আমার প্রিয় পোস্ট

"আকাশে নক্ষত্র দেখে নক্ষত্রের মতন না হয়ে পারিনি আমি / নদী তীরে বসে তার ঢেউয়ের কাঁপন, / বেজেছে আমার বুকে বেদনার মত / ঘাসের হরিৎ রসে ছেয়েছে হৃদয়"। _আহমদ ছফা

টিপাইবাঁধ নিয়ে বাদ-প্রতিবাদ ও ভারত রাষ্ট্রের চরিত্র বিচার - ৫/শেষ পর্ব

৩০ শে জুলাই, ২০০৯ সন্ধ্যা ৭:৩৮

শেয়ারঃ
0 12 0

প্রথম পর্ব : Click This Link
দ্বিতীয় পর্ব : Click This Link
তৃতীয় পর্ব : Click This Link
চতুর্থ পর্ব : Click This Link

ভারত রাষ্ট্রের চরিত্র বিচার করতে গিয়ে আমি ভারতে পুঁজি গড়ে ওঠার ইতিহাস, তার লগ্নীপুঁজির বা একচেটিয়া পুঁজির স্তরে উপনীত হওয়ার ইতিহাসটুকু সংক্ষেপে হলেও তুলে ধরেছি। এ কথা বলব না যে এ লেখার সীমাবদ্ধতা নেই। অনেক কথা সংক্ষেপে সারতে গিয়ে হয়ত যা বলতে চেয়েছি, পাঠকের কাছে তার উল্টো অর্থ প্রতিভাত হয়েছে। কোনো একটি বিষয়ের তথ্য হয়ত আরো তুলে ধরা প্রয়োজন ছিল, আবার কোথাও হয়ত তথ্যের বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। কিন্তু যাই হোক, আমার ধারণা, আমি কিঞ্চিৎ হলেও সফল হয়েছি।

এখন আমাদের শেষ প্রতিপাদ্য : ভারত কি সাম্রাজ্যবাদী স্তরে উপনীত হয়েছে না হয়নি? নাকি আমাদের প্রপদের বন্ধুদের মতে, ভারত এখনো সম্প্রসারণবাদী (যদিও আমার কাছে সম্প্রসারণবাদী কথাটার মানে পরিস্কার নয়)? নাকি ভারত এমন দেশ যা আমাদের অর্থাৎ বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলোর প্রতিবেশী বলে বন্ধুও হতে পারে? অর্থাৎ ভারত সাম্রাজ্যবাদ হলেও হতে পারে, কিন্তু সে নখদন্তহীন, সুকুমার রায় বর্ণিত সেই সাপ যার শিং-নখ কিছু নেই, কাউকে কাটে না!

১৯১৬ সালে লেনিন তাঁর ‘সাম্রাজ্যবাদ : পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায়’ গ্রন্থে সাম্রাজ্যবাদের পাঁচটি বৈশিষ্ট্য নির্দেশ করেন, যা সাম্রাজ্যবাদকে পুঁজিবাদের পূর্ববর্তী স্তর অর্থাৎ অবাধ প্রতিযোগিতা ও বাজারের আপেক্ষিক ক্রমসম্প্রসারণের যুগ থেকে আলাদা করে। লেনিন বলেন, সাম্রাজ্যবাদের যুগে -
১। উৎপাদন ও পুঁজির কেন্দ্রীভবন এমন একটা উচ্চ স্তরে পৌঁছায় যা একচেটিয়ার জন্ম দেয় এবং একচেটিয়া পুঁজি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নির্ধারক ভূমিকা গ্রহণ করে।
২। ব্যাংক পুঁজি ও শিল্পপুঁজির মিলনের মধ্য দিয়ে লগ্নীপুঁজির জন্ম হয়, যার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে ধনকুবের গোষ্ঠী।
৩। পণ্য-রপ্তানির থেকে পৃথক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন পুঁজি-রপ্তানি অতিমাত্রায় গুরুত্ব নিয়ে দেখা দেয়।
৪। একচেটিয়া গোষ্ঠীর আন্তর্জাতিক এসোসিয়েশন গড়ে ওঠে, যারা বিশ্বকে নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেয়।
৫। বৃহৎ পুঁজিগোষ্ঠীগুলি গোটা দুনিয়াকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে দখল করে।

এই পুসিত্মকাতেই লেনিন পুঁজিবাদের বিকাশের স্তরগুলি ভেঙে ভেঙে দেখান যে -
(১) ১৮৬০-৭০ সালে অবাধ প্রতিযোগিতা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায় এবং একচেটিয়া পুঁজি ভ্রূণাকারে জন্ম নেয়।
(২) ১৮৭৩-এর পুঁজিবাদের সঙ্কটের পর, দীর্ঘ সময় ধরে একচেটিয়া জোট (কার্টেল) গড়ে উঠলেও তা ছিল খুবই নগণ্য। সেগুলির স্থায়িত্ব ছিল না এবং ভাঙাগড়ার পর্যায় চলছিল।
(৩) উনিশ শতকের শেষদিকের তেজিভাব শেষ হওয়ার পর ১৯০০-১৯০৩ এর তীব্র মন্দার সময়েই একচেটিয়া জোটগুলি গোটা অর্থনীতির অন্যতম সত্মম্ভে পরিণত হয়। পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদী স্তরে প্রবেশ করে।

বিশ্বজুড়ে পুঁজিবাদ যখন সাম্রাজ্যবাদের স্তরে প্রবেশ করে, সেই সময় ভারতে পুঁজিবাদ মাথা তুলে দাঁড়াতে শুরু করে। ফলে, খুব স্বাভাবিকভাবেই সে বিশ্বসাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার বড় মোড়লদের অধীনে, তাদের ছোট শরিক হয়েই চলেছে। কিন্তু যতই দিন গিয়েছে, সাম্রাজ্যবাদীদের নিজেদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব, খেয়োখেয়ী, টানাপোড়েনে কেউ এগিয়েছে, কেউ পিছিয়েছে। এক্ষেত্রে ভারত এগিয়েছে। এর একটা বড় কারণ ছিল তার নিজের দেশের বিশাল বাজার।

১৯৯১ সালে পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বে যে মুক্তবাজার নীতি গ্রহণ করা হয়, তা ভারতের জন্য আশীর্বাদ হয়ে আসে। এ তথ্যও আমি আগে উল্লেখ করেছি যে ওই সময়টাতে বিদেশের মাটিতে ভারতীয় শিল্প-প্রতিষ্ঠান বা উদ্যোগের সংখ্যা দাঁড়ায় ৬০০টিতে যার মধ্যে ৩৪৫টি গড়ে উঠেছে ১৯৯১-৯৩ এ তিন বছরে, যার মূল্যমান ১১.৬৫ বিলিয়ন রুপি। এর পর থেকে ভারতীয় পুঁজিপতিদের আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। এখন বিশ্বের ধনীদের তালিকায় প্রথম দশজনের মধ্যে ভারতীয়দের নাম পাওয়া যায়।
২০০৯ সালে এসে আমরা যখন ভারতের পুঁজির চরিত্র এবং রাষ্ট্রচরিত্র বিচার করছি, তখন উইকিপিডিয়াতে বলা হচ্ছে, "The economy of India is the fourth largest in the world by GDP measured on a purchasing power parity (PPP) basis[5] and the twelfth largest in the world by market exchange rates." শুধু তাই নয়, বিশ্লেষকদের মতে, "In 2009, India had prominently established itself as the world's second-fastest growing major economy. According to one estimate, India is expected to overtake China as the world's fastest growing major economy in 2010."
দেখুন : http://en.wikipedia.org/wiki/Economy_of_India

ভারতের পুঁজি খাটছে বিশ্বের প্রায় ৭০টি দেশে। এবং এ পুঁজি শুধু পণ্য-রপ্তানি নয়, লেনিন বর্ণিত পৃথক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন পুঁজি-রপ্তানি (প্রযুক্তি, পরামর্শক, নো-হাউ ইত্যাদি, এ বিষয়টিও গর্ব পর্বে নাগেশকুমারের লেখার মাধ্যমে তুলে ধরেছি) অতিমাত্রায় গুরুত্ব নিয়ে দেখা দেয়। আগস্ট ১৯৯১ থেকে হিসাব ধরে এপ্রিল ২০০৯ পর্যন্ত ভারতের ক্রমবর্ধমান এফডিআই-এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ লক্ষ ৬৫ হাজার ৩৫৫ কোটি রুপি।
তথ্যসূত্র : Click This Link

এতো গেল ভারতীয় পুঁজির একচেটিয়া হয়ে ওঠার ইতিহাস যা ভারত রাষ্ট্রটিকে সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের স্তরে উন্নীত করেছে। ভারত তার দেশের অভ্যন্তরে যে নীতি নিয়ে চলছে, সেখানকার জনগণকে যে শোষণ-নিপীড়নের মধ্যে ফেলেছে সেটা এই একচেটিয়া পুঁজিরই স্বার্থে, ওখানকার ধনকুবের গোষ্ঠীর স্বার্থে। ওই একই নিপীড়ন এবং আগ্রাসনের শিকার হচ্ছে আশেপাশের দেশের মানুষ।
১৯৭১ সালে ভারত যখন বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা করছে, তখনও তার পেছনে কাজ করছে তার সাম্রাজ্যবাদী দূরভিসন্ধী। ভারতের জনগণ বিশেষত পশ্চিম বাংলার জনগণও বাংলাদেশর মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা করেছে, কিন্তু উভয়ের মধ্যে অবশ্যই প্রভেদ ছিল।
প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে ভারতের আগ্রাসী ভূমিকার কয়েকটি নজির টেনেই আমি আপাতত আমার লেখা শেষ করব।
সিকিম ছিল একটি স্বাধীন দেশ, ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত। দেশটি 'ল্যান্ডলক' হওয়ায় অর্থাৎ চর্তুদিকে ভূমি বা অন্যদেশ পরিবেষ্টিত হওয়ায় নানা কারণে দেশটি ছিল ভারতের ওপর নির্ভরশীল। ১৯৭৬ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী দেশে জরুরি অবস্থার সুযোগ নিয়ে সংসদে প্রস্তাব উত্থাপন করে সিকিম-কে ভারতের দখলে নিয়ে নেয়। ১৯৮৮ সালের অক্টোবরে এক অভ্যুত্থানে মালদ্বীপের প্রসিডেন্ট মামুন আব্দুল গাইয়ুম ক্ষমতাচ্যুত হলে ভারত ছত্রিসেনা পাঠিয়ে মামুনকে পুনরায় ক্ষমতায় বসিয়ে দিয়ে আসে। শ্রীলঙ্কার জাতি-সমস্যাকে ব্যবহার করেও ভারত দেশটির ওপর আধিপত্য কায়েম করে রেখেছে। ১৯৮৭ সালের জুনে তামিলদের ওপর শ্রীলঙ্কান সরকারের নির্যাতন-নিপীড়নের পরিপ্রেক্ষিতে মানবিক সাহায্যের ধুয়া তুলে শ্রীলঙ্কার আকাশ-সীমা লঙ্ঘন করে জাফনাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ত্রাণ নিক্ষেপ করে। এবং তারপর শান্তি রক্ষার নামে সেখানে সৈন্য প্রেরণ করে। শ্রীলঙ্কান সরকারকে বাধ্য করে একটা চুক্তিতে উপনীত হতে। ১৯৮৭ সালের ২৯ জুলাই তামিল বিদ্রোহ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে ভারত-শ্রীলঙ্কার চুক্তির আড়ালে মূলত একটি গোপন সমঝোতায় উপনীত হয় যার আসল লক্ষ্য ছিল ভারত মহাসাগরে এবং এ অঞ্চলে মার্কিন বা অন্য কোনো পরাশক্তির অনুপ্রেবশ রোধ করা। কারণ ওই সমঝোতায় বলা হয়েছিল --
(১) ভারতের জন্য ক্ষতিকর বিবেচিত হলে অন্য কোনো রাষ্ট্রকে শ্রীলঙ্কার ত্রিঙ্কোমালি বা অন্য কোনো বন্দর সামরিক কাজে ব্যবহার করতে দেয়া হবে না।
(২) সামরিক বা গুপ্তচরবৃত্তির কাজে ব্যবহৃত হতে পারে, ভারতীয়দের এমন আশঙ্কার ভিত্তিতে, একটি বিদেশী রেডিও কর্পোরেশনকে প্রচারকেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি দিয়ে শ্রীলঙ্কা সরকার যে চুক্তি করেছিল, সেটি পুনর্বিবেচনা করা।
(৩) পাকিস্তান, ইসরায়েল, ব্রিটেন ও আমেরিকার সামরিক বা গোয়েন্দা বাহিনীর লোকেরা শ্রীলঙ্কায় আছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে ভারত সরকারের সঙ্গে একটি যৌথ 'কনসালটেনটিভ মেশিনারি' গঠন করা এবং শ্রীলঙ্কার যাবতীয় সামরিক প্রয়োজন -- সৈন্যবাহিনীর অস্ত্রশস্ত্র, প্রশিক্ষণ প্রভৃতি সবই ভারত সরকারের কাছ থেকে নেওয়া।
নেপালের সঙ্গে আচরণেও ভারতের এ সাম্রাজ্যবাদী-আধিপত্যকামী চরিত্র ফুটে ওঠে। ১৯৫০ সালে নেপাল-ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত 'শান্তি ও মৈত্রী' চুক্তির আওতায় ১৯৬৫ সালে ভারত নেপালকে আরো একটি চুক্তি করতে বাধ্য করে। সেখানে বলা হয়, নেপালের সেনাবাহিনীর জন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্র ভারতে থেকে কিনতে হবে। আর যদি কোনো অস্ত্র ভারত সরবরাহ করতে না পারে, তাহলে তা আমেরিকা-ব্রিটেন থেকে কেনা যাবে কিন্তু তা স্থলপথে ভারতের ভিতর দিয়ে নেপালে যেতে হবে। ভারত নেপালের সেনাবাহিনীর সদস্যদের ট্রেনিং দেবে, এমনকি তাদের পোষাক-পরিচ্ছদও সরবরাহ করবে। তথাকথিত এ 'শান্তি-মৈত্রী' চুক্তি লঙ্ঘন করে ১৯৮৯ সালে নেপাল চীন থেকে একটি এন্টি এয়ারক্রাফট গান কেনে এবং তিব্বতের মধ্য দিয়ে সড়ক পথে নেপালে নিয়ে আসে। এর বিনিময়ে শাস্তি হিসাবে ভারত ১৯৮৯ সালের ২৩ মার্চ ভারত-নেপালের ট্রানজিট চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে ভারত ট্রানজিট পয়েন্ট বন্ধ করে দিয়ে নেপালের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে। নেপাল বহুদিন ধরে বাংলাদেশের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ এবং মংলা বন্দর ব্যবহার করার জন্য ভারতের কাছে ১৮ কিমি ট্রানজিট চাইছে, আজ পর্যন্ত পায়নি। আর এসব টানাপোড়েনে নেপালি বুর্জোয়াদের ভারত ঘনিষ্ঠ অংশের সহযোগিতায় ভারত-বিরোধী হিসাবে খ্যাত রাজা জ্ঞানেন্দ্র খুন হয়ে গেছেন।
স্থানীয় মোড়ল হিসাবে ভারতের ভূমিকা মার্কিন-ব্রিটিশ সাম্রজ্যবাদী শক্তি আরো আগেই স্বীকার করে নিয়েছে :
“The US governments approval of Indian action in Sri Lanka & Maldives, said Dr. William Richer, Head of the Dept of Political Science, Kansas State University, in Culcutta on Monday, is recognition of regional role that Washington expect New Delhi to play in the Indian sub-continent and its neighborhood. After all, India is the strongest & largest military power in the region. The Indian action in the Maldives, according to Dr. Richter, has reinforced its image of being the policeman of the region.” (The Statesman, 22.11.88)
এমনকি প্রতিবেশী দেশগুলোও এ সম্পর্কে সচেতন : ১৯৮৮ সালে শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট জয়বর্ধনে রোমের দৈনিক 'লা রিপাবলিকা'তে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলছেন, "আমি ভারতকে আঞ্চলিক বৃহৎ শক্তি মনে করি। এটা অস্বীকার্য সত্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন সমেত বিশ্বের সকল বৃহৎ শক্তিই এটা স্বীকার করেছে। ... আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, ভারতের সাথে পরামর্শ না করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আমাদের সাহায্য করতে কোনো উদ্যোগই নেবে না। (আনন্দবাজার, ১৩.০৮.৮৭)
আর আজকের পরিস্থিতি তো খোলা চোখেই দেখা যাচ্ছে। ভারতের মূল্য বিশ্বসাম্রাজ্যবাদের মোড়ল মার্কিনীদের কাছে বহু গুণ বেড়ে গেছে। (কেন সে আলোচনায় এখন আর খুব বেশি ঢুকব না।) ভারতের সাথে পরমাণু চুক্তি করার জন্য আমেরিকা তার নিজ দেশের আইন পর্যন্ত পাল্টে ফেলছে। দু'দেশের মিলিত সামরিক মহড়া হচ্ছে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সামরিক অক্ষ বলা হচ্ছে 'মার্কিন-ইসরায়েল-ভারত' জোটকে।
বাংলাদেশের সাথে ভারতের আচরণ নিয়ে আলাদা একটা লেখা হওয়া উচিত। ভবিষ্যতে সে চেষ্টা অবশ্যই করব। শুধু কয়েকটি বিষয় উল্লখ করে লেখাটি শেষ করব। মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার মুহূর্তে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী বাংলাদেশের কাছে আত্মসমর্পন না করে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পন, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও ভারতীয় সেনাদের বাংলাদেশের বুকে অবস্থান এবং লুটপাট, বাংলাদেশের সাথে চুক্তি যাতে ভারতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত করা, ফারাক্কা সমস্যা, তিনবিঘা সমস্যা, ছিটমহল বিনিময়, মুহুরীর চর দক্ষিণ তালপট্টি দখল, সমুদ্রসীমা নির্ধারণসহ ছোট-বড় নানা ঘটনায় ভারত তার 'দাদাগিরি' ফলিয়ে চলেছে। এ দাদাগিরি নিছক বড়ভাই সুলভ আচরণ নয়, সাম্রাজ্যবাদের আধিপত্যকামী চরিত্র।
আমাদের শাসকরা কি এ সম্পর্কে জানেন না? তারাও জানেন। কিন্তু এটাকে দেশবাসীর সামনে তুলে ধরে সচেতন করে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী চেতনার বিকাশে কাজে লাগানোর পরিবর্তে সকলেই সুবিধা নিতে সচেষ্ট। কেউ মুখে ভারত-বিরোধিতা করছেন, কেউ ভারত-বাংলাদেশ বন্ধু বলে গলায় মধুর সুর ফুটিয়ে তুলে চলেছেন। যেমন, জিয়াউর রহমান ভারত-বিরোধিতার জিকির তুলেছেন, কিন্তু তলে তলে ভারতের স্বার্থেই 'সার্ক' গঠনের কাজ করেছেন। এরশাদও তাই। জামাত ভারত-বিরোধিতার কথা বলে, আর ভারতের সবচেয়ে প্রতিক্রিয়াশীর দল বিজেপির সঙ্গে গিয়ে বৈঠক করে (২১ মে ১৯৯৩, তথ্য ২৫ মে আনন্দ বাজার)।
তাহলে জনগণের ভরসা কোথায়? একমাত্র ভরসা বামপন্থী শক্তি। বামপন্থী শক্তি নিজেদের বিভ্রান্তি-বিচ্যুতি কাটিয়ে যত সংহত হবে, ভারত-বাংলাদেশের গণতন্ত্রমনা, শান্তিপ্রিয় জনগণের ঐক্য যখন গড়ে ওঠবে -- ভারতের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনকে মোকাবেলা করা তখনই সম্ভব হবে। জনগণের বিজয় সুনিশ্চিত, জনগণের বিপ্লবী সংগ্রামের বিজয় অনিবার্য।ভারত রাষ্ট্রের চরিত্র বিচার করতে গিয়ে আমি ভারতে পুঁজি গড়ে ওঠার ইতিহাস, তার লগ্নীপুঁজির বা একচেটিয়া পুঁজির স্তরে উপনীত হওয়ার ইতিহাসটুকু সংক্ষেপে হলেও তুলে ধরেছি। এ কথা বলব না যে এ লেখার সীমাবদ্ধতা নেই। অনেক কথা সংক্ষেপে সারতে গিয়ে হয়ত যা বলতে চেয়েছি, পাঠকের কাছে তার উল্টো অর্থ প্রতিভাত হয়েছে। কোনো একটি বিষয়ের তথ্য হয়ত আরো তুলে ধরা প্রয়োজন ছিল, আবার কোথাও হয়ত তথ্যের বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। কিন্তু যাই হোক, আমার ধারণা, আমি কিঞ্চিৎ হলেও সফল হয়েছি।

এখন আমাদের শেষ প্রতিপাদ্য : ভারত কি সাম্রাজ্যবাদী স্তরে উপনীত হয়েছে না হয়নি? নাকি আমাদের প্রপদের বন্ধুদের মতে, ভারত এখনো সম্প্রসারণবাদী (যদিও আমার কাছে সম্প্রসারণবাদী কথাটার মানে পরিস্কার নয়)? নাকি ভারত এমন দেশ যা আমাদের অর্থাৎ বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলোর প্রতিবেশী বলে বন্ধুও হতে পারে? অর্থাৎ ভারত সাম্রাজ্যবাদ হলেও হতে পারে, কিন্তু সে নখদন্তহীন, সুকুমার রায় বর্ণিত সেই সাপ যার শিং-নখ কিছু নেই, কাউকে কাটে না!

১৯১৬ সালে লেনিন তাঁর ‘সাম্রাজ্যবাদ : পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায়’ গ্রন্থে সাম্রাজ্যবাদের পাঁচটি বৈশিষ্ট্য নির্দেশ করেন, যা সাম্রাজ্যবাদকে পুঁজিবাদের পূর্ববর্তী স্তর অর্থাৎ অবাধ প্রতিযোগিতা ও বাজারের আপেক্ষিক ক্রমসম্প্রসারণের যুগ থেকে আলাদা করে। লেনিন বলেন, সাম্রাজ্যবাদের যুগে -
১। উৎপাদন ও পুঁজির কেন্দ্রীভবন এমন একটা উচ্চ স্তরে পৌঁছায় যা একচেটিয়ার জন্ম দেয় এবং একচেটিয়া পুঁজি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নির্ধারক ভূমিকা গ্রহণ করে।
২। ব্যাংক পুঁজি ও শিল্পপুঁজির মিলনের মধ্য দিয়ে লগ্নীপুঁজির জন্ম হয়, যার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে ধনকুবের গোষ্ঠী।
৩। পণ্য-রপ্তানির থেকে পৃথক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন পুঁজি-রপ্তানি অতিমাত্রায় গুরুত্ব নিয়ে দেখা দেয়।
৪। একচেটিয়া গোষ্ঠীর আন্তর্জাতিক এসোসিয়েশন গড়ে ওঠে, যারা বিশ্বকে নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেয়।
৫। বৃহৎ পুঁজিগোষ্ঠীগুলি গোটা দুনিয়াকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে দখল করে।

এই পুসিত্মকাতেই লেনিন পুঁজিবাদের বিকাশের স্তরগুলি ভেঙে ভেঙে দেখান যে -
(১) ১৮৬০-৭০ সালে অবাধ প্রতিযোগিতা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায় এবং একচেটিয়া পুঁজি ভ্রূণাকারে জন্ম নেয়।
(২) ১৮৭৩-এর পুঁজিবাদের সঙ্কটের পর, দীর্ঘ সময় ধরে একচেটিয়া জোট (কার্টেল) গড়ে উঠলেও তা ছিল খুবই নগণ্য। সেগুলির স্থায়িত্ব ছিল না এবং ভাঙাগড়ার পর্যায় চলছিল।
(৩) উনিশ শতকের শেষদিকের তেজিভাব শেষ হওয়ার পর ১৯০০-১৯০৩ এর তীব্র মন্দার সময়েই একচেটিয়া জোটগুলি গোটা অর্থনীতির অন্যতম সত্মম্ভে পরিণত হয়। পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদী স্তরে প্রবেশ করে।

বিশ্বজুড়ে পুঁজিবাদ যখন সাম্রাজ্যবাদের স্তরে প্রবেশ করে, সেই সময় ভারতে পুঁজিবাদ মাথা তুলে দাঁড়াতে শুরু করে। ফলে, খুব স্বাভাবিকভাবেই সে বিশ্বসাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার বড় মোড়লদের অধীনে, তাদের ছোট শরিক হয়েই চলেছে। কিন্তু যতই দিন গিয়েছে, সাম্রাজ্যবাদীদের নিজেদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব, খেয়োখেয়ী, টানাপোড়েনে কেউ এগিয়েছে, কেউ পিছিয়েছে। এক্ষেত্রে ভারত এগিয়েছে। এর একটা বড় কারণ ছিল তার নিজের দেশের বিশাল বাজার।

১৯৯১ সালে পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বে যে মুক্তবাজার নীতি গ্রহণ করা হয়, তা ভারতের জন্য আশীর্বাদ হয়ে আসে। এ তথ্যও আমি আগে উল্লেখ করেছি যে ওই সময়টাতে বিদেশের মাটিতে ভারতীয় শিল্প-প্রতিষ্ঠান বা উদ্যোগের সংখ্যা দাঁড়ায় ৬০০টিতে যার মধ্যে ৩৪৫টি গড়ে উঠেছে ১৯৯১-৯৩ এ তিন বছরে, যার মূল্যমান ১১.৬৫ বিলিয়ন রুপি। এর পর থেকে ভারতীয় পুঁজিপতিদের আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। এখন বিশ্বের ধনীদের তালিকায় প্রথম দশজনের মধ্যে ভারতীয়দের নাম পাওয়া যায়।
২০০৯ সালে এসে আমরা যখন ভারতের পুঁজির চরিত্র এবং রাষ্ট্রচরিত্র বিচার করছি, তখন উইকিপিডিয়াতে বলা হচ্ছে, "The economy of India is the fourth largest in the world by GDP measured on a purchasing power parity (PPP) basis[5] and the twelfth largest in the world by market exchange rates." শুধু তাই নয়, বিশ্লেষকদের মতে, "In 2009, India had prominently established itself as the world's second-fastest growing major economy. According to one estimate, India is expected to overtake China as the world's fastest growing major economy in 2010."
দেখুন : http://en.wikipedia.org/wiki/Economy_of_India

ভারতের পুঁজি খাটছে বিশ্বের প্রায় ৭০টি দেশে। এবং এ পুঁজি শুধু পণ্য-রপ্তানি নয়, লেনিন বর্ণিত পৃথক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন পুঁজি-রপ্তানি (প্রযুক্তি, পরামর্শক, নো-হাউ ইত্যাদি, এ বিষয়টিও গর্ব পর্বে নাগেশকুমারের লেখার মাধ্যমে তুলে ধরেছি) অতিমাত্রায় গুরুত্ব নিয়ে দেখা দেয়। আগস্ট ১৯৯১ থেকে হিসাব ধরে এপ্রিল ২০০৯ পর্যন্ত ভারতের ক্রমবর্ধমান এফডিআই-এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ লক্ষ ৬৫ হাজার ৩৫৫ কোটি রুপি।
তথ্যসূত্র : Click This Link

এতো গেল ভারতীয় পুঁজির একচেটিয়া হয়ে ওঠার ইতিহাস যা ভারত রাষ্ট্রটিকে সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের স্তরে উন্নীত করেছে। ভারত তার দেশের অভ্যন্তরে যে নীতি নিয়ে চলছে, সেখানকার জনগণকে যে শোষণ-নিপীড়নের মধ্যে ফেলেছে সেটা এই একচেটিয়া পুঁজিরই স্বার্থে, ওখানকার ধনকুবের গোষ্ঠীর স্বার্থে। ওই একই নিপীড়ন এবং আগ্রাসনের শিকার হচ্ছে আশেপাশের দেশের মানুষ।
১৯৭১ সালে ভারত যখন বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা করছে, তখনও তার পেছনে কাজ করছে তার সাম্রাজ্যবাদী দূরভিসন্ধী। ভারতের জনগণ বিশেষত পশ্চিম বাংলার জনগণও বাংলাদেশর মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা করেছে, কিন্তু উভয়ের মধ্যে অবশ্যই প্রভেদ ছিল।
প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে ভারতের আগ্রাসী ভূমিকার কয়েকটি নজির টেনেই আমি আপাতত আমার লেখা শেষ করব।
সিকিম ছিল একটি স্বাধীন দেশ, ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত। দেশটি 'ল্যান্ডলক' হওয়ায় অর্থাৎ চর্তুদিকে ভূমি বা অন্যদেশ পরিবেষ্টিত হওয়ায় নানা কারণে দেশটি ছিল ভারতের ওপর নির্ভরশীল। ১৯৭৬ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী দেশে জরুরি অবস্থার সুযোগ নিয়ে সংসদে প্রস্তাব উত্থাপন করে সিকিম-কে ভারতের দখলে নিয়ে নেয়। ১৯৮৮ সালের অক্টোবরে এক অভ্যুত্থানে মালদ্বীপের প্রসিডেন্ট মামুন আব্দুল গাইয়ুম ক্ষমতাচ্যুত হলে ভারত ছত্রিসেনা পাঠিয়ে মামুনকে পুনরায় ক্ষমতায় বসিয়ে দিয়ে আসে। শ্রীলঙ্কার জাতি-সমস্যাকে ব্যবহার করেও ভারত দেশটির ওপর আধিপত্য কায়েম করে রেখেছে। ১৯৮৭ সালের জুনে তামিলদের ওপর শ্রীলঙ্কান সরকারের নির্যাতন-নিপীড়নের পরিপ্রেক্ষিতে মানবিক সাহায্যের ধুয়া তুলে শ্রীলঙ্কার আকাশ-সীমা লঙ্ঘন করে জাফনাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ত্রাণ নিক্ষেপ করে। এবং তারপর শান্তি রক্ষার নামে সেখানে সৈন্য প্রেরণ করে। শ্রীলঙ্কান সরকারকে বাধ্য করে একটা চুক্তিতে উপনীত হতে। ১৯৮৭ সালের ২৯ জুলাই তামিল বিদ্রোহ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে ভারত-শ্রীলঙ্কার চুক্তির আড়ালে মূলত একটি গোপন সমঝোতায় উপনীত হয় যার আসল লক্ষ্য ছিল ভারত মহাসাগরে এবং এ অঞ্চলে মার্কিন বা অন্য কোনো পরাশক্তির অনুপ্রেবশ রোধ করা। কারণ ওই সমঝোতায় বলা হয়েছিল --
(১) ভারতের জন্য ক্ষতিকর বিবেচিত হলে অন্য কোনো রাষ্ট্রকে শ্রীলঙ্কার ত্রিঙ্কোমালি বা অন্য কোনো বন্দর সামরিক কাজে ব্যবহার করতে দেয়া হবে না।
(২) সামরিক বা গুপ্তচরবৃত্তির কাজে ব্যবহৃত হতে পারে, ভারতীয়দের এমন আশঙ্কার ভিত্তিতে, একটি বিদেশী রেডিও কর্পোরেশনকে প্রচারকেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি দিয়ে শ্রীলঙ্কা সরকার যে চুক্তি করেছিল, সেটি পুনর্বিবেচনা করা।
(৩) পাকিস্তান, ইসরায়েল, ব্রিটেন ও আমেরিকার সামরিক বা গোয়েন্দা বাহিনীর লোকেরা শ্রীলঙ্কায় আছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে ভারত সরকারের সঙ্গে একটি যৌথ 'কনসালটেনটিভ মেশিনারি' গঠন করা এবং শ্রীলঙ্কার যাবতীয় সামরিক প্রয়োজন -- সৈন্যবাহিনীর অস্ত্রশস্ত্র, প্রশিক্ষণ প্রভৃতি সবই ভারত সরকারের কাছ থেকে নেওয়া।
নেপালের সঙ্গে আচরণেও ভারতের এ সাম্রাজ্যবাদী-আধিপত্যকামী চরিত্র ফুটে ওঠে। ১৯৫০ সালে নেপাল-ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত 'শান্তি ও মৈত্রী' চুক্তির আওতায় ১৯৬৫ সালে ভারত নেপালকে আরো একটি চুক্তি করতে বাধ্য করে। সেখানে বলা হয়, নেপালের সেনাবাহিনীর জন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্র ভারতে থেকে কিনতে হবে। আর যদি কোনো অস্ত্র ভারত সরবরাহ করতে না পারে, তাহলে তা আমেরিকা-ব্রিটেন থেকে কেনা যাবে কিন্তু তা স্থলপথে ভারতের ভিতর দিয়ে নেপালে যেতে হবে। ভারত নেপালের সেনাবাহিনীর সদস্যদের ট্রেনিং দেবে, এমনকি তাদের পোষাক-পরিচ্ছদও সরবরাহ করবে। তথাকথিত এ 'শান্তি-মৈত্রী' চুক্তি লঙ্ঘন করে ১৯৮৯ সালে নেপাল চীন থেকে একটি এন্টি এয়ারক্রাফট গান কেনে এবং তিব্বতের মধ্য দিয়ে সড়ক পথে নেপালে নিয়ে আসে। এর বিনিময়ে শাস্তি হিসাবে ভারত ১৯৮৯ সালের ২৩ মার্চ ভারত-নেপালের ট্রানজিট চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে ভারত ট্রানজিট পয়েন্ট বন্ধ করে দিয়ে নেপালের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে। নেপাল বহুদিন ধরে বাংলাদেশের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ এবং মংলা বন্দর ব্যবহার করার জন্য ভারতের কাছে ১৮ কিমি ট্রানজিট চাইছে, আজ পর্যন্ত পায়নি। আর এসব টানাপোড়েনে নেপালি বুর্জোয়াদের ভারত ঘনিষ্ঠ অংশের সহযোগিতায় ভারত-বিরোধী হিসাবে খ্যাত রাজা জ্ঞানেন্দ্র খুন হয়ে গেছেন।
স্থানীয় মোড়ল হিসাবে ভারতের ভূমিকা মার্কিন-ব্রিটিশ সাম্রজ্যবাদী শক্তি আরো আগেই স্বীকার করে নিয়েছে :
“The US governments approval of Indian action in Sri Lanka & Maldives, said Dr. William Richer, Head of the Dept of Political Science, Kansas State University, in Culcutta on Monday, is recognition of regional role that Washington expect New Delhi to play in the Indian sub-continent and its neighborhood. After all, India is the strongest & largest military power in the region. The Indian action in the Maldives, according to Dr. Richter, has reinforced its image of being the policeman of the region.” (The Statesman, 22.11.88)
এমনকি প্রতিবেশী দেশগুলোও এ সম্পর্কে সচেতন : ১৯৮৮ সালে শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট জয়বর্ধনে রোমের দৈনিক 'লা রিপাবলিকা'তে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলছেন, "আমি ভারতকে আঞ্চলিক বৃহৎ শক্তি মনে করি। এটা অস্বীকার্য সত্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন সমেত বিশ্বের সকল বৃহৎ শক্তিই এটা স্বীকার করেছে। ... আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, ভারতের সাথে পরামর্শ না করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আমাদের সাহায্য করতে কোনো উদ্যোগই নেবে না। (আনন্দবাজার, ১৩.০৮.৮৭)
আর আজকের পরিস্থিতি তো খোলা চোখেই দেখা যাচ্ছে। ভারতের মূল্য বিশ্বসাম্রাজ্যবাদের মোড়ল মার্কিনীদের কাছে বহু গুণ বেড়ে গেছে। (কেন সে আলোচনায় এখন আর খুব বেশি ঢুকব না।) ভারতের সাথে পরমাণু চুক্তি করার জন্য আমেরিকা তার নিজ দেশের আইন পর্যন্ত পাল্টে ফেলছে। দু'দেশের মিলিত সামরিক মহড়া হচ্ছে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সামরিক অক্ষ বলা হচ্ছে 'মার্কিন-ইসরায়েল-ভারত' জোটকে।
বাংলাদেশের সাথে ভারতের আচরণ নিয়ে আলাদা একটা লেখা হওয়া উচিত। ভবিষ্যতে সে চেষ্টা অবশ্যই করব। শুধু কয়েকটি বিষয় উল্লখ করে লেখাটি শেষ করব। মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার মুহূর্তে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী বাংলাদেশের কাছে আত্মসমর্পন না করে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পন, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও ভারতীয় সেনাদের বাংলাদেশের বুকে অবস্থান এবং লুটপাট, বাংলাদেশের সাথে চুক্তি যাতে ভারতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত করা, ফারাক্কা সমস্যা, তিনবিঘা সমস্যা, ছিটমহল বিনিময়, মুহুরীর চর দক্ষিণ তালপট্টি দখল, সমুদ্রসীমা নির্ধারণসহ ছোট-বড় নানা ঘটনায় ভারত তার 'দাদাগিরি' ফলিয়ে চলেছে। এ দাদাগিরি নিছক বড়ভাই সুলভ আচরণ নয়, সাম্রাজ্যবাদের আধিপত্যকামী চরিত্র।
আমাদের শাসকরা কি এ সম্পর্কে জানেন না? তারাও জানেন। কিন্তু এটাকে দেশবাসীর সামনে তুলে ধরে সচেতন করে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী চেতনার বিকাশে কাজে লাগানোর পরিবর্তে সকলেই সুবিধা নিতে সচেষ্ট। কেউ মুখে ভারত-বিরোধিতা করছেন, কেউ ভারত-বাংলাদেশ বন্ধু বলে গলায় মধুর সুর ফুটিয়ে তুলে চলেছেন। যেমন, জিয়াউর রহমান ভারত-বিরোধিতার জিকির তুলেছেন, কিন্তু তলে তলে ভারতের স্বার্থেই 'সার্ক' গঠনের কাজ করেছেন। এরশাদও তাই। জামাত ভারত-বিরোধিতার কথা বলে, আর ভারতের সবচেয়ে প্রতিক্রিয়াশীর দল বিজেপির সঙ্গে গিয়ে বৈঠক করে (২১ মে ১৯৯৩, তথ্য ২৫ মে আনন্দ বাজার)।
সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে কোনো মোহ নিয়ে থাকার সুযোগ নেই। সেটা ভারতই হোক আর মার্কিনিই হোক। আর সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন একজন, সাম্রাজ্যবাদ যখন ফুল নিয়ে বন্ধুত্ব দেখাতে আসে তখনও সে তার হীন সাম্রাজ্যবাদী উদ্দেশ্য চরিতর্থ করার জন্যেই আসে।
তাহলে জনগণের ভরসা কোথায়? একমাত্র ভরসা বামপন্থী শক্তি। বামপন্থী শক্তি নিজেদের বিভ্রান্তি-বিচ্যুতি কাটিয়ে যত সংহত হবে, ভারত-বাংলাদেশের গণতন্ত্রমনা, শান্তিপ্রিয় জনগণের ঐক্য যখন গড়ে ওঠবে -- ভারতের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনকে মোকাবেলা করা তখনই সম্ভব হবে। জনগণের বিজয় সুনিশ্চিত, জনগণের বিপ্লবী সংগ্রামের বিজয় অনিবার্য।

 

সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে জুলাই, ২০০৯ সন্ধ্যা ৭:৪৫ | বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...

 

১. ৩০ শে জুলাই, ২০০৯ সন্ধ্যা ৭:৪৭
সাইফ হাসনাত বলেছেন: প্রিয়তে রাখলাম...
পরে পড়ে দেখবো...
৩০ শে জুলাই, ২০০৯ সন্ধ্যা ৭:৫০

লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ। পড়ে মন্তব্য করবেন। যদিও আগামী ৭/৮ দিন আমি ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন থাকব। তবুও আপনার মত জানতে চাই।

২. ৩০ শে জুলাই, ২০০৯ সন্ধ্যা ৭:৪৭
শয়তান বলেছেন: পড়লাম এই কদিন পর্বগুলো। সবচে ভাল হয় সবগুলো মিলিয়ে একটা সামারাইজ পোস্ট দেন যদি ।

অনেক ধন্যবাদ ।
৩০ শে জুলাই, ২০০৯ সন্ধ্যা ৭:৫২

লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ। চেষ্টা করব। কিন্তু আমার আগে চেষ্টা থাকবে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বিষয়ে একটা পোষ্ট দেওয়া।

৩. ৩০ শে জুলাই, ২০০৯ সন্ধ্যা ৭:৫০
সিটিজি৪বিডি বলেছেন: প্রতিবেশী রাষ্ট হিসেবে ভারত আমাদের সাথে ভাল সুবিচার করছেনা। আগামী কি হয় দেখার বিষয়............. আর টিপাই বাধ নিয়ে আলোচলা করতে একটি প্রতিনিধি দল ভারতে গেছে আমার তো মনে হয় না ভারত তাদেরকে গুরত্ব দিবে। ভারত সব সময় তার স্বাথটাই দেখে।
৩০ শে জুলাই, ২০০৯ সন্ধ্যা ৭:৫৩

লেখক বলেছেন: রাষ্ট্র তার চরিত্র অনুযায়ী আচরণ করবে। 'যখন সে ফুল নিয়ে আসে ...
পড়ার জন্য ধন্যবাদ।

৪. ৩০ শে জুলাই, ২০০৯ সন্ধ্যা ৭:৫২
একজন সুখীমানুষ বলেছেন: সবগুলো পর্বকে একত্রে পিডিএফ করে ফেলেন।
৩০ শে জুলাই, ২০০৯ সন্ধ্যা ৭:৫৪

লেখক বলেছেন: সেটা করার আগে আরো কিছু সংশোধন-পরিমার্জন করতে হবে। লেখাটার দু'এক জায়গায় তাড়াহুড়ার ছাপ রয়ে গেছে। কোথাও বক্তব্য স্পষ্ট হয়নি।
পড়ার জন্য ধন্যবাদ।

৫. ৩০ শে জুলাই, ২০০৯ সন্ধ্যা ৭:৫৩
কিরিটি রায় বলেছেন: --------মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার মুহূর্তে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী বাংলাদেশের কাছে আত্মসমর্পন না করে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পন, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও ভারতীয় সেনাদের বাংলাদেশের বুকে অবস্থান এবং লুটপাট, বাংলাদেশের সাথে চুক্তি যাতে ভারতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত করা, ফারাক্কা সমস্যা, তিনবিঘা সমস্যা, ছিটমহল বিনিময়, মুহুরীর চর দক্ষিণ তালপট্টি দখল, সমুদ্রসীমা নির্ধারণসহ ছোট-বড় নানা ঘটনায় ভারত তার 'দাদাগিরি' ফলিয়ে চলেছে। এ দাদাগিরি নিছক বড়ভাই সুলভ আচরণ নয়, সাম্রাজ্যবাদের আধিপত্যকামী চরিত্র।

কিন্তু দু:খজনক হলো স্বাধীনতার চেতনার নাম নিয়ে এক দল ভাদাকার স্ববিরোধিতা করছে আজও। স্বাধীনতার চেতনার কথা বলছে.. আবার ভারতের তাবেদারীতেও জুড়ি নেই...

মুক্তির পথ .. বিশ্বস্ত.. খাটি দেশপ্রমিক সেই নতুন ধারায়..কবে আসবে সেই প্রজন্ম!!!
৩০ শে জুলাই, ২০০৯ সন্ধ্যা ৭:৫৭

লেখক বলেছেন: বামপন্থীদের ওপর শুধু বাংলাদেশ নয় গোটা বিশ্বের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে, এটাই আমার বিশ্বাস, তবে বিশ্বাসটা অন্ধ নয়, যুক্তিসঙ্গত বলেই মনে করি।
আপনাকেও আহ্বান করছি , ... কিরিটি রায়।

০২ রা আগস্ট, ২০০৯ বিকাল ৪:০৩

লেখক বলেছেন: পড়ে জবাব দিবেন তো?

৭. ৩০ শে জুলাই, ২০০৯ রাত ১০:১৭
আবদুল ওয়াহিদ বলেছেন:
বেশ লেগেছে। প্রিয়েতে। আরো লেখা আশা করি।
০২ রা আগস্ট, ২০০৯ বিকাল ৪:০৪

লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ।

৮. ৩১ শে জুলাই, ২০০৯ রাত ১২:৪৬
সালাহ্ উদ্দিন শুভ্র বলেছেন: আপনার প্রচেষ্টর জন্য ধন্যবাদ। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদ-রাষ্ট্র-কোম্পানি-পুঁজি এগুলোকে সংজ্ঞায়িত করার ক্ষেত্রে আরো আলোচনা করা যেত।

পোস্টটি নজরে রইলো।
০২ রা আগস্ট, ২০০৯ বিকাল ৪:১০

লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ শুভ্র, আপনার এ সমালোচনাটি আমাকে অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে দুটো সমস্যা কাজ করেছে। এক , আমাকে খুব দ্রুত লেখাটি শেষ করতে হয়েছে, কারণ আগামী আরো কয়েকদিন আমি ইন্টারনেট থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন থাকব। আর দুই, আমার লেখাটার মূল টার্গেট গ্রুপ হচ্ছেন বামপন্থী বন্ধুরা, যারা এ সংজ্ঞাগুলো জানেন। আমি তাদের সাথেই বিতর্কে লিপ্ত হয়েছি। কিন্তু আমার মাথায় তখন এটা কাজ করেনি যে ব্লগে এমন অনেক পাঠক আছেন যারা সাম্রাজ্যবাদ-রাষ্ট্র-কোম্পানি-পুঁজি এসব সম্পর্কে আমাদের মতো জানা-বোঝা নেই। এটা অবশ্যই আমার ভুল হয়েছে।

৯. ৩১ শে জুলাই, ২০০৯ ভোর ৪:০০
নিকো৮১২৩ বলেছেন: পুরো লেখাটা আর একটু ঘষামাজা করলে একটা চমৎকার বই হতে পারে। ভেবে দেখো। তবে ঘষামাজাটা একটু ভাল মতো করা দরকার।
০২ রা আগস্ট, ২০০৯ বিকাল ৪:১১

লেখক বলেছেন: অবশ্যই, আমি নিজেও লেখাটি নিয়ে খুব সন্তুষ্ট না। তারপরও একটা বিতর্ক শুরু করেছি বলে দ্রুত শেষ করেছি। এটাকে আরো অনেক ঘষা-মাজা করতে হবে, রূপ-লাবণ্যম সংযোজন করতে হবে।

১০. ০৩ রা আগস্ট, ২০০৯ রাত ১:০৫
সালাহ্ উদ্দিন শুভ্র বলেছেন: হ্যাঁ নাঈম ভাই......এমন অসংখ্য ভুল, অসংখ্য না বোঝা, অসংখ্য অকার্যকারিতা তৈরি করে।

ইতিহাস তাই বলে, অনেককেই তারা বুঝতে পারে না যারা নিজেদের অনেক বুঝেছি ভাবে।

১১. ০৩ রা আগস্ট, ২০০৯ রাত ১০:২৬
প্রণব আচার্য্য বলেছেন: +++
সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে কোনো মোহ নিয়ে থাকার সুযোগ নেই। সেটা ভারতই হোক আর মার্কিনিই হোক। আর সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন একজন, সাম্রাজ্যবাদ যখন ফুল নিয়ে বন্ধুত্ব দেখাতে আসে তখনও সে তার হীন সাম্রাজ্যবাদী উদ্দেশ্য চরিতর্থ করার জন্যেই আসে।
তাহলে জনগণের ভরসা কোথায়? একমাত্র ভরসা বামপন্থী শক্তি। বামপন্থী শক্তি নিজেদের বিভ্রান্তি-বিচ্যুতি কাটিয়ে যত সংহত হবে, ভারত-বাংলাদেশের গণতন্ত্রমনা, শান্তিপ্রিয় জনগণের ঐক্য যখন গড়ে ওঠবে -- ভারতের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনকে মোকাবেলা করা তখনই সম্ভব হবে। জনগণের বিজয় সুনিশ্চিত, জনগণের বিপ্লবী সংগ্রামের বিজয় অনিবার্য।

০৮ ই আগস্ট, ২০০৯ রাত ১১:৩৪

লেখক বলেছেন: সাম্রাজ্যবাদের দুইটি অস্ত্র : ওয়ার মঙ্গারিং আর পিস মঙ্গারিং। যেটি যখন কাজে লাগে সেটিকেই কাজে লাগায়। এখন দুনিয়া জুড়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ পিস মঙ্গারিং-এর রাস্তা ধরেছে।

১২. ০১ লা সেপ্টেম্বর, ২০০৯ রাত ১:২২
দিনমজুর বলেছেন: ১ মাসেরও বেশি সময় পরে লেখাগুলো চোখে পড়ল। ভিন্ন চিন্তার প্রিয় লিংকগুলো থেকে। ভালো লাগলো। এই ভাবে, বেশ ডিটেলস বিশ্লেষণ সহকারে ভারতের রাষ্ট্র চরিত্র বিচার করার উদ্যোগটা চমৎকার। লেখা প্রকাশের সময় চোখে পড়লে আলোচনায় অংশ নেয়া যেত। Economic and Political Weekly'র ঐ সংখ্যাগুলো কিভাবে সংগ্রহ করা যেতে পারে জানাবেন।

আরেকটা বিষয়, অনেকদিন আগে ভারতের মাওবাদীদের একটা পত্রিকায় পড়ে ছিলাম, নাম মনে করতি পারছি না, ভারতীয় একচেটিয়াগুলোর মালিকানায় বিদেশী পুজির অংশীদারিত্বের ব্যাপারে প্রশ্ন তুলে এগুলোর ভারতীয়ত্ব নিয়েই তারা প্রশ্ন তুলেছিল। আপনার লেখা পড়ে আবার সেই প্রসংগ মনে পড়ে গেল। এই বিষয়ে কি আপনার কাছে কোন তথ্য আছে?
০১ লা সেপ্টেম্বর, ২০০৯ রাত ৯:৫৪

লেখক বলেছেন: না, এখনো বিস্তারিত তথ্য আমার হাতে নেই। তবে চাইলে খোঁজ করা যাবে ... আর এ খোঁজে আপনারও সহযোগিতা লাগবে ...

১৫. ২১ শে জুলাই, ২০১০ রাত ৩:০৩
তানিয়া মুন বলেছেন: তথ্যবহুল, সংগ্রহে বাখলাম।
১৬. ২৬ শে জুন, ২০১১ রাত ১০:৫৭
সৌভিক ঘোষাল বলেছেন: রাজনৈতিক দুর্নীতি এবং ভারতরাষ্ট্রের চরিত্র
৬৪ কোটি টাকার বোফর্স কেলেঙ্কারি একটি সরকারের পতন ঘটিয়েছিল। আর এখন আমরা প্রায় প্রতিদিনই লক্ষ লক্ষ কোটি টাকার দুর্নীতির ঘটনা প্রকাশ হতে দেখছি। এটা ঘটনা যে দুর্নীতির মাত্রা বহুগুণ বেড়ে গেছে। কিন্তু আরো বড় কথা হলো আজকের দুর্নীতির চেহারাটাই উদারনৈতিক ও বিশ্বায়িত ভারতরাষ্ট্রের চেহারাটাকে প্রতিফলিত করছে। বৃহৎ পুঁজি ও সাম্রাজ্যবাদী সব সময়েই ভারতরাষ্ট্রকে প্রভাবিত করেছে। কিন্তু বিশ্বায়নের যুগে জাতীয় ও বহুজাতিক কর্পোরেট সংস্থা এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলি ক্রমবর্ধমান হারে রাষ্ট্রনীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে আরো প্রত্যক্ষ ভূমিকা গ্রহণ করছে।
শাসকশ্রেণির রাজনীতিবিদরা কি কর্পোরেটদের দালাল ?
রাডিয়া টেপ দেখিয়ে দিয়েছে কর্পোরেট সংস্থাগুলি তাদের দালালদের মাধ্যমে কিভাবে মন্ত্রীদের নিয়োগ, সংসদের আইন পাশ এবং নীতিকে তাদের স্বার্থে নিয়ন্ত্রণ করে।
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে রাজনীতি ও কর্পোরেট তহবিল এর আলিঙ্গন ক্রমশ বেড়েছে। কয়েকবছর আগে বিজেপির প্রমোদ মহাজন এবং সমাজবাদী পার্টির অমর সিং এর কথা শোনা যেত, যারা তাদের পার্টির জন্য কয়েক মিনিটের মধ্যে কয়েক শো কোটি টাকা তুলে ফেলতে পারেন। এই কর্পোরেট দাক্ষিণ্য নিশ্চিতভাবেই প্রতি দক্ষিণার শর্তের সাথে যুক্ত। রাডিয়ারা কর্পোরেট লবির হয়ে যে কাজ করে দেন, যেমন এ রাজাকে টেলিকম মন্ত্রী বানানো, তা পরবর্তী উপকারের কথা মাথায় রেখেই। কর্পোরেটদের টাকা রাজনীতিবিদের পরিবারকে ঘুষ হিসেবে দেওয়া হয়, আর সেই ঘুষের কালো টাকা পরিবারের মাধ্যমেই সাদা হয়। কর্পোরেটদের বিপুল টাকা যে সুবিধাজনক রিপোর্ট বা সুপারিশের জন্যই শুধু কাজে লাগে তা নয়, এ দিয়ে এমনকী বিচারপতিদেরও প্রভাবিত করা যায়। এই ছবিটা অমর সিং টেপ, প্রমোদ মহাজন ঘটনাবলীতে নিহিত ছিল এবং রাডিয়া টেপএ তার পরিপূর্ণ চেহারা বেরিয়ে এসেছে। সবচেয়ে বড় কথা বিভিন্ন আর্থিক এবং আভ্যন্তরীণ নীতি – এস ই জেড আইন, পেটেন্ট আইন, নিউক্লিয়ার লায়াবিলিটি আইন, বিভিন্ন কালা কানুন, অপারেশন গ্রীন হান্ট প্রভৃতি এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত কিছু নীতিমালাও তৈরি হচ্ছে কর্পোরেট স্বার্থের কথা মাথায় রেখেই।
উইকিলিকস যা প্রমাণ করেছে
রাজনৈতিক দুর্নীতির সবচেয়ে বড় প্রমাণ সম্ভবত সংসদে নিউক্লিয়চুক্তির সময় আস্থাভোটে টাকার বিনিময়ে সাংসদদের ভোট কেনাবেচার ঘটনাটি। উইকিলিকস এর এই সংক্রান্ত কেবল এর প্রকাশ ইউ পি এ সরকারের আস্থাভোটে জয়ের জন্য সাংসদ কেনাবেচার ব্যাপক অভিযোগটি শেষপর্যন্ত প্রমাণ করে দিয়েছে। কিন্তু কংগ্রেস ও বিজেপি উভয়দলই উইকিলিকস এর কেবল প্রকাশ এর ঘটনার গুরুত্বকে কমিয়ে দেখাতে সচেষ্ট। কেন কংগ্রেস নেতারা আমেরিকান কূটনীতিকদের বলতে গেলেন আস্থাভোটে জয়ের জন্য ভোট কেনার পরিকল্পনার কথা, আর কেনই বা তাদের ট্রাঙ্ক ভর্তি টাকা দেখালেন? এর স্পষ্ট কারণ একটাই। তাদের আমেরিকি প্রভুদের এটা দেখিয়ে তারা নিশ্চিন্ত করতে চেয়েছিলেন, ইউ পি এ সরকার আস্থাভোটে জিতে যাতে নিউক্লিয় চুক্তি করতে পারে, তা নিশ্চিত করার জন্য যা যা করণীয় তারা তা করছেন।
মন্ত্রীসভার আমেরিকাপন্থী অদলবদল
উইকিলিকস এর কেবলগুলি প্রকাশ করে দিয়েছে ভারতের আর্থিক ও বিদেশনীতির ওপর, এমনকী কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমেরিকার প্রভাব কতটা। ৩০জানুয়ারী ২০০৬ পাঠানো আমেরিকান দুতাবাসের কূটনীতিক ডেভিড সি মালফোর্ড এর কেবলবার্তা অনুসারে দেখা যাচ্ছে তিনি লক্ষ্য রাখছেন ২০০৬ এর জানুয়ারীতে পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হিসেবে মনমোহন সিং সরকার নিযুক্ত করছে (কেবল এর মতে) আমেরিকাপন্থী মুরলী দেওরাকে, সরিয়ে দিচ্ছে মনী শঙ্কর আইয়ারকে, যিনি (কেবল এ) বর্ণিত হচ্ছেন ইরাণ পাইপলাইন এর উচ্চকিত প্রস্তাবক হিসেবে। মালফোর্ড এও বলেছেন “দেওরা সহ সাংসদদের একটা বড় অংশ আমাদের রণনৈতিক সমঝোতার সঙ্গে প্রকাশ্যেই যুক্ত হয়েছেন। এদের মধ্যে সাতজন ভারত আমেরিকা যৌথ সংসদীয় মঞ্চের সদস্য”। মন্ত্রীসভার অদল বদল প্রসঙ্গে মালফোর্ড এই বলে উপসংহার টানছেন, “ভারত এবং ইরাণে এটা আমেরিকার লক্ষ্যের সঙ্গে ভীষণভাবে সঙ্গতিপূর্ণ” এবং এটা মনমোহন সিং সরকারের “ভারত আমেরিকা সম্পর্কের দ্রুত অগ্রগতিকে নিশ্চিত করতে দৃঢ়তার প্রমাণ”।
আমেরিকা নির্দেশিত আর্থিক নীতিমালা
প্রকাশিত কেবলবার্তা যেমন দেখিয়ে দিচ্ছে ভারতের আর্থিক নীতির ওপর আমেরিকার নিবিড় নজরদারী ও নিয়ন্ত্রণ এর দিকটি, তেমনি প্রকাশ করছে ভারতের মন্ত্রীরা বিভিন্ন কর্পোরেশনকে কেমন সুবিধা পাইয়ে দিচ্ছেন সেই দিকটিও। একটি কেবল বার্তায় আমেরিকার সেক্রেটারি অব স্টেট হিলারি ক্লিন্টন ভারতের অর্থমন্ত্রী সম্পর্কে জানতে চাইছেন, “মুখার্জী (প্রণব) কোন শিল্প বা বাণিজ্য গোষ্ঠীর কাছে দায়বদ্ধ এবং কাদের তিনি আর্থিক নীতির মাধ্যমে সুবিধা পাইয়ে দেবেন?’’ আমরা কি এরকমই অর্থমন্ত্রী চাই, যিনি ভারতের সাধারণ মানুষের পরিবর্তে বিভিন্ন কর্পোরেট গোষ্ঠীর কাছে দায়বদ্ধ? হিলারী ক্লিন্টনের কেবল এটাও দেখিয়ে দেয় মন্ত্রীদের থেকেও আমেরিকাপন্থী আর্থিক নীতি রূপায়ণে আমেরিকার কাছে যিনি বেশি বিশ্বস্ত, তিনি হলেন যোজনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারপার্সন মন্টেক সিং আলুওয়ালিয়া। প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এর মতোই যিনি কিনা আই এম এফ দ্বারা নিযুক্ত। হিলারী প্রশ্ন করেছেন, “মন্টেক সিং আলুওয়ালিয়ার পরিবর্তে মুখার্জীকে কেন অর্থমন্ত্রীর পদে বসানো হল?’’
বিদেশনীতির আমেরিকাপন্থী রূপান্তর
অন্যান্য কেবলগুলি দেখিয়ে দিচ্ছে ইজরায়েল এবং ইরাণ এর সঙ্গে তার সম্পর্কর প্রকৃত চেহারা নিয়ে ভারত সরকার তার জনগণের কাছে মিথ্যাচার করেছে। একটি কেবল এরকম মনে করেছে ইরাণের সাথে দৃশ্যত ভারতের উষ্ণ সম্পর্ক আসলে ‘লোকদেখানো, মূলত দেশের মুসলিম জনসমাজ এবং জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের অংশকে খুশি রাখার চেষ্টা’। আরেকটি কেবল তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এম কে নারায়ণনকে উদ্ধৃত করে জানাচ্ছে দ্বিতীয়বার আই এ ই এ তে বিষয়টি আসার সময়ে ইরাণের বিরুদ্ধে ভারতের ভোট দেবার ভাবনার কথা, কিন্তু ভয় আছে দেশের মধ্যকার রাজনৈতিক আধারের প্রতিক্রিয়া নিয়ে।
আমেরিকার কেবলবার্তার নথি অনুসারে ভারতকে আমেরিকার প্রতিনিধি সতর্ক করে জানাচ্ছেন আই এ ই এ তে ইরাণের বিরুদ্ধে ভারতের ভোট দেবার ব্যর্থতা নিউক্লীয় চুক্তিকে ক্ষতিগ্রস্থ করবে। ঘটনাবলী দেখিয়ে দিয়েছে মনমোহন সিং সরকার তাদের আমেরিকি প্রভুর নির্দেশানুযায়ীই ভোট দিয়ে তাদের সেবা করেছেন।
নিশ্চিতভাবেই ফাঁস হওয়া কেবল বার্তা জীবন্ত ও বিস্ফোরক সব প্রমাণ হাজির করেছে। শুধুমাত্র ঘুষের বিষয়টিই নয়, বরং আমেরিকার স্বার্থ রক্ষার তাগিদে ভারতের নিজের স্বার্থহানি ঘটানো এবং গণতন্ত্রকে বিপন্ন করার মতো আরো গভীর অভিযোগই এতে যুক্ত।
বিজেপি – কর্পোরেট ও আমেরিকি প্রভুদের অনুগত
প্রধান বিরোধী দল বিজেপি রাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে কর্পোরেট ও সাম্রাজ্যবাদী হস্তক্ষেপকে তুলে ধরতে বা প্রতিরোধ করতে একেবারেই আগ্রহী নয়। বস্তুতপক্ষে বিজেপি সহ সব শাসক দলই কর্পোরেট পক্ষপাতদুষ্ট। কর্পোরেটদের সত্যিকারের কোন ক্ষতি করবে, এরকম কোন কিছু করতে তারা আদৌ প্রস্তুত নয়। রাডিয়া টেপ এরকম অনেক ঘটনা তুলে ধরেছে যেখানে দেখা যাচ্ছে বিজেপির উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্বও বাধ্যের মতো কর্পোরেট স্বার্থর সেবা করেছেন।
উইকিলিকস বিজেপির দ্বিচারিতাকে প্রমাণ করে দিয়েছে। আমেরিকার ইচ্ছার কাছে মাথা নত করার ক্ষেত্রে কংগ্রেস বিজেপি এক গোয়ালেরই গরু। বিজেপির একজন বরিষ্ঠ নেতৃত্বকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে তিনি আমেরিকার প্রতিনিধিকে আশ্বস্ত করে জানাচ্ছেন আমেরিকার অধীনতার বিষয়টিকে কেন্দ্র করে বিজেপির করা ইউ পি এ সরকারের সমালোচনাকে খুব বেশি গুরুত্ব দেবার দরকার নেই। এটা ইউ পি এ সরকারের বিরুদ্ধে কিছু সমর্থন আদায় করে নেবার জন্য রাজনৈতিক ভাষণ মাত্র। আর একটি কেবলের সূত্র অনুযায়ী লালকৃষ্ণ আদবানী নিউক্লিয় চুক্তি বিষয়ে বিজেপির সরকারী বক্তব্যকে খাটো করে দেখাচ্ছেন আর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন বিজেপি ক্ষমতায় এলে ইন্দো আমেরিকি সম্পর্ক, এমনকি নিউক্লিয় চুক্তিকে পর্যন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। আরেকটি কেবলবার্তা দেখাচ্ছে নরেন্দ্র মোদিকে আমেরিকা ভিসা না দেওয়ায় অরুণ জেটল ক্রুদ্ধ হয়ে বলছেন যে তিনি কিছুতেই এটা বুঝে উঠতে পারছেন না, যে পার্টি ইন্দো আমেরিকি সম্পর্ক পুনর্বিন্যাসের কাজ শুরু করল তার নেতা সম্পর্কে আমেরিকা কিভাবে এরকম সিদ্ধান্ত নিতে পারে। একই কেবলে জেটলি খুচরো ব্যবসা ও আইনি ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা করছেন। আমেরিকান দূতাবাসের আধিকারিক মন্তব্য করেছেন যে মোদিকে ভিসা দেওয়া সংক্রান্ত বিষয়টি ছাড়া ঐ সাক্ষাৎকারে জেটলি আগাগোড়া আমেরিকার সঙ্গে ব্যক্তিগত ও অর্থনীতিগত সংযোগ স্থাপনের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন।
লোকের কাছে জাতিয়তাবাদী সাজলেও আসলে বিজেপি যেমন আমেরিকার সাথে গাঁটছড়া বাঁধতেই দায়বদ্ধ, তেমনি দুর্নীতি বিরোধী লোকদেখানো ভড়ং থাকলেও নব্যউদারনৈতিক অর্থনীতি ও কর্পোরেট ভজনায় সে নিবেদিত প্রাণ।
ইউ পি এ র আমেরিকাপন্থী নীতির বিরুদ্ধে বিজেপির তথাকথিত স্বদেশীর মুখোশ উইকিলিকস কেবল খুলে দিয়েছে। তাদের হিন্দুত্ব রাজনীতিও সুযোগসন্ধানী বলে প্রমাণিত হয়েছে। জেটলি নিজেই সাক্ষাৎকারে হিন্দুত্ব রাজনীতিকে সুবিধাবাদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমেরিকার প্রতিনিধিকে জেটলি বলেছেন, “উদাহরণ হিসেবে ভারতের উত্তর পূর্ব কে নেওয়া যায়। সেখানে হিন্দুত্ব ভালো তাস, কারণ লোকের মনে বাংলাদেশ থেকে মুসলিম অনুপ্রবেশ সংক্রান্ত ভীতি আছে। ভারত পাকিস্থান সম্পর্কের অধুনা উন্নতি হিন্দু জাতিয়তাবাদী রাজনীতিকে দিল্লিতে এখন কিছুটা গুরুত্বহীন করে দিয়েছে, কিন্তু সীমান্তের ও পার থেকে পার্লামেন্ট হামলার মত কোন ঘটনা ঘটলেই সেটা পালটে যেতে পারে।” এসব কথা দেখিয়ে দেয় পার্লামেন্ট আক্রমণের মত ঘটনাও বিজেপির কাছে কাঙ্ক্ষিত, কারণ তা হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির জন্য উর্বর জমি তৈরি করে।
অনৈতিক গণতন্ত্র ?
এখনো অবধি সবচেয়ে জঘণ্য দুর্নীতির ঘটনায় তাঁর নিজের কর্পোরেট হাউসের লবিইস্ট নীরা রাডিয়া জড়িয়ে যাওয়ার পর রতন টাটা নেমেছেন আহত শহীদের ভূমিকায় অভিনয় করতে। একটি মিডিয়া হাউসের ‘ওয়াক অ্যাণ্ড টক শো’ তে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার সম্পাদক শেখর গুপ্তর সাথে কথা বলার সময় তিনি জানিয়েছেন, বিশ্বরঙ্গমঞ্চে প্রবেশে জন্য ওবামা ভারতকে প্রশংসা করলেও তখন থেকে ভারত কর্ণি ক্যাপিটালিজম (সরকারী আধিকারিকদের মদতপুষ্ট পুঁজিপতিদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত পুঁজিবাদী অর্থনীতি) ও ব্যানানা রিপাবলিক (দুর্নীতিপরায়ণ গণতন্ত্র, দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলি সম্পর্কে প্রযুক্ত হত কথাটি) এ পরিণত হবার বিপদের সম্মুখীন হয়েছে। টাটা যখন কর্ণি ক্যাপিটালিজম বা সরকারী আধিকারিকদের মদতপুষ্ট পুঁজিপতিদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত পুঁজিবাদী অর্থনীতির কথা বলছিলেন, সেই কর্পোরেট লবিইস্ট এর কথা কি বলছিলেন, যিনি মন্ত্রী, সরকার ও বিরোধী পক্ষ, বিচারক ও সংবাদ মাধ্যমের প্রতিনিধিদের তাঁর আঁচলের তলায় রেখেছেন? যখন তিনি দুর্নীতিপরায়ণ গণতন্ত্রর কথা বলছিলেন, তিনি কি তখন সরকার ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সহায়তাপুষ্ট সেইসব অতি ধনী কর্পোরেট হাউসের কথা বলছিলেন, যারা শাস্তির ভয়মুক্ত হয়ে আইন ভাঙে, গণতন্ত্রকে অস্বীকার করে, দেশের অমূল্য সম্পদ লুঠ করে? ঠিক যেরকম দুর্নীতি পরায়ণ গণতন্ত্র গড়ে উঠেছিল দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোতে? না, এসব টাটা বলছিলেন না। তিনি বলছিলেন একজন কর্পোরেট লবিইস্ট এর ফোন ট্যাপ হওয়া এবং তার ‘ব্যক্তিগত’ কথা মিডিয়ায় ফাঁস হবার কথা। তিনি বোঝাতে চাইছিলেন অন্য কিছু প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানীর স্বার্থে টাটার ভাবমূর্তি ম্লান করার কথা।
টাটা সতর্কবাণী দিয়েছেন, ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতার মতো তথাকথিত গণতান্ত্রিক অধিকার ইত্যাদির নামে যদি আমরা গণতন্ত্রবিলাস এর অপব্যবহার করি’, তবে ভারত এমন একটা দেশে পরিণত হবে, যেখানে মানুষ ‘যথাযথ প্রমাণ ছাড়াই জেলে যাবে বা তাদের দেহ গাড়ির ট্রাঙ্কে পাওয়া যাবে। এটা কৌতূহলজনক ব্যাপার যে মত প্রকাশের স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক অধিকার এবং সাধারণভাবে গণতন্ত্রকেই টাটা বিলাস বলে উল্লেখ করেছেন। সিঙ্গুরের কৃষক বা কলিঙ্গনগরের আদিবাসীরা সেই জগৎ সম্পর্কে টাটাকে শেখাতে পারে, যেখানে জমি অধিগ্রহণের মত স্বার্থবাহী বিষয়ে শক্তিশালী কর্পোরেটদের চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিলে বিরোধী আন্দোলনকারীদের ‘যথোপযুক্ত প্রমাণ ছাড়াই জেলে যেতে হয়’, জমিতে মরে পড়ে থাকতে হয় অথবা পুলিশের গুলি খেয়ে মরে যেতে হয়। টাটার দৃষ্টিতে কৃষক ও আদিবাসী জনগণের জীবন ও জীবিকার স্বার্থে কৃষি জমি রক্ষার লড়াই, প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ হল গণতান্ত্রিক বিলাস। অন্যদিকে টাটার মত ধনকুবেররা উপভোগ করবেন ব্যক্তিগত গোপনিয়তার গণতান্ত্রিক অধিকার এবং আদালতে গিয়ে ব্যক্তিগত গোপনিয়তার নামে প্রমাণ লোপের চেষ্টা করবেন।
বস্তুতপক্ষে রাডিয়া টেপ এবং উইকিলিকস এর ফাঁস হওয়া তথ্যাবলী দেখায় যে ভারত ইতোমধ্যেই অনৈতিক গণতন্ত্র বা ব্যানানা রিপাবলিক হবার রাস্তায় অনেকদূর এগিয়ে গেছে। এখানে কর্পোরেট ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলি কর্পোরেট স্বার্থ সুরক্ষিত রাখতে গণতন্ত্র ও জনাধিকারকে ধ্বংস করছে। যদি অবিলম্বে নব্যউদারনৈতিক নীতিসমূহকে পালটানো না যায় তা হলে অচিরেই ভারত একটি ব্যানানা রিপাবলিক বা অনৈতিক গণতন্ত্র হয়ে উঠবে। দক্ষিণ আমেরিকার পূর্বতন ব্যানানা রিপাবলিকগুলি এক নতুন জাগরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সেখানে জনপ্রিয় সরকার ও আন্দোলনগুলি সাম্রাজ্যবাদের শক্তিশালী ভূমিতে দাঁড়িয়েই তাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। ভারত তাদের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের সম্পদের সাম্রাজ্যবাদী লুন্ঠন, আমাদের সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রের বিপদের প্রশ্নে নয়া উদারনীতির বিরুদ্ধে সংকল্পবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলবে কিনা, সেটাই এখন প্রশ্ন।
কর্পোরেট লুঠকে সাহায্য করতে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস
সারা দেশ জুড়েই সরকারের সাহায্যে কর্পোরেটদের দ্বারা চলছে বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি ও জঙ্গল দখল। দখল চলছে খনি, আবাসন ও অন্যান্য নানা ধরণের প্রজেক্ট ও শিল্প স্থাপনার জন্য। প্রতিটি ক্ষেত্রেই ব্যাপকভাবে জমি আইনকে ভাঙা হয়েছে, আর সরকারি আধিকারিকরা চোখ বুজে থেকেছেন। কিন্তু এই কর্পোরেটকুল মদত পেয়েছে পুলিশি লাঠি গুলি আর দানবীয় আইনের। যারাই একে প্রশ্ন করতে গেছেন, তাদের পড়তে হয়েছে ব্যাপক নিপীড়ণের মুখে।
আদিবাসী ও কৃষক সম্প্রদায় জমি হারানোর মুখোমুখি হয়ে স্বাভাবিকভাবেই তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। কলিঙ্গনগর, জগৎসিঙ্ঘপুর, দাদরি, সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম, সোমপেটা, শ্রীকাকুলাম – সর্বত্রই তারা মুখোমুখি হয়েছেন পুলিশের নির্মম লাঠি গুলির। পুলিশি নিপীড়ণ ও সংগঠিত রাজনৈতিক হিংসার বলি হয়ে অনেকে হতাহত হয়েছেন। জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে অধিকাংশ জনপ্রিয় আন্দোলনই মাওবাদী ঘরাণার ছিল না, বরং ছিল জনতার সংগ্রাম। কিন্তু জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী সবাইকেই ‘মাওবাদী’ তকমা দিয়ে দেওয়া হয়েছে। আদিবাসীরা তাদের আবাসভূমি জঙ্গল থেকে উচ্ছেদ হচ্ছেন। ছত্তিশগড়ে মাওবাদী দমনের নামে ‘সালওয়া জুডুম’ নামধারী বাহিনী মাওবাদী দমনের নামে জোর করে হাজার হাজার আদিবাসীকে উচ্ছেদ করছে, ধর্ষণ, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে।
মাওবাদী দমনের নামে কেন্দ্রীয় সরকার, বিশেষ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক অপারেশন গ্রীন্ট হান্ট নামক সেনা হামলা নামিয়ে এনেছে। কিন্তু বোঝা যাচ্ছে মাওবাদের বাহানায় কর্পোরেট লুঠের স্বার্থে এটা আসলে গণপ্রতিরোধ আর প্রতিবাদী কন্ঠস্বরকেই নিশানা করেছে। বিনায়ক সেনের মত যারা কর্পোরেট লুঠ আর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের নীতির বিরোধিতা করেন, তাদের প্ররোচনাদাতা, সন্ত্রাসবাদীদের সমপর্যায়ভুক্ত বলে জেলে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বিনায়ক সেন সেইসব হাজার হাজার কর্মী ও সাধারণ মানুষেরই একজন, যিনি কর্পোরেটদের সম্পদ হরণের ঘটনাকে প্রশ্ন করায় কালা কানুনে বন্দী হয়ে জেলে গেছেন।
এটা মনে রাখা দরকার অপারেশন গ্রীন হান্ট নামিয়ে এনেছেন যে চিদাম্বরম, তিনি নিজেই ২০০৪ এ অর্থমন্ত্রী হবার আগের দিন পর্যন্ত বহুজাতিক মাইনিং কোম্পানী বেদান্ত এর অধিকর্তা ছিলেন।
চিদাম্বরমএর লোক সুপারিশ করেছেন কর্পোরেট এলাকাভুক্ত সেনাবাহিনীর
চিদাম্বরমের লক্ষ্য ও ভাবনাচিন্তা প্রকাশিত হয়েছে মাহিন্দ্রার বিশেষ পরিষেবার সি ই ও রঘুরামনের কথায়। এই রঘুরামন আবার চিদাম্বরমের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের পেটোয়া প্রজেক্ট ন্যাটগ্রিড এর মাথা, যারা গোয়েন্দা তথ্যাবলী সংযোজন করে। একটি রিপোর্ট এর রঘুরামন আশ্চর্যজনকভাবে তার সুপারিশে বলেছেন, কর্পোরেটদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে পা দেওয়ার সময় এসে গেছে। এই ভাবনার সমর্থনে তিনি আমেরিকা, ইজরায়েল এবং অন্যান্য দেশের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ব্যবস্থার উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি প্রস্তাব দিয়েছেন কর্পোরেটদের নিজেদের নিরাপত্তা বাহিনী গড়ে তোলার অনুমতি দেওয়া হোক। বলেছেন ব্যবসায়ী সম্রাটরা যদি এখনই তাদের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য রক্ষায় এগিয়ে না আসে, তাহলে তাদের হয়ত দেখতে হবে তাদের সাম্রাজ্যর সীমারেখা ভেঙে যাচ্ছে।
কর্পোরেটদের নিজেদের নিজস্ব সেনাবাহিনী রাখা আর দূরের কোন কষ্টকল্পনা নয়। বস্তার, রায়গড়া, সিঙ্গুর বা জগৎসিঙ্ঘপুরে শাসক রাজনৈতিক দলের সহায়তায় কর্পোরেটরা প্রতিবাদীদের ভয় দেখানো ও জোর করে কাজ হাসিল করার জন্য নিজস্ব সশস্ত্র গোষ্ঠী গড়েই নিয়েছিল। অপারেশন গ্রীন হান্টও একটা এমন দৃষ্টান্ত যেখানে ভারতের পুলিশ ও আধাসেনাকে কর্পোরেট সম্রাটদের সাম্রাজ্য রক্ষায় ব্যবহার করা হচ্ছে।
১৭. ২৬ শে জুন, ২০১১ রাত ১০:৫৮
সৌভিক ঘোষাল বলেছেন: রাজনৈতিক দুর্নীতি এবং ভারতরাষ্ট্রের চরিত্র
৬৪ কোটি টাকার বোফর্স কেলেঙ্কারি একটি সরকারের পতন ঘটিয়েছিল। আর এখন আমরা প্রায় প্রতিদিনই লক্ষ লক্ষ কোটি টাকার দুর্নীতির ঘটনা প্রকাশ হতে দেখছি। এটা ঘটনা যে দুর্নীতির মাত্রা বহুগুণ বেড়ে গেছে। কিন্তু আরো বড় কথা হলো আজকের দুর্নীতির চেহারাটাই উদারনৈতিক ও বিশ্বায়িত ভারতরাষ্ট্রের চেহারাটাকে প্রতিফলিত করছে। বৃহৎ পুঁজি ও সাম্রাজ্যবাদী সব সময়েই ভারতরাষ্ট্রকে প্রভাবিত করেছে। কিন্তু বিশ্বায়নের যুগে জাতীয় ও বহুজাতিক কর্পোরেট সংস্থা এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলি ক্রমবর্ধমান হারে রাষ্ট্রনীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে আরো প্রত্যক্ষ ভূমিকা গ্রহণ করছে।
শাসকশ্রেণির রাজনীতিবিদরা কি কর্পোরেটদের দালাল ?
রাডিয়া টেপ দেখিয়ে দিয়েছে কর্পোরেট সংস্থাগুলি তাদের দালালদের মাধ্যমে কিভাবে মন্ত্রীদের নিয়োগ, সংসদের আইন পাশ এবং নীতিকে তাদের স্বার্থে নিয়ন্ত্রণ করে।
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে রাজনীতি ও কর্পোরেট তহবিল এর আলিঙ্গন ক্রমশ বেড়েছে। কয়েকবছর আগে বিজেপির প্রমোদ মহাজন এবং সমাজবাদী পার্টির অমর সিং এর কথা শোনা যেত, যারা তাদের পার্টির জন্য কয়েক মিনিটের মধ্যে কয়েক শো কোটি টাকা তুলে ফেলতে পারেন। এই কর্পোরেট দাক্ষিণ্য নিশ্চিতভাবেই প্রতি দক্ষিণার শর্তের সাথে যুক্ত। রাডিয়ারা কর্পোরেট লবির হয়ে যে কাজ করে দেন, যেমন এ রাজাকে টেলিকম মন্ত্রী বানানো, তা পরবর্তী উপকারের কথা মাথায় রেখেই। কর্পোরেটদের টাকা রাজনীতিবিদের পরিবারকে ঘুষ হিসেবে দেওয়া হয়, আর সেই ঘুষের কালো টাকা পরিবারের মাধ্যমেই সাদা হয়। কর্পোরেটদের বিপুল টাকা যে সুবিধাজনক রিপোর্ট বা সুপারিশের জন্যই শুধু কাজে লাগে তা নয়, এ দিয়ে এমনকী বিচারপতিদেরও প্রভাবিত করা যায়। এই ছবিটা অমর সিং টেপ, প্রমোদ মহাজন ঘটনাবলীতে নিহিত ছিল এবং রাডিয়া টেপএ তার পরিপূর্ণ চেহারা বেরিয়ে এসেছে। সবচেয়ে বড় কথা বিভিন্ন আর্থিক এবং আভ্যন্তরীণ নীতি – এস ই জেড আইন, পেটেন্ট আইন, নিউক্লিয়ার লায়াবিলিটি আইন, বিভিন্ন কালা কানুন, অপারেশন গ্রীন হান্ট প্রভৃতি এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত কিছু নীতিমালাও তৈরি হচ্ছে কর্পোরেট স্বার্থের কথা মাথায় রেখেই।
উইকিলিকস যা প্রমাণ করেছে
রাজনৈতিক দুর্নীতির সবচেয়ে বড় প্রমাণ সম্ভবত সংসদে নিউক্লিয়চুক্তির সময় আস্থাভোটে টাকার বিনিময়ে সাংসদদের ভোট কেনাবেচার ঘটনাটি। উইকিলিকস এর এই সংক্রান্ত কেবল এর প্রকাশ ইউ পি এ সরকারের আস্থাভোটে জয়ের জন্য সাংসদ কেনাবেচার ব্যাপক অভিযোগটি শেষপর্যন্ত প্রমাণ করে দিয়েছে। কিন্তু কংগ্রেস ও বিজেপি উভয়দলই উইকিলিকস এর কেবল প্রকাশ এর ঘটনার গুরুত্বকে কমিয়ে দেখাতে সচেষ্ট। কেন কংগ্রেস নেতারা আমেরিকান কূটনীতিকদের বলতে গেলেন আস্থাভোটে জয়ের জন্য ভোট কেনার পরিকল্পনার কথা, আর কেনই বা তাদের ট্রাঙ্ক ভর্তি টাকা দেখালেন? এর স্পষ্ট কারণ একটাই। তাদের আমেরিকি প্রভুদের এটা দেখিয়ে তারা নিশ্চিন্ত করতে চেয়েছিলেন, ইউ পি এ সরকার আস্থাভোটে জিতে যাতে নিউক্লিয় চুক্তি করতে পারে, তা নিশ্চিত করার জন্য যা যা করণীয় তারা তা করছেন।
মন্ত্রীসভার আমেরিকাপন্থী অদলবদল
উইকিলিকস এর কেবলগুলি প্রকাশ করে দিয়েছে ভারতের আর্থিক ও বিদেশনীতির ওপর, এমনকী কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমেরিকার প্রভাব কতটা। ৩০জানুয়ারী ২০০৬ পাঠানো আমেরিকান দুতাবাসের কূটনীতিক ডেভিড সি মালফোর্ড এর কেবলবার্তা অনুসারে দেখা যাচ্ছে তিনি লক্ষ্য রাখছেন ২০০৬ এর জানুয়ারীতে পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হিসেবে মনমোহন সিং সরকার নিযুক্ত করছে (কেবল এর মতে) আমেরিকাপন্থী মুরলী দেওরাকে, সরিয়ে দিচ্ছে মনী শঙ্কর আইয়ারকে, যিনি (কেবল এ) বর্ণিত হচ্ছেন ইরাণ পাইপলাইন এর উচ্চকিত প্রস্তাবক হিসেবে। মালফোর্ড এও বলেছেন “দেওরা সহ সাংসদদের একটা বড় অংশ আমাদের রণনৈতিক সমঝোতার সঙ্গে প্রকাশ্যেই যুক্ত হয়েছেন। এদের মধ্যে সাতজন ভারত আমেরিকা যৌথ সংসদীয় মঞ্চের সদস্য”। মন্ত্রীসভার অদল বদল প্রসঙ্গে মালফোর্ড এই বলে উপসংহার টানছেন, “ভারত এবং ইরাণে এটা আমেরিকার লক্ষ্যের সঙ্গে ভীষণভাবে সঙ্গতিপূর্ণ” এবং এটা মনমোহন সিং সরকারের “ভারত আমেরিকা সম্পর্কের দ্রুত অগ্রগতিকে নিশ্চিত করতে দৃঢ়তার প্রমাণ”।
আমেরিকা নির্দেশিত আর্থিক নীতিমালা
প্রকাশিত কেবলবার্তা যেমন দেখিয়ে দিচ্ছে ভারতের আর্থিক নীতির ওপর আমেরিকার নিবিড় নজরদারী ও নিয়ন্ত্রণ এর দিকটি, তেমনি প্রকাশ করছে ভারতের মন্ত্রীরা বিভিন্ন কর্পোরেশনকে কেমন সুবিধা পাইয়ে দিচ্ছেন সেই দিকটিও। একটি কেবল বার্তায় আমেরিকার সেক্রেটারি অব স্টেট হিলারি ক্লিন্টন ভারতের অর্থমন্ত্রী সম্পর্কে জানতে চাইছেন, “মুখার্জী (প্রণব) কোন শিল্প বা বাণিজ্য গোষ্ঠীর কাছে দায়বদ্ধ এবং কাদের তিনি আর্থিক নীতির মাধ্যমে সুবিধা পাইয়ে দেবেন?’’ আমরা কি এরকমই অর্থমন্ত্রী চাই, যিনি ভারতের সাধারণ মানুষের পরিবর্তে বিভিন্ন কর্পোরেট গোষ্ঠীর কাছে দায়বদ্ধ? হিলারী ক্লিন্টনের কেবল এটাও দেখিয়ে দেয় মন্ত্রীদের থেকেও আমেরিকাপন্থী আর্থিক নীতি রূপায়ণে আমেরিকার কাছে যিনি বেশি বিশ্বস্ত, তিনি হলেন যোজনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারপার্সন মন্টেক সিং আলুওয়ালিয়া। প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এর মতোই যিনি কিনা আই এম এফ দ্বারা নিযুক্ত। হিলারী প্রশ্ন করেছেন, “মন্টেক সিং আলুওয়ালিয়ার পরিবর্তে মুখার্জীকে কেন অর্থমন্ত্রীর পদে বসানো হল?’’
বিদেশনীতির আমেরিকাপন্থী রূপান্তর
অন্যান্য কেবলগুলি দেখিয়ে দিচ্ছে ইজরায়েল এবং ইরাণ এর সঙ্গে তার সম্পর্কর প্রকৃত চেহারা নিয়ে ভারত সরকার তার জনগণের কাছে মিথ্যাচার করেছে। একটি কেবল এরকম মনে করেছে ইরাণের সাথে দৃশ্যত ভারতের উষ্ণ সম্পর্ক আসলে ‘লোকদেখানো, মূলত দেশের মুসলিম জনসমাজ এবং জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের অংশকে খুশি রাখার চেষ্টা’। আরেকটি কেবল তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এম কে নারায়ণনকে উদ্ধৃত করে জানাচ্ছে দ্বিতীয়বার আই এ ই এ তে বিষয়টি আসার সময়ে ইরাণের বিরুদ্ধে ভারতের ভোট দেবার ভাবনার কথা, কিন্তু ভয় আছে দেশের মধ্যকার রাজনৈতিক আধারের প্রতিক্রিয়া নিয়ে।
আমেরিকার কেবলবার্তার নথি অনুসারে ভারতকে আমেরিকার প্রতিনিধি সতর্ক করে জানাচ্ছেন আই এ ই এ তে ইরাণের বিরুদ্ধে ভারতের ভোট দেবার ব্যর্থতা নিউক্লীয় চুক্তিকে ক্ষতিগ্রস্থ করবে। ঘটনাবলী দেখিয়ে দিয়েছে মনমোহন সিং সরকার তাদের আমেরিকি প্রভুর নির্দেশানুযায়ীই ভোট দিয়ে তাদের সেবা করেছেন।
নিশ্চিতভাবেই ফাঁস হওয়া কেবল বার্তা জীবন্ত ও বিস্ফোরক সব প্রমাণ হাজির করেছে। শুধুমাত্র ঘুষের বিষয়টিই নয়, বরং আমেরিকার স্বার্থ রক্ষার তাগিদে ভারতের নিজের স্বার্থহানি ঘটানো এবং গণতন্ত্রকে বিপন্ন করার মতো আরো গভীর অভিযোগই এতে যুক্ত।
বিজেপি – কর্পোরেট ও আমেরিকি প্রভুদের অনুগত
প্রধান বিরোধী দল বিজেপি রাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে কর্পোরেট ও সাম্রাজ্যবাদী হস্তক্ষেপকে তুলে ধরতে বা প্রতিরোধ করতে একেবারেই আগ্রহী নয়। বস্তুতপক্ষে বিজেপি সহ সব শাসক দলই কর্পোরেট পক্ষপাতদুষ্ট। কর্পোরেটদের সত্যিকারের কোন ক্ষতি করবে, এরকম কোন কিছু করতে তারা আদৌ প্রস্তুত নয়। রাডিয়া টেপ এরকম অনেক ঘটনা তুলে ধরেছে যেখানে দেখা যাচ্ছে বিজেপির উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্বও বাধ্যের মতো কর্পোরেট স্বার্থর সেবা করেছেন।
উইকিলিকস বিজেপির দ্বিচারিতাকে প্রমাণ করে দিয়েছে। আমেরিকার ইচ্ছার কাছে মাথা নত করার ক্ষেত্রে কংগ্রেস বিজেপি এক গোয়ালেরই গরু। বিজেপির একজন বরিষ্ঠ নেতৃত্বকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে তিনি আমেরিকার প্রতিনিধিকে আশ্বস্ত করে জানাচ্ছেন আমেরিকার অধীনতার বিষয়টিকে কেন্দ্র করে বিজেপির করা ইউ পি এ সরকারের সমালোচনাকে খুব বেশি গুরুত্ব দেবার দরকার নেই। এটা ইউ পি এ সরকারের বিরুদ্ধে কিছু সমর্থন আদায় করে নেবার জন্য রাজনৈতিক ভাষণ মাত্র। আর একটি কেবলের সূত্র অনুযায়ী লালকৃষ্ণ আদবানী নিউক্লিয় চুক্তি বিষয়ে বিজেপির সরকারী বক্তব্যকে খাটো করে দেখাচ্ছেন আর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন বিজেপি ক্ষমতায় এলে ইন্দো আমেরিকি সম্পর্ক, এমনকি নিউক্লিয় চুক্তিকে পর্যন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। আরেকটি কেবলবার্তা দেখাচ্ছে নরেন্দ্র মোদিকে আমেরিকা ভিসা না দেওয়ায় অরুণ জেটল ক্রুদ্ধ হয়ে বলছেন যে তিনি কিছুতেই এটা বুঝে উঠতে পারছেন না, যে পার্টি ইন্দো আমেরিকি সম্পর্ক পুনর্বিন্যাসের কাজ শুরু করল তার নেতা সম্পর্কে আমেরিকা কিভাবে এরকম সিদ্ধান্ত নিতে পারে। একই কেবলে জেটলি খুচরো ব্যবসা ও আইনি ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা করছেন। আমেরিকান দূতাবাসের আধিকারিক মন্তব্য করেছেন যে মোদিকে ভিসা দেওয়া সংক্রান্ত বিষয়টি ছাড়া ঐ সাক্ষাৎকারে জেটলি আগাগোড়া আমেরিকার সঙ্গে ব্যক্তিগত ও অর্থনীতিগত সংযোগ স্থাপনের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন।
লোকের কাছে জাতিয়তাবাদী সাজলেও আসলে বিজেপি যেমন আমেরিকার সাথে গাঁটছড়া বাঁধতেই দায়বদ্ধ, তেমনি দুর্নীতি বিরোধী লোকদেখানো ভড়ং থাকলেও নব্যউদারনৈতিক অর্থনীতি ও কর্পোরেট ভজনায় সে নিবেদিত প্রাণ।
ইউ পি এ র আমেরিকাপন্থী নীতির বিরুদ্ধে বিজেপির তথাকথিত স্বদেশীর মুখোশ উইকিলিকস কেবল খুলে দিয়েছে। তাদের হিন্দুত্ব রাজনীতিও সুযোগসন্ধানী বলে প্রমাণিত হয়েছে। জেটলি নিজেই সাক্ষাৎকারে হিন্দুত্ব রাজনীতিকে সুবিধাবাদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমেরিকার প্রতিনিধিকে জেটলি বলেছেন, “উদাহরণ হিসেবে ভারতের উত্তর পূর্ব কে নেওয়া যায়। সেখানে হিন্দুত্ব ভালো তাস, কারণ লোকের মনে বাংলাদেশ থেকে মুসলিম অনুপ্রবেশ সংক্রান্ত ভীতি আছে। ভারত পাকিস্থান সম্পর্কের অধুনা উন্নতি হিন্দু জাতিয়তাবাদী রাজনীতিকে দিল্লিতে এখন কিছুটা গুরুত্বহীন করে দিয়েছে, কিন্তু সীমান্তের ও পার থেকে পার্লামেন্ট হামলার মত কোন ঘটনা ঘটলেই সেটা পালটে যেতে পারে।” এসব কথা দেখিয়ে দেয় পার্লামেন্ট আক্রমণের মত ঘটনাও বিজেপির কাছে কাঙ্ক্ষিত, কারণ তা হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির জন্য উর্বর জমি তৈরি করে।
অনৈতিক গণতন্ত্র ?
এখনো অবধি সবচেয়ে জঘণ্য দুর্নীতির ঘটনায় তাঁর নিজের কর্পোরেট হাউসের লবিইস্ট নীরা রাডিয়া জড়িয়ে যাওয়ার পর রতন টাটা নেমেছেন আহত শহীদের ভূমিকায় অভিনয় করতে। একটি মিডিয়া হাউসের ‘ওয়াক অ্যাণ্ড টক শো’ তে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার সম্পাদক শেখর গুপ্তর সাথে কথা বলার সময় তিনি জানিয়েছেন, বিশ্বরঙ্গমঞ্চে প্রবেশে জন্য ওবামা ভারতকে প্রশংসা করলেও তখন থেকে ভারত কর্ণি ক্যাপিটালিজম (সরকারী আধিকারিকদের মদতপুষ্ট পুঁজিপতিদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত পুঁজিবাদী অর্থনীতি) ও ব্যানানা রিপাবলিক (দুর্নীতিপরায়ণ গণতন্ত্র, দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলি সম্পর্কে প্রযুক্ত হত কথাটি) এ পরিণত হবার বিপদের সম্মুখীন হয়েছে। টাটা যখন কর্ণি ক্যাপিটালিজম বা সরকারী আধিকারিকদের মদতপুষ্ট পুঁজিপতিদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত পুঁজিবাদী অর্থনীতির কথা বলছিলেন, সেই কর্পোরেট লবিইস্ট এর কথা কি বলছিলেন, যিনি মন্ত্রী, সরকার ও বিরোধী পক্ষ, বিচারক ও সংবাদ মাধ্যমের প্রতিনিধিদের তাঁর আঁচলের তলায় রেখেছেন? যখন তিনি দুর্নীতিপরায়ণ গণতন্ত্রর কথা বলছিলেন, তিনি কি তখন সরকার ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সহায়তাপুষ্ট সেইসব অতি ধনী কর্পোরেট হাউসের কথা বলছিলেন, যারা শাস্তির ভয়মুক্ত হয়ে আইন ভাঙে, গণতন্ত্রকে অস্বীকার করে, দেশের অমূল্য সম্পদ লুঠ করে? ঠিক যেরকম দুর্নীতি পরায়ণ গণতন্ত্র গড়ে উঠেছিল দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোতে? না, এসব টাটা বলছিলেন না। তিনি বলছিলেন একজন কর্পোরেট লবিইস্ট এর ফোন ট্যাপ হওয়া এবং তার ‘ব্যক্তিগত’ কথা মিডিয়ায় ফাঁস হবার কথা। তিনি বোঝাতে চাইছিলেন অন্য কিছু প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানীর স্বার্থে টাটার ভাবমূর্তি ম্লান করার কথা।
টাটা সতর্কবাণী দিয়েছেন, ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতার মতো তথাকথিত গণতান্ত্রিক অধিকার ইত্যাদির নামে যদি আমরা গণতন্ত্রবিলাস এর অপব্যবহার করি’, তবে ভারত এমন একটা দেশে পরিণত হবে, যেখানে মানুষ ‘যথাযথ প্রমাণ ছাড়াই জেলে যাবে বা তাদের দেহ গাড়ির ট্রাঙ্কে পাওয়া যাবে। এটা কৌতূহলজনক ব্যাপার যে মত প্রকাশের স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক অধিকার এবং সাধারণভাবে গণতন্ত্রকেই টাটা বিলাস বলে উল্লেখ করেছেন। সিঙ্গুরের কৃষক বা কলিঙ্গনগরের আদিবাসীরা সেই জগৎ সম্পর্কে টাটাকে শেখাতে পারে, যেখানে জমি অধিগ্রহণের মত স্বার্থবাহী বিষয়ে শক্তিশালী কর্পোরেটদের চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিলে বিরোধী আন্দোলনকারীদের ‘যথোপযুক্ত প্রমাণ ছাড়াই জেলে যেতে হয়’, জমিতে মরে পড়ে থাকতে হয় অথবা পুলিশের গুলি খেয়ে মরে যেতে হয়। টাটার দৃষ্টিতে কৃষক ও আদিবাসী জনগণের জীবন ও জীবিকার স্বার্থে কৃষি জমি রক্ষার লড়াই, প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ হল গণতান্ত্রিক বিলাস। অন্যদিকে টাটার মত ধনকুবেররা উপভোগ করবেন ব্যক্তিগত গোপনিয়তার গণতান্ত্রিক অধিকার এবং আদালতে গিয়ে ব্যক্তিগত গোপনিয়তার নামে প্রমাণ লোপের চেষ্টা করবেন।
বস্তুতপক্ষে রাডিয়া টেপ এবং উইকিলিকস এর ফাঁস হওয়া তথ্যাবলী দেখায় যে ভারত ইতোমধ্যেই অনৈতিক গণতন্ত্র বা ব্যানানা রিপাবলিক হবার রাস্তায় অনেকদূর এগিয়ে গেছে। এখানে কর্পোরেট ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলি কর্পোরেট স্বার্থ সুরক্ষিত রাখতে গণতন্ত্র ও জনাধিকারকে ধ্বংস করছে। যদি অবিলম্বে নব্যউদারনৈতিক নীতিসমূহকে পালটানো না যায় তা হলে অচিরেই ভারত একটি ব্যানানা রিপাবলিক বা অনৈতিক গণতন্ত্র হয়ে উঠবে। দক্ষিণ আমেরিকার পূর্বতন ব্যানানা রিপাবলিকগুলি এক নতুন জাগরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সেখানে জনপ্রিয় সরকার ও আন্দোলনগুলি সাম্রাজ্যবাদের শক্তিশালী ভূমিতে দাঁড়িয়েই তাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। ভারত তাদের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের সম্পদের সাম্রাজ্যবাদী লুন্ঠন, আমাদের সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রের বিপদের প্রশ্নে নয়া উদারনীতির বিরুদ্ধে সংকল্পবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলবে কিনা, সেটাই এখন প্রশ্ন।
কর্পোরেট লুঠকে সাহায্য করতে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস
সারা দেশ জুড়েই সরকারের সাহায্যে কর্পোরেটদের দ্বারা চলছে বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি ও জঙ্গল দখল। দখল চলছে খনি, আবাসন ও অন্যান্য নানা ধরণের প্রজেক্ট ও শিল্প স্থাপনার জন্য। প্রতিটি ক্ষেত্রেই ব্যাপকভাবে জমি আইনকে ভাঙা হয়েছে, আর সরকারি আধিকারিকরা চোখ বুজে থেকেছেন। কিন্তু এই কর্পোরেটকুল মদত পেয়েছে পুলিশি লাঠি গুলি আর দানবীয় আইনের। যারাই একে প্রশ্ন করতে গেছেন, তাদের পড়তে হয়েছে ব্যাপক নিপীড়ণের মুখে।
আদিবাসী ও কৃষক সম্প্রদায় জমি হারানোর মুখোমুখি হয়ে স্বাভাবিকভাবেই তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। কলিঙ্গনগর, জগৎসিঙ্ঘপুর, দাদরি, সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম, সোমপেটা, শ্রীকাকুলাম – সর্বত্রই তারা মুখোমুখি হয়েছেন পুলিশের নির্মম লাঠি গুলির। পুলিশি নিপীড়ণ ও সংগঠিত রাজনৈতিক হিংসার বলি হয়ে অনেকে হতাহত হয়েছেন। জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে অধিকাংশ জনপ্রিয় আন্দোলনই মাওবাদী ঘরাণার ছিল না, বরং ছিল জনতার সংগ্রাম। কিন্তু জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী সবাইকেই ‘মাওবাদী’ তকমা দিয়ে দেওয়া হয়েছে। আদিবাসীরা তাদের আবাসভূমি জঙ্গল থেকে উচ্ছেদ হচ্ছেন। ছত্তিশগড়ে মাওবাদী দমনের নামে ‘সালওয়া জুডুম’ নামধারী বাহিনী মাওবাদী দমনের নামে জোর করে হাজার হাজার আদিবাসীকে উচ্ছেদ করছে, ধর্ষণ, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে।
মাওবাদী দমনের নামে কেন্দ্রীয় সরকার, বিশেষ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক অপারেশন গ্রীন্ট হান্ট নামক সেনা হামলা নামিয়ে এনেছে। কিন্তু বোঝা যাচ্ছে মাওবাদের বাহানায় কর্পোরেট লুঠের স্বার্থে এটা আসলে গণপ্রতিরোধ আর প্রতিবাদী কন্ঠস্বরকেই নিশানা করেছে। বিনায়ক সেনের মত যারা কর্পোরেট লুঠ আর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের নীতির বিরোধিতা করেন, তাদের প্ররোচনাদাতা, সন্ত্রাসবাদীদের সমপর্যায়ভুক্ত বলে জেলে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বিনায়ক সেন সেইসব হাজার হাজার কর্মী ও সাধারণ মানুষেরই একজন, যিনি কর্পোরেটদের সম্পদ হরণের ঘটনাকে প্রশ্ন করায় কালা কানুনে বন্দী হয়ে জেলে গেছেন।
এটা মনে রাখা দরকার অপারেশন গ্রীন হান্ট নামিয়ে এনেছেন যে চিদাম্বরম, তিনি নিজেই ২০০৪ এ অর্থমন্ত্রী হবার আগের দিন পর্যন্ত বহুজাতিক মাইনিং কোম্পানী বেদান্ত এর অধিকর্তা ছিলেন।
চিদাম্বরমএর লোক সুপারিশ করেছেন কর্পোরেট এলাকাভুক্ত সেনাবাহিনীর
চিদাম্বরমের লক্ষ্য ও ভাবনাচিন্তা প্রকাশিত হয়েছে মাহিন্দ্রার বিশেষ পরিষেবার সি ই ও রঘুরামনের কথায়। এই রঘুরামন আবার চিদাম্বরমের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের পেটোয়া প্রজেক্ট ন্যাটগ্রিড এর মাথা, যারা গোয়েন্দা তথ্যাবলী সংযোজন করে। একটি রিপোর্ট এর রঘুরামন আশ্চর্যজনকভাবে তার সুপারিশে বলেছেন, কর্পোরেটদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে পা দেওয়ার সময় এসে গেছে। এই ভাবনার সমর্থনে তিনি আমেরিকা, ইজরায়েল এবং অন্যান্য দেশের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ব্যবস্থার উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি প্রস্তাব দিয়েছেন কর্পোরেটদের নিজেদের নিরাপত্তা বাহিনী গড়ে তোলার অনুমতি দেওয়া হোক। বলেছেন ব্যবসায়ী সম্রাটরা যদি এখনই তাদের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য রক্ষায় এগিয়ে না আসে, তাহলে তাদের হয়ত দেখতে হবে তাদের সাম্রাজ্যর সীমারেখা ভেঙে যাচ্ছে।
কর্পোরেটদের নিজেদের নিজস্ব সেনাবাহিনী রাখা আর দূরের কোন কষ্টকল্পনা নয়। বস্তার, রায়গড়া, সিঙ্গুর বা জগৎসিঙ্ঘপুরে শাসক রাজনৈতিক দলের সহায়তায় কর্পোরেটরা প্রতিবাদীদের ভয় দেখানো ও জোর করে কাজ হাসিল করার জন্য নিজস্ব সশস্ত্র গোষ্ঠী গড়েই নিয়েছিল। অপারেশন গ্রীন হান্টও একটা এমন দৃষ্টান্ত যেখানে ভারতের পুলিশ ও আধাসেনাকে কর্পোরেট সম্রাটদের সাম্রাজ্য রক্ষায় ব্যবহার করা হচ্ছে।
১৮. ২৬ শে জুন, ২০১১ রাত ১১:০৫
সৌভিক ঘোষাল বলেছেন: ওপরের লেখাটি (ভুলবশত দুবার পাঠানো হয়েছে) ভারত রাষ্ট্রের চরিত্রকে আর এক দিক থেকে দেখা। আপনার লেখাটি ভালো লেগেছে, উপকৃত হয়েছি আপনার ভাবনার সাথে পরিচিত হয়ে। কুম্ভীলকবৃত্তি হিসেবে নয়, কিন্তু পাঁচপর্বের লেখাটিকে আমরা অনেকেই জ্ঞানত অজ্ঞানত হয়ত নানাকাজে ব্যবহার করব। আপনার সঙ্গে চিন্তাবিনিময়ে আগ্রহী।
২৮ শে জুন, ২০১১ রাত ১২:৪৭

লেখক বলেছেন: পড়ার জন্য ধন্যবাদ। আপনার লেখাটিও আমাকে সমৃদ্ধ করেছে ...
শুধু একটা প্রশ্ন : ব্রিটেনের মতো বনেদী সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের কর্ণধাররা যখন আমেরিকার শাসকদের নীতির সাথে প্রায় নতজানু হয়ে যুক্ত হন যে কারণে টনি ব্লেয়ারকে বুশের কুকুর বলেও নিজের দেশে গালাগাল করা হয় তখন দালাল বলতে ঠিক কি বোঝায় সেটা নিয়ে বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে যাই। আসলে আজকের এই তীব্র বাজার সংকটের যুগে এবং অনেকগুলো সমশক্তিধর দেশের মুখোমুখী অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে কোনো দেশের পক্ষেই একা বিশ্ব রাজনীতি-অর্থনীতীতে কর্তৃত্ব করার সুযোগ নেই। একে অপরের লেজ ধরতেই হয় .. যে কারণে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমেরিকাকেও ভারতের লেজ ধরতে হয়। উদাহরণ বাংলাদেশ। বাংলাদেশকে ঘিরে মার্কিন পরিকল্পনা যাই থাকুক, ভারতকে নাখোশ করে সে কিছুই করতে পারছে না। এটা আমরা বাংলাদেশের বুকে বসে খুব স্পষ্ট টের পাচ্ছি।

 

মোট সময় লেগেছে ১.১৪৩০ সেকেন্ড

 

সামহোয়‍্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...
© সামহোয়্যার ইন...নেট লিমিটেড | ব্যবহারের শর্তাবলী | গোপনীয়তার নীতি
'আগুনের ছবি দেখতে আগুনের মতো দেখালেও পোড়াবার ক্ষমতা থাকে না' _ আহমদ ছফা
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ

    কোন বিভাগ নেই