খাদ্য দ্রব্যের মূল্য ও সংকট
বর্তমানে খাদ্যদ্রব্যের মূল্য এমন অবস্থায় উপণীত হয়েছে যে - মানুষ রাস্তায় লাইনে দাঁড়িয়ে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য সংগ্রহ করছে, দ্রব্যমূল্যের দাম কমানোর দাবি জানাচ্ছে। এই দাবী আরও ঘনীভূত হয়ে অচিরেই দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে। গত ১৩ই এপ্রিল আইএমএফ এর চেয়ারম্যান ওয়াশিংটনে এক সাংবাদিক সম্মেলনে হুঁশিয়ার করে বলেছেন, "খাদ্যমুল্যের উর্ধ্বগতি এবং খাদ্য ঘাটতি সারা দুনিয়ার জন্য বিপজ্জনক পরিণতি ডেকে আনতে পারে, এমনকি এই খাদ্যের জন্য বিশ্বব্যাপী ভয়াবহ যুদ্ধ বেঁধে যেতে পারে"।
এক কথায় খাদ্য সংকট আজ এক গুরুতর আন্তর্জাতিক সংকটে পর্যবসিত হয়েছে। সেই সাথে আশংকাজনক ভাবে মুদ্রাস্ফীতি ঘটছে। এ সংকটের বাইরে থাকা তৃতীয় বিশ্বের অধিকাংশ দেশের পক্ষে সম্ভব নয়। বর্তমান বাংলাদেশের আর্থ-রাজনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত থমথমে। চাল, ডাল তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমুল্যের বাজারে আগুন, কর্মসংস্থানের অভাবে মানুষের হাতে টাকাকড়ি নেই, নীরব দুর্ভিক্ষ ধেয়ে আসছে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার জন্য বিদেশীরা আমাদের পিছনে উঠে পড়ে লেগেছে।
সংবাদপত্র সমুহ তাদের ‘তিলকে তাল, আর তালকে তিল’ করবার কথা ফলাও করে ছাপছে। বিনিয়োগের কোন কথাবার্তা নেই, আমাদের মূল সমস্যা বিদ্যুৎ সংকট ও খাদ্য নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলার প্রতি ভ্রুক্ষেপ নেই, সম্পদ সৃষ্টির কোন কথা নেই। অথচ খবরের কাগজ জুড়ে শুধু খাদ্যভাব, বিদ্যুৎ সংকট, দুর্নীতি-মামলা আর ক্রাইম জগতের লোমহর্ষক খবর। বিদেশে বাংলাদেশ সম্বন্ধে বিকৃত তথ্য বেড়েই চলেছে। দেশ যদি আজ খাদ্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানী ক্ষেত্রে তেমন কোন বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয় তবে কেউ যে আমরা নিরাপদে থাকবো, সে ভাবনা বোধকরি এখনো অনেককে স্পর্শ করেনি। বিশেষতঃ প্রশাসনিক দায়ভার ও রাজনৈতিক কর্মকান্ড সমূহ তেমনটাই আভাষ দেয়।
চিরায়ত অর্থনৈতিক শাস্ত্রে বলা হয়, “It is a long established view that over certain epoch’s people lived by plunder. But in order to be able to plunder, there must be something to be plundered, and this implies production. Moreover the manner of plunder depends itself on the manner of production, e.g. a stock jobbing nation cannot be robbed in the same way as nation of cowherds. As nation like us are being robbed directly in the form of debt slave. Debt slave cannot be an entrepreneur”.
মানুষ সবসময় লুন্ঠনকারিদের দ্বারা অবিরত লুন্ঠিত হতে থাকে যতক্ষণ না তার নিজস্ব উৎপাদন পদ্ধতি বা অর্থনৈতিক পথের ঠিকানা থাকে। যে জাতি সম্পদ সৃষ্টি করতে জানেনা বা পারে না, সে জাতি রাখাল জাতির মত সদাসর্বদা শোষিত হতে থাকে। আমাদের ঠিকানাবিহীন অর্থনীতির কারনে সাপ্লায়ার্স ক্রেডিটের আফিম আর মাইক্রো ক্রেডিটের হেরোইন খেয়ে সমস্ত দেশ, জাতি ও জনগণ আজ স্থবির হয়ে পড়ে আছে। ১/১১/০৬ এর পরিবর্তনের পর (১১ই জানুয়ারী ০৭ হতে ৩১শে মার্চ ০৮পর্যন্ত) ১৫ মাসে দ্রব্যমুল্যের তথা চাল ডাল ও তেলের মুল্যসহ প্রায় সকল পণ্যের মুল্য গড়ে দ্বিগুন হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী একজন মানুষের আয় আড়াইগুন বৃদ্ধি পাওয়া প্রয়োজন। কি ভাবে আড়ই গুন বৃদ্ধির প্রয়োজন মেটানো হবে তার কোন ব্যাখ্যা এখন পর্যন্ত আমাদের সামনে তথা দেশবাসীর সামনে কেউ প্রকাশ করেনি বা পথ দেখায়নি। তবে আড়াইগুন আয় বৃদ্ধি করবার উপায়ের নাম হচ্ছে মহাউদ্যোগ। কে গ্রহন করবে এ মহাউদ্যোগ? চাষী, মজুর, নিম্নবিত্তের মানুষ, বণিক- শিল্পপতি, বুদ্ধিজীবি, আইনজীবি-সাংবাদিক, আমলাপ্রশাসন, সামরিকবাহিনী, না কি আমাদের চিরায়ত ক্ষমতা পিয়াসী দুর্বল রাজনীতির দুধ ও তামাকে সমান আগ্রহী রাজনৈতিক কালচার?
যে রাজনৈতিক কালচারের কথা প্রফেসর ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ গত ১লা জুন দারিদ্র বিমোচন কৌশলপত্র (পিআরএসপি) পরামর্শ সভায় অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে বলেছেন, “পিআরএসপি এর ধারণা এসেছে দাতাদের নিকট থেকে, কিন্তু আমরা নিজস্ব শক্তিতে এ দেশের দারিদ্র দ্রুত নিরসনে দাতাদের নির্দেশের বাইরেও অনেক কিছু করতে পারি। এ জন্য রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ঐক্য ও রাজনৈতিক দিক নির্দেশনা প্রয়োজন। শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারা বিশ্বেও অর্থনীতিই বর্তমান একটি অস্থির ও অন্তবর্তীকালীন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে"। তিনি গুরুত্বের সাথে বলেন, "খাদ্যদ্রব্য ও জ্বালানী মুদ্রাস্ফীতির ফলে খাদ্য নিরাপত্তা ও মানবিক নিরাপত্তা বিষয়টি এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে পড়েছে।”
সোজা বাংলায় দ্রব্যমুল্যের কষাঘাতে ওষ্ঠাগত মানুষকে আজ কর্মসংস্থানের ও বাড়তি আয়ের পথ দিয়ে আশ্বস্থ করা ছাড়া দ্বিতীয় কোন পথ খোলা নেই। বিগত ৩৫ বছর ধরে বিদেশী দাতাদের ঋণদান পরিকল্পনা বা চানক্য অর্থনীতির কৌশলপত্রই আপততঃ আমাদের বর্তমান ব্যর্থতার গ্লানি দীর্ঘায়িত করছে। বিদ্যমান আর্থ-সামাজিক সম্পর্ক না বদলালে, রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বিশাল কোন পটান্তর না হলে আমাদের আর্থিক প্রগতি ব্যহত হতেই থাকবে। প্রগতি কলাকৌশলের বিষয় নয়, এর জন্য প্রয়োজন হয় যুৎসই ও টেকসই পরিকল্পনা- বাস্তবসম্মত, জনকল্যাণমূলক, কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে জুলাই, ২০০৮ রাত ১২:৪৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


