somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

স্পেকট্রাম : হয়ত সহজ ভুলে যাওয়া এবং রাষ্ট্রের স্মৃতিশক্তি

১২ ই এপ্রিল, ২০০৯ রাত ৩:১৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

একটা পুরনো গণসঙ্গীত দেয়ার ইচ্ছে ছিল আজকে। কিন্তু মন চাইল না। গতকাল ঢাকায় ছিলাম না। তাই কম্পিউটারে বসা হয়নি, ব্লগও দেখা হয়নি। আজ সামহোয়্যার-এ গত ২/৩ দিনের লেখাগুলো দেখে মনটা খারাপই হল। ভুলে যাওয়ার মতো সহজ বোধ হয় আর কিছু নেই। বিশেষত আমাদের কাছে। আমরা ভুলে যাই, ভুলে যেতে অভ্যস্ত, ভুলিয়ে দিতেও অভ্যস্ত। অবশ্য আমাদের জীবনে এত ঘটনা, অথবা দুর্ঘটনার আধিক্য, যে কোনটা ছেড়ে কোনটা মনে রাখি। কিন্তু এমন অনেক ঘটনা আছে যা ভুলে যাওয়া উচিত নয়।
ব্লগে অনেকে লিখছেন, অনেক কিছু নিয়ে লিখছেন। সৎ-ভাবেই অনেকে লিখছেন। আবার কারো কারো সময় কাটানো অথবা পাণ্ডিত্য ফলানো -- এমন চেষ্টাও দেখি। বিডিআর বিদ্রোহের রেশ কাটেনি। আসলে বিডিআর বিদ্রোহের রেশ কারো মধ্যেই নেই। আছে ৫৭ জন আর্মি অফিসারের হত্যাকাণ্ডের রেশ। নিহতদের উদ্দেশ্যে জাতি তিনদিনের শোক পালন করেছে। কালো পতাকা উঠেছে। বিউগলে করুণ সুর বেজেছে। অনেক অশ্রু গড়িয়েছে। সংবাদপত্রের পাতায় আর টিভির পর্দায় গড়িয়েছে অনেক বেশি। এখন নিহত সেনাকর্মকর্তাদের পরিবারকে পুনর্বাসনের জন্য অনেক উদ্যোগ, অনেক আয়োজন। এ ঘটনার পেছনে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকী হওয়ার মতো বিষয় আছে বলে অনেকেই মনে করছেন। সঠিক এবং সত্য কারণগুলো দেশবাসীর সামনে উঠে আসলে দেশের মানুষ বুঝতে এবং সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন, আসলে কি হয়েছে, ঘটনার গভীরতা কতটুকু, তাৎপর্য কি। এ ঘটনা হয়ত আমাদের অনেক দিন মনে থাকবে। সরকার মনে করিয়ে দেবে, মিডিয়া মনে করিয়ে দেবে। ব্যক্তির স্মৃতিশক্তির চেয়ে সরকার এবং রাষ্ট্রের স্মৃতিশক্তি নিশ্চয়ই অনেক শক্তিশালী। তাদের দায়িত্ব আমাদের মনে করিয়ে দেওয়া। সংবাদমাধ্যমগুলোর দায়িত্ব আমাদের মনে করিয়ে দেওয়া। মনে তারা হয়ত করিয়ে দেয়, কিন্তু আমাদের ভুলিয়ে দেবার কাজও তারা করে থাকে।
সাল ২০০৫। ১০ এপ্রিল মধ্যরাত। ঘড়ির কাঁটা তখন ১টা ছুঁই ছুঁই। সাভার ক্যান্টনমেন্টের সীমানার মধ্যেই একটি ভবন ধসে পড়ল। ৯তলা ওই ভবনে একটা গার্মেন্টস কারখানা ছিল। তাতে কাজ করত প্রায় ৩ হাজার শ্রমিক। রাতে সব শ্রমিক কাজে থাকে না, তারপরও কমপক্ষ ৫শতাধিক শ্রমিক কর্মরত ছিল বলেই ধারণা। মুহূর্তের মধ্যে পিষে চ্যাপ্টা হয়ে গেল কয়েকশত তাজা প্রাণ।

এরপর কয়েকদিন পত্র-পত্রিকা-টিভি চ্যানেলে একটু হৈচৈ, তারপর সব বিস্মরণের চাদরে ঢাকা। কারো কি মনে আছে ঘটনাটি?

চার-পাঁচ দিন ধরে উদ্ধার কাজ চলল। সরকারের তরফ থেকে বলা হল, মারা গেছে মাত্র ৭৩ জন। প্রথম দিন উদ্ধারকর্মীরা ৯৮ জনকে উদ্ধার করতে সক্ষম হল। শ্রমিক এবং প্রত্যক্ষদর্শীরা দাবি করল, ভেতরে কমপক্ষে ৩শত শ্রমিক চাপা পড়েছে। কিন্তু সরকার সেটা স্বীকার করল না। একজন নিখোঁজ(!) শ্রমিকের মা, যার ছেলে ওই কারখানায় কাজ করত, ছেলের ছবি হাতে নিয়ে দুদিন ঘুরল। তার ছেলেকে পাওয়া গেল না। ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত পত্রপত্রিকায় ৯৭ জনকে নিখোঁজ বলা হল।

জহির নামের একজন শ্রমিককে উদ্ধার করার সময় তার হাত কেটে ফেলতে হল। তখন সে কেঁদে বলেছিল, ‍"আপনারা আমার হাতটা কাটবেন না। এই হাত দিয়ে আমি কাজ করে খাব।" তাকে অজ্ঞান করে তার হাত কেটেই তাকে উদ্ধার করতে হল। আরেকজন শ্রমিক, জালাল, উদ্ধারের পর তার হাত-পা কেটে ফেলতে হল।
একটা নীচু ডোবা জমিতে চারতলা বিল্ডিং করার অনুমতি দিয়েছিল রাজউক। ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের নাকের ডগায় সেটি ৯ তলা হয়ে গেল। ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের অনুমতি নিয়ে সেখানে গার্মেন্টস হল। ওই গার্মেন্টসের মালিকের নাম শাহরিয়ার সাঈদ। তিনি নাকি কোন এমপি/মন্ত্রীর শালা না দুলাভাই। তাকে আর খুঁজেও পাওয়া গেল না। ঘটনার পর ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড তরিঘড়ি করে এ রকম অনুনোমোদিত কয়েকটি বহুতল ভবনের ভাঙার কাজ শুরু করল। শাহরিয়ার সাঈদ আজ পর্যন্ত ধরা পড়েনি। ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের যে কর্তাব্যক্তিরা এ অবৈধ অনুমোদন দিয়েছিলেন তাদের কারো কোনো ধরনের সাজা হয়েছে কিনা জানা যায়নি।
অনেকেরই হয়ত মনে পড়বে এ ঘটনাটি। কিন্তু আমরা মনে করতে চাই না। এবং আমাদের ভুলিয়ে দিতেও অনেকে নানা প্রয়াস চালাচ্ছেন। একজন শ্রমিকের জীবনের আর দাম কতটুকু? ২০০৭ সালের ডিসেম্বর মাসের ৮ তারিখ র‌্যাংগস ভবন ধসে পড়ে অন্তত ৪০ জন নির্মাণ শ্রমিক নিহত হওয়ার পর সরকার দাবি করল মারা গেছে মাত্র্র ৯/১০ জন। ৩০ জন শ্রমিকের লাশ দিনের পর দিন সেখানে ঝুলেছে। ওদের মৃত্যুর জন্য দায়ী কারো বিচার হয়েছে বলে শোনা যায়নি।
আমরা কী মনে রাখি? কাদের মনে রাখি? কেন মনে রাখি? এ রাষ্ট্র কাদের মনে রাখে? কাদের জন্য শোক পালন করে? কালো পতাকা ওড়ায়?
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই এপ্রিল, ২০০৯ রাত ৩:৩৪
৭টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×