আমি আমাদের বইটি ধারাবাহিকভাবে এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করব।
ভূমিকা
বাংলাদেশে দারিদ্র্য-দূরীকরণ, ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম, এনজিও(NGO)দের ভূমিকা ইত্যাদি বেশ আলোচিত প্রসঙ্গ। এনজিওদের দারিদ্র-দূরীকরণ কর্মসূচির পক্ষে-বিপক্ষে নানা মত আছে। কিন্তু এর অধিকাংশই যতটা আবেগতাড়িত কিংবা কায়েমী-স্বার্থের সাথে সংশ্লিষ্ট ততটা আর্থ-সামাজিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নির্ভর, রাজনৈতিক-দার্শনিক বিচার নির্ভর নয়। এ ঘাটতি পূরণ করার উদ্দেশ্যেই, এনজিওদের শীর্ষস্থানীয় গ্রামীণ ব্যাংক এবং এর প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহাম্মদ ইউনূস-এর তত্ত্ব ও কার্যক্রম নিয়ে, বিশ্লেষণধর্মী একটি লেখা প্রায় এক দশক আগে প্রস্তুত করা হয়েছিল। কিন্তু তা সর্বসাধারণে প্রকাশ করা হয়ে ওঠেনি।
এরপর গত ২০০৬ সালের অক্টোবরে গ্রামীণ ব্যাংক এবং ড. ইউনূস যখন নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হল, বিষয়টি পুনরায় সামনে চলে আসে এবং পুরনো ওই লেখাটিকে নতুন করে সংযোজন-বিয়োজনের মাধ্যমে পুস্তিকা আকারে প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ক্রমপরিবর্তনশীল পরিস্থিতির কারণে এবং সবশেষে জরুরি অবস্থা জারির প্রেক্ষাপটে সব ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়ায় বইটি আর প্রকাশ করা হয় নি।
আমাদের প্রত্যাশা, বইটি গ্রামীণ ব্যাংক, ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম এবং এনজিওদের ভূমিকা সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ উপলব্ধি গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)
কেন্দ্রীয় কমিটি
ফেব্রুয়ারি ২০০৯
নোবেল শান্তি পুরস্কার : গ্রামীণ ব্যাংক ও ড. মুহাম্মদ ইউনূস
১৩ অক্টোবর ২০০৬ ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তার গ্রামীণ ব্যাংক নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে। এই খবরে গ্রামীণ ব্যাংকের ৬৪ লক্ষ ঋণগ্রহীতা এবং তাদের পরিবারের ৩ কোটি লোক উৎসাহে-উল্লাসে ফেটে পড়লে বাংলাদেশে উৎসবের বন্যা বয়ে যেত; তেমনটি হয়নি। তবে ৫ বার দুর্নীতির চ্যাম্পিয়ান খেতাবপ্রাপ্ত, দ্বি-দলীয় অসুস্থ রাজনীতির সহিংস পাল্টাপাল্টি হানাহানি, নানামুখী সংকটে জর্জরিত অশান্ত অবহেলিত দেশের মানুষ এ ধরনের সম্মান প্রাপ্তিতে, বিশেষত মিডিয়ার কল্যাণে কিছুটা হলেও গৌরব বোধ করেছে। সুশীল সমাজের একটা অংশ এ বিরল সম্মানের অধিকারী ব্যক্তিটিকে ধরে ও ঘিরে হতাশাগ্রস্ত জাতির ‘নতুন স্বপ্নে ও সংকল্পে ঘুরে দাঁড়াবার’ আওয়াজ তুলে নানা স্থানে সংবর্ধনা, আলোচনা ইত্যাদি অনুষ্ঠান করেছেন। দারিদ্র্য সকল অশান্তির মূল। তাই ড. ইউনূস প্রবর্তিত গ্রামীণ ব্যাংকের দারিদ্র্য-বিমোচন সাফল্যের পক্ষে নানা যুক্তি হাজির করে তারা শান্তি পুরস্কারের যথার্থতা প্রমাণেও সচেষ্ট হন। ড. ইউনূস নিজেও আবেগ আপ্লুত হয়ে তার এক সংবর্ধনা সভায় বলেছেন যে একদিনের আগ-পিছ ব্যবধানে অর্থাৎ ১৩ অক্টোবরের আগে পরে গোটা বাংলাদেশ বদলে গেছে, বাংলাদেশের মানুষের বুক গর্বে চওড়া হয়ে গেছে, গৌরবের অহংকারে বাঙালিরা ১০ ফুট লম্বা হয়ে গেছে, ইত্যাদি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান ও রাষ্ট্রপতি কর্তৃক ৫ নভেম্বর ’০৬ ড. ইউনূসকে রাষ্ট্রীয় সংবর্ধনা দেয়া হয়েছে। সেই সংবর্ধনা সভায় তিনি দাবি করেছেন, অতি উন্নত পুঁজিবাদী দেশ আমেরিকা থেকে চীনের মতো সমাজতান্ত্রিক দেশসহ ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে বিশ্বের প্রায় সকল রাষ্ট্রই আজ দারিদ্র্য-দূরীকরণের লক্ষ্যে গ্রামীণ ব্যাংকের মডেল অনুসরণ করছে।
৯ ডিসেম্বর ’০৬ জার্মানির একটি বিশেষ বিমান ভাড়া করে ৭৯ জনের বিশাল বাহিনী নিয়ে ড. ইউনূস নরওয়ের রাজধানী অসলোতে যান এবং ১০ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার গ্রহণ করেন। নোবেল পুরস্কার পাওয়ার কয়েকদিন পরই ড. ইউনূস দক্ষিণ কোরিয়ায় গিয়ে লাভ করেন সিউল শান্তি পুরস্কার। এর আগেও দেশী-বিদেশী ৬৮টি পুরস্কার, ১৫টি সম্মাননা এবং বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২৮টি সম্মানসূচক ডিগ্রি তিনি লাভ করেছেন। গ্রামীণ ব্যাংক পেয়েছে দেশী-বিদেশী ৮টি পুরস্কার।
ড. ইউনূসের ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্প অর্থাৎ গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে ইতোপূর্বে সীমিত পরিসরে আলোচনা-সমালোচনা-পর্যালোচনা থাকলেও নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রাপ্তির পরে তা ব্যাপক পরিসরে কৌতূহল ও জানা-বোঝার আগ্রহ সৃষ্টি করে। পক্ষে-বিপক্ষে নানা মতামতও ব্যক্ত হতে থাকে। ড. ইউনূস নোবেল পাওয়ার পর পরই চট্টগ্রাম বন্দরকে আন্তর্জাতিক মানের সমুদ্র বন্দরে রূপান্তরিত করে বহুজাতিকদের জন্য খুলে দিয়ে বাংলাদেশের ভাগ্য বদলে দেওয়ার ফর্মুলা বাতলে দেন। দ. কোরিয়ায় সিউল শান্তি পুরস্কার প্রাপ্তির পর তিনি কোরিয় ইপিজেড খোলার তাগিদ অনুভব করেন। বাংলাদেশের চরম রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সময় তিনি কোনো ভূমিকা না নিয়ে দেশের বাইরে অবস্থান নেন এবং বাইরে যাওয়ার প্রাক্কালে রাজনৈতিক দল করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। দেশে ফিরে পারস্পরিক খোঁচাখুঁচি না করে সকলকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের তাগিদ দেন। তারপর ২৯ নভেম্বর ঢাকা সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক প্রদত্ত সম্বর্ধনা সভায় তিনি উদ্ভূত সংকট নিরসনকল্পে বিবদমান দুই প্রধান বুর্জোয়া দলের মধ্যে আপসমূলক চুক্তির ৭ দফা প্রস্তাব পেশ করেন। কয়েক বছর আগে তিনি গণফোরামের প্রতিষ্ঠা সভায় তার স্বপ্নের দল কেমন হবে তার একটা আভাসও দিয়েছিলেন। কিছু কাল আগে তিনি সুশীল সমাজের পক্ষ হয়ে নির্বাচনে সৎ ও যোগ্য প্রার্থী জেতানোর আন্দোলনের ঘোষণা দিয়ে এক পর্যায়ে থেমে যান। নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার পর তিনি ফ্রান্সের তারকা ফুটবলার জিনেদিন জিদানকে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন ফ্রান্সের বিখ্যাত ডানোন কোম্পানির সাথে যৌথ কারবারে ‘গ্রামীণ-ডানোন’ শক্তি দই কারখানা উদ্বোধনের মাধ্যমে বিজ্ঞাপনী সাফল্য লাভের জন্য। সবকিছু মিলে মিশ্র ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া রয়েছে।
নোবেল নিয়ে নানা মত
দৈনিক সমকাল পত্রিকায় ২ কিস্তিতে ‘একটি নোট অব ডিসেন্ট’ শিরোনামে লেখা নিবন্ধে আবদুল গাফফার চৌধুরী প্রশ্ন তুলেছেন, “গ্রামীণ ব্যাংক যে কোনো মৌলিক গবেষণার ফসল নয় এবং বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে তা কোনো রূপান্তর ঘটাতে পারেনি, একথা জেনেই নোবেল পুরস্কার দান কমিটির নেপথ্যের অভিভাবকেরা অর্থনীতিতে ড. ইউনূসকে পুরস্কারটি দিতে সাহস করেন নি। এ জন্যই শান্তি পুরস্কারের আড়ালে তাকে পুরস্কৃত করা। নোবেল সাহিত্য পুরস্কারের চেয়েও শান্তি পুরস্কারটিকেই সাম্রাজ্যবাদী ও ধনবাদী পশ্চিমাগোষ্ঠি প্রথমে তাদের স্নায়ুযুদ্ধের এবং বর্তমানে তাদের আধিপত্যবাদী নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডারের অধিক শক্তিশালী অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করছে। যদিও বাংলাদেশের ভুক্তভোগী গ্রামীণ জনগোষ্ঠি জানে, বিশাল গ্রামবাংলায় শান্তি ও সমৃদ্ধি আনয়নে এই গ্রামীণ প্রকল্পটির অবদান খুবই সীমিত। ড. ইউনূস তার নিজের জেলা চট্টগ্রামের পার্বত্য এলাকায় দীর্ঘ পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে যে অশান্তি ও রক্তপাত চলেছে, সে সম্পর্কে একবারও মুখ খোলেননি, কিংবা সেখানে কিভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় তা নিয়েও মাথা ঘামাননি। কিংবা ভারতের ফারাক্কা বাঁধের ফলে উত্তরবঙ্গে পানির অভাবে নদীর নাব্যতা নষ্ট হয়ে এবং জলসেচের অভাবে জমির ফসল ধ্বংস হয়ে পৌণঃপুণিক ‘মঙ্গায়’ লাখ লাখ মানুষের দুর্ভোগের প্রতিকারকল্পে তার আন্তর্জাতিক মুরুব্বিদের সাহায্যে দেশটিতে শান্তি ও সমৃদ্ধি ফিরিয়ে আনারও কোনো প্রকল্প হাতে নেননি। এ ধরনের প্রকল্প নিয়ে কোনো চিন্তা-ভাবনাও তিনি করেননি। তিনি গ্রামের মানুষের দারিদ্র্য নিয়ে স্বল্পঋণ ও বিস্তর সুদের ব্যবসা করেছেন। তাহলে তিনি কী জন্য শান্তি পুরস্কার পেলেন?”
তিনি আরও লেখেন, “... গ্রামীণ ব্যাংক বা মাইক্রো ক্রেডিটের ফর্মুলা চালু হয় ড. ইউনূসেরও বহু আগে জার্মানির ব্রেমেন প্রভিন্সে। ইকো এন্টারপ্রাইজ (Iko enterprise) নামে একটি কোম্পানি এই মাইক্রো ক্রেডিটের ফর্মুলাটি উদ্ভাবন ও তদনুযায়ী ঋণদান পরিকল্পনা কার্যকর করে।
“এই ইকো এন্টারপ্রাইজ এখনো আছে। বাংলাদেশের গ্রামীণ ব্যাংক যে দাবি করে তারা বিনা গ্যারান্টিতে গরিবদের ঋণদানের ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছে সেই দাবিও সত্য নয়। অর্ধশতাব্দী আগেই জার্মানির ইকো এন্টারপ্রাইজ বিনা গ্যারান্টিতে ঋণদান প্রথা প্রবর্তন করে। তাদের ঋণ বা সুদের টাকা আদায়ে কেউ ব্যর্থ হলে (এই প্রজেক্টের ঋণগ্রহীতাদেরও বেশীরভাগ নারী) তাদের উপর বাংলাদেশের কায়দায় নির্যাতন করা হয় না, কিংবা তাদের ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদের সরাসরি ব্যবস্থা করা হয় না।
“ব্রেমেন প্রভিন্সের মাইক্রো ক্রেডিট প্রজেক্টে উৎসাহিত হয়ে জার্মানির আরেকটি প্রদেশ ব্যাডেন ডুটেমবার্গেও ((Baden Waremberg) এ ধরনের প্রজেক্ট প্রবর্তনে উৎসাহিত হয়েছিলেন এরভিন টয়ফেল (Erwin Teufel) নামে এক ভদ্রলোক। চার-পাঁচ বছর আগে ড. ইউনূস তাকে অতি উৎসাহে বাংলাদেশে আমন্ত্রণ করে নিয়ে এসেছিলেন তার গ্রামীণ ব্যাংকের সাফল্য দেখানোর জন্য। টয়ফেল দেশে ফিরে গিয়ে জানান, ‘এটা তাদের জন্য উপকারী কোনো প্রজেক্ট নয়’ (Not a useful project for us)। পৃথিবীর আরো কয়েকটি দেশে এ ধরনের প্রজেক্ট চালু ছিল এবং এখনও আছে। কোথাও ব্যাপক সাফল্য লাভের প্রমাণ পাওয়া যায় নি। ... ... ফিলিপাইনের এক অর্থনীতিবিদ বলেছেন, ‘বাংলাদেশের এ ব্যবস্থাটি দারিদ্র্যমোচনের নামে কার্পেটের তলায় দারিদ্র্য লুকিয়ে রাখার মতো। গরিব লোকদের সামান্য অংকের ঋণ দিয়ে উচ্চ সুদ আদায় করে অল্প কিছু লোকের ধনী হওয়ার এবং বিগ ক্যাপিটালিস্টদের স্বার্থরক্ষার এটি একটি কৌশলী প্রকল্প। এ প্রকল্প দ্বারা দারিদ্র্য দূর হয় না। দারিদ্র্য দূর হওয়ার এমন একটি আশা গরিব মানুষের মনে সৃষ্টি করা হয়, যাতে তাদের মনে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বেড়ে না ওঠে এবং তারা কোনো ধরনের সংগ্রাম ও আন্দোলনের পথে পা না বাড়ায়।’ ফিলিপাইনের এই অর্থনীতিবিদের উক্তিটি ফেলে দেওয়ার মতো নয়।”
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই মার্চ, ২০১১ বিকাল ৩:০৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


