অতি সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ সংসদীয় সংবিধান সংস্কার কমিটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়ার জন্যে একটি খসড়া প্রণয়ন করেছেন। খসড়ায় তাদেরকে ‘ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী’ হিসেবে বলা হয়েছে। কিন্তু এ জনগোষ্ঠী সমূহের কতিপয় নেতৃবৃন্দ তাদেরকে ‘আদিবাসী’ বলে স্বীকৃতি না দেয়ায় মনোক্ষুন্ন হয়েছেন, পত্রিকান্তরে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, সরকারি নথিপত্রে, বিভিন্ন বক্তৃতা বিবৃতিতে এতকাল ‘আদিবাসী’ হিসেবে বলা হয়েছে কিন্তু এখন কেন সাংবিধানিকভাবে বলা হচ্ছে না? তাই তারা ‘আদিবাসী’ হিসেবে তাদের স্বীকৃতি চাচ্ছেন।
কারো কারো ধারণা যারা পাহাড়ে বসবাস করে তারা ‘আদিবাসী’। আবার অনেকের ধারণা মঙ্গোলীয় বা নেগ্রিটো চেহারা মানেই ‘আদিবাসী’। হতে পারে কোন জনগোষ্ঠীর শারিরীক গঠন, জীবনধারা, জীবিকা ভিন্ন; হতে পারে তাদের ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক জীবনও মূলধারা থেকে ভিন্ন। তাই বলে তাদের সবাই জাতিসংঘের ব্যাখ্যা অনুযায়ী ‘আদিবাসী’র স্বীকৃত সংজ্ঞায় পড়ে কি? আবার অনেকে তাদেরকে ‘উপজাতি’ হিসেবেও আখ্যায়িত করেন। এ শব্দটির মধ্য বৈষম্যের অভিযোগ উঠেছে অনেক আগেই। আধুনিক রাষ্ট্র বিজ্ঞানীরা মনে করেন রাষ্ট্র কাঠামোয় ‘উপজাতি’ বলে কোন শব্দ থাকা উচিত নয়।
ঐতিহাসিকভাবে বাঙালিরাই বাংলাদেশের আদিবাসিন্দা বা ‘ফার্ষ্ট নেশন’ হিসেবে বিশ্ব স্বীকৃত। অন্যান্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী (বাংলাদেশে বসবাস করছে ৪০টি জনগোষ্ঠীর অধিক) পরবর্তীতে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দেশ থেকে এসে অত্র অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছে। বাংলাদেশে বসবাসরত মনিপুরীদের আদিবাস ভারতের মনিপুর রাজ্যে, খাসিয়াদের মেঘালয় রাজ্যে, গারোদের আসাম ও মেঘালয়ের গারো পাহাড়ি এলাকায়। চাকমা, বোমাং, মং, রাখাইনসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যান্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী এসেছে প্রতিবেশী মিয়ানমার (বার্মা) এবং থাইল্যা- থেকে। এসব জনগোষ্ঠীর আগমন ২০০ থেকে ৬০০ বছর আগে। অন্যদিকে বিভিন্ন প্রমাণপত্রে দেখা যায় অত্র এলাকায় বাঙালি জাতিগোষ্ঠীর অস্তিত্ব ৫ হাজার বছরেরও অধিক পুরনো।
সকলেরই জানা যে, উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, অষ্ট্রেলিয়া সহ বিভিন্ন দেশে ইউরোপীয়রা এসে জোর পূর্বক বসতি স্থাপন করে। যেহেতু তারা বাইরে থেকে আগত তাই সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দারদেরকে ‘অ্যাবঅরিজিন্যাল’ বা ‘আদিবাসী’ বলা হয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় না যে, বাঙালিরা এসে কাউকে হটিয়ে কারো রাজ্য দখল করেছে। উপরোন্ত ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, শত শত বছর ধরে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী দ্বারা বাঙালিরা শাসিত হয়েছে। শাসকরা বাঙালি জাতিকে দূর্বল করে দেয়ার জন্য বাংলাকে খ--বিখ- করেছে। অবশেষে পাকিস্তানী হানাদারদের সাথে যুদ্ধ করে ৩০ লক্ষ লোকের প্রাণের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। এ গৌরবের অংশীদার এ ভূখ-ে বসবাসরত সকল জনগোষ্ঠীর। সকলের সম্মিলিত অংশগ্রহনের মাধ্যমেই এ অর্জন সম্ভব হয়েছে।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, বাংলাদেশে অনেক সুবিধা বঞ্চিত জনগোষ্ঠী রয়েছে যারা জীবিকার কারণে মূল সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন। তাদের জন্য কথা বলারও কেউ নেই। বাংলাদেশের বেদে(আদি নাম মনতং) এ অঞ্চলের একটি প্রাচীন ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম এরা নৌকাতে বসবাস করে আসছে, নৌকাই তাদের ঘরবাড়ি। ভোটার তালিকায় তাদের নাম ওঠে না। তাদের সন্তানদের জন্য স্কুল নেই, তাদের জন্য কোন সরকারি স্বাস্থ্য সুবিধা নেই। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল এবং সিলেটের লক্ষাধিক ওরাওঁ (অবজ্ঞাসূচক কুলি হিসেবে পরিচিত) চা শ্রমিক যারা বংশানুক্রমে এ দেশকেই তার দেশ মনে করে মাটি আঁকড়ে পড়ে আছে। অশিক্ষা এবং নেতৃত্বহীনতার কারনে এরা সকল সুবিধা থেকে বঞ্চিতই রয়ে গেছে। জানি না, সংস্কারকৃত সংবিধান বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর যে স্বীকৃতি দিচ্ছে তাতে এরা অন্তর্ভূক্ত হতে পারলো কি না!
আমরা বিভিন্ন সময় অনেক ‘ভুল’ জিনিষকে ‘শুদ্ধ’ করে ফেলি ‘প্রচলিত’ শব্দটির জোরে। অথচ ‘ভুল’ ভুলই। ১৯৭১ সালে সংঘটিত মহান ‘মুক্তিযুদ্ধ’কে কেউ কেউ ‘স্বাধীনতা যুদ্ধ’ বলে থাকেন। অথচ ঐতিহাসিকভাবে ওটা ছিল ‘মুক্তিযুদ্ধ’। জেনারেল আতাউল গণি ওসমানীকে পত্র-পত্রিকায় ‘মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক’ হিসেবে লিখতে দেখা যায়। অথচ তিনি ছিলেন ‘মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক’ (তাঁর স্বাক্ষরিত চিঠিপত্র প্রমাণ)। আমরা ‘বইয়ের দোকান’কে ‘লাইব্রেরী’ বলে থাকি। আমরা বললেই কি ওটা ‘লাইব্রেরী’ হিসেবে স্বীকৃত হবে? আমরা পানি ‘খাই’ তার অর্থ এই নয় যে পানি ‘খাওয়া’ যায়। প্রচলিত ভুলকে আমরা লালন করছি বংশ পরম্পরায়। অথচ বিশ্বের সব জাতি, সব ভাষার উন্নতি হচ্ছে, ভুল সংশোধন হচ্ছে, আরও মার্জিত হচ্ছে। কিছুদিন আগেও উত্তরমেরুর বাসিন্দা যাদেরকে আমরা ‘এক্সিমো’ হিসেবে জানতাম তারা এখন নিজেদের ‘ইনউইট’ হিসেবে পরিচিতি দেয়। ‘এক্সিমো’-র অর্থ হচ্ছে কাঁচা মাংস ভক্ষণকারী। সভ্য যুগে কেউ চায় না তাকে কেউ এ নামে সন্মোধন করুক।
আমাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দরা তাদের অসচেতনতা বা অজ্ঞানতা যে কারণেই হোক ‘আদিবাসি’, ‘উপজাতি’ বা ‘ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী’ এই শব্দগুলোর পার্থক্য না বুঝেই বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে উল্লেখ করেছেন। কোন কোন লেখক ‘ফার্ষ্ট নেশন’, ‘অ্যবঅরিজিন্যাল’, ‘ইনডেজেনিয়াস’ শব্দগুলোকে অনুবাদ করতে গিয়ে গুলিয়ে ফেলেছেন। তাই বলে কি এই ভুলের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে? সংবিধানের মতো গুরুত্বপূর্ণ দলিলে নিশ্চয়ই নয়!
বাংলাদেশে বসবাসরত বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ভাইবোনদের বলতে চাই, আপনাদের গোষ্ঠীগত বা জাতিগত পরিচিতি যাই হোক না কেন; ‘বাঙালি’দের মতো আপনারও রাষ্ট্রীয় পরিচয় ‘বাংলাদেশী’। বাংলাদেশে আমার মতো আপনারও রয়েছে সমান অধিকার।
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে মার্চ, ২০১১ সন্ধ্যা ৭:২১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



