মাত্র দুইদিনেই মামা হোস্টেলের রীতি নীতি সাথে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে। হোস্টেল জীবনের সকল কর্ম-অপকর্ম এখন মামার নখদর্পনে। মামা আমাকে একখানা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বলে, 'এইটা পড়।' আমার জিজ্ঞাসু দৃষ্টি, 'মামা এইটা কি?' মামার কন্ঠে উত্তেজনা, 'আহ্, আগে পড়। কালকে রুমমেট মধূর কাছ থেকে প্রেমপত্র লেখার কৌশল শিখেছি।'
আহারে মামা কতই না সুখে আছে। হোস্টেলে স্বাধীন জীবন-যাপন করছে। কোন বাধা নিষেধ নাই। কত কিছুই যে মনের আনন্দে শিখতে পারছে। আমরা শুধু বাসা আর কলেজ, কলেজ আর বাসা। একই বৃত্তে ঘুরপাক খাচিছ। জীবনে কোন রোমাঞ্চ নাই, কোন উত্তেজনা নাই। জীবনটা বড়ই পাংসে হয়ে গেছে। তাই মামার প্রেমপত্র অন্ধকার গুহার শেষে একটুকরো আলোর ঝিলিক হয়ে এলো। আহ্ মামার প্রেমপত্রের কি অসাধারণ ভাষা। এমন সাহিত্য কোন কবি-সাহিত্যিকও লিখে যেতে পেরেছে কিনা সন্দেহ!
আমরা মামাকে উৎসাহ দিই। মামা তুমি চালিয়ে যাও। আমরা আছি তোমার পিছে। কিন্তু পত্র ব্যাপারটা এমনই পোস্টম্যানের হাতে না পড়লে এটাকে কেউ পত্র বলে গণ্য করে না। তাই মামার নতুন সংকল্প তার জন্য সুন্দরী, রুপবতী পত্রপাঠিকা খুঁজে দিতে হবে। নইলে সে আর পত্র লিখবে না। আমাদের বয়েজ কলেজে সুন্দরী, রুপবতী পত্রপাঠিকা কোথায় পাবো? স্কুল জীবনটাও কেটেছে বয়েজ স্কুলের চারদেয়ালের মাঝে। তাই দেখা গেল বন্ধুমহলে কারোরই সুন্দরী, রুপবতী কোনো মেয়ের সাথে কোন পরিচয় নেই। কি করার? কি করার? চিন্তায় আমাদের ঘুম হারাম ! শেষ পর্যন্ত বুড়োই উপায় বের দিল। বুড়োর ভাষ্যমতে তার পাশের বাসার মেয়েটির নাকি ইদানিং ডাট (!) বেড়ে গেছে। উল্টা পাল্টা পোশাকে পাড়ার রাস্তায় ক্যাটওয়াক করে বেড়ায়। মেয়েটির জন্য পাড়ার পরিবেশ নষ্ট হচেছ! কিন্তু হবু কমিশনারের মেয়ে। পাড়ার কার সাধ্যি তাকে কিছু বলে। একটা মেয়ের জন্য পাড়ার সকল ছেলে গোল্লায় যাবে তা তো মেনে নেওয়া যায় না ! তাই আমাদের মতো যুব সমাজকেই এগিয়ে আসতে হবে।
বুড়োর প্রস্তাবে আমরা এককথায় রাজি হয়ে গেলাম। আমাদের মামাও খুব খুশি। সুতরাং পুনোরদ্দমে মামা প্রেমপত্র লিখতে শুরু করে দিল। বুড়ো অদেখা সেই রুপবতী সুন্দরী মেয়েটির খুঁটিনাটি তথ্য সরবারহ করে প্রেমপত্রকে আরও রসালো করতে সাহায্য করল। আর আমার দায়িত্ব পড়ল কবিতা রচনা। ছোটকাল থেকেই একটু আধটু কবিতা লেখার চেষ্টা করতাম। সেই সুবাদেই মামা আমাকে এই গুরুদায়িত্ব দিয়েছে। প্রেমপত্রের লাইনের ফাকে ফাকে কবিতার ছন্দে প্রেমপত্র নাকি আরও প্রেমময় হয়। মামার কথামতো আমি ছোট্ট একখান কবিতা লিখে ফেললাম।
'বৃষ্টিস্নাত রাতে,
বর্ষার হাত ধরে,
যাব হারিয়ে দূর-দূরান্তের পথে।'
মেয়েটির নাম ছিল বর্ষা। অদেখা রুপবতী সেই বর্ষা মেয়েটির জন্য লেখা প্রেমপত্রে কবিতার লাইনগুলো ছিল এমনই।
অনেক আয়োজন শেষে পত্রটি ডাকবক্সে ফেলা হল। এবার অপেক্ষার পালা। দুইদিন পর বুড়ো খবর নিয়ে আসল, 'মিশন হান্ড্রেড পার্সেন্ট সাকসেসফুল। পত্রটি পড়বি পড় পড়েছে ওর বাবার হাতে। অনেক জিজ্ঞাসাবাদের পরও পত্রপ্রেরকের কোন কুল কিনারা করতে না পেরে সব ঝড় বর্ষার উপরে দিয়েই গেছে। বর্ষার ঘরের বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে। এবং বলা বাহুল্য তার ডাট (!) ঘরে-বাইরে সর্বস্থলেই বন্ধ হয়ে গেছে।
বুড়ো নিয়মিতই আপডেট দিতে লাগল। সেই আগেরমতোই মেয়েটি গৃহবন্দি। এখন ভাবতে অবাক লাগে, মনে অপরাধ বোধ জাগে, বেচারী বর্ষা কিছুই জানলো, বুঝলো না অথচ তাকে চারদেয়ালের মাঝে দিন কাটাতে হলো শুধু একটুকরো উড়োচিঠির (!) জন্য। কাজটা যে আমরা মোটেই ঠিক করি নাই এই বোধটা তখন আমাদের মাঝে কাজ করে নি। প্রেমপত্রের কারিশমায় আমরা রীতিমতো পুলকিত। সমাজের বড়ধরনের উপকার করতে পেরে গর্বে আমাদের বুক ভরে যায় !
কিন্তু মনের সেই চনমনে ভাব এক সপ্তাহের বেশি টিকল না। সপ্তাহ এক পর বুড়ো খবর নিয়ে আসলো যে, বর্ষাকে আজ আবারও পাড়ার রাস্তায় ডাট (!) মারতে দেখা গেছে। মাত্র এক সপ্তাহেই প্রেমপত্রের কারিশমা শেষ হয়ে গেল ? আমরা মামাকে প্রেমপত্রের দ্বিতীয় খন্ড রচনার অনুরোধ করলাম। কিন্তু মামা সুযোগ বুঝে বেঁকে বসল। তার ঘোষনা, সে আর অচেনা অদেখা কোন মেয়েকে কখনও পত্র লিখবে না। তার প্রেমপত্র রচিত হবে একমাত্র তার প্রাণের প্রিয়ার জন্য। মামা ছাড়া আমাদের বন্ধুমহলে আর কারও প্রেমপত্র রচনায় দীক্ষা নেই । তাই আমাদের প্রেমপত্র মিশনটি অংকুরেই থমকে দাড়াল। সেই প্রথম সেই শেষ। আর কখনও কোন অচেনা অদেখা সুন্দরী রুপবতী মেয়েকে প্রেমপত্র লেখা হয়নি, হবেও না। পরে বুঝেছিলাম মামা ঠিকই বলেছিল, প্রেমপত্র রচিত হবে শুধুই প্রাণের প্রিয়ার জন্য।
(স্মৃতিচারণা)
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা মে, ২০১১ বিকাল ৫:৩৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




