হল লাইফের একটা ছবি দেখে আজ অনেকদিন পর চাচার কথা মনে পড়ে গেল। এই চাচা শুধু আমার চাচা নয়, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম বর্ষ থেকেই ছাদে একটু মাল মসল্লা কম আর ভারিক্কি ধরনের গড়নের জন্য আমাদের অতি প্রিয় এই বন্ধুটি আমাদের চাচা হয়ে যায়। আমাদের ব্যচের সবার অতি প্রিয় চাচা সৌভাগ্যক্রমে আমার রুমমেট ছিল। ছবিতে যেমন দেখছেন চাচা আমার অতি মনযোগ দিয়ে পড়াশোনায় ব্যস্ত ব্যপারটা মোটেও সেরকম নয়! সারাবছর চাচা রহস্যময় কারনে অতিব্যস্ত থাকত কিন্তু পরীক্ষার আগে চাচার কান্ডকীর্তি দেখার মত বটে! আমরা বন্ধুরা অবশ্য বলতাম চাচা ছোটছেলেটাকে স্কুলে ভর্তি করা নিয়ে ঝামেলায় আছে কিংবা চাচা বড় মেয়ের বিয়ে দেয়া নিয়ে ব্যস্ত কিংবা সংসারের ঘানি টানতে গিয়ে চাচা পড়াশুনার সময় পায় না (সবই ফান করে বলা!)। পরীক্ষার আগে চাচার কান্ডকীর্তির সাথে আমিও অবশ্য জড়িত থাকতাম কারন সারাবছর টাংকি মারলেও পরীক্ষার আগের ৩-৪দিন আমাদের হল লাইফের সবই চেন্জ হয়ে যেত। ঢাবির অমর একুশে হলের ৩১২ নম্বর রুমটি তখন রীতিমত একটা চিড়িয়াখানায় পরিনত হত! দিনে ২৪ঘন্টার মধ্যে ২০-২২ ঘন্টা আমরা পড়াশুনা করতাম। তিন বেলা খাবার থেকে শুরু করে সবকিছুই আমরা রুমেই সারতাম, এমনকি মাঝে মাঝে রাতের বেলা ছোটবাথরুমটাও বোতলে সারার ঘটনা ঘটত(ঘটনা ১০০%সত্যি)!! আমার তৃতীয় রুমমেট ডাইল ফারুক এই বিষয়ে খুবি ওস্তাদ লোক ছিল!
যাই হোক চাচাকাহিনী বলছিলাম তাই বলি! চাচার ঘুম ছিল জগৎবিখ্যাত! একবার ঘুমালে চাচার কাথাবালিশ থেকে শুরু করে লুংগী পর্যন্ত কোনটারই কোন খবর থাকত না! সেই ঘুমরাজ চাচা পরীক্ষার আগে থাকত ঘুমহীন!আর যাও দুই একঘন্টা ঘুমাত তাও সেই ঘুমের মধ্যে চলত অনবরত পড়াশুনা! যখন আমরা দুজনেই একসাথে দুইএক ঘন্টার জন্য ঘুমাতাম তখন চাচার ঘড়ি এলার্ম দেয়ার সিস্টেম ছিল অসাধারন! ঘড়ি মোবাইল সব এলার্ম একসাথে দিয়ে টেবিলের ড্রয়ারে তালা বন্ধ করে রেখে তারপর লাইট বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে ড্রয়ারের চাবি ফ্লোরে ফেলে দেয়া হতো! ঘুম থেকে না উঠে থাকে সাধ্য কার?? চাবি খুজতে খুজতে ঘুমের বারটা বেজে যেত! তৃতীয় বর্ষের কোন এক বিষয়ের ফাইনাল পরীক্ষার আগের রাতের একটা মজার ঘটনা না বললেই নয়! রাত প্রায় চারটা! আমি তখনো টেবিল ল্যম্প জ্বালিয়ে পড়ছি, চাচা ঘুমাচ্ছে-খুব সকালে উঠবে বলে! হঠাৎ খেয়াল করলাম পাশের টেবিলে চাচাও ঘুম থেকে উঠে বিড় বিড় করে পড়ছে, কিন্তু চাচার গায়ে শুধু একটা স্যন্ডু গেন্জী! আমি ভাবলাম চাচা হয়ত আমার সাথে মজা করার চেষ্টা করছে! যাই হোক একটু পরেই চাচা টেবিল থেকে উঠে হেলতে দুলতে বাইরে চলে গেল, যেহেতু মেইন লাইট বন্ধ আমি অতটা খেয়াল করিনি। একটু পর আমিও বাথরুমে যাওয়ার জন্য বাহির হলাম! কড়িডোর দিয়ে কয়েকটা রুম পেরিয়ে বাথরুমে যেতে হয়! আমি যখন যাচ্ছি তখন দেখি চাচা বাথরুমের দিক থেকে আসছে কিন্তু চাচার গায়ে শুধু একটা স্যন্ডু গেন্জী তাও কোমর পর্যন্ত! চাচা বায়ে ডানে হেলে দুলে লারে লাপ্পা লারে লাপ্পা করতে করতে রুমের দিকে আসছে! আমি হতবাক হয়ে চাচার দিকে তাকিয়ে আছি কিন্তু চাচা নির্বিকার! আমাকে পাশ কেটে চাচা রুমে চলে গেল! আমি বাথরুম থেকে ফিরে দেখি চাচা আবার বিছানায় শুয়ে ঘুমুচ্ছে! পরদিন যথারীতি পরীক্ষা দিতে চলে গেলাম! পরীক্ষা শেষ করে আগের রাতের কথা মনে পড়ল, চাচাকে বললাম ঘটনা কি? চাচাত পুরাপুরি অস্বীকার করে বসল! সেই রাতে তার নাকি একবারও ঘুম ভাংগে নি আর বাথরুমে যাওয়াতো দূরে থাক!! কিন্তু আমি যা দেখেছি তা একশত ভাগ সত্যি!! চাচাকে বারবার বলার পর চাচা শেষ পর্যন্ত স্বীকার করে যে সেদিন সকালে উঠে চাচা তার পড়নের লুংগিটা খুজে পাচ্ছিল না, পরে নাকি সেটা খাটের নীচে কুড়িয়ে পেয়েছিল! এর বেশি চাচা আর কিছুই জানে না! হল লাইফের এমনি কত শত মজার কাহিনী যে আজো মনে পড়ে!
চাচা এখন মস্ত বড় কোম্পানীর মস্ত বড় অফিসার! সবাই হয়ত বস বলে ডাকে কিন্তু আমাদের চাচা আমাদের কাছে চিরজীবনের জন্য চাচা হয়েই থাকবে! যে দিন গেছে সেদিন কি আর ফিরিয়ে আনা যায়!!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



