উদ্বেগ প্রকাশ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কমপক্ষে ২২টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। কেউ কেউ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে, কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে মালিকদের একচ্ছত্র আধিপত্য চলছে। এ ছাড়া সরকারের অনুমোদন ছাড়া শাখা ক্যাম্পাস খুলে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বদলে মালিক বা ট্রাস্টির নামে জমি কিনে প্রতারণা করা হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষা মন্ত্রণালয় দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তিন ভাগে ভাগ করে লাল, হলুদ ও সবুজ সংকেত দিয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গুণ, মান ও অবস্থান সম্পর্কে একটি ধারণা পাবেন। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বেশির ভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক এলাকায় এবং ব্যস্ততম সড়কের পাশে মার্কেট, দোকান, হোটেল-রেস্তোরাঁর ওপর খুবই স্বল্পপরিসরে ভাড়া করা ভবনে গড়ে উঠেছে। এগুলো ক্যাম্পাস খুলে লেখাপড়ার উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি না করে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তি করে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মতো কার্যক্রম চালাচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যেসব বিশ্ববিদ্যালয় স্থায়ী ক্যাম্পাসে পর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়েছে, তারা আগামী সেপ্টেম্বর ২০১১ (ফল সেমিস্টার) এর পরে আর কোনো প্রোগ্রাম বা কোর্সে নতুন ছাত্রছাত্রী ভর্তি করতে পারবে না। তবে, তার আগে ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীদের চলমান কোর্স মান বজায় রাখা সাপেক্ষে শেষ করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে ওই সব বিশ্ববিদ্যালয় স্থায়ী ক্যাম্পাসে স্থানান্তরে অতিরিক্ত আরও পাঁচ বছর সময় পাবে। এর মধ্যে যারা স্থায়ী ক্যাম্পাসে শিক্ষাকার্যক্রম শুরু করতে সক্ষম হবে, তারাই নতুন প্রোগ্রাম বা কোর্সের অনুমোদন ও ছাত্র ভর্তির সুযোগ পাবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে গতকাল রোববার আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসব সিদ্ধান্তের কথা জানান শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম এবং শিক্ষাসচিব আবু নাসের কামাল চৌধুরী বক্তব্য দেন।
ব্রিফিংয়ে বলা হয়, স্বল্প সংখ্যক প্রশংসনীয় ব্যতিক্রম ছাড়া অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষা দিতে অসমর্থ বা অনাগ্রহী বলে প্রমাণিত হয়েছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে মানসম্পন্ন উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে।
আটটি সফল বিশ্ববিদ্যালয়: ব্রিফিংয়ে বলা হয়, ৫১টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে এ পর্যন্ত মাত্র আটটি বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব ক্যাম্পাসে গেছে। এগুলোকে প্রতীকী অর্থে সবুজ সংকেত দেওয়া হয়। এগুলো হচ্ছে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, আহছানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি, চট্টগ্রামের ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ও আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
সাময়িক অনুমতির শর্ত প্রতিপালন ও নিশ্চিত করতে ৪৩টি বিশ্ববিদ্যালয় ব্যর্থ হয়েছে। এগুলোর মধ্যে ২১টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের কাজ করছে বা জমি কিনেছে এবং এগুলোকে হলুদ সংকেত দেওয়া হয়। বাকি ২২টি বিশ্ববিদ্যালয়কে লাল সংকেত দিয়ে বলা হয়, এগুলোর মালিক বা উদ্যোক্তাদের সদিচ্ছার অভাব রয়েছে।
পাঁচটির অবকাঠামো নির্মাণ প্রায় শেষ: পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয় জমি ক্রয় করে অবকাঠামো নির্মাণ করছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, গণ বিশ্ববিদ্যালয়, সাউথ ইস্ট ইউনিভার্সিটি এবং সিটি ইউনিভার্সিটি। ব্রিফিংয়ে আরও বলা হয়, এই পাঁচটির মধ্যে ইন্ডিপেনডেন্ট এবং ইস্ট ওয়েস্ট সবার আগে নিজস্ব ক্যাম্পাসে চলে যাবে বলে আশা করা যায়।
নয়টি বিশ্ববিদ্যালয় জমি কিনেছে: নয়টি বিশ্ববিদ্যালয় জমি কিনেছে, কিন্তু অবকাঠামো নির্মাণ শুরু করেনি। এগুলো হচ্ছে আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, দি ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক, ডেফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব সাউথ এশিয়া, সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।
নয়টির নিজস্ব ভবন, তবে জমি কম: নিজস্ব ভবন তৈরি করলেও জমির পরিমাণ কম, এমন নয়টি বিশ্ববিদ্যালয় চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে দি পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস, সিলেটের মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি, নর্দার্ন ইউনিভার্সিটি, চট্টগ্রামের প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি, ডেফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।
২২টি বিশ্ববিদ্যালয়কে লাল সংকেত: ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, ২২টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য জমি কেনেনি। এই তালিকাটি লাল সংকেতের ইঙ্গিত বহন করে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়, লিডিং ইউনিভার্সিটি, সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি, ইবাইস ইউনিভার্সিটি, প্রাইম ইউনিভার্সিটি, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, দি মিলেনিয়াম ইউনিভার্সিটি, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, উত্তরা ইউনিভার্সিটি, ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্স, প্রাইম এশিয়া ইউনিভার্সিটি, রয়েল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা, অতীশ দীপঙ্কর ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, আশা ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটি, গ্রীন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।
আদালতের নির্দেশে চলা তিন বিশ্ববিদ্যালয়: ৫১টির বাইরে তিনটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আদালতের নির্দেশে পরিচালিত হচ্ছে। এগুলোর মধ্যে সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটি অধিকাংশ শর্ত ইতিমধ্যে পূরণ করেছে বলে জানান ইউজিসির চেয়ারম্যান। এ ছাড়া কুইন্স ইউনিভার্সিটি এবং আমেরিকা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির (আম্বান) মামলা মোকাবিলায় অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান শিক্ষামন্ত্রী। জোট সরকারের সময় এই তিনটিসহ পাঁচটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাময়িক সনদ বাতিল করেছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
দারুল ইহসান নিয়ে সিদ্ধান্ত শিগগিরই: ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের চারটি গ্রুপ মালিকানা দাবি করে আসছে। ইউজিসির চেয়ারম্যান বলেন, দারুল ইহসান বিষয়ে খুব শিগগির সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, রাষ্ট্রপতি এ বিষয়ে সম্মতি দিয়েছেন। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে চারটি পক্ষকে নিয়ে বৈঠক করা হবে।
ব্রিফিংয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির পক্ষ থেকে জমি ও সময় চাওয়া প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, জমি বরাদ্দের ব্যাপারে সরকার সম্ভব হলে অবশ্যই তাদের সহায়তা করবে। কিন্তু এ অজুহাতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের অধীনে সাময়িক অনুমতিপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার জন্য আরও ১৫ বছর সময় চাওয়া অযৌক্তিক, অবাস্তব এবং অগ্রহণযোগ্য।
শিক্ষাসচিব আবু নাসের কামাল চৌধুরী বলেন, উচ্চশিক্ষাকে শৃঙ্খলার জায়গায় নেওয়ার চেষ্টা চলছে, এজন্য আইনের পাশাপাশি মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব নজরদারি জোরদার করা হবে।
ইউজিসির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম বলেন, ঢাকা শহরে অতিমাত্রায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থাকায় ঢাকার বাইরে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ইতিমধ্যে ৪২টি আবেদনপত্র পাওয়ার কথা জানান তিনি।
সমিতির চেয়ারম্যানের বক্তব্য: শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির চেয়ারম্যান ও সাবেক সচিব সি এম শফি সামি প্রথম আলোকে বলেন, স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার জন্য পাঁচ বছর সময় দেওয়া যুক্তিসংগত ও বাস্তবসম্মত। তিনি বলেন, যেসব বিশ্ববিদ্যালয় ভালো করছে সেগুলোর প্রশংসনীয় ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি উচ্চশিক্ষার প্রসারে সম্পূরক শক্তি হিসেবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাজ করার কথা উল্লেখ করেন। সি এম শফি সামি বলেন, ‘সমিতি চায় না কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে দুর্নীতি ও অনাচার থাকুক। তাই এটা নিরসনে সরকারি প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানাই।’
একজন উদ্যোক্তার কথা: শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, উচ্চশিক্ষা ব্যবসা হতে পারে না। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তকে তিনি ভারসাম্যমূলক উল্লেখ করে বলেন, যারা ভালো করেছে তাদের সাধুবাদ জানানো এবং যারা খারাপ করছে তাদের তিরস্কার করার সময় এসেছে। ড. ফরাসউদ্দিন বেসরকারি পর্যায়ে উচ্চশিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল গঠন এবং ইউজিসিকে শক্তিশালী করতে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। ...............................

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

