আজ শুরুতে বাংলাদেশের সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর দু-তিনটি বিষয় উল্লেখ করে নিতে চাই। এ সংশোধনী দিয়ে : (১) প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে দিয়ে দেওয়া হয়, যা আগে ছিল প্রধানমন্ত্রীর হাতে এবং প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য ছিলেন; (২) দেশে শুধু একটি রাজনৈতিক দল রাখা হয়, যাকে সংবিধানে অভিহিত করা হয় 'জাতীয় দল' নামে এবং রাষ্ট্রপতি এই জাতীয় দলটি গঠন করার ঘোষণা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্য সব দল বিলুপ্ত হয়ে যায়; (৩) জাতীয় সংসদে ওই কথিত জাতীয় দলটির সদস্যদের বাইরে যেন কেউ সদস্য না থাকেন, তার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয় এভাবে যে তখনকার সংসদে যাঁরা সদস্য ছিলেন, তাঁদের প্রত্যেককে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ওই জাতীয় দলে যোগ দিতে হবে এবং কোনো সংসদ সদস্য যদি তা না করেন, তাহলে তাঁর সংসদ সদস্যের পদ বাতিল হয়ে যাবে; (৪) ভবিষ্যতের জন্য ব্যবস্থা রাখা হয়, যদি কোনো ব্যক্তি 'জাতীয় দলের দ্বারা রাষ্ট্রপতি বা সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীরূপে মনোনীত না হন, তাহা হইলে অনুরূপ নির্বাচনে রাষ্ট্রপতি বা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হইবার যোগ্য হইবেন না।' এ ছাড়া চতুর্থ সংশোধনী দ্বারা এই বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয় যে ওই সংশোধনী পাস হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তৎকালীন সরকারপ্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে যাবেন কোনো ভোট গ্রহণ ছাড়াই। ওই পদে তিনি থাকবেন পরবর্তী পাঁচ বছর। সে সময়কার জাতীয় সংসদের মেয়াদও আরো পাঁচ বছর করে দেওয়া হয়। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারিতে ওই সংশোধনী পাস হওয়ার সময় জাতীয় সংসদের বয়স হয়েছিল পৌনে দুই বছর। বঙ্গবন্ধুও বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ওই সময়টুকু সরকারপ্রধানের ক্ষমতা প্রয়োগ করছিলেন। অর্থাৎ তাঁরা নিজেদের মেয়াদ বাড়িয়ে নিলেন। এরপর রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান যখন চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে পাওয়া ক্ষমতাবলে দেশের জন্য একমাত্র রাজনৈতিক দল 'জাতীয় দল'-এর জন্ম দিলেন ও অতঃপর দলটির কর্মকর্তাদের নাম ঘোষণা করলেন, তখন দেখা গেল যে সব পদই পেয়েছেন শেখ সাহেবের আগের দল আওয়ামী লীগের লোকেরা। তিনি হলেন এই জাতীয় দলের, যার নাম দেওয়া হয়েছিল 'বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ' (সংক্ষেপে বাকশাল নামে পরিচিত) প্রধান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রজাতন্ত্রের সব নির্বাহী ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে যে মন্ত্রিসভা এবং নতুন ব্যবস্থায় যে উপ-রাষ্ট্রপতি নিয়োগ করেছিলেন, তাঁরাও সবাই চতুর্থ সংশোধনী-পূর্ব আওয়ামী লীগের নেতা ছিলেন। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর দল দেশ থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্র তুলে দিয়ে যে একদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা চালু করলেন, একটু ঘুরিয়ে বলা যায়, তা দিয়ে পুরনো আওয়ামী লীগই বাংলাদেশের মালিক ও সর্বেসর্বা হয়ে গেল। 'মালিক' শব্দটি ব্যবহার করলাম এ জন্য যে আমরা সেই ১৯৭২ সালে সংবিধান রচনার সময় থেকে বলে আসছি, জনগণ প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক। একই সঙ্গে আমরা বিশ্বাস করে আসছি যে জনগণের পক্ষে তাদের 'মালিকানার' তদারকি করে জাতীয় সংসদ।
দুই. বাংলাদেশে এখন যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে তাতে মনে হতেই পারে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী-সমর্থক এবং তাঁদের আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবরা মিলে দেশের ভেতর যেদিকে যা পাওয়া যায় তা-ই দখল করে নেওয়ার ব্রত নিয়ে কোমর বেঁধে নেমেছেন। ২০০৮-এর ডিসেম্বরের শেষে বিগত অসাংবিধানিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জাতীয় সংসদে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন পেয়ে ক্ষমতায় আসার পর বলতে গেলে মুহূর্ত মাত্র দেরি না করে ওই দলের ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতা ও সদস্যরা দিকে দিকে দখল কায়েম করতে নেমে পড়েন। এ কর্মকাণ্ডে শুরু হয় পদ দখল আর চাকরি দখল দিয়ে, তবে দখলের দলীয় প্রতিযোগিতা রক্তারক্তিতে রূপ নেয় অতিসত্বর হল এবং দোকানপাট ও হাটবাজার দখলের সময়। ধীরে ধীরে এর মধ্যে খুনাখুনিও ঢুকে পড়ে এবং তা তাঁদের নিজেদের মধ্যে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটগুলো নতুন রাজনৈতিক ক্ষমতাধরদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন ও সমীকরণ করে ফেলে খুবই তাড়াতাড়ি। ফলে দেশের বাণিজ্যনীতি তাদের পছন্দমতো চলে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীর মূল্য যথারীতি ঊর্ধ্বগামী থেকে যায়। তবে আওয়ামী লীগের দখল অভিযানের ভয়ংকর রূপ সর্বসাধারণের সামনে ঘন ঘন এবং স্পষ্টভাবে আসতে থাকে ভর্তি-বাণিজ্য ও চাকরি-বাণিজ্যের চেহারা নিয়ে। আসলে এ দুই বাণিজ্যের ভিত্তি হচ্ছে ঘুষ। এখন সরকারি প্রতিষ্ঠানে দ্বাররক্ষী থেকে শুরু করে অফিসপ্রধান পর্যন্ত সব পদেই নিয়োগ পাওয়ার জন্য আওয়ামী লীগ নেতা, সংসদ সদস্য, যুবলীগ নেতা, ছাত্রলীগ নেতা, শ্রকি লীগ নেতা ও স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতাদের নির্দিষ্ট হারে ঘুষ দিয়ে চাকরি পাওয়ার বন্দোবস্ত হয়_এ কথা চারদিকে সরবে প্রচারিত হচ্ছে। এই যে সম্প্রতি স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মী নিয়োগ নিয়ে পাঁচ-ছয় জেলায় মারপিট, ভাঙচুর হলো, ভোলায় সিভিল সার্জনকে কাজে যোগ দিতে দিল না ওই লীগার নামধারীরা এবং পাবনায় জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের স্থানীয় এক এমপি ও তাঁর সমর্থিত দলীয় লোকজন মারপিট করল_এর সবই চাকরি-বাণিজ্য নিয়ে। জাতীয় সংসদের মূল অধিবেশন কক্ষে গণশিক্ষামন্ত্রী ডা. আফসারুল আমিন যে পনেরো-কুড়িজন সরকারদলীয় সংসদ সদস্যের দ্বারা ঘেরাও হয়েছিলেন, তা-ও এই বাণিজ্যের কারণেই। যাঁরা চাকরি পাইয়ে দেওয়ার জন্য প্রার্থীদের কাছ থেকে বিনিময় মূল্য নিয়েছেন তাঁরা যদি 'পণ্য' বা 'সেবাটি' ক্রেতার হাতে ধরিয়ে দিতে না পারেন, তাহলে তাঁদের জন্য তো সেটা বিপদের কথা বটেই। বিপদ বা অসুবিধার কথা মনে পড়লে মেজাজ তো খারাপ হয়ই, আর মেজাজ খারাপ হলে অন্য কারো পিঠে লাঠি ভাঙতে চাওয়া তো স্বাভাবিক ব্যাপার! তবে এসব তথাকথিত বাণিজ্য এতটাই ব্যাপক আকার ধারণ করেছে যে সাধারণ চাকরিপ্রার্থীরা এখন ধরেই নিয়েছেন, সরকারি চাকরি তাঁরা পাবেন না। যা পাবেন তা পাবেন আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের দ্বারা নির্বাচিত বা নির্ধারিত লোকজন। ওই যে শুরুতে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশকে প্রতিদ্বন্দ্বীহীন করে আওয়ামী লীগের সব কিছু দখলের কথা বলেছিলাম, তা আসলে উল্লেখ করেছি অন্য একটি প্রাসঙ্গিক কথা বলার জন্য। তা হলো, ১৯৭৫ সালে আওয়ামী লীগ ও এর নেতারা একচ্ছত্র ক্ষমতা মুঠোয় নেওয়ার পর বাকশাল নামে একটা সংগঠন করেছিলেন এবং এর বিভিন্ন পদে লোক বসিয়েছিলেন। ফলে তাঁদের চেনা যেত। এখন আর চেনার উপায় নেই। যে কেউ 'আমি অমুক লীগ করি' বলে এসে দাঁড়িয়ে গেলেই হলো, আর তাঁকে প্রশ্রয় দেওয়ার জন্য আওয়ামী লীগ বা এর কোনো সহযোগী সংগঠনের পাতিনেতা, এমনকি তথাকথিত নেতা_থাকলেই হলো। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে এই সেদিন ঢাকার অদূরে এক যুবক তাঁর দলবল নিয়ে দিনের বেলায় রাস্তা থেকে এক কলেজছাত্রীকে জোর করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। যুবকটি এক প্রতিমন্ত্রীর ভাগ্নে বলে 'কালের কণ্ঠ' পত্রিকায় (২২ সেপ্টেম্বর) পড়লাম।
তিন. দেশে এখন ক্ষমতাসীনদের এই যে অনাচার চলছে এর ফল ভালো হচ্ছে না। রাজনৈতিক ভাষ্যকার বদরুদ্দীন উমর 'আমার দেশ' পত্রিকায় (২৩-৯-২০১০) লিখেছেন, 'প্রকাশ্যে নীতিবাক্য বর্ষণ ও কার্যক্ষেত্রে চরম দুর্নীতি সমাজে যে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করে, সরকারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় সমাজের সর্বস্তরে দুর্নীতি ও তার প্রয়োজনে সন্ত্রাস কিভাবে ছড়িয়ে পড়ে সেটাই এখন আওয়ামী লীগের বর্তমান সরকারের শাসন আমলে আমরা প্রত্যক্ষ করছি।' তবে তিনি এ কথাও লিখেছেন, 'বাংলাদেশের ইতিহাসে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলোই যে সমাজের ক্রিমিনিলাইজেশনের জন্য দায়ী_এটা ধারাবাহিকভাবে তাদের নানা নীতি ও কার্যকলাপের মাধ্যমে স্পষ্টভাবেই বোঝা যায়।' আওয়ামী লীগের খোলাখুলি সমর্থক পত্রিকা 'দৈনিক জনকণ্ঠ' একই তারিখে একটি প্রতিবেদন লিখেছে, 'জুলাই ও আগস্ট মাসে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহস্রাধিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। নিহত হয়েছে ১০ জনের বেশি। সন্ত্রাসের কারণে পাঁচটিরও বেশি জেলায় স্থগিত করা হয়েছে নিয়োগ পরীক্ষা। অসহায় প্রশাসন। নিয়োগ নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের ওপর শুধু চাপ সৃষ্টি নয়; খাতাপত্রে আগুন, কর্মকর্তাদের ওপর হামলাসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র লুট করে নিয়ে যাচ্ছে সরকারদলীয় ক্যাডাররা।' 'ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ'-এর নির্বাহী পরিচালক প্রতিবাদ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. মোদাচ্ছের আলীর ঘোষণার যে স্বাস্থ্য বিভাগ সাড়ে ১৩ হাজার পদের সব কটিতেই নিয়োগ দেওয়া হবে আওয়ামী লীগ কর্মীদের। তিনি বলেছেন, 'এ কথা মনে রাখতে হবে যে কর্মসংস্থানের সুযোগ সবার জন্য সমান।' আমরা জানি, এমন কথা বাংলাদেশের সংবিধানেও আছে। তবে কার্যক্ষেত্রে আমরা এ-ও দেখেছি যে যখন যিনি ক্ষমতায় থাকেন তখন তিনি সংবিধান ও আইনের যে ব্যাখ্যা দেন সে সময় তা-ই সঠিক হয়। আমরা কে যে আমাদের কথা কাউকে শুনতে হবে?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


