
তখন আমি খুব ছোট। আমাদেরই গ্রামের পাশে আরেকটি গ্রাম। নাম সোনাপুর। এ গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে একটি নদী। নদীর নাম বহড়া। বেশ সুন্দর ও ছায়াঘেরা পরিবেশ এই সোনাপুর গ্রাম। এ গ্রামেই কেটেছে আমার শৈশব। আমি ছেলে বেলা থেকেই একটু চঞ্চল প্রকৃতির। আমি তিন ভাই বোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। আমার বড় ভাইয়ের নাম সুমন, বোনের নাম মিলা এবং আমার নাম ইমন। বাসায় সাধারণত আমাকে ক্যাচরা বলে ডাকা হয়। আমার মা একটু খুতখুতে প্রকৃতির। কোন কিছু মন মত না হলে তার চলে না।
বাড়িতে একটি কাজের ছেলে অনেকদিন যাবৎ কাজ করছে। তার নাম মনা। সে কালো বলে তাকে আমরা দুষ্টুমি করে কালা ডাকতাম। মনা ছেলেটা আসলে ভীষণ ভালো। ছোট বেলায় ওর মা আমাদের বাড়িতে কাজ করত। হঠাৎ করে একবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ওর মা মারা যায়। মা তাই অসহায় এই শিশুটিকে বাড়ির বাইরে ফেলে দিতে পারেননি। ওর তখন চার বছর বয়স। বলতে গেলে মনা ও আমি একই বয়েসী।
ছোট বেলা থেকেই ওর সাথে আমার খুব ভাব। ওর যে কোন কিছু আমার কাছে অজানা থাকতনা। আবার, আমার কোন কিছু ওর কাছে অজানা থাকতনা। এর পর বছর পাঁচেক পরের ঘটনা। আমি তখন কাস ফাইভে পড়ি। তখনতো ওর সাথে আমার খুব ভাব। পালা করে আমি ওর পড়া ধরতাম এবং ও আমার পড়া ধরত। খাবার সময় পাল্লা ধরে খেতাম যে কে কার আগে খাব। রাতে ঘুমোবার সময় ওর ঘরে বসে এক দেড় ঘন্টা নানা ধরনের গল্পগুজব করতাম।
আমার সাথে মনার এরকম বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব দেখে প্রতিবেশীরা একটু একটু নিন্দা যে করত তা বেশ বোঝা যেত যখন পাড়ার সব ছেলেরা একসাথে খেলাধুলা করতাম। অনেকে অনেক কথা বলে গেলেও আমি তা গায়ে মাখতাম না। কিন্তু মনা ভীষণ মন খারাপ করত।
তার কিছুদিন পরের কথা। একদিন মনা বাড়ি থেকে বাজারের উদ্দেশ্যে বের হলো। আমি চলে গেলাম স্কুলে। ক্লাস শেষে স্কুল থেকে ফিরলাম বিকেল সাড়ে চারটায়। আর ফিরেই শুনলাম এক খবর। মনা সেই সকালে যে বাজারের উদ্দেশ্যে বেরিয়েছিল এখনও পর্যন্ত সে বাড়ি ফেরেনি। বাবা ও ভাইয়ার ধারণা যে সে বাড়ি থেকে বাজারের টাকা নিয়ে পালিয়েছে। তাই বাবা মনাকে বকা ঝকা করতে লাগলেন। কিন্তু মা ভাবলেন হয়তো সে কোনও বিপদে পড়েছে বা হারিয়ে গেছে। তাই বাবাকে বললেন খোঁজ লাগাতে।
ভাইয়া তার বন্ধু বান্ধবদের বলে দিল যদি এলাকায় তার খোঁজ মেলে তবে তাকে যেন ধরে নিয়ে আসা হয়। শুধু আমি আর মা একমত যে, মনার কোন বিপদ ঘটেছে। সেদিন কেটে গেল এমনিতেই। পরদিন সকাল থেকে আমার ভীষণ মন খারাপ। কারণ আমার খেলার সাথী আর রইলনা। স্কুলে গেলামনা সেদিন। বিকেল পোনে চারটার দিকে বাবার পরিচিত এক ওসি আঙ্কেল হঠাৎ করে এসে হাজির।
আমি ঘুম থেকে উঠে ঘরে বড়দের কথোপকথনে ড্রইং রুমে গিয়ে দেখি ওসি আঙ্কেল বসে আছেন সোফায় এবং তার পাশে বসে আছে মনা নিশ্চুপ ভঙ্গিতে। আমি মনাকে ডাকতেই সে আমার দিকে এমন ভাবে তাকাল যেন সে আমাকে চিনতেই পারছেনা। কিন্তু ওর চোখের চাহনিটা যেন আর আগের মত নেই। আমি ওর এ ব্যবহার দেখে একটু হতভম্ব হলাম।
পরে মার মুখ থেকে জানতে পারলাম, গতকাল যখন মনা বাজারের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে রওনা করেছিল তখন বাবু বাজারের মেইন রোড ক্রস করতে গিয়ে এক মিনিবাসের সাথে ধাক্কা খায়। আঘাতটা খুব জোরে না লাগাতে ও প্রাণে বেঁচে যায় ঠিকই কিন্তু যখন জ্ঞান ফেরে তখন সে কোন কিছুই বলতে বা চিনতে পারছিলনা।
ডাক্তার জানালেন যে মনা স্মৃতি শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। সে আর কাউকে চিনবেনা। তখন ঘটনাস্থল থেকে হাসপাতাল পর্যন্ত বাবার সুপরিচিত সেই ওসি আঙ্কেল উপস্থিত ছিলেন। তিনি আমাদের বাসায় এর আগে মনাকে দেখেছিলেন। তাই চিনতে পেরে তাকে হাসপাতাল থেকে রিলিজ করিয়ে নিয়ে এলেন। এদিকে মনার মাথা খানিকটা কেটে যাওয়ায় সেলাই করে ব্যান্ডেজ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন মনা যদি স্মৃতি শক্তি সত্যিই হারিয়ে থাকে তবে ওর নাম ধরে যখন ডাকলাম তখন ও আমার দিকে তাকাল কেন। সে যা হোক ব্যাপারটায় তেমন একটা আমল না দিয়ে আমি আবার স্বাভাবিক ভাবেই রইলাম। একটু একটু খারাপ লাগলো এই ভেবে যে ও এখন আর কাউকে আগের মত চিনতে পারবেনা। এমনকি আমাকেও না।
মনা ফিরে স্মৃতি শক্তি হারিয়ে ফেললেও বেশ অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই একটু স্বাভাবিক হয়ে আসতে লাগলো। একদিন তো ওর আর আমার কুকুরের ধাওয়া খাওয়ার ঘটনা মনে করিয়ে দিয়ে আমাকে একেবারে অবাক করে দিয়েছিল।
চলবে .............
বিঃ দ্রঃ কিভাবে পেয়েছি, কবে লেখা হয়েছিল খেয়াল নেই। লেখাটির থিম হয়তো অনেক পুরাতন। ভাল লাগায় সকলের উদ্দেশ্যে প্রকাশ করছি। জানিনা ইতিপূর্বে অন্য কোথাও প্রকাশ করা হয়েছে কিনা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


