বতর্মান মহাজোট সরকারের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগের একজন এমপি শাহরিয়ার আলম। তিনি রাজশাহী অঞ্চল থেকে সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি আবার একজন গার্মেন্টস মালিকও বটে। প্যানডোরা সোয়েটার্স লি. নামে তার তিনটি গার্মেন্টস কারখানা আছে গাজীপুরে। একটি বোর্ড বাজার এলাকায়, একটি গাজীপুর চৌরাস্তায় এবং একটি শ্রীপুর উপজেলার গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ী এলাকায়।
তার ওই শ্রীপুরের কারখানাটি ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের মাওনা চৌরাস্তার ৪/৫ কিলোমিটার আগে গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ী এলাকায় মহাসড়কের বাম দিকে ৪০০ গজ ভেতরে। ওই কারখানার একজন নারী শ্রমিক, রুমানা আক্তার, সেখানকার আন্দোলন এবং মালিক-প্রশাসনের ভূমিকা তুলে ধরে একটি লিফলেট প্রকাশ ও প্রচার করেছে।
রুমানা আক্তার গত প্রায় সাড়ে চার মাস কারাভোগের পর মাত্র ১০/১২ দিন আগে জামিনে ছাড়া পেয়েছে। তার বিরুদ্ধে, এবং আরো ১২৭ জন শ্রমিকের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। এছাড়া তাদের বিরুদ্ধে আরো ৪টি ভিন্ন ভিন্ন মামলা দায়ের করা হয়েছে।
এখানে রুমানা আক্তারের বক্তব্য সম্বলিত লিফলেটটি তুলে ধরলাম।
প্যানডোরার শ্রমিকদের ওপর সকল অন্যায় নির্যাতনের প্রতিকার চাই
অধিকার বঞ্চিত সংগ্রামী গার্মেন্টস শ্রমিক ভাই ও বোনেরা, আপনাদের প্রতি রইল আমার সংগ্রামী অভিনন্দন ও রক্তিম শুভেচ্ছা।
প্রিয় ভাই বোনেরা, মালিকদের স্বার্থে প্রতিদিন বায়ারদের কাছে শ্রমিকদের অসংখ্য মিথ্যা কথা বলতে হচ্ছে। যেমন : আমরা প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি পাই, আট ঘণ্টার অতিরিক্ত কাজ করলে দ্বিগুণ মজুরি পাই, সরকার ঘোষিত সকল প্রকার ছুটি সবেতনে পাই, ঘর ভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, যাতায়াত ভাতা পাই এবং আমাদের মালিক আইএলও (ILO) স্বীকৃত সকল সুযোগ সুবিধা শ্রমিকদের প্রদান করে। আমাদের এই মিথ্যা বলার পর মালিকরা কাজের অর্ডার পায়। আর এর পুরস্কার হিসেবে ন্যূনতম অধিকারের কথা বললে সন্ত্রাসী মাস্তান লেলিয়ে দিয়ে শ্রমিকদের উপর চালায় নির্যাতন ও ষড়যন্ত্রমূলক মামলা দিয়ে কারাগারে নিক্ষেপ করে।
সংগ্রামী বন্ধুগণ
গত ২৭ এপ্রিল ২০০৮ বায়ার আসার আগের দিন প্যানডোরা সোয়েটার্সের মালিক জনাব শাহরিয়ার আলম, আমরা সকল অধিকার পাই -- এই মিথ্যা কথাগুলি বলার জন্য শ্রমিকদের এক সভা আহ্বান করে। উক্ত সভায় মালিক পক্ষ থেকে নরমে গরমে শাসানো হয় যাতে এর ব্যতিক্রম না হয়। এই সভায় শ্রমিকদের মধ্যে থেকে আমিসহ আরও কয়েকজন শ্রমিক মালিকের অনুমতি নিয়ে বলি, আপনি যা বলছেন আমরা তো তা বায়ারদের মাসের পর মাস বলেই যাচ্ছি, আপনার কাছে আমরা দুইটি দাবি উত্থাপন করছি যা বাস্তবায়ন করতে আপনার কোনো বাড়তি পয়সা খরচ হবে না। প্রথম দাবি হল, আমরা যারা প্রডাকশনে কাজ করি তাদের জন্য কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্ধারিত যে মজুরি প্রচলিত আছে তার সাথে মাস শেষে আমরা যে মজুরি পাই তার অনেক গরমিল হয়। প্রতিদিন আমরা কত প্রডাকশন দিচ্ছি, মাসের শেষে আমাদের প্রডাকশন কত এবং সেই অনুযায়ী আমাদের মজুরি কত হয় তা মাসিক মজুরি প্রদানের আগের দিন নোটিশ বোর্ডে লাগিয়ে দিতে হবে এবং ভুল হলে সংশোধনের ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের দ্বিতীয় দাবি, আট ঘণ্টার অতিরিক্ত কাজ করাতে হলে বর্তমানে মাস্তানদের দিয়ে টিফিন হিসেবে যে পঁচা রুটি-কলা দেয়া হয় তা বন্ধ করে বাজার দর অনুযায়ী ২৫ টাকা করে দিলে শ্রমিকরা তাদের পচ্ছন্দ অনুযায়ী টিফিন কিনে খাবে।
আমাদের এই বক্তব্যের পর কারখানার মালিক শাহরিয়ার আলম সাহেব বলেন, তোমরা আমার জন্য অনেক করেছো, ২০০৯ সালে আমার জন্য আর কোনো মিথ্যা কথা বলতে হবে না। তোমরা যে ভাবে উৎপাদন করছো তা অব্যাহত রাখো। ২০০৯ সালের প্রথম দিকেই আইএলও স্বীকৃত সকল সুযোগ সুবিধা প্রদান করবো। মালিকের এই আশ্বাস পেয়ে শ্রমিকেরা কারখানার স্থাপিত হওয়ার পর সে বারই সর্বোচ্চ প্রডাকশন দিয়েছে। ২০০৮ সাল শেষ হলো। মালিক রাজশাহী-৬ আসন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে ৪ ফেব্রুয়ারি ’০৯ কারখানায় আসেন। এসেই এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের নিয়ে কারখানায় একটা শোডাউন করলেন। ৫ তারিখে সকাল বেলায় শ্রমিকরা কারখানায় ঢুকতে গিয়ে দেখে অসংখ্য বহিরাগত মাস্তান ও দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। কয়েকজন শ্রমিক ভিতরে প্রবেশ করা মাত্রই তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন বিল, ভাউচার ও সাদা কাগজে সই রেখে তাদেরকে মারধর করে বের করে দেয়া হয়। এতে বাকি শ্রমিকরা হতভম্ব হয়ে যায় এবং তারা আর কারখানায় প্রবেশ করে না।
মালিকের এই বেআইনি কার্যকলাপের বিরুদ্ধে আমরা জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, শিল্পমন্ত্রী, শ্রমমন্ত্রীসহ প্রধানমন্ত্রীকেও অবহিত করি। এ দিকে মালিক কারখানা বন্ধ ঘোষণা করে। সন্ত্রাসীদের দিয়ে শ্রমিকদের মেস ও বাসাবাড়িতে হামলা চালানো হয়। এ বিষয়ে বারবার শ্রমিকদের পক্ষ থেকে পুলিশকে অবহিত করা হয়। মালিকের এ অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে আমরা নিয়মতান্ত্রিকভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছি এবং আমাদের সকল কর্মসূচি সম্পর্কে পুলিশ প্রশাসনকে অবহিত করেছি। আমাদের এই নিয়মতান্ত্রিক ও সুশৃঙ্খল কর্মপদ্ধতি দেখে এলাকার সুধী সমাজ এমনকি প্রশাসনও সাধুবাদ জানিয়েছিল। কর্তৃপক্ষ কারখানা বন্ধ করার পর থেকে আমরা প্রতিদিনই কারখানার গেটে কাজের জন্য যাই। কারখানা বন্ধ থাকায় আমরা মাঠে ঘণ্টাখানেক অবস্থান নেই, তারপর যার যার বাড়িতে চলে যাই। বেতন না পাওয়া শ্রমিকদের জন্য এলাকাবাসীর সহযোগিতায় কয়েক দিন লঙ্গরখানাও চালানো হয়।
এ সময় অবস্থায় মালিক কারখানা খোলার আশ্বাস দেয়। গত ৭ মার্চ ’০৯ সকালে কারখানার সামনে গেলেই অসংখ্য সন্ত্রাসী আমাদের উপরে হামলা করে। এ সময়ে সন্ত্রাসীরা আমার মাথা, হাত-পা ও পিঠে প্রচণ্ড আঘাত করে মৃত মনে করে আমাকে ফেলে যায়। বিকাল ৫টার দিকে আমার জ্ঞান ফিরলে দেখি আমি হাসপাতালে। ডাক্তার-নার্সদের কাছে জিজ্ঞেস করলে তারা জানায় পুলিশ আমাকে এখানে রেখে গেছে। এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখি আমার অসংখ্য শ্রমিক ভায়েরা রক্তাক্ত অবস্থায় কাতরাচ্ছে। ডাক্তাররা বললেন, আপনাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়ে গেছে, এখন আপনারা বাইরে গিয়ে চিকিৎসা করান। আমরা এখানে এত লেবারের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারবো না। আমি, সোহাগ, আনিস এতই ক্ষত-বিক্ষত ছিলাম যে হাসপাতালের বেড ছেড়ে ওঠার মতো অবস্থা আমাদের ছিল না। রাত ১১টার দিকে বেশ কিছু পুলিশ এসে আমাদের চারজনের বেড ঘিরে ফেলে এবং হাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে বলে, তোমরা মার্ডার কেসের আসামী। পুলিশদের জিজ্ঞেস করলাম কে মার্ডার হয়েছে, কখন মার্ডার হয়েছে? তখন পুলিশ উত্তর দেয়, কে মার্ডার হয়েছে জানি না। তবে মার্ডার হয়েছে ৩টার দিকে। তখনই ডাক্তার, নার্স, বয়-বেয়ারা সবাই বলে, এই মহিলা ভর্তি হয়েছে সকাল দশটায় আর আপনারা রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে হ্যান্ডকাফ পরাচ্ছেন? এ কথা শুনে তখনই পুলিশের সাথে থাকা মালিকের গুন্ডারা বেডের উপরে রাখা চিকিৎসার কাগজপত্র ও হাসপাতালের রেজিস্ট্রি খাতায় ভর্তি হবার সমস্ত ডুকুমেন্ট ছিড়ে ফেলে। গ্রেফতার করার ৪ দিন পরে আমাকেসহ ৫ জনকে কোর্টে চালান করে জেলে পাঠানো হয়।
সংগ্রামী ভাই ও বোনেরা
আমাদের এই সুশৃঙ্খল সংগ্রাম ও শ্রমিক ঐক্যকে বানচাল করার জন্য মালিকপক্ষ একের পর এক চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র করতে থাকে। এই ষড়যন্ত্রের একটা অংশ হচ্ছে সাইফুল হত্যা। সে ২৫/২৬ বছরের যুবক। সে খুন হবার ৫ ঘণ্টা পর তার প্রথম ছেলে সন্তানের জন্ম হয়। সে দেখে যেতে পারেনি নিজের সন্তানের মুখ। কারা এই হত্যাকারী? সাইফুল যেখানে নিহত হয়েছে তা প্যানডোরা গার্মেন্টস থেকে ২ কি.মি. দূরে, ঢাকা-ময়মনসিংহ প্রধান সড়ক থেকে বাম দিকে একটি ভিতরের গলিতে। কারা এই সাইফুলকে হত্যা করেছে? এই হত্যাকাণ্ডের সুযোগ নিয়ে শ্রমিকদের বিরুদ্ধে একের পর এক মিথ্যা মামলা দিয়েছে? হাজার হাজার শ্রমিককে করছে এলাকাছাড়া? আমি মনে করি একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করলে কারা সাইফুলের হত্যাকারী তা বেরিয়ে আসবে।
সম্মানিত এলাকাবাসী
প্যানডোরা সোয়েটার্সের শত শত শ্রমিক আজ মজুরি থেকে বঞ্চিত হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। প্রায় দুই শতাধিক শ্রমিকের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। তাদের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে তাদের বাবা-মাকেও হয়রানি করা হচ্ছে। প্রায় সাড়ে ৪ মাস কারাভোগের পর আমি গত ২৫ জুন এলাকার শ্রমিক কর্মচারীদের আন্দোলনের মুখে এবং আইনজীবীদের সহযোগিতায় কারগার থেকে মুক্তি পেয়েছি। বের হয়ে মনে হচ্ছে আমি কারাগারে ছিলাম, ভালই ছিলাম। আমার হাজার হাজার শ্রমিক ভাইদের ঘরবাড়ি লুট হয়েছে, পরনের জামা-কাপড় ছাড়া তাদের আর কিছুই নেই। আজ সাড়ে ৪ মাস যাবৎ তারা এক কাপড়ে, ঘর-বাড়ি ছাড়া। একদিকে বেতন না পাওয়া, বহু দিনের জমানো সহায়-সম্পদ লুট, দিনের পর দিন চাকুরি বিহীন অবস্থায় এখানে-সেখানে ভেসে বেড়ানো, আর অন্যদিকে মিথ্যা মামলার হয়রানি -- এই হচ্ছে প্যানডোরার শ্রমিকদের অবস্থা।
তাই আমি দাবি জানাচ্ছি -
* অবিলম্বে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে এবং শ্রমিকদের কাজে পুনর্বহাল করতে হবে।
* শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি পরিশোধ করতে হবে।
* সাইফুলের প্রকৃত হত্যাকারীদের চিহ্নিত করে গ্রেফতার ও বিচার করতে হবে।
* সাইফুলের বাবা-মা, স্ত্রী ও সন্তানের ভরণপোষণ ও শিক্ষার দায়িত্ব নিতে হবে।
* নির্যাতন হয়রানীর পথ বাদ দিয়ে আলোচনা করে সমস্যার সমাধান করতে হবে।
শ্রদ্ধান্তে
রোমানা আক্তার
মেন্ডিং অপারেটর, কার্ড নম্বর - ১২৩
প্যানডোরা সোয়েটার্স
শ্রীপুর, গাজীপুর
তারিখ: ২৯ জুন ২০০৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

