প্রায় তিন ঘন্টা হতে চলল, মুখোমুখি বসে আছে। অথচ একবারো চোখা'চোখী হলনা। ভেতরে ভেতরে প্রচন্ড রকম বিরক্ত হচ্ছিল কাজল।
এতো অহংকার কিসের! কি এমন পানতোয়া যে একবার তাকানোও যায় না! নাকি অন্ধ! চোখে দেখেনা?
কোথায় যেন একটা গল্প পড়েছিল কাজল- নয়িকা প্রতিদিন আকাশের দিকে তাকিয়ে দাড়িয়ে থাকে জানালায়। নায়ক পাশের লিল্ডিং এর জানালা থেকে তার রুপ সৌন্দর্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলে। কিছুতেই নায়িকার দৃস্টি আকর্ষন করতে পারে না। একসময় আবিস্কার করে মেয়েটা অন্ধ। সে কিছুই দেখেনা। আকাশ বা পাশের জানালা কিছুই না।
গল্পটা কি সত্যি হতে চলল কাজলের বেলায়?
সেই কখন থেকে সে দেখছে, চোখে কালো চশমা চাপিয়ে বসে আছে ভাবলেশ হীন। জানালা গলে তাকিয়ে আছে বিকালের পড়ন্ত রোদের দিকে। রেললাইনের কোল ঘেষে গড়ে ওঠা অট্রালিকা, ফসলের মাঠ আর খোলা আকাশে এমনকি সৌন্দর্য লেপটে আছে যে সামনে বসে থাকা মানুষটার দিকে একবারো চোখ ফেরান যায় না! নিশ্চই অন্ধ। ওই গল্পের নায়িকার মতো চোখে দেখে না।
নিজেকে একটা বুঝ দিতে চেষ্টা করে কাজল। বিরক্তিটা হালকা করতে চায়। কিন্তু নাহ্- একথাও তার মন মেনে নিতে চায় না। কোথায় যেন খচখচ করছে। এতো সুন্দর একটা মেয়ে অন্ধ হয় কিভাবে! এটা অন্যায়। সে অন্ধ হলে বড্ড অবিচার হবে। সুন্দরের সাথে নিদারুন বেইমানী হবে।
নিজের সাথে ঠিক এভাবে কথা বলতে বলতে এক সময় দু'চোখ বন্ধ হয়ে এলো কাজলের। সামনে বসে থাকা সুন্দরীর অবহেলা, অস্তগামী সূর্যের আরক্তিম আভা, নিজের ভেতরের বিরক্তি- সবকিছু ছাপিয়ে চোখের পাতায় নেমে এলো রাজ্জের ঝিমুনি। কাজল যখন ধড়পড়িয়ে জেগে উঠল ততক্ষনে ট্রেন প্রায় যাত্রী শুন্য। দু'চার জন যা আছে, সবাই ব্যাগ বোচকা নিয়ে দরজার দিকে ছুটছে।
কাজল চটজলদি তার ব্যাগ কাঁধে চাপিয়ে পা বাড়ায় দরজার দিকে।
সেই উন বেংগালেজে?
পেছর ফিরে তাকায় কাজল। হ্যাঁ আমি বাংলাদেশী।
হাত বাড়িয়ে দেয় মেয়েটা। আমি ক্লাউদিয়া। তুমি এ শহরেই থাক?
- হ্যাঁ। তুমি?
- আমি ফিরেন্স থেকে এসেছি। তোমার কাছে কি একটা ইনফরমেশন জিজ্ঞাসা করতে পারি?
- অবশ্যই পার। আমি চেষ্টা করব তোমাকে সাহায্য কতে।
- তুমি কি মফিজ নামে কাউকে জান? সেও বাংলাদেশী। আগে ফিরেন্স থাকত। শুনেছি এখন এই শহরে আছে।
- ঠিক মনে করতে পারছি না। তবে আশা করছি এই শহরে থাকলে তোমাকে সাহায্য করতে পারব। তুমি কি তার বর্ননা দিতে পারবে?
- হ্যাঁ পারবো। সে আমার বন্ধু। এক সময়ের খুব ভাল বন্ধু।
ক্লাউদিয়াকে থামিয়ে দেয় কাজল। আমরা কি একটু কফি নিতে নিতে কথা বলতে পারি?
- হ্যাঁ পারি। ওরা কাছের একটা বারে ঢোকে। কফিতে চুমুক দিয়ে কাজল শুনতে থাকে ক্লাউদিয়ার কথা। ক্লাউদিয়ার সাথে মফিজের বন্ধুত্ব হয় দু'বছর আগে। ওরা খুব ভাল বন্ধ হয়। দু'জন কাছাকাছি থাকতে শুরু করে। ক্লাউদিয়া মফিজকে ভালবেসে ফেলে। তার ধারনা মফিজও। কিন্তু হঠাৎ একদিন মফিজ হারিয়ে যায়। কোথায় যায় ক্লাউদিয়া জানেনা। সেদিন থেকে তার সেলফোন বন্ধ। ক্লাউদিয়া খুজতে থাকে মফিজকে। কোন খবর পায়না। ভুলতেও পারেনা। এতো দিন পর জানতে পেরেছে মফিজ ভেনিসে থাকে। তাই সে এতোদুর ছুটে এসেছে মফিজের খোজে।
কথাগুলো বলতে বলতে ক্লাউদিয়ার দু'চোখ ভিজে গড়িয়ে পড়ল দু'ফোটা অশ্রু। কাজলও অপ্রস্তুত। সে কোন ভাবেই মনে করতে পারেনা, মফিজ নামের কাউকে........

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

