চলামান বিতর্ক অভ্র ও বিজয়কে মুখোমুখি দাড় করিয়ে দিয়েছে। অভ্রের কারনে বিজয়ের একচ্ছত্র বাজারে ভাটা পড়েছে ঠিক কিন্তু বিজয় ও অভ্র সমগোত্রীয় বস্তু নয়। বিজয়ের সাথে ইউনিজয়ের সাথে তুলনা চলতে পারে (লিনাক্সে ইউনিজয় ব্যবহার করা হয়, সেখানে অভ্র নেই, অভ্র ফোনেটিক আছে অবশ্য) ঠিক অভ্রের সাথে নয়। অভ্র অভ্র একটা প্ল্যাটফর্ম যা মানুষকে পছন্দ অনুযায়ী কীবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ করে দিয়েছে।আর অভ্র মানেই ইউনিজয় বা ইউনিবিজয় নয়। কিছু কিছু আলোচনায় এমন মনে হয়েছে যেন অভ্র শুধুই ইউনিজয় আর তা বিজয় চুরি করে বানানো হয়েছে। অভ্র কয়েকটি কীবোর্ডের আধার। এটি প্রথাগত একটা কীবোর্ড নির্ভর সফটওয়ার নয়। অভ্র কাউকে জোড় করে ইউনিজয় গেলাচ্ছে না। অভ্রের ডিফল্ট কীবোর্ড হল ‘অভ্র ইজি’, যার লেআউট ডিজাইন করেছে অমিক্রন ল্যাব, আর রয়েছে ফোনেটিক যার ডিজাইনার মেহেদী হাসান খান, এটিও অভ্রের নিজের। আমরা অলস বাঙ্গালী কষ্টেসৃষ্টে একটা কীবোর্ড শিখেফেলেছি, আর একটা নতুন কীবোর্ড শিখতে গেলে আমাদের গাত্রদাহ্য হবে, অভ্র তাই একটু ঘষা মাজা করে, কপিরাইট আইনকে আর একটু সম্মান করে বিজয়ের অনুরুপ কীবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ করে দিয়েছে মাত্র। নইলে কি দায় পড়েছে অভ্রের ইউনিজয় দেবার! এছাড়া রয়েছে বর্ণনা ও জাতীয় কীবোর্ড। জাতীয় কীবোর্ড টি ডিজাইন করেছে Bangladesh Computer Council (BCC), এটিও বিজয়ের অনুরুপ। কিন্তু মোস্তফা জব্বার কখনো এটিকে অভিযুক্ত করেছেন এমন শুনি নি।
অভ্র ব্যবহারকারী মাত্রেই ইউনিজয় ব্যবহার করছেন এমন নয়। এখানে যে ইউনিজয় আছে তার সাথে বিজয়ের টেকনিক্যাল কোন সম্পর্ক নেই, শুধু কী-স্ট্রোক বা লেআউটে ব্যাপক মিল রয়েছে, পুরোপুরি নয়।
বিজয়ের সবচে’ বড় শক্তি হল যে বিপুল সংখ্যক লোক এটি শিখে ফেলেছে। এবং তারা শিখেছে মোস্তফা জব্বারকে কোন টাকা না দিয়ে। অর্থাৎ মোস্তফা জব্বারের গলায় আজ যে জোড় তার অনেকটাই পাইরেসির সুবাদে পাওয়া। নয়তো ক’জন বাঙ্গালী আছেন যারা ৫০০০ টাকা (পুরোনো গ্রাহকরা ১৫০০ টাকায় পেতেন, বিজয়ের একটি বিজ্ঞাপনে দেখেছিলাম) দিয়ে বাংলা লেখার সফটওয়ার কিনবে, যেখানে তারা লেখার খাতা মাইক্রোসফট অফিস ব্যবহার করে পাইরেসি করে। তিনি শুরু থেকেই শুধু নিজের ব্যবসার কথা ভেবেছেন, সীমিত আয় সম্পন্ন বাঙ্গালী জাতির কথা ভাবেন নি। বাংলাদেশে যদি কপিরাইট আইন সঠিক ভবে মানা হতো তবে বিজয়ের নাম নিশানাও থাকত না, বহু আগেই এর সুলভ বিকল্প বেরিয়ে যেত। বাজারে পাইরেটেড কপি সিডিতে, সিডিতে, পেন ড্রাইভে ছড়িয়ে যাওয়ার কারনেই আজ তার এতো প্রতিপত্তি। আজ বিজয় ১০০ টাকায় ফেরী করা হচ্ছে। এ কাজটা যদি শুরু থেকেই করতেন তবে অভ্রের হয়তো জন্ম নেয়া লাগত না, কারন এই মূল্যটি অনেকেরই ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আছে।
মো. জব্বার কীবোর্ড কপিরাইট, পেটেন্ট ইত্যাদী করে নিয়েছেন, কেউকি ভেবে দেখেছেন নৈতিকতার বিচারে এর অবস্থান কোথায়! বায়ান্নোর মিছিলে গুলি বর্ষণের পর বাংলা ভাষার উপর এটাই সবচে’ বড় আঘাত। বাংলা বর্ণে বাংলা লেখার জন্য তিনি কি কাউকে মূল্য দিয়েছেন? যদি এমন হতো যে পণ্ডিত, মণিষীরা বাংলা বর্ণমালা সৃষ্টি করেছেন তারা যদি বর্ণমালা কপিরাইট করে নিতেন তবে কেমন হতো? বাংলা লেখার জন্য তাদের বংশ পরম্পরায় টাকা দিতে হতো। আমাদের সে সাধ্য নেই ফলে কি হতো- ১. ভাষা চর্চা হতো না, ফলে শিক্ষাচর্চা, বিদ্যাচর্চা হতো না, বিদ্যালয়-বিশ্ববিদ্যালয় থাকতো না, আমাদের অবস্থা হতো বর্ণমালা বিহীন সাওঁতালী ভাষার মতো; ২. অন্যকোন পণ্ডিতদল পরম মমতায় বিকল্প কোন বর্ণমালা সৃষ্টি করে উন্মুক্ত করে দিতেন, ফলে ভাষাচর্চা অব্যাহত থাকত; ৩. পর্তূগীজ বা ইংরেজ মিশনারীরা লাতিন বর্ণমালা চাপিয়ে দিত; ৪. তাও যদি না হতো ফজলুর রহমানের (পাকিস্তান আমলের কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রী, সালমান এফ. রহমানের পিতা) প্রস্তাবে উর্দূ বর্ণে বাংলা চালু হতো। কোন কিছুই কারো জন্য ঠেকে থাকে না তাই খড়িমাটি ও স্লেটের স্থান নেয়া কীবোর্ড-মনিটরে বাংলা চর্চা বর্ণবেনিয়ার হাত থেকে রক্ষার জন্য দ্বীতিয় ঘটনাটির অনুরুপ ঘটেছে।
সবাই একথা স্বীকার করছেন যে বাংলা লেখালেখির পেছনে মোস্তফা জব্বারের অসামান্য অবাদান রয়েছে। কিন্তু ভেবে দেখুন তার এই ‘অসামান্য অবদান’কে প্রতিষ্ঠা করতে আমাদের চোর হতে হয়েছে। যদি তিনি স্কুল কলেজ, ব্যক্তিগত ব্যবহারকারীদের বিনামূল্যে বা সুলভ মূ্ল্যে ব্যবহার করতে দিতেন তবে তার অবদানের কথা বিবেচনা করতাম।
কেউ কেউ অভ্রের বিপক্ষে কথা বলে ‘উল্টো শ্রোতে’ চলার বিনোদন নিচ্ছেন। দেশের বিপুল সংখ্যক লোক এখনো ‘বিজয়’ ব্যবহার করে (বেশির ভাগই না কিনে) তাদের কাছে মো. জব্বার চরম সম্মানিত লোক। তারা এই আত্মরম্ভী ব্যক্তিটির হীন মানসিকতার সাথে পরিচিত নন। আমি আমাদের গ্রামের এক স্থানীয় ‘প্রযু্ক্তিবিদ’কে কোন এক কথা প্রসঙ্গে বলেছিলাম মো. জব্বারকে ইমেইল করতে, উনি বললেন, “মোস্তফা জব্বারকে ইমেইল করব!?” “ক্যান, সমস্যা কি?” উত্তর দিলেন, “কত বড় মানুষ।“ তাহলে বুঝেন বাংলার মূর্খ সমাজে তার অবস্থান কত উচুতে! গুটি কতক বঙ্গসন্তান যারা অনলাইনে বাংলায় ভাব বিনিময় করতে চায় তারা জানে অভ্র তাদের কি দিয়েছে। দেশের ব্যাপক জনসংখ্যার মাঝে তারা অভ্র নিয়ে বিজয়ের বিপরীতে উজান শ্রোতে তরী বাইছে। তাই ব্লগ অভ্রের পক্ষে ভেসে যাবে, আর দেশের বৃহত্তর অংশকে তা স্পর্শ করবে না এটাই স্বাভাবিক।
কোন পরিস্থিতিতে যদি নতুন কোন কীবোর্ড আসে, আর তা সার্বজনীনও হয় তা যদি অভ্র সংযুক্ত করে নেয় তবে অভ্র কোনদিনই উপযোগীতা হারাবে না। কারন অভ্র একটি প্যাকেজ।
পরিশেষে মোস্তফা জব্বারের প্রতি সমবেদনা, পাঁচ কোটি টাকা হাত ছাড়া হয়ে গেলে আমিও মাথা ঠিক রাখতে পারতাম না।
ভাষা হোক উন্মুক্ত।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে এপ্রিল, ২০১০ রাত ১:৩৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


