ব্লগে অনেকে লিখছেন, অনেক কিছু নিয়ে লিখছেন। সৎ-ভাবেই অনেকে লিখছেন। আবার কারো কারো সময় কাটানো অথবা পাণ্ডিত্য ফলানো -- এমন চেষ্টাও দেখি। বিডিআর বিদ্রোহের রেশ কাটেনি। আসলে বিডিআর বিদ্রোহের রেশ কারো মধ্যেই নেই। আছে ৫৭ জন আর্মি অফিসারের হত্যাকাণ্ডের রেশ। নিহতদের উদ্দেশ্যে জাতি তিনদিনের শোক পালন করেছে। কালো পতাকা উঠেছে। বিউগলে করুণ সুর বেজেছে। অনেক অশ্রু গড়িয়েছে। সংবাদপত্রের পাতায় আর টিভির পর্দায় গড়িয়েছে অনেক বেশি। এখন নিহত সেনাকর্মকর্তাদের পরিবারকে পুনর্বাসনের জন্য অনেক উদ্যোগ, অনেক আয়োজন। এ ঘটনার পেছনে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকী হওয়ার মতো বিষয় আছে বলে অনেকেই মনে করছেন। সঠিক এবং সত্য কারণগুলো দেশবাসীর সামনে উঠে আসলে দেশের মানুষ বুঝতে এবং সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন, আসলে কি হয়েছে, ঘটনার গভীরতা কতটুকু, তাৎপর্য কি। এ ঘটনা হয়ত আমাদের অনেক দিন মনে থাকবে। সরকার মনে করিয়ে দেবে, মিডিয়া মনে করিয়ে দেবে। ব্যক্তির স্মৃতিশক্তির চেয়ে সরকার এবং রাষ্ট্রের স্মৃতিশক্তি নিশ্চয়ই অনেক শক্তিশালী। তাদের দায়িত্ব আমাদের মনে করিয়ে দেওয়া। সংবাদমাধ্যমগুলোর দায়িত্ব আমাদের মনে করিয়ে দেওয়া। মনে তারা হয়ত করিয়ে দেয়, কিন্তু আমাদের ভুলিয়ে দেবার কাজও তারা করে থাকে।
সাল ২০০৫। ১০ এপ্রিল মধ্যরাত। ঘড়ির কাঁটা তখন ১টা ছুঁই ছুঁই। সাভার ক্যান্টনমেন্টের সীমানার মধ্যেই একটি ভবন ধসে পড়ল। ৯তলা ওই ভবনে একটা গার্মেন্টস কারখানা ছিল। তাতে কাজ করত প্রায় ৩ হাজার শ্রমিক। রাতে সব শ্রমিক কাজে থাকে না, তারপরও কমপক্ষ ৫শতাধিক শ্রমিক কর্মরত ছিল বলেই ধারণা। মুহূর্তের মধ্যে পিষে চ্যাপ্টা হয়ে গেল কয়েকশত তাজা প্রাণ।
এরপর কয়েকদিন পত্র-পত্রিকা-টিভি চ্যানেলে একটু হৈচৈ, তারপর সব বিস্মরণের চাদরে ঢাকা। কারো কি মনে আছে ঘটনাটি?
চার-পাঁচ দিন ধরে উদ্ধার কাজ চলল। সরকারের তরফ থেকে বলা হল, মারা গেছে মাত্র ৭৩ জন। প্রথম দিন উদ্ধারকর্মীরা ৯৮ জনকে উদ্ধার করতে সক্ষম হল। শ্রমিক এবং প্রত্যক্ষদর্শীরা দাবি করল, ভেতরে কমপক্ষে ৩শত শ্রমিক চাপা পড়েছে। কিন্তু সরকার সেটা স্বীকার করল না। একজন নিখোঁজ(!) শ্রমিকের মা, যার ছেলে ওই কারখানায় কাজ করত, ছেলের ছবি হাতে নিয়ে দুদিন ঘুরল। তার ছেলেকে পাওয়া গেল না। ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত পত্রপত্রিকায় ৯৭ জনকে নিখোঁজ বলা হল।
জহির নামের একজন শ্রমিককে উদ্ধার করার সময় তার হাত কেটে ফেলতে হল। তখন সে কেঁদে বলেছিল, "আপনারা আমার হাতটা কাটবেন না। এই হাত দিয়ে আমি কাজ করে খাব।" তাকে অজ্ঞান করে তার হাত কেটেই তাকে উদ্ধার করতে হল। আরেকজন শ্রমিক, জালাল, উদ্ধারের পর তার হাত-পা কেটে ফেলতে হল।
একটা নীচু ডোবা জমিতে চারতলা বিল্ডিং করার অনুমতি দিয়েছিল রাজউক। ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের নাকের ডগায় সেটি ৯ তলা হয়ে গেল। ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের অনুমতি নিয়ে সেখানে গার্মেন্টস হল। ওই গার্মেন্টসের মালিকের নাম শাহরিয়ার সাঈদ। তিনি নাকি কোন এমপি/মন্ত্রীর শালা না দুলাভাই। তাকে আর খুঁজেও পাওয়া গেল না। ঘটনার পর ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড তরিঘড়ি করে এ রকম অনুনোমোদিত কয়েকটি বহুতল ভবনের ভাঙার কাজ শুরু করল। শাহরিয়ার সাঈদ আজ পর্যন্ত ধরা পড়েনি। ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের যে কর্তাব্যক্তিরা এ অবৈধ অনুমোদন দিয়েছিলেন তাদের কারো কোনো ধরনের সাজা হয়েছে কিনা জানা যায়নি।
অনেকেরই হয়ত মনে পড়বে এ ঘটনাটি। কিন্তু আমরা মনে করতে চাই না। এবং আমাদের ভুলিয়ে দিতেও অনেকে নানা প্রয়াস চালাচ্ছেন। একজন শ্রমিকের জীবনের আর দাম কতটুকু? ২০০৭ সালের ডিসেম্বর মাসের ৮ তারিখ র্যাংগস ভবন ধসে পড়ে অন্তত ৪০ জন নির্মাণ শ্রমিক নিহত হওয়ার পর সরকার দাবি করল মারা গেছে মাত্র্র ৯/১০ জন। ৩০ জন শ্রমিকের লাশ দিনের পর দিন সেখানে ঝুলেছে। ওদের মৃত্যুর জন্য দায়ী কারো বিচার হয়েছে বলে শোনা যায়নি।
আমরা কী মনে রাখি? কাদের মনে রাখি? কেন মনে রাখি? এ রাষ্ট্র কাদের মনে রাখে? কাদের জন্য শোক পালন করে? কালো পতাকা ওড়ায়?
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই এপ্রিল, ২০০৯ রাত ৩:৩৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


