিয়ে এসে ধমকের সুরে স্থানীয় ভাষায় জানতে চাইল আমি কেন নেমেছি। তার হাতে একটি হকিষ্টিক জাতীয় একটা কিছু। আমি কোন কথা না বলে তাড়াতাড়ি নিজ সীটে গিয়ে বসলাম।
চলবে....

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

