টিপাইমুখ ড্যামে বাংলাদেশের কোনো ক্ষতি হবে না : সংসদীয় দলের ঘোষণা
দেশবাসী কি নিশ্চিত হতে পারে?
[প্রথমেই বলা দরকার, এটি আমার লেখা নয়। এটি প্রকাশিত হয়েছে মাসিক ভ্যানগার্ডের চলতি সংখ্যায় (আগস্ট ২০০৯ ।। দ্বাদশ বর্ষ - দশম সংখ্যা)। সেখান থেকেই আমি লেখাটি ব্লগের পাঠকদের জন্য তুলে ধরছি। টিপাইবাঁধ নিয়ে চলমান তর্ক-বিতর্কে এ লেখা খানিকটা চিন্তার খোরাক যোগাবে, এটা আমার বিশ্বাস। ]
সাবেক পানিসম্পদ মন্ত্রী এবং পানিসম্পদ বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর হবে -- এমন কোনো প্রকল্প ভারত বাস্তবায়ন করবে না বলে ‘তাঁরা’ নিশ্চিত হয়েছেন। ‘তাঁরা’ মানে তাঁর নেতৃত্বে গঠিত ভারতের টিপাইমুখ বাঁধ সফরকারী বাংলাদেশের সংসদীয় প্রতিনিধি দল। গত ২৯ জুলাই তাঁরা টিপাইমুখ বাঁধ পরিদর্শনে ভারতে যান। ফিরে এসেছেন ৪ আগস্ট। ওই দিনই জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সামনে তিনি এ কথা বলেন। তিনি আরও বলেছেন, “ভারত সেচের জন্য সেখানে কোনো ব্যারাজ করবে না বলেও আমাদের নিশ্চিত করেছে।” তিনি বেশ আশ্বস্ত হওয়ার সুরে বলেছেন, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তাঁদের জানিয়েছে, বিদ্যুতের জন্য বাঁধ নির্মাণ করা হলে সুরমা ও কুশিয়ারাতে আগে যে পানি আসত, তা আরও বাড়বে।
হেলিকপ্টারযোগে দু’দিন চেষ্টার পরও তাঁরা প্রকল্প এলাকায় নামতে পারেননি। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া বাধ সেধেছে। তার পরও তিনি দাবি করেছেন, তাদের সফর শতভাগ সফল হয়েছে। তাদের এ ‘শতভাগ সাফল্যে’ প্রবুদ্ধ হয়ে আমরা কি এখন নাকে তেল দিয়ে ঘুমাতে পারি? ঘুমানোর আগে চাইলে ওই সংসদীয় প্রতিনিধি দলকে একটা জাতীয় সংবর্ধনা দেয়া যায়। কারণ, তাঁরা, জনাব আব্দুর রাজ্জাকের দাবি অনুসারে, টিপাই প্রকল্প সম্পর্কে এমনসব তথ্য আদায় করে এনেছেন যা গত ২৫/৩০ বছরে কেউ করতে পারেনি। নিঃসন্দেহে এ এক বীরোচিত কাজ বৈকি!
টিপাইমুখ সফরকারী সংসদীয় প্রতিনিধি দলে যারা ছিলেন তাঁদের সবাই সরকার দলীয় বা সরকার সংশ্লিষ্ট লোক। তাই জনাব রাজ্জাকের বক্তব্যের সাথে প্রতিনিধি দলের অন্য কারোরই দ্বিমত থাকার কথা নয়। বাস্তবেও তা-ই দেখা গেছে। ওই টিমের অন্যতম সদস্য জাতীয় পার্টির সাংসদ রুহুল আমিন হাওলাদারও বলেছেন, আমাদের কোনো ক্ষতি হবে না বলে ভারত তাঁদের আশ্বস্ত করেছে। তাই ওই টিমের বক্তব্য থেকে টিপাইবাঁধ সম্পর্কে সরকারের অবস্থানটাও বোঝা যায়।
মজার ব্যাপার হল, জনাব আব্দুর রাজ্জাক ভারত সফরে যাওয়ার প্রাক্কালেও ওই একই কথা বলে গিয়েছিলেন। তিনি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, টিপাইবাঁধটা যদি ব্যারাজ হয় তাহলে তাঁরা এর প্রবল বিরোধিতা করবেন; আর যদি তা ড্যাম হয় তাহলে তাঁরা ভারতের কাছে এ সম্পর্কিত তথ্য-উপাত্ত চাইবেন। অর্থাৎ টিপাইমুখে ড্যাম হলে তাঁরা কোনো আপত্তি করবেন না। তাঁদের ধারণা ব্যারাজ বাংলাদেশের ক্ষতি করলেও ড্যাম বাংলাদেশের কোন ক্ষতি করবে না। এমনকি তাঁরা এ-ও বলেছেন যে, ড্যাম আমাদের উপকার করবে। তাঁদের মতে টিপাই ড্যাম নাকি সুরমা-কুশিয়ারা অববাহিকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ করবে, শীত মওসুমে পানি প্রবাহ বাড়াবে এবং উপরি পাওনা হিসেবে আমরাও ওখান থেকে বিদ্যুৎ পাব। এত এত লাভের দিকে না তাকিয়ে টিপাইবাঁধের বিরোধিতা করাটা হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলা নয় কি? তাই হয়তো তাঁরা একেবারে ভারত সরকারের কথাগুলোই আওড়ে যাচ্ছেন।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত পিনাকরঞ্জন চক্রবর্ত্তীও একাধিকবার বলেছেন, টিপাইমুখে ড্যাম হবে, ব্যারাজ হবে না; এতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ হবে, শীতকালে পানি প্রবাহ বাড়বে ইত্যাদি ইত্যাদি। মিশরে সাম্প্রতিক ন্যাম সম্মেলন চলাকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে বলেছিলেন, বাংলাদেশের ক্ষতি হয় এমন কোনো পদক্ষেপ ভারত নেবে না। এই একই কথার প্রতিধ্বনি শোনা গেছে জনাব রাজ্জাকের কণ্ঠে। তিনি সফর থেকে ফিরে ৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করে বলেছেন, ভারত তাকে আশ্বস্ত করেছে বাংলাদেশের ক্ষতি হয় এমন কোনো কিছুই ভারত করবে না।
এ কথাগুলো শুধু জনাব রাজ্জাক নয়, অনেক মন্ত্রীর মুখেও শোনা গেছে। পানিসম্পদমন্ত্রী রমেশ সেন, বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনির মুখে বহুবার শোনা গেছে -- ভারত বাংলাদেশের বন্ধু, তারা বাংলাদেশের ক্ষতি হয় এমন কিছু করবে না। কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেছেন, আমরা আলোচনার মাধ্যমে গঙ্গার পানির হিস্যা আদায় করেছি, এখানেও তা করা হবে। কিছুদিন আগে এক ভাষণে প্রধানমন্ত্রীও এমনই একটা কথা বলেছিলেন। বোঝা যায়, টিপাইবাঁধ নিয়ে বর্তমান সরকারের মাথায় খুব একটা ব্যাথা নেই, বরং এ নিয়ে জনগণের বিভিন্ন অংশের মধ্যে যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার সৃষ্টি হয়েছে সেটাই তাদেরকে একটু বিব্রত করছে; যে জন্যে যে-কোনো উপায়ে জনগণকে এ ব্যাপারে প্রবোধ দেওয়াটাই তাঁদের কৌশল হয়ে দাঁড়িয়েছে। লোকেরা যখন ফারাক্কার দুর্গতির কথা তুলছেন, তখন তাঁরা বলছেন, টিপাইমুখে তো ব্যারাজ হবে না, ড্যাম হবে। তাঁরা বলতে চাচ্ছেন -- ব্যারাজ? না। ড্যাম? হাঁ। তাঁরা ব্যারাজের তাৎক্ষণিক ক্ষতিকে দেখছেন, ড্যামের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতিকে হিসেবের মধ্যে আনছেন না। অথচ, ওয়ার্ল্ড কমিশন অন ড্যামস-এর রিপোর্ট দেখে বোঝা যায়, শুধু ব্যারাজ নয় নিছক কিছু আর্থিক ও কারিগরি সমীক্ষার ভিত্তিতে বানানো ড্যামেরও ক্ষতিকর প্রভাব কতটা সুদূরপ্রসারী হতে পারে।
ভারত আমাদের ‘বন্ধু’ -- এ কথাটা শুনতে শুনতে কান পঁচে যাবার যোগাড় হয়েছে। আচ্ছা, একজন বন্ধুর বৈশিষ্ট্য কী? বন্ধু বন্ধুর স্বার্থ দেখতে না পারুক, অন্তত কথা দিয়ে তো কথা রাখবে। কিন্তু, ভারত ১৯৭২ সাল থেকে বাংলাদেশকে দেওয়া কোন কথাটা রেখেছে? ফারাক্কা ব্যারাজ চালুর সময় ভারত বলেছিল, এটা চালু হচ্ছে পরীক্ষামূলকভাবে, বাংলাদেশের জন্য তা কোনো ক্ষতির কারণ হবে না। কিন্তু বাস্তবতা কী বলে? ফারাক্কার প্রভাবে পদ্মা অববাহিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল মরুকরণের হুমকির মুখে পড়েছে। ’৭৪ এর মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি অনুসারে তিনবিঘা করিডোর ওই বছরই বাংলাদেশের কাছে হস্তানন্তর করার কথা; কিন্তু আজও তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফিরিস্তি না বাড়িয়ে সর্বশেষ '৯৬ সালের পানিচুক্তির কথা বলা যায়। আজ পর্যন্ত কোনো শুষ্ক মওসুমে ভারত বাংলাদেশকে চুক্তি মতো পানি দেয়নি। ওই চুক্তিতে বলা আছে, যে কোনো নদীতে কোনো স্থাপনা গড়তে হলে ভারতকে বাংলাদেশের সম্মতি নিতে হবে। কিন্তু তিস্তার উজানে গজলডোবাতে বাঁধ দেওয়ার আগে তো দূরের কথা, পরেও বাংলাদেশেকে কিছু জানানো হয়নি।
টিপাইমুখ বাঁধ নিয়েও ভারত একটা লুকোচুরি খেলায় লিপ্ত হয়েছে। নিজে থেকে তো কিছু জানায়ইনি, জনগণের চাপে বাংলাদেশ সরকার যখন জানতে চেয়েছে তখনও উপরে বর্ণিত কথাগুলো শুনিয়ে দেওয়া ছাড়া ভারত আর কিছু জানাচ্ছে না। রাজ্জাক সাহেব ‘অনেক তথ্য আদায়ের’ দাবি করলেও, জানা গেছে, বাঁধের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ্য-উচ্চতা এবং এ ধরনের আরও কিছু তথ্য -যা বাঁধ নির্মাণের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা 'নর্থ ইস্টার্ন ইলেকট্রিক পাওয়ার করপোরেশন' বা 'নিপকো’র ওয়েবসাইটে বেশ কিছুদিন ধরেই ঝুলছে- তার বাইরে কিছুই দেয়নি ভারত। আরও বিস্ময়কর হল, বাংলাদেশের পড়্গ থেকে ভারতকে টিপাইবাঁধের ওপর যৌথ সমীড়্গা চালানোর প্রসত্মাব দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু ভারত তাতে কর্ণপাতও করেনি। অথচ রাজ্জাক সাহেব তা বেমালুম চেপে গিয়ে বলছেন, তাদের সফর শতভাগ সফল হয়েছে।
আসলে যৌথ সমীক্ষ চালাবে কি, ভারত তার নিজ অংশেও টিপাইবাঁধের প্রভাব সম্পর্কে ভালভাবে সমীক্ষা চালায়নি। যে সমীক্ষা প্রতিবেদনটি নিপকো তাদের ওয়েবসাইটে দিয়েছে, বিশেষজ্ঞদের মতে তা খুবই দায়সারা এবং ওপর ওপর গোছের, কোনোমতেই বস্তুনিষ্ঠ নয়। মণিপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সাবেক রেজিস্ট্রার ও পরিবেশ বিজ্ঞানী অভিযোগ করেছেন, নিপকো পরিবেশের ওপর টিপাইবাঁধের প্রভাব সম্পর্কে প্রতিবেদন তৈরি করেছে স্থানীয় জনগণ বা পরিবেশ বিজ্ঞানীদের সাথে কোনো কথা বলা ছাড়াই। তিনি বলেছেন, বাঁধের জন্য যে স্থানটিকে বেছে নেওয়া হয়েছে সেটি রিখ্টার স্কেলে ৭ (কখনো ৮) মাত্রার ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা। এ জায়গায় ভূ-তাত্ত্বিক ভারতীয় প্লেটটি বর্মী প্লেটটির নিচে ঢুকে গেছে। ফলে এখানে একটা বিচ্যুতি বা ফল্ট তৈরি হয়েছে। এটাকে বলা হচ্ছে তাইতু ফল্ট। এ কারণে যে কোনো সময় এখানে বড় ধরনের ভূমিকম্প ঘটার আশংকা আছে। এ ধরনের ভূমিকম্প হলে প্রায় ১৮০ মিটার উঁচু বাঁধ ভেঙে বিপুল জলরাশি আমাদের বৃহত্তর সিলেটসহ বিস্তীর্ণ এলাকা সয়লাব করে দেবে। কিন্তু নিপকো এ বিষয়টিকে ধর্তব্যের মধ্যেই নেয়নি।
মণিপুরী বিশেষজ্ঞদের মতে, নিপকো তাদের সমীক্ষায় টিপাইবাঁধ বরাক নদীর ভাটিতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ করবে বলে যে কথা বলেছে তা ঠিক নয়। সেখানে বর্ষাকালে যে পরিমাণ বৃষ্টি হয় তার মাত্র ২০ ভাগ ধরে রাখা সম্ভব হবে বলে তাঁরা মনে করেন। বাকিটা ছেড়ে দিতে হবে। অতএব, অস্বাভাবিক বর্ষণজণিত বন্যা আটকানো যাবে না। আবার, কোনো বছর বৃষ্টি কম হলে এ ২০ ভাগ পানির ঘাটতি কি বাংলাদেশের জন্য উল্টো ফল বয়ে আনবে না? টিপাইবাঁধ থেকে নিপকোর বিদ্যুৎ উৎপাদনের হিসাবের সাথেও তাঁরা ভিন্নমত পোষণ করেন। নিপকো বলেছে ১৫০০ মেগাওয়াট, আর ওই বিশেষজ্ঞরা বলছেন ৪০০-৪৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। হিসেবের এই গড়মিলটা ভাল করে বোঝা দরকার। কারণ আমাদের সরকার প্রচার করে বেড়াচ্ছে সেখান থেকে আমরা বিদ্যুৎ পাব। কিন্তু কীভাবে তা সম্ভব হবে? ইতোমধ্যে ভারত সরকার মণিপুরী জনগণকে প্রবোধ দেওয়ার জন্য ঘোষণা দিয়েছে তাদেরকে টিপাইবাঁধের ১২ শতাংশ বিদ্যুৎ বিনামূল্যে দেওয়া হবে। উপরন্তু, সবাই জানেন, একটা উদীয়মান পরাশক্তি হিসেবে ভারতের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ক্ষুধা কী ভীষণ। এ জন্য পারলে সে আশে পাশের সমস্ত দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ শুষে নেয়। নির্দ্বিধায় বলা যায়, ওই বিদ্যুৎ ভারত তার জাতীয় গ্রিডে দিয়ে দিবে। এমনকি মনিপুরকে দেওয়ার ঘোষণাও বাস্তবায়ন করবে না। এই আশঙ্কাটা মনিপুরের ওই বিশেষজ্ঞদের। তাঁরা তাঁদের এ শঙ্কার সমর্থনে একটা উদাহরণও দিয়েছেন। মনিপুরের লোকতাক পানি বিদ্যুৎ প্রকল্পে ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। কিন্তু এ থেকে মাত্র ১৮/২০ মেগাওয়াট মনিপুরকে দিয়ে বাকি পুরোটাই জাতীয় গ্রিডে চলে যায়। তাঁরা খুব দুঃখ করে বলছেন, বর্তমানে মনিপুরের প্রয়োজন ২০০ মেগাওয়াট। ওই ১৮/২০ মেগাওয়াট তাদের কিছুই হয় না। রাত হলে সেখানে এখনও নেমে আসে সেই আদিম অন্ধকার।
টিপাইবাঁধ হলে সুরমা-কুশিয়ারায় শীত মৌসুমে পানি প্রবাহ বাড়বে বলে যে কথা বলা হচ্ছে সেটাও হিতে বিপরীত ফল বয়ে আনতে পারে। বিশিষ্ট পানি বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত বলেছেন, এর ফলে হাওরাঞ্চলে স্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে। তাঁর মতে, হাওরাঞ্চলের মানুষ শীতকালে পানি টান দিলে বোরো চাষে নেমে পড়েন। হাওরের পলি-পড়া জমিতে চাষীরা শুধু এ ফসলটাই আবাদ করতে পারেন। কিন্তু ওই সময় পানি প্রবাহ বেড়ে গেলে জলাবদ্ধতার কারণে এ ধান চাষ বন্ধ হয়ে যাবে। চাষীরা তখন পথে বসবে। তাছাড়া শতশত বছরের একটা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ওই অঞ্চলে যে জীববৈচিত্র্য গড়ে উঠেছে, যা নিয়ে আমরা সবাই গর্ব করি -- তা-ও কি এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না?
আমাদের মনে হয়, বারাক-সুরমা-কুশিয়ারার অববাহিকায় টিপাইবাঁধের প্রভাব নিয়ে ব্যাপক একটা যৌথ সমীক্ষা চালানো দরকার ছিল। তাহলে যেসব সমস্যা আলোচিত হল সেগুলো সম্পর্কে একটা স্বচ্ছ ধারণা বেরিয়ে আসত। কিন্তু ভারতের এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেই। বাংলাদেশের সরকারও ভারতকে রাজী করাতে খুব একটা তৎপর নয়।
আমাদের কাছে বাংলাদেশ সরকারের এই নিষ্ক্রিয়তাই সবচেয়ে উদ্বেগজনক বলে মনে হয়। শুধু বর্তমান সরকার নয়, অতীতের সব সরকারেরই সময়ে এই পরিস্থিতি দেখা গেছে। যেমন, ভারতের সাথে যৌথ নদী কমিশন (জে.আর.সি) গঠিত হয়েছে স্বাধীনতার পরপর। নিয়ম অনুসারে জে.আর.সি’র বৈঠক অন্তত বছরে দু’বার হবার কথা এবং এতে সব আন্তর্জাতিক নদী নিয়ে আলোচনা ওঠার কথা। কিন্তু গত ৩৮ বছরে মাত্র ৩৬টা জেআরসি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে; গড়ে বছরে একটাও নয়। এ ক্ষেত্রে ভারতের অনাগ্রহ আছে ঠিক, কিন্তু বাংলাদেশ সরকার এ নিয়ে কতটুকু পীড়াপীড়ি করেছে? বিগত বিএনপি-জামাত জোট সরকারের পুরো পাঁচ বছরে জেআরসি মাত্র দু’বার বসেছে। এর মধ্যে তৎকালীণ পানিসম্পদমন্ত্রী হাফিজউদ্দীন বলেছেন, তাদের প্রধানমন্ত্রী তখন টিপাইবাঁধের ব্যাপারে ভারত সরকারকে একটা চিঠি দিয়েছিলেন। ভারত এর কোনো জবাব দেয়নি। কিন্তু, এটুকুতেই একটা কথিত জাতীয়তাবাদী সরকারের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়? তারা এখন হেন করেঙ্গা তেন করেঙ্গা বলে রণহুঙ্কার ছাড়ছেন। কিন্তু একটু খেয়াল করলেই বোঝা যায়, টিপাইবাঁধ প্রতিরোধের চেয়েও তাদের লক্ষ্য কথিত ভারত-বিরোধিতার আড়ালে সাম্প্রদায়িক সুড়সুড়ি দিয়ে ফায়দা লোটা, নিজেদের বেকায়দা দশা থেকে উতরিয়ে আনা।
জাতিসংঘের সাবেক পানি বিশেষজ্ঞ এস আই খান বলেছেন, মেঘনার উজানে ভারত ২২টির মধ্যে ১৮টি নদীতে বাঁধ দিয়েছে। এ নিয়ে কোনো সরকার কোনো প্রশ্ন তোলেনি! তিনি হিসাব করে দেখিয়েছেন, ভারত বিভিন্ন বাঁধ ও জলাধার তৈরি করে প্রায় ৬ হাজার ৩৭৩ বিলিয়ন ঘনমিটার (বিসিএম) পানি আটকে রেখেছে। এটা তাদের বাৎসরিক প্রয়োজনের প্রায় ৭ গুণ। শুধু গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনার উজানেই ৮০০ বিসিএম পানি সরিয়ে নেয় তারা। এর ফলে বাংলাদেশ তার বাৎসরিক চাহিদার (১৩৪৬ বিসিএম) মাত্র ৪০ শতাংশ পানি পায়। কিন্তু, এ ব্যাপারে সামরিক-বেসামরিক নির্বাচিত-অনির্বাচিত কোনো সরকারকেই খুব একটা উচ্চবাচ্চ করতে দেখা যায় নি।
না কাঁদলে নাকি মা-ও দুধ দেয় না। ভারত তো একটা সাম্রাজ্যবাদী দেশ, ইদানিং আবার তার পরাশক্তি হওয়ার খায়েশ জেগেছে। ফলে আশেপাশে যেখানে যত সম্পদ আছে সবই কুক্ষিগত করার একটা চেষ্টায় আছে সে। এজন্য সকল আন্তর্জাতিক রীতি-নীতি আইন বা চুক্তিকে পায়ে দলার একটা প্রয়াস আছে তার। উন্নয়নের নামে এক উন্মাদনায় মেতে আছে দেশটির শাসকশ্রেণী। এর মাধ্যমে তারা একদিকে জনগণের অর্থ তসরূপ করে নিজেদের পকেট ভারী করছে, আরেকদিকে জনগণের দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে। আর এর বিরুদ্ধে জনগণের প্রতিবাদ-বিক্ষোভকেও তোয়াক্কা করছে না তারা। টিপাইবাঁধের বেলায়ও যা দেখা যাচ্ছে। মণিপুর-আসাম-মিজোরামের জনগণ টিপাইবাঁধের নানা ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে ইতোমধ্যেই সংগঠিত প্রতিবাদ করে চলেছেন। সম্প্রতি মণিপুরে ৬৪টি রাজনৈতিক-সামাজিক সংগঠনের সম্মিলিত উদ্যোগে দু’দফা হরতাল পালিত হয়েছে। কিন্তু ভারত সরকার এটাকে হিসাবে নিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। মণিপুরবাসীর আশংকা, হয়তো সেনাবাহিনী নামিয়ে সরকার এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। এ অবস্থায় বাংলাদেশ যদি, প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিয়ে হলেও, যথেষ্ট সোচ্চার হয় তাহলে হয়তো ভারত একটু নমনীয় হতে পারে। কিন্তু, ইতোমধ্যেই এটা পরিষ্কার হয়ে গেছে যে বাংলাদেশের শাসকশ্রেণী নিজে থেকে এ নিয়ে খুব একটা সরব হবে না। কারণ পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থায় টিকে থাকার জন্য তারা আমেরিকার পাশাপাশি ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদের সাথেও গাঁটছড়া বেঁধে আছে। তাই বাংলাদেশের বামপন্থি দলগুলোকে সচেতন, গণতন্ত্রমনা ও অসাম্প্রদায়িক শক্তিসমূহকে ঐক্যবদ্ধ করেই এগিয়ে যেতে হবে।
টিপাইবাঁধ প্রতিরোধে সিলেটে বাসদের পদযাত্রা
ভারত কর্তৃক টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে বাসদ সিলেট জেলার উদ্যোগে ২৫ জুলাই এক বর্ণাঢ্য পদযাত্রার আয়োজন করা হয়। সিলেট জেলা বাসদ সমন্বয়ক উজ্জ্বল রায়ের সভাপতিত্বে সকাল ১১টায় উদ্বোধনী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় জেলার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। বক্তব্য রাখেন টিপাইমুখ বাঁধ প্রতিরোধ আন্দোলন, সিলেটের আহ্বায়ক সিপিবি সিলেট জেলার সভাপতি এড. বেদানন্দ ভট্টাচার্য্য, গণতন্ত্রী পার্টি সিলেট জেলার সভাপতি ব্যারিস্টার মো: আরশ আলী, সাধারণ সম্পাদক মো: আরিফ মিয়া, ওয়ার্কার্স পার্টির সিকান্দর আলী, বাসদ নেতা এড. হুমায়ুন রশীদ সোয়েব, সুশান্ত সিনহা সুমন, চা শ্রমিক নেতা হৃতেশ মোদি, মহিলা ফোরাম নেত্রী ডা. ফাতেমা ইয়াছমিন ইমা, রনেন সরকার রনি, ছাত্র ফ্রন্ট নেতা আবদুল্লাহ-আল-মামুন, উজ্জ্বল রায়, কপিল রায় প্রমুখ।
নারায়ণগঞ্জে আলোচনা সভা
টিপাইবাধঁ নির্মাণের প্রতিবাদে ৮ আগস্ট বিকাল ৫টায় বাসদ নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার উদ্যোগে আলী আহম্মদ চুনকা পৌর পাঠাগারে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা সভায় প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কমরেড খালেকুজ্জামান। আরো আলোচনা করেন বিশিষ্ট পানি বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক, বজলুর রশিদ ফিরোজ, এড. মাহবুবুর রহমান ইসমাইল, অসিত বরণ বিশ্বাস। আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন আবু নাঈম খান বিপ্লব।
গোবিন্দপুরে বিক্ষোভ
টিপাইমুখে বাঁধ নির্মাণের প্রতিবাদে কিশোরগঞ্জ গোবিন্দপুরে ২১ জুলাই বিকেল ৩টায় বাসদের উদ্যোগে মিছিল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। গোবিন্দপুর স্কুলের সামনে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন হোসেনপুর উপজেলা বাসদের আহ্বায়ক আলাল মিয়া, খাইরুল ইসলাম ফকির ও মো: রায়হান আকন্দ।
সীতাকুণ্ডে মানববন্ধন
১০ আগস্ট সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট সীতাকুণ্ড থানা শাখার উদ্যোগে এক মানববন্ধন ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বাসদ সীতাকুণ্ড থানার সংগঠক নাসিরুদ্দিন শিবলু, ছাত্র ফ্রন্ট চট্টগ্রাম নগর শাখার সহ-সভাপতি আল কাদেরী জয়, সীতাকুণ্ড থানা শাখার সভাপতি শামসুদ্দীন মুরাদ ও সাধারণ সম্পাদক মিঠুন ভট্টাচার্য্য।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই আগস্ট, ২০০৯ রাত ৩:০৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


