somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

চিঠি ----জিসান শা ইকরাম : আমার নানা,আমার বয়ফ্রেন্ড কে............নীলাঞ্জনা নীলা

১৫ ই জানুয়ারি, ২০১১ রাত ১০:৪৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমার প্রিয় নানা,

বেশ কিছুদিন ধরেই ভাবছি তোমায় চিঠি লিখবো । কিন্তু কি লিখবো ভেবেই পাচ্ছিলাম না । আজ সকালে ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিলো আমার ছেলেটা । আজ ওর স্কুল ছুটি । কোথায় ভেবেছিলাম আজ অনেক ঘুমাবো । ভোরের ঘুমের জন্যে পাগল আমি জানো ? পরীক্ষার সময় ভোরে উঠতে হতো । কি যে কষ্ট ! তারপর যখন বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ হলো আহ কি শান্তি ! কি মুক্তি !

নানা আমার বাপি বলতো "ওরে সময়ে সময়ের কাজ করতে হয় রে নীলমনি , এখন কষ্ট করে পড়লে পরে সেটা কাজে লাগবে । আনন্দ করার সময় পাবি কিন্তু লেখাপড়ার সময় থাকবে না রে ।" সেদিন বাপি কে ফোনে বললাম বাপি যে কোনো সময় ইচ্ছে করলেই লেখাপড়া করা যায় কিন্তু দুষ্টুমী-আড্ডা-খেলাধূলো এসব করা যায় না । নানা বাপিটা আমার ঠিক আমার ছেলে নভোনীলের মতো, আদর করে আমি যাকে বুবুল ডাকি। মজার একটা কথা বলে নেই ওকে যদি কখনো তীর্থ ডাকি ও বুঝে ফেলে আমি রাগ করেছি । তারপর শোনো বাপি হেসে বলে কি জানো "তোর মতো আনন্দ কি আর কেউ করেছে ? তুই যা করতে পেরেছিস নিজেই চেয়ে দেখ কতোজনে এমন সুযোগ পেয়েছে ?" কতো কি বলে যে কথা কাটায় ! আমি ফোন রাখার পরে হাসতে হাসতে জল ফেলি । না না কান্না নয় আমি হাসলেই জল পড়ে । আসলেই তো আমি যা করেছি জীবনে,যতো ভালোবাসা পেয়েছি সকলের , এখন কেবলই হারাচ্ছি।

বয়ফ্রেন্ড এই শব্দটা দেখলেই অনেকেই একটু আড় চোখে চায় , ঘটনা কি ? মনে আছে নানা তোমার সাথে আমার কি করে পরিচয় ? "নিজামীর দুই গালে জুতা মারো তালে তালে" এই শ্লোগানই আমাদের বন্ধন তৈরী করলো । সবাই গালে জুতা মারতে চায়, আরে দাঁড়ি থাকলে তো ব্যাথা কম পাবে । তার চেয়ে নিজামীর গালের দাঁড়ি ছিঁড়ে ফেললেই তো হয় । এরপর মারো যতো খুশী । নানা আমার মাথায় এতো বুদ্ধি ! কি করে যে ঘুমাই এ আমি জানি আর আমার রাত জানে ।

তোমার ভালোবাসায় কি করে যে জড়িয়ে গেলাম তোমার স্নেহ-শাসন-ভুল থেকে শুদ্ধ পথে । এর মাঝে তোমার কতো প্রিয়জন তোমায়-আমায় ভুল বুঝলো তারপরেও নানা আমাদের ভালোবাসার নদীতে চর পড়েনি । যেদিন প্রথম তোমার সাথে স্কাইপে কথা হয় কি আনন্দ আমার ! অমি যেই বাসায় এলো ওকে জড়িয়ে ধরে বললাম জানো অমি আজ নানার কন্ঠ শুনেছি ? ও আমার এসব পাগলামী খুব ভালো করেই জানে , তাই বললো "তবে তো আজ অনেক ভালো ভালো রান্না পাবো আর বেশ আদর করেই টেবিলে সাজিয়ে খাওয়াবে ।" আমি বললাম ইস কতো আব্দা্র ! সবাই আমায় তোমরা পাগলী বলো আমার খুব ভালো লাগে জানো ? অনেকেই ভার্চুয়াল এই সম্পর্ককে ভালো চোখে নেয়না । কিন্তু নানা আমার কাছে সম্পর্ক মানে কেবল রক্তের জন নয় এ তো জানোই ।

বয়ফ্রেন্ড আমার , জানো এবার যখন দেশে যাই প্লেনে বসে ভাবছিলাম তোমার সাথে যখন দেখা হবে আমি কি করবো ? বেশ তো বলেছিলাম চুল ছিঁড়বো , পারবো তো ? আরে পারবো না কেন আমি নীলাঞ্জনা কি পারি না ? অন্তত মারামারিতে ওস্তাদ । ভাগ্য ভালো এবার সবাই বেঁচে গেছে , আসলে তাও না আমার ভেতরে মায়ার জন্ম হয়েছে । যখন ঢাকার আকাশ ছুঁয়ে ফেললো প্লেন আমি আমার গ্রামীণের সিমটা ঢোকালাম । সাথে সাথেই দেখি এসএমএস তোমার "নাতনী স্বাগতম" । তখুনি মনে হলো প্লেনটা মাটি স্পর্শ করবে কখন ? নানা জানো না তুমি সেদিন আমি জীবনের প্রথম এতো এক্সাইটেড ছিলাম ! যখন দেখলাম তোমাকে, সেই দৌঁড় মনে আছে নানা ? ঝাঁপিয়ে পড়ে তোমার বুকে ! তুমি বললে "পাগলী" । আর আমার কাছ থেকে টাকা নেবার জন্যে যারা লাগেজ টেনে আনছিলো তাদের ফেরালে । খুব বোকা আমি আসলেই । আচ্ছা বলো তো এত্তো বোকা কেন আমি ? তারপর বারবার চেয়ে দেখছিলাম এই সেই নানা যার সাথে কতো মজা করেছি । কথা ছিলো তোমার চুল ছেঁড়ার এবার বেঁচে গেলে নানীর জন্যে । নানীর আদর তোমার চুল ছিঁড়তে দিলো না ।

এরপর তো ঘোরাঘুরি , সেই চারুকলার বকুলতলা যেখানে আমার অনেক মজার স্মৃতি , সাথে জান্নাতের ক্যাডারী দুষ্টুমী । জানো সেই রাতে বাসায় ফিরবো জান্নাত আমায় এগিয়ে দেবে , ওরে আমার অভিভাবক জান্নাত রিক্সাওয়ালা কে নিয়ে ট্রাফিকের উলটো দিকে , ট্রাফিক পুলিশ দিলো আটকে । পুলিশ কে বলে "ভাই দিয়ে দেন না যেতে চুপ করে চলে যাবে কেউ টের পাবে না।" নানা আমার ওর অবস্থা দেখে এমন হাসি পেলো কোনো রকমে আটকে নিলাম । পুলিশের বোধ হয় মায়া হলো ওর ব্যবহারে বললো অন্য পাশ দিয়ে চলে যান । সেদিন উলটো দিক দিয়ে জান্নাতের বুদ্ধিতে জ্যাম ছাড়িয়ে পশ্চিম রাজাবাজার ।

তারপর ঊর্মী খালামনির সাথে দেখা হলো বই প্রকাশনা অনুষ্ঠানে । নানা অহল্যা জীবনের অহল্যা কে ছিলো কে জানে ! পরের সম্পূর্ণ দিন এতো ব্যস্ত ছিলাম আমি , রাতে ফ্লাইট । বাসায় ফিরলাম রাত নয়টায় তুমি নানী কে নিয়ে এলে । মাথায় হাত বুলিয়ে দিলে, নানা সেই স্পর্শ এখনো আছে। অনেক কিছু হারিয়েছি , হারাচ্ছি আরো হারাবো । শুধু তোমার সেই হাত রেখে বলা "নাতনী ভালো থাকিস" সে কেউ নিয়ে যেতে পারবে না । সেই স্পর্শ আমায় কষ্টের কান্নায় কাঁদাবে না । এই যে এক ফোঁটা করে করে গাল ছুঁয়ে যাচ্ছে এটা না-হারানো ভালোবাসার ।

আমায় নিয়ে চিন্তা করোনা নানা । আর অমন করে মাঝরাতে স্বপ্ন দেখে হাঁপাতে হাঁপাতে লিখোনা "নাতনী তুই ভালো আছিস তো ? আমি তোরে নিয়া খুব বাজে স্বপ্ন দেখসি রে ।" আমি প্রস্তুত থাকি , প্রতিটি মূহুর্তের অন্ধকার ছুঁতে । আলো কে খুঁজি না আমি , সে এমনিতেই আসবে তাই । নানা আমি আশাবাদী জানো তুমি । অহল্যা অভিশাপ পেয়েছিলো পুরুষ দেবতার কারণে আর আরেক পুরুষ স্বামীর ভুলের কারণে পাথর হয়েছিলো অনেক অনেক যুগ আগে। তারপর পুরুষাবতার রামচন্দ্র পাথর থেকে মুক্ত করেছিলো অহল্যা কে । আমি অহল্যা নই , হবোও না । একদিন আলো আসবেই । আমার সেই আশ্রম , দ্বারের দু'পাশে দেবদারু আর অর্জুন মাথা নুয়ে স্বাগত জানাবে আমায় । পুরোটা বাগান জুড়ে কামিনী , বেলি , যুঁথি , গন্ধরাজ , প্রিয় নীল ঘাস ফুল , কাশ ফুল ভরে থাকবে আর ঘ্রাণে - আঘ্রাণে মাতিয়ে দেবে ন্যুব্জ হয়ে থাকা শরীর ।

সমাজের কিছু নিয়মের বিরূদ্ধে আমি , সেসব মানিয়ে নিয়ে চলা সম্ভব না । নিয়ম আমরাই তৈরী করেছি , সময়ের সাথে সাথে তার বদল হওয়া উচিত। যে নিয়মে কারো কোনো ক্ষতি হয়না, সেই নিয়ম হলে ক্ষতি কি ? একদিন দেখে নিও নীলাঞ্জনার মতো মানুষেরা আর এই নিয়মের জালে আটকে থাকবে না । আমি অন্যরকম যে তোমার মতে । বারবার তুমি একই কথা বলো , লেখো আমাকে । "তুই কেন আর পাঁচ/দশটা মেয়ের মতো হইলি না রে নাতনী ?" তুমি বলো তো আমি যদি অমন হতাম আমার জন্যে কি এমন করে চিন্তা করতে ? আমি মারাত্মক দুষ্টু নানা ভুলতে দিতে চাইনা । তবুও অনেকেই আমায় ভুলে থাকার ভাণ করে , আবার কেউ এড়িয়ে যায় , ভাবখানা এমন যেনো আমি কিছুই না। আসলেই আমি কেউ না , কিছু না। অনেক অনেক কথা আছে জমে নানা।এবার দেশে এলে তোমার চুল ছিঁড়বোনা তবে চুল পাকানোর ঔষধ নিয়ে আসবো। পাকা চুল না হলে কি আর নানা বলে মানায়?এবার কিন্তু সাবধান,তোমার খবর আছে । পড়ে কি হাসছো ? নানা আমি যেনো এমনই দুষ্টুমী করতে পারি, এই হাসি যেনো থাকে আমার , যেদিন আমি দেখবো কষ্টেও আমার হাসি নেই সেদিন জেনে নিও শ্বাসধারণ করা একটা প্রাণী আছে , তোমার গার্লফ্রেন্ড নেই । সে কারণেই তো এমন পাগলামী করি , আর এমন করেই থাকতে চাই জীবনের শেষ দিন কিংবা রাত্রি পর্যন্ত ।

তোমার নাতনী ও গার্লফ্রেন্ড

নীলাঞ্জনা

ইতারব্যাক , ব্রাশেলস , বেলজিয়াম

সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই জানুয়ারি, ২০১১ বিকাল ৩:৫৩
৩৯টি মন্তব্য ৩৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রাসূলের (সা.) অনুসারি হবেন শুধুমাত্র সাহাবা (রা.), অন্যরা এবং ওলামা ওলামার অনুসারি হবেন

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:৪০




সূরাঃ ৩৫ ফাতির, ২৮ নং আয়াতের অনুবাদ-
২৮। এভাবে রং বেরং- এর মানুষ, জন্তু ও আন’আম রয়েছে। নিশ্চয়ই আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে (ওলামা) আলেমরাই তাঁকে ভয় করে।নিশ্চয়্ই আল্লাহ পরাক্রমশালী ক্ষমাশীল।

সূরা:... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:২৩


Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে নবীজির শেখানো এক অনন্য আমল

লিখেছেন নতুন নকিব, ১১ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৯:০৩

দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে নবীজির শেখানো এক অনন্য আমল

ছবি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

মানুষের জীবন মূলত অসংখ্য ছোট-বড় সিদ্ধান্তের সমষ্টি। প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি মোড়ে আমাদের কোনো না কোনো... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪

আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×