বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে ইনাম আহমদ চৌধুরী
আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষেত্রে আমাদের মুক্তি সংগ্রামের অবদানের জন্য ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধিকে এর আগে সম্মানজনক স্বীকৃতি দেওয়ার ব্যাপারে কুণ্ঠা থাকার কারণ ছিল। বিশেষ করে ইন্দিরা গান্ধি ১৯৭১ সালের ৬ নভেম্বর নিউইয়র্কের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সমাবেশে ঘোষণা দিয়েছিলেন ‘স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়া হয়েছে শেখ মুজিব গ্রেফতার হওয়ার পরে, আগে নয়। এখন পর্যন্ত (৬/১১/১৯৭১) আমার জানা মতে তার আগে তিনি স্বাধীনতার ডাক দেননি।’ এটি আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। কমনওয়েলথ সোসাইটির প্রেসিডেন্ট ইনাম আহমেদ চৌধুরী গতকাল একান্ত সাক্ষৎকারে একথা বলেন।
ইনাম চৌধুরী বলেন, এটি আওয়ামী লীগের পক্ষে গলাধঃকরণ করা কষ্টকর ছিল। অন্যদিকে ২৬ মার্চ জিয়াউর রহমান যে ঘোষণা দেন, সেখানে তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের নাম নিয়েছিলেন। বিএনপিও ইন্দিরা গান্ধির বক্তব্য সমর্থন করতে পারে না।
এদিকে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি সঞ্জিব রেড্ডি ১৯৭৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর নয়াদিল্লিতে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সম্মানে একটি রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় ঘোষণা করেন ‘একজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রথম ঘোষণাকারী হিসেবে আপনার মর্যাদা ইতোমধ্যে সুপ্রতিষ্ঠিত। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হবার পরে জাতীয় অগ্রগতি এবং জনকল্যাণে নিবেদিত একজন জননেতা হিসেবে এবং বাংলাদেশের বাইরে আপনি গভীর শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন।’ সাধারণত প্রেসিডেন্টকে দিয়েই সেদেশের পলিসির কথা ঘোষণা করানো হয়। এ ঘোষণার পরে এ দুটি কারণে আওয়ামী লীগ এটি মানতে চায়নি বলে ইন্দিরা গান্ধিকে সম্মাননা জানাতে এতদিন তারা কুষ্ঠাবোধ করেছিল।
অনেকেই প্রশ্ন করছেন, সোনিয়া গান্ধির বাংলাদেশ সফর কেন এত বিলম্বিত হল? ইন্দিরা গান্ধিকে কেন এত দেরিতে সš§াননা জানানো হল। এতে বাংলাদেশের কী লাভ হল? বস্তুতপক্ষে লাভের দিক থেকে এতটুকু বলা যায়, এতে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ আবহ সৃষ্টি হয়েছে। এই সফরে কোনও বৈষয়িক লাভ হয়েছে বলে আমার জানা নেই। ইন্দিরা গান্ধিকে দেরিতে যে সম্মাননা দেয়া হল, তা নিয়ে অনেকে আক্ষেপ করেছেন। আমার কাছে মনে হয় পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে সিদ্ধান্তবদল ঘটেছে। ইন্দিরা গান্ধিকে যে সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে তাতে আমরা আশা করি বাংলাদেশ-ভারত বিভিন্ন বিরোধ সমাধানে ভারতীয় সরকার সেটা স্মরণ রাখবে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের কথা ইদানিং খুবই শোনা যাচ্ছে। বিশেষ করে আজ ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকায় আসবেন এবং মনমোহন আসবেন সেপ্টেম্বরে। এই সফরগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে বাস্তবে কী হচ্ছে তা পরীক্ষা-নীরিক্ষা করে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। শুধু আকাশ কুসুম ফানুস ওড়ালে চলবে না। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর থেকে বন্ধুত্বপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ চলে আসছে। ভারতের সঙ্গে ৭২ সালে ২৫ বছরের মৈত্রী চুক্তি, বাণিজ্য চুক্তি হয়। আমি তখন ব্যক্তিগতভাবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব ছিলাম। সেই সময় সীমান্ত বাণিজ্য চুক্তিও হয়। উড়েছিল সম্ভাব্য বন্ধুত্বের অনেক রঙিন ঘুড়িও। বছর তিনেকের মধ্যেই সব টপটপ করে পড়ে গেল। সীমান্ত বাণিজ্য বন্ধ হয়ে গেল। আমরা মরিয়া হয়ে বাঁচার জন্য অনান্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করতে লাগলাম। ১৯৭৫ সালের শুরুর দিকে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাকে পাঠিয়েছিলেন চিনে বাণিজ্য চুক্তি করার মানসে। তখনও চিন কিন্তু বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি। তারপরও চুক্তি স্বাক্ষর হয়। অন্যদিকে তৈরি হল ফারাক্কাতে ব্যারাজ যা বাংলাদেশের কৃষি ক্ষেত্রকে তছনছ করে দিল। বাজল একদা প্রমত্তা পদ্মার মৃত্যুঘণ্টা। বর্ডার চুক্তি হল; সরল বিশ্বাসে আমরা বেরুবাড়ি দিয়ে দিলাম। কিন্তু প্রতিদানে কিছুই পেলাম না। দোহাই দেয়া হল ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের আদেশ। অসংখ্য মানুষের জন্য অতীব প্রয়োজন ফুটবল মাঠের চেয়েও ছোট তিন বিঘা করিডোর এখনও পাওয়া যায়নি। নেপাল, ভুটানের জন্য মংলা ও চট্টগ্রাম বন্দর সুবিধা আদায়ের চেষ্টা ব্যর্থ হল। ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব আমাদের খুবই প্রয়োজনীয় ও মূল্যবান। কিন্তু ভারত যদি এটা না বোঝে বা তাকে না বোঝানো যায়, তাহলে তো কিছু হবে না। বন্ধুত্ব তৈরি হতে হয় বাস্তব ভিত্তির ওপরে। ইদানিং খুবই জোরেসোরে বন্ধুত্ব দেয়া-নেয়া, কানেকটিভিটি কথা উঠেছে। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশ উজাড় করে ভারতকে যথাসাধ্য সব ঢেলে দিচ্ছে। গতবছর শেখ হাসিনার ভারত সফরে যে চুক্তিগুলো হল, তার ৫০টি ধারার কোনওটিতে বাস্তব কিছুই নেই। ১ বিলিয়ন ডলারের যে ঋণ দিয়েছে, তাতেও রয়েছে সুদ। কিনতে হবে সব মালামাল ভারত থেকে। এ নিয়ে কোথায়ও আন্তর্জাতিক সালিশের ব্যবস্থা নেই।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


