somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অবিস্মরণীয় চট্টগ্রাম যুববিদ্রোহ এবং মহানায়ক মাস্টারদা সূর্যসেন (৭)

২৮ শে এপ্রিল, ২০০৯ রাত ২:৩৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পর্ব - ৭
জেলে বন্দি বিপ্লবীদের মুক্ত করার প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হল। মাস্টারদা এবং তাঁর সহযোগীরা নতুন পরিকল্পনা করতে লাগলেন।

২২ এপ্রিল জালালাবাদ পাহাড়ের যুদ্ধে শহীদ বিপ্লবীগণ
(ছবি - ১) কিশোর হরিগোপাল বল (টেগরা) এবং মতি কানুনগো

(ছবি -২) নরেশ রায়, ত্রিপুরা সেন, বিধু ভট্টাচার্য

(ছবি -৩) প্রভাস বল, শশাঙ্ক দত্ত, নির্মল লালা

(ছবি - ৪) জিতেন দাশ, মধু দত্ত, পুলিনবিকাশ ঘোষ

১৯৩২ সালের ১৩ জুন। পটিয়ার ধলঘাটে সাবিত্রী দেবীর বাড়িতে বিপ্লবীরা মিলিত হলেন এক গোপন বৈঠকে। সেখানে আচম্বিতে হানা দিল ক্যাপ্টেন ক্যামেরনের নেতৃত্বে একদল ইংরেজ সিপাহী। তারা বাড়িটি ঘিরে ফেলল। ব্রিটিশ সৈনদের ঠেকিয়ে রাখার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে শহীদ হলেন নির্মল সেন ও অপূর্ব সেন (ভোলা)। ক্যাপ্টেন ক্যামেরনও নিহত হলেন বিপ্লবীদের হাতে।
এরপর মাস্টারদা পরিকল্পনা করলেন চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে অবস্থিত ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমণের। এ অভিযানের দায়িত্ব দেওয়া হল প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারকে। ১৯৩২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে আক্রমণ করা হল ইউরোপীয়ান ক্লাব। সফল আক্রমণ শেষে ফেরার পথে এক ইংরেজ অফিসারের গুলিতে প্রীতিলতা আহত হলেন। ধরা না দেবার প্রত্যয়ে সঙ্গে রাখা সায়ানাইড বিষ পান করে তিনি আত্মাহুতি দিলেন। ভারতের মুক্তিসংগ্রামের প্রথম নারী শহীদের নাম প্রীতিলতা।
যুববিদ্রোহের পর ব্রিটিশ সরকার মাস্টারদার মাথার দাম ঘোষণা করেছিল ১০ হাজার টাকা। ধলঘাটের যুদ্ধের পর তাঁর মাথার দাম বাড়িয়ে দ্বিগুণ করা হয়। ওই সময়টাতে পুলিশী তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই মাস্টারদাকে চট্টগ্রাম থেকে অন্যত্র চলে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু মাস্টারদা ছিলেন অনঢ়; বিপ্লবী আন্দোলনকে সংগঠিত করার জন্য তিনি চট্টগ্রামেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ওই সময় তিনটি বছর তিনি চট্টগ্রামের আশেপাশের বিভিন্ন গ্রামে আত্মগোপন করে থেকেছেন। তাঁকে ধরতে বিভিন্ন সময় পুলিশ ও সেনাবাহিনী সে-সব গ্রামে একের পর এক অভিযান চালিয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই মাস্টারদা উপস্থিত বুদ্ধি, কৌশল ও সাহসের সাথে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। কয়েকবার তো মাস্টারদা নিশ্চিত গ্রেফতারের হাত এড়িয়ে পালাতে সক্ষম হয়েছিলেন। এ সম্পর্কে তাঁর নামে চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষের মধ্যে বহু কৌতুকপ্রদ গল্প এবং জনশ্রুতি প্রচলিত ছিল।
প্রীতিলতার আত্মদানের ৪ মাস পর মাস্টারদা গ্রেফতার হলেন। ১৯৩৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম থেকে ১০ মাইল দূরে পটিয়া থানার গৈরিলা গ্রামের ক্ষীরোদপ্রভা বিশ্বাসের বাড়িতে তিনি আত্মগোপন করে ছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ব্রজেন সেন, কল্পনা দত্ত ও মনি দত্ত। নেত্র সেন নামের এক বিশ্বাসঘাতক এ খবর পৌঁছে দিল পুলিশের কাছে। খবর পেয়ে পুলিশ সামরিক সেনাসহ বাড়িটি ঘিরে ফেলে। সেখান থেকে পালাতে গিয়ে ছোট-খাট এক লড়াই চালিয়ে অবশেষে গ্রেফতার হন মাস্টারদা ও ব্রজেন সেন। কল্পনা দত্ত ও মনি দত্ত পুলিশের বেষ্টনী ভেদ করে পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেন।
গ্রেফতারের পর মাস্টারদা ও ব্রজেন সেনের ওপর চালানো হয় বর্বর অত্যাচার। হাত-পা শিকলে বেঁধে মাস্টারদাকে নিয়ে যাওয়া হয় চট্টগ্রামে। ২০ ফেব্রুয়ারি তাঁদের জেলে পাঠানো হল। ওদিকে তারকেশ্বর দস্তিদার, কল্পনা দত্ত এবং শচীন্দ্র দাস প্রমুখ ১৯ মে তারিখে গ্রেফতার হলেন আনোয়ারা থানার গহিরা গ্রামের পূর্ণ তালুকদারের বাড়ি থেকে। এ সময় বিপ্লবীদের সঙ্গে ব্রিটিশ সেনাদের সংঘর্ষে বিপ্লবী মনোরঞ্জন দাশগুপ্ত এবং গৃহস্বামী পূর্ণ তালুকদার শহীদ হলেন।
মাস্টারদা সূর্যসেন, তারকেশ্বর দস্তিদার এবং কল্পনা দত্তের বিচারের উদ্দেশ্যে তিন সদস্যের বিচারকের সমন্বয়ে এক বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসকরা প্রহসনের বিচার সাজিয়ে মাস্টারদা ও তারকেশ্বর দস্তিদারের ফাঁসির হুকুম জারি করে। কল্পনা দত্ত-কে দেওয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। ফাঁসির সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি দিবাগত রাতে। সে রাতেই মহাপ্রাণ বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্যসেন এবং তাঁর সহকর্মী তারকেশ্বর দস্তিদার নিঃশঙ্কচিত্তে ব্রিটিশের ফাঁসির রজ্জুতে জীবন বিসর্জন দিলেন। যদিও অনেকেরই ধারণা, পুলিশী অত্যাচারেই তাঁদের মৃত্যু হয়েছিল। গ্রেফতারের পর থেকে ফাঁসি কার্যকর করার দিন পর্যন্ত এক বছর সময় ধরে তাঁদের ওপর চালানো হয়েছে নির্মম অত্যাচার। বর্বর সাম্রাজ্যবাদী শক্তি দুই বীরের মৃতদেহকেই ফাঁসিতে ঝুলিয়ে উল্লাস প্রকাশ করে।
ফাঁসির পর মাস্টারদার মৃতদেহ কি করা হয়েছে সে সম্পর্কে সঠিক কোনো জবাব কেউ দিতে পারেনি। কারো কারো ধারণা, 'দি রিনাউন' নামক একটি যুদ্ধ জাহাজে করে তাঁর লাশ বঙ্গোপসাগরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং গভীর সমুদ্রে নিক্ষেপ করা হয়। সূর্যসেনের মৃতদেহকে বাংলার মাটিতে সমাহিত হতে দেওয়ারও সাহস হয়নি সাম্রাজ্যবাদী শক্তির। এখানে বলে রাখা ভাল, মাস্টারদার ফাঁসির দিনেই বিপ্লবীরা আরেকটি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেন। সেটি বিশ্বাসঘাতক নেত্র সেনের।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে এপ্রিল, ২০০৯ রাত ২:৪৩
৮টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×