গতকাল আমরা গীবত বা পরচর্চা নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। আজ আরেকটি বিষয় ঈর্ষা বা হিংসা নিয়ে আলোচনা করছি। কারো উন্নতি বা ভালো অবস্থা দেখে তা অসহ্যকর মনে হওয়া ও মনে মনে তার ক্ষতি কামনা করা – এটাই হিংসা । বলা হয় বাঙালীদের মধ্যে এই ব্যাপারটি বিশেষভাবে বিদ্যমান। এবং এই নিয়ে তো চমৎকার গল্পই রয়েছে আপনারা জানেন। সেটা এইরকম- প্রতিটা দোজখেই তো পাহাড়াদার রয়েছে যাতে করে কেউ বেরিয়ে যেতে না পারে । কিন্তু দেখা গেলো একটা দোজখে কোন পাহাড়াদার নেই। এবং সেই দোজখ নিয়ে কারো কোন চিন্তাও নেই। তো জিজ্ঞেস করা হল কেন এই দোজখে কোন পাহাড়াদার নেই। এখান থেকে যদি কেউ বের হয়ে যায় তাহলে কি হবে? উত্তর আসলো যে এটা আসলে বাঙালীদের দোজখ। এখান থেকে কেউ বেরোতে চেষ্টা করলে অন্য বাঙালীরা তাকে টেনে নামায় , বেরোতে দেয় না । সুতারং এটা নিয়ে চিন্তা নেই । এখান থেকে কেউ বেরোতে পারবে না ।
আসলে ব্যাপারটা এটাই। আমি কি বা কি না সেটা নিয়ে চিন্তা না করে আমার চেষ্টা যদি থাকে – অপরে কি হয়ে গেলো এবং তার এটা বাধা দিতে হবে- তাহলে সেটাই ইর্ষা , হিংসা বা পরশ্রীকাতরতা। পরশ্রীকাতরতা শব্দটি আসলে ঈর্ষার প্রকৃত রূপকে প্রকাশ করে। একজন মানুষের ভালো কিছু হল- তাহলে আমি কেন মন খারাপ করব? আসলে মানুষের মধ্যে যতগুলো অযৌক্তিক দোষ বিদ্যমান তার মধ্যে ঈর্ষা অন্যতম। কিন্তু কেন মানুষ ঈর্ষা করে? তার কতগুলো কারন হতে পারে নিম্নরূপ:
১। মানুষ সবসময়ই নিজেকে উপরে দেখতে চায়। অপরে তার চেয়ে উপরে উঠলে সেটা সে সহ্য করতে পারে না।
২। আবার যে উপরে আছে , সে চায় না অন্য মানুষ তার পজিশনকে স্পর্শ করুক। সেটাও ঈর্ষার অন্যতম কারন।
৩। মানুষ মনে করে যে কেউ তার চেয়ে উপরে উঠে গেলে বা বেশী কিছু পেয়ে গেলে সেই জিনিসটা সে আর পাবে না । সে সবসময় নিজের প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে চায়। তাই অপরে কিছু পেয়ে না যাক সেটাই তার কাম্য ।
৪। মূলত মানুষের অহম বা অহংকার তাকে ঈর্ষান্বিত হতে বলে।
৫। নিজের কোন লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য না থাকলে । লক্ষ্যহীন মানুষ সহজেই ঈর্ষা দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে।
আপনি হয়ত ভাববেন আমার মধ্যে কোন ঈর্ষা নেই। কিন্তু দেখুন তো এই সব বিষয়গুলো কখনো আপনার মনে উদয় হয়েছে কিনা :
কোন বন্ধুর ভালো রেজাল্ট দেখে আপনার মন খারাপ হয়েছে।
কারো ভালো চাকুরী হতে দেখে আপনার মন খারাপ করেছে।
কাউকে ভালো কিছু অর্জন করতে বা কিনতে দেখে – যেমন: ভালো টিভি , ফ্রিজ, কম্পিউটার-ইত্যাদী আপনার মনে হয়েছে আহারে সে এই জিনিসটা কিনে ফেললো, আমি পারলাম না।
---ইত্যাদী বিষয়গুলো যদি কখনো আপনার মনে কোনভাবে উদয় হয়ে থাকে, তাহলে অবশ্যই আপনি পরশ্রীকাতরতায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। এই ঈর্ষা আমাদের নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করে। তার কতগুলো নিম্নরূপ হতে পারে :
১। ঈর্ষা আমাদের কাজের গতিকে কমিয়ে দেয় , অবদমিত করে।
২। আমাদের হীনমন্যতায় আক্রান্ত করে। আর হীনমন্যতা আসলে নানা মানসিক ব্যাধির জন্ম দেয়। আর তা থেকে জন্ম নেয় নানা শারীরীক ব্যাধি।
৩। আমাদের নিজেদের মেধার বিকাশ বাধাগ্রস্থ হয়। কারন আমরা অপরকে নিয়ে পরে থাকি। ফলে আমাদের কাঙ্খিত পরিবর্তন আসে না।
৪। আমাদের পারস্পরিক সম্পর্ককে দুর্বল করে । কারন যাকে ঈর্ষা করছি তার সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক রাখা কঠিন ব্যাপার।
তাহলে আমরা কি করবো? আমরা নিজেদের ঈর্ষাকে চিনতে শিখবো। আমাদের অনেক মন খারাপ অবস্থার কারন ঈর্ষা । আমাদের অনেকে হতাশার মূলে ঈর্ষা ।আমাদের অনেক না পাওয়ার মূলেও ঈর্ষা। নিজেদেরকে উন্নতি করতে চাইলে এবং আমাদের লক্ষ্যে পৌছতে চাইলে আমাদেরকে ঈর্ষা নামের বিষ থেকে মুক্ত হতে হবে। তার জন্য আমরা একটু চিন্তা করতে পারি:
১। নিরিবিলি বসে ভাবুন আপনার মধ্যে ইর্ষার পরিমাণ কতটুকু । আমরা শুদ্ধ মানুষ , কোন ঈর্ষা নেই –এটা ভাবার আগে একটু পরীক্ষা করুন।
২। কোন কোন ক্ষেত্রে কার কার প্রতি আপনি ঈর্ষাগ্রস্থ তার একটা লিস্ট তৈরী করুন। এবং তার কারণগুলো লিখুন। কারণগুলো দূর করার উপায়গুলোও লেখার চেষ্টা করুন।
৩। যাকে ঈর্ষা করেন তাকে তার প্রাপ্তির জন্য ধন্যবাদ জানানোর অভ্যাস গড়ে তুলুন। প্রথমে মনে মনে ,তারপর সামনাসামনি এটা করবেন। সবসময় তার প্রশংসা করতে সচেষ্ট থাকবেন। আন্তরিক ভাবে এ কাজটি করবেন । দেখবেন আপনার প্রাপ্তির পরিমাণও বেড়ে যাবে।
৪। সবসময় আপনার নিজের লক্ষ্য ঠিক করুন এবং সেটা অর্জনের উপায় নিয়ে ভাবুন। অপরে কি করলো তা ভাবতে গেলে আপনি নিজের পথ হারিয়ে ফেলবেন।
৫। মনে দৃঢ় বিশ্বাস রাখুন সঠিক পথে এগুলে আপনিও আপনার লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে পারবেন। প্রয়োজনে এ ব্যাপারে যাকে ঈর্ষা করছেন তার কাছ থেকে সাহায্য নিতে দ্বিধা করবেন না।
আসলে ঈর্ষা বা হিংসা আমাদের নিজেদের ও যাকে হিংসা করছি উভয়ের সম্পর্ক নষ্ট করার মাধ্যমে উভয়কে ই ক্ষতি করে । আল্লাহতাআলা পবিত্র কোরানে বলেছেন:
--- এবং হিংসুকের হিংসার অনিষ্ট হইতে বাচিবার জন্য ( আমি আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করছি) : সূরা ফালাক।
নবীজী (স) বলেছেন: তোমরা হিংসা থেকে বেচে থাক। কারন হিংসা মানুষের পূন্যকাজগুলোকে ঐভাবে খেয়ে ফেলে যেমনি আগুন কাঠকে খেয়ে ফেলে।
ভালো মানুষ বা অনন্য মানুষ হওয়ার জন্য আসলে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার জন্যই রমজান মাস। আসুন এই রমজান মাসে সাধনার অংশ হিসাবে আমরা নিজেদের ঈর্ষামুক্ত করে গড়ে তুলতে চেষ্টা চালিয়ে যাই।
ধন্যবাদ। আগামীকাল আবার দেখা হবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



