ছেলেটির শৈশব কৈশোর বেশ ভালই কেটে যাচ্ছিল, হাসিখুশি উচ্ছল জীবন। কিন্তু কৈশোরের শুরুতেই নিজের অজান্তে কখনো কখনো একটা পাপবোধ তার সারা হৃদয়ে ছড়িয়ে যেত, তাও সে এক অদ্ভুদ কারনে! বাবার দিকে তাকালেই তার এই পাপবোধ তাকে ঘিরে ফেলত, নিজেকে শেষ করে ফেলতে ইচ্ছে হত। তখন সারাদেশ স্বাধীনতার জন্য উত্তাল, ৭১ এর মার্চের অগ্নিঝরা দিন। অথচ বাবা তখনও বাংলাদেশ বা বাংলা নামটা পর্যন্ত স্বীকার করতেন না, তার অন্তরে বাহিরে তখনও শুধুই পাকিস্থান! ঘৃনা হত রাগ হত বাবার জন্য! তারপর কখন চলে এল স্বাধীনতা যুদ্ধ, আকাশে বাতাসে হাহাকার, বুলেট আর লাশের গন্ধ একাকার! কিন্তু তাদের ঘরে আনন্দের বন্যা। কত কত পাকিস্থানি অফিসাররা আসত, বাবার বুদ্ধি পরামর্শ নিত কিন্তু ছেলেটি কিছুই মানতে পারত না! বাবার প্রতি ঘৃনা আরো বাড়তেই লাগলো! একসময় দেশ স্বাধীন হল, বাবা হয়ে গেলেন সবার চোখে এক ঘৃনার নাম, দেশের সবচেয়ে বড় রাজাকার! দূরন্ত ছেলেটি এখন আর সমাজে মাথা তুলে দাড়াতে পারে না, চারদিক থেকে বাবার মুখে এত থুতু পড়ে যে তার অনেকটাই তার উপর এসেও পড়ে!
এক সময় মামা খালারা ছুটে আসে, বাবার দেয়া নামটা চেন্জ করার অনুনয় বিননয় করে, এ নাম যে কুকুরের চেয়ে অধম! মীরজাফর মরে বেঁচে গেছে কিন্তু এই নাম সাথে থাকলে যে বেচে থেকেও মৃত! সকলের অনুরুধে শেষ পর্যন্ত আযম কে বদলিয়ে আযমী করা হয়, তাও যদি কিছুটা রক্ষা হয়! কিন্তু তবু কি আর ইতিহাস লুকানো যায়? পদে পদে বাবার প্রতি ঘৃনার থুতু ছেলেটির উপর এসে পরে! মেধাবি ছেলেটি বারবার লুকাতে চেয়েছে জীবন থেকে কিন্তু পারেনি! কারন মেধার একটা মূল্য যে থাকতেই হয়। একসময় মেধার জোড়ে সকলের আগোচোরে ছেলেটি ঢুকে পড়ে ৫ম বি এম এ লং কোর্সে, তাও কত ঝাক্কি ঝামেলা, একরকম বাবাকে অস্বীকার করেই ঢুকে পড়তে হয় সেনাবাহিনীর নিভৃত এক জীবনে! ভেবেছিল এবার বুঝি মুক্তি মিলবে! বাবার প্রতি ঘৃনার রেশ ধরে কেউ বুঝি আর থুথু ছিটাবে না! কিন্তু মানুষ ভাবে এক, হয় আরেক!
অদম্য মেধাবী ছেলেটি ২ বছরের বি এম এ লং কোর্সে সোর্ড অফ অনার ছাড়াও একাডেমিক কৃতিত্বের জন্য স্বর্নপদক লাভ করে! কিন্তু অবহেলা আর অপমানের জ্বালা তাকে একবারের জন্যও ছেড়ে যায়নি! হয়নি সময়মত প্রমোশন, পায়নি কোন সম্মান! তবু জীবন, বেচে থাকতে হয়, কিন্তু বেচে থাকা আর হল কই! অবশেষে চাকরি জীবন থেকেও ঘাড় ধরে বের করে দিল শুধু এক বাবার জন্যই! ৩০বছরের চাকরি জীবনে নেই কোন কলংক, কিন্তু এক বাবার জন্যই পৃথিবীটা এত নিষ্ঠুর? তার মানে বাবা কি এরচেয়ে নিষ্ঠুর?
-একটি সত্য ঘটনার ছায়া অবলম্বনে
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে জুন, ২০০৯ সন্ধ্যা ৬:৫৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।






