somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

উত্তর আমেরিকানদের অস্থিরতা

২০ শে জানুয়ারি, ২০১০ সকাল ৯:৪৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ক্যানাডা ও আমেরিকার ভোর আমার কাছে খুব ভাল লাগে। টরন্টো, মনট্রিয়ল, নিউ ইয়র্ক যেখানেই গিয়েছি কাক ডাকা ভোর (যদিও এখানে কাক ডাকে না) আমাকে অবাক করে দিয়েছে। না নৈসর্গিক কোন দৃশ্য দেখে নয়। অবাক হয়েছি সাত সকালের জনস্রোত দেখে। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় শীতের দেশের মানুষ ভোর চারটায় ঘুম থেকে ওঠে কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে। সে এক দেখার মতো দৃশ্য। মানুষ দৌঁড়ৃচ্ছে, দৌঁড়ে দৌঁড়ে বাসে উঠছে, ট্রেনে উঠছে। কি সে গতি মানুষের! মনে মনে ভাবি যে দেশের সকাল শুরু হয় গতির প্রতিযোগিতা করে সে দেশের উন্নতি না হয়ে পারে কি!
শহর জেগে ওঠে সূর্য ওঠার আগে। বাস ষ্টেশন, রেল ষ্টেশন, রেষ্টেুরেন্ট, কফি শপগুলো ব্যস্ত হয়ে পড়ে এ সময়টাতেই। সবাই যেন সকাল বেলার পাখি! কার আগে কে জাগে, কার আগে কে আসে!
পরিচিত অনেকের সাথে কথা বলে তাদের দৈনন্দিন কর্মতালিকার একটি চিত্র বের করেছি। অনেকের কর্মস্থল বাসস্থান থেকে কয়েক শ’ কিলোমিটার দূরে। তারা ঘুম থেকে ওঠে চারটায়। তারপর সেজেগুজে বের হতে যতক্ষণ লাগে। কেউ ড্রাইভ করে আসে, কেউ আসে সাবওয়ে বা কমিউটার ট্রেনে। প্রত্যেকেরই টার্গেট থাকে পনেরো মিনিট আগে অফিসে পৌঁছানো।
টরন্টোতে জেনিফার নামে এক মহিলা কাজ করতো আমার পাশের অফিসে। আসতো সেন্ট ক্যাথারিন থেকে। প্রায় দেড় ঘন্টার ড্রাইভ। সে ঘুম থেকে উঠে চারটায় কিংবা তারও আগে। ঝড়-বৃষ্টি যাই হোক একদিনও তার অফিস লেট হয়নি। এজন্যে সহকর্মীদের কাছে তার সুনাম আছে।
কর্মজীবী মানুষ রাত নটা থেকে দশটার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ে। প্রথম প্রথম মনে করতাম এরা ঘুম কাতুরে। কেউ যখন বলতো রাতে ন’টার পর সে ফোন রিসিভ করে না; ভাবতাম নেশা করে বুঁদ হয়ে যায় এজন্যেই হয়তো ফোন ধরতে চায় না। এখন বুঝি কেন তারা এ কথা বলতো। অভিজ্ঞতার আলোকে আজ বলতে পারি যে, উত্তর আমেরিকার মানুষ কাজকে প্রাধান্য দেয়। সবকিছু একদিকে, আর কাজ অন্যদিকে। কাজের সময় কাজ, অবসরে স্ফূর্তি।
এবার আমার পরিচিত বন্ধু-বান্ধবদের কথা একটু বলে নিই। সকালে ঘুম থেকে উঠবে বলে অনেকে মর্নিং শিফট পছন্দ না করে আফটারনুন অথবা নাইট শিফটে কাজ করে। গভীর রাত পর্যন্ত যদি টিভি দেখা আর টেলিফোনে আলাপ না-ই হলো তাহলে এ আর কেমন জীবন! তাদের ঘুম ভাঙে দশটা কিংবা এগারোটায়। এলার্ম বাজিয়েও ঘুম ভাঙানো যায় না। ততক্ষনে অফিস পাড়ায় লাঞ্চ আওয়ার শুরু হয়ে গেছে।
নিউ ইয়র্কে যখন ছিলাম তখন আমার সাথে কাজ করতেন আব্দুস সালাম নামে এক ভদ্রলোক। তিনি যেমন বাংলা জানেন তেমন ইংরেজীতেও চোস্ত। নানান বিষয়ে তার জ্ঞান দেখে আমি মুগ্ধ। কিন্তু একটা কারণে তার প্রতি খুব বিরক্ত ছিলাম সেটা হচ্ছে তিনি সময় মতো অফিসে আসতে পারতেন না। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো দেরী হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি প্রতিদিন নিত্য নতুন গল্প তৈরি করতেন। খুবই চমকপ্রদ। এমন গল্প তৈরি করতেন যেগুলো বিশ্বাস না করে উপায় ছিল না। যতই রাগ করি না কেন গল্প শোনার পর সব পানি হয়ে যেতো। আরও আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে প্রায় দুইবছর একসাথে কাজ করেছি কিন্তু তার বলা কোন গল্প ‘রিপিট’ হয়নি।
-সালাম সাহেব আপনি তো আজ ৯টায় অফিসে আসার কথা! জানেন যে, অ্যাপোয়েনমেন্ট আছে।
- ঠিকই রওয়ানা দিয়েছিলাম কিন্তু হঠাৎ করে সাবওয়ে আটকে গেলো। প্রায় আধঘন্টা আটকে ছিলাম। কি যে ভয়ংকর অবস্থা! কে একজন সুইসাইড করেছে।
ব্যাস, রাগ কি আর দেখানো যায়! উল্টো সে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি শোনার জন্য আগ্রহ দেখাই।
- সালাম সাহেব, আপনি আজকে লেট করলেন কিভাবে? ব্যাংকে যাবেন কখন?
- আর বলবেন না। সারারাত ঘুমুতে পারিনি। ঐ যে আমার ওপরের ফ্লাটে যে বাঙালি ফ্যামিলিটা থাকে ভেবেছিলাম খুবই ভদ্র বোধহয়। কিন্তু না, লোকটা বড্ড বদমেজাজি। জানেন, সে ভদ্রমহিলার গায়ে হাত তুলেছে! শেষ পর্যন্ত পুলিশ ডাকতে হলো। ব্যাপারটা সামলাতে সামলাতে ভোর হয়ে গেছে।
রাগ কি আর রাখা যায়? উল্টো ঐ ফ্যামিলির কাহিনী শোনার জন্য তাঁকে চা বানিয়ে খাওয়াতে হয়।
-সালাম সাহেব আজ কি হলো?
- কেন খবর পাননি? আজাদ আর মজিদকে তো ইমিগ্রেশন টাস্কফোর্স ধরে নিয়ে গেছে। ওরা এখন ডিটেনশন সেন্টারে। নূরজাহানের বেশ কিছু টাকা জমা আছে আজাদের কাছে ওগুলো উদ্ধার করতে হবে।
সালাম সাহেব পেরেশান! কত বড় গুরুদায়িত্ব তার! দেশ ও জাতিকে নিয়ে তিনি সব সময় চিন্তিত! শুধু চিন্তা নেই তিনি যেখানে কাজ করেন; সে অফিসের। সংক্ষেপে মাত্র তিনটে কাহিনী বললাম। এরকম কয়েকশ’ কাহিনী আমার স্মৃতির সংগ্রহশালায় জমা পড়ে আছে।
কেউ মানুন বা নাই মানুন, আমি মনে করি হুজুগের ব্যাপারে বাঙালি, আমেরিকান, কানাডিয়ানদের মধ্যে কোন তফাৎ নেই।
সব দেশের মানুষের চরিত্র মূলত এক। কোন একটা উৎসব বা উপলক্ষ পেলেই হলো। কেনাকাটার জন্য পাগল হয়ে যায় সবাই। যেদিন থেকে জিংগেল বেল এর বাজনা বাজানো শুরু হলো সেদিন থেকে কেনাকাটার ধুমও পড়ে গেলো। লক্ষ্য করছি আজকাল মানুষ কাপড়-চোপড়ের চাইতে বিনোদন এবং খেলাধুলার জিনিষপত্রের দিকেই নজর দিচ্ছে বেশি। মানুষ পেটের ক্ষুধার চাইতে মনের ক্ষুধাকে প্রাধান্য দিচ্ছে।
উত্তর আমেরিকায় ক্রিসমাসের পরদিনকে বলা হয় বক্সিংডে। এদিন বিপুল পরিমাণ পণ্য কেনাবেচা হয়ে থাকে। ভোররাত, কখনো পূর্বরাত থেকেই বিভিন্ন শপিং সেন্টার ও দোকানের সামনে ক্রেতাদের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। দোকান খোলার পর হুমড়ি খেয়ে পড়ে সবাই। বক্সিং ডে মানে শুধু হ্রাসকৃত মূল্যে জিনিষ কেনা নয়; ঐদিনটিকে বেচা-কেনার উৎসবও বলা যেতে পারে। জিনিষ কেনাতে যে একটা মজা আছে তা বুঝা যায় বক্সিং ডে-তে। শপিং মলগুলোর উৎসব মুখর পরিবেশটা আমার কাছে ভাল লাগে।
এ সময়টাতে কানাডা-আমেরিকায় প্রচন্ড ঠান্ডা থাকে ও প্রচুর তুষারাপাত হয়। বৈরি আবহাওয়াকে উপেক্ষা করে শত শত মানুষের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার বিষয়টি পাগলামি মনে হলেও অনেকের কাছে বিষয়টি আনন্দের। বিরাট মূল্য হ্রাসের বিশাল বিজ্ঞাপন দেখে লোকজন আকৃষ্ট হয়ে লাইন ধরে। ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অব শপিং সেন্টারস কর্তৃক জরিপে দেখা গেছ, কানাডিয়ানরা বক্সিংডে-তে বছরের সবচেয়ে বেশী কেনাকাটা করে। হ্রাসকৃত মূল্যে কেনার লোভ এবং একই সাথে বক্সিংডে-কে কেনা কাটার উৎসব হিসেবে মনে করে কানাডিয়ানরা ঐদিন দল বেধে শপিং মলগুলোতে ভিড় করে।
৬টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অনুকুলে নয় শেখ হাসিনা (আপা) প্রতিকুল পরিস্থিতিতেই বেশি অকুতোভয়।

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৪




একদিকে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন তিনি দেশে ফিরছেন, আরেকদিকে তিনি প্রায় নিশ্চিন্ন করে দেয়া আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠন করে ফেলেছেন! এবং সেই সঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের অগণতান্ত্রিক, ভয়ঙ্কর এবং অবৈধ রাজনৈতিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিএনপির আবালীপনা।

লিখেছেন তানভির জুমার, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮

বিএনপি ৫০ হাজার নাচের শিক্ষক নিয়োগ দিতে যাচ্ছে। যার পেছনে ১০ বছরে ব্যায় হবে ১৫ হাজার কোটি টাকা। যা দিয়ে ফুল প্যাকেজ ৩০ টি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান... ...বাকিটুকু পড়ুন

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

লিখেছেন নতুন নকিব, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২৪

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশ শোকাহত। এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণের মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×