নির্দিষ্ট দিনে লাঙ্কাউই পৌছালাম। একটা রিসোর্টে উঠলাম। আমাদের জন্য একটা স্যুট রেডি করা ছিল। রুমে ঢুকতেই ড্রয়িং কাম ডাইনিং। চেয়ার টেবিল খুব সুন্দর করে সাজানো। এরপর বেডরুম, ড্রেসিং রুম আর বেডরুমের চেয়েও বড় ওয়াশরুম। রুম থেকেই সমুদ্র দেখা যায়। এক কথায় চমৎকার। নিচে সুইমিং পুলের কাছে যেয়ে দেখি তা ঠিক সমুদ্রের লেভেলে করা। সুইমিং করার সময় মনে হয় যেনো সাঁতার কেটে বুঝি সমুদ্রে চলে যাওয়া যাবে। পুলের সাথেই একটা বার, আর এর কাঠের মোড়া পুলের পানির ভেতরে। পুলের উপর দিয়ে একটা ছোট ব্রিজ বানানো, এই ব্রিজ দিয়ে ছোটদের আর বড়দের পুল আলাদা করা। আমি সাঁতার জানিনা, তাই প্রথমদিন ছোটদের হাটু পানির পুলে সাঁতার কাটার ব্যর্থ চেষ্টা চালালাম, পরে লজ্জা পেয়ে উঠে গেছি। কারন ওই পুলে ১বছর বয়সের বাচ্চারা সাঁতার দিচ্ছে। পরবর্তিতে বয়াতে চড়ে বড়দের পুলে ভেসে বেড়াতাম।
আমাদের রিসোর্ট থেকে খুব কাছে একটা খাওয়ার জায়গা খুজে পেলাম। একটা একতলা বিল্ডিং, সামনে লম্বা বারান্দা। এখানে অনেক চেয়ার টেবিল পাতা। বারান্দার লাগোয়া কয়েকটা খোলা রুম। এই রুমগুলি কিচেন, আর এর সামনে ছোট ছোট শোকেজে খাওয়া সাজিয়ে রাখা। দেখে মিনি ফুড কোর্ট মনে হল। এদের একটা স্পেশাল চাটনি আছে, তা হল কাচকি মাছের শুটকি দিয়ে অসম্ভব ঝাল চাটনি। খেতে খুবি মজা। এই বিল্ডিং এর বিপরীতে আরেকটা খাওয়ার জায়গা, ওখানে সব গ্রিল। অনেক ধরনের টাটকা সামুদ্রিক মাছ, যেটা খাবে দেখালেই সামনে গ্রিল করে দেয়। আরেকটা মজার খাবার ওখানে খেয়েছি, তা হল ABC। এটা আরো কয়েক দেশে খেয়েছি, কিন্তু লাঙ্কাউই য়েরটা পুরাপুরি আলাদা। বিভিন্ন রকম বাদাম, বিভিন্ন রকম বিনস অনেক পরিমানে থাকে আর উপরে গুড়া করা বরফের উপর বিভিন্ন ফ্লেভারের সিরাপ। গরমে এই জিনিস অসম্ভব ভালো লাগে।
আমাদের রিসোর্ট থেকে কিছুটা দূরে একটা খোলা বাজারে এক ট্যাক্সি ড্রাইভার নিয়ে গেল। সারি সারি ফুটপাথের দোকান একপাশে আরেক পাশে খোলা আকাশের নিচে সব হোটেল। ওই এলাকায় প্রচুর ট্যুরিস্ট, জানতে পারলাম জিপ্সি টাইপ ট্যুরিস্টরা ওই এলাকার মোটেলগুলিতে থাকে, কারন অনেক সস্তা। ওখানকার এক হোটেলে গলদা চিংড়ির গ্রিল খেলাম।
আরেকটা খাওয়ার বাজারে গিয়েছিলাম, ওটা তাবুর নিচে। সারি সারি টেবিলের উপর হরেক রকম খাওয়া, প্রতিটা টেবিলের পাশেই বড় বড় চুলা। ঘুরে বুঝলাম, পৃথিবীর মোটামোটি সব দেশের খাওয়ার দোকান আছে। আমরা দুজন মিলে প্রচুর খাওয়া কিনে সেদিন রিসোর্টে ফিরেছিলাম।
এই দ্বীপে ওনেক কিছু দেখার আছে। ম্যানগ্রোভ ফোরেস্ট, সমুদ্রের পাহাড়ের ভিতরের গুহা, ঈগল ফিডিং এরিয়া, ফিশ ফার্ম, ফিডিং এরিয়া, মাঙ্কি ফিডিং এরিয়া। সবচেয়ে অবাক হয়েছি, ম্যানগ্রোভ বনের ভেতর একটা রেস্টুরেন্ট দেখে। পুরানো বাড়ির মত করে সাজানো, ভিতরে এসি চলছে, সব ধরনেরি খাওয়া পাওয়া যায়। মজা পেয়েছি বানরদের কান্ড দেখে। একটা জায়গায় প্রচুর বানর বসা, ওদেরকে খাওয়ানোর জন্য পাওরুটি নেয়া হয়েছিল। আমদের স্পিড বোট পাড়ের কাছে আসতেই সব বানর কাছাকাছি জটলা বেধে বসল, সামনে বেশ মোটা আর বড় একটা বানর। রুটি দেবার পর সবাই চুপ করে বসে আছে, একটু পরে হেলতে দুলতে গদা বানরটা এসে রুটি টা নিল, এরপরি দেখি বাকি সবাই খাওয়ার জন্য ঝাপা ঝাপি শুরু করল। বুঝল, প্রথম জন পালের রাজা। তার অনুমতি ছাড়া কেউ নড়েনা।
আমরা আরেকদিন গেলাম কেবল কার চড়তে। এটা আরো ভয়ঙ্কর, ২.২ কি.মি যাত্রা, ৭০৯ মি. সমুদ্রতটের উপর। অনেক সাহস আর দোয়া দরুদ পড়ে কারে উঠলাম (ভয় পেলেও যেতেই হল 'শ' এর কথা ভেবে। আমি না গেলে সেও যাবেনা, আমার জন্য এটা তার মিস হবে)। ২টা স্টেশন আছে। শেষ স্টেশনে যাওয়ার পর একটা টাওয়ার, 'শ' ধরে ধরে আমাকে তুলল টাওয়ারে। আমার পা তখন কাপছে ভয়ে। কিন্তু উপরে যেয়ে দেখলাম কিযে সুন্দর লাগছে নিচের দিক। অনেক সবুজ বন আর সমুদ্র। উপরে মেঘ যেনো মাথা ছুয়ে যাচ্ছে। ১ম স্টেশন থেকে আবার একটা কাঠের তৈরি করা সেতু নেমে গেছে বনের ভিতর, অনেকেই দেখলাম সেতু দিয়ে নেমে কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে।
লাঙ্কাউইতে থাকার দিন কোন দিক থেকে যে শেষ হয়ে গেল টেরি পেলামনা। আরো একদিন বেশি থাকতে চেয়েছিলাম, কিন্তু পরের দিনের প্লেনের টিকেট না পাওয়াতে মন খারাপ করে নির্দিষ্ট দিনে কুয়ালালামপুর ফিরতে হল।
(চলবে)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



