somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অভ্র-বিজয় বিতর্ক: নৈতিকতা ও ব্যবসায়ের চিরন্তন দ্বৈরথ

২৩ শে এপ্রিল, ২০১০ রাত ১২:৫৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

চলামান বিতর্ক অভ্র ও বিজয়কে মুখোমুখি দাড় করিয়ে দিয়েছে। অভ্রের কারনে বিজয়ের একচ্ছত্র বাজারে ভাটা পড়েছে ঠিক কিন্তু বিজয় ও অভ্র সমগোত্রীয় বস্তু নয়। বিজয়ের সাথে ইউনিজয়ের সাথে তুলনা চলতে পারে (লিনাক্সে ইউনিজয় ব্যবহার করা হয়, সেখানে অভ্র নেই, অভ্র ফোনেটিক আছে অবশ্য) ঠিক অভ্রের সাথে নয়। অভ্র অভ্র একটা প্ল্যাটফর্ম যা মানুষকে পছন্দ অনুযায়ী কীবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ করে দিয়েছে।আর অভ্র মানেই ইউনিজয় বা ইউনিবিজয় নয়। কিছু কিছু আলোচনায় এমন মনে হয়েছে যেন অভ্র শুধুই ইউনিজয় আর তা বিজয় চুরি করে বানানো হয়েছে। অভ্র কয়েকটি কীবোর্ডের আধার। এটি প্রথাগত একটা কীবোর্ড নির্ভর সফটওয়ার নয়। অভ্র কাউকে জোড় করে ইউনিজয় গেলাচ্ছে না। অভ্রের ডিফল্ট কীবোর্ড হল ‘অভ্র ইজি’, যার লেআউট ডিজাইন করেছে অমিক্রন ল্যাব, আর রয়েছে ফোনেটিক যার ডিজাইনার মেহেদী হাসান খান, এটিও অভ্রের নিজের। আমরা অলস বাঙ্গালী কষ্টেসৃষ্টে একটা কীবোর্ড শিখেফেলেছি, আর একটা নতুন কীবোর্ড শিখতে গেলে আমাদের গাত্রদাহ্য হবে, অভ্র তাই একটু ঘষা মাজা করে, কপিরাইট আইনকে আর একটু সম্মান করে বিজয়ের অনুরুপ কীবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ করে দিয়েছে মাত্র। নইলে কি দায় পড়েছে অভ্রের ইউনিজয় দেবার! এছাড়া রয়েছে বর্ণনা ও জাতীয় কীবোর্ড। জাতীয় কীবোর্ড টি ডিজাইন করেছে Bangladesh Computer Council (BCC), এটিও বিজয়ের অনুরুপ। কিন্তু মোস্তফা জব্বার কখনো এটিকে অভিযুক্ত করেছেন এমন শুনি নি।

অভ্র ব্যবহারকারী মাত্রেই ইউনিজয় ব্যবহার করছেন এমন নয়। এখানে যে ইউনিজয় আছে তার সাথে বিজয়ের টেকনিক্যাল কোন সম্পর্ক নেই, শুধু কী-স্ট্রোক বা লেআউটে ব্যাপক মিল রয়েছে, পুরোপুরি নয়।
বিজয়ের সবচে’ বড় শক্তি হল যে বিপুল সংখ্যক লোক এটি শিখে ফেলেছে। এবং তারা শিখেছে মোস্তফা জব্বারকে কোন টাকা না দিয়ে। অর্থাৎ মোস্তফা জব্বারের গলায় আজ যে জোড় তার অনেকটাই পাইরেসির সুবাদে পাওয়া। নয়তো ক’জন বাঙ্গালী আছেন যারা ৫০০০ টাকা (পুরোনো গ্রাহকরা ১৫০০ টাকায় পেতেন, বিজয়ের একটি বিজ্ঞাপনে দেখেছিলাম) দিয়ে বাংলা লেখার সফটওয়ার কিনবে, যেখানে তারা লেখার খাতা মাইক্রোসফট অফিস ব্যবহার করে পাইরেসি করে। তিনি শুরু থেকেই শুধু নিজের ব্যবসার কথা ভেবেছেন, সীমিত আয় সম্পন্ন বাঙ্গালী জাতির কথা ভাবেন নি। বাংলাদেশে যদি কপিরাইট আইন সঠিক ভবে মানা হতো তবে বিজয়ের নাম নিশানাও থাকত না, বহু আগেই এর সুলভ বিকল্প বেরিয়ে যেত। বাজারে পাইরেটেড কপি সিডিতে, সিডিতে, পেন ড্রাইভে ছড়িয়ে যাওয়ার কারনেই আজ তার এতো প্রতিপত্তি। আজ বিজয় ১০০ টাকায় ফেরী করা হচ্ছে। এ কাজটা যদি শুরু থেকেই করতেন তবে অভ্রের হয়তো জন্ম নেয়া লাগত না, কারন এই মূল্যটি অনেকেরই ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আছে।

মো. জব্বার কীবোর্ড কপিরাইট, পেটেন্ট ইত্যাদী করে নিয়েছেন, কেউকি ভেবে দেখেছেন নৈতিকতার বিচারে এর অবস্থান কোথায়! বায়ান্নোর মিছিলে গুলি বর্ষণের পর বাংলা ভাষার উপর এটাই সবচে’ বড় আঘাত। বাংলা বর্ণে বাংলা লেখার জন্য তিনি কি কাউকে মূল্য দিয়েছেন? যদি এমন হতো যে পণ্ডিত, মণিষীরা বাংলা বর্ণমালা সৃষ্টি করেছেন তারা যদি বর্ণমালা কপিরাইট করে নিতেন তবে কেমন হতো? বাংলা লেখার জন্য তাদের বংশ পরম্পরায় টাকা দিতে হতো। আমাদের সে সাধ্য নেই ফলে কি হতো- ১. ভাষা চর্চা হতো না, ফলে শিক্ষাচর্চা, বিদ্যাচর্চা হতো না, বিদ্যালয়-বিশ্ববিদ্যালয় থাকতো না, আমাদের অবস্থা হতো বর্ণমালা বিহীন সাওঁতালী ভাষার মতো; ২. অন্যকোন পণ্ডিতদল পরম মমতায় বিকল্প কোন বর্ণমালা সৃষ্টি করে উন্মুক্ত করে দিতেন, ফলে ভাষাচর্চা অব্যাহত থাকত; ৩. পর্তূগীজ বা ইংরেজ মিশনারীরা লাতিন বর্ণমালা চাপিয়ে দিত; ৪. তাও যদি না হতো ফজলুর রহমানের (পাকিস্তান আমলের কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রী, সালমান এফ. রহমানের পিতা) প্রস্তাবে উর্দূ বর্ণে বাংলা চালু হতো। কোন কিছুই কারো জন্য ঠেকে থাকে না তাই খড়িমাটি ও স্লেটের স্থান নেয়া কীবোর্ড-মনিটরে বাংলা চর্চা বর্ণবেনিয়ার হাত থেকে রক্ষার জন্য দ্বীতিয় ঘটনাটির অনুরুপ ঘটেছে।

সবাই একথা স্বীকার করছেন যে বাংলা লেখালেখির পেছনে মোস্তফা জব্বারের অসামান্য অবাদান রয়েছে। কিন্তু ভেবে দেখুন তার এই ‘অসামান্য অবদান’কে প্রতিষ্ঠা করতে আমাদের চোর হতে হয়েছে। যদি তিনি স্কুল কলেজ, ব্যক্তিগত ব্যবহারকারীদের বিনামূল্যে বা সুলভ মূ্ল্যে ব্যবহার করতে দিতেন তবে তার অবদানের কথা বিবেচনা করতাম।

কেউ কেউ অভ্রের বিপক্ষে কথা বলে ‘উল্টো শ্রোতে’ চলার বিনোদন নিচ্ছেন। দেশের বিপুল সংখ্যক লোক এখনো ‘বিজয়’ ব্যবহার করে (বেশির ভাগই না কিনে) তাদের কাছে মো. জব্বার চরম সম্মানিত লোক। তারা এই আত্মরম্ভী ব্যক্তিটির হীন মানসিকতার সাথে পরিচিত নন। আমি আমাদের গ্রামের এক স্থানীয় ‘প্রযু্ক্তিবিদ’কে কোন এক কথা প্রসঙ্গে বলেছিলাম মো. জব্বারকে ইমেইল করতে, উনি বললেন, “মোস্তফা জব্বারকে ইমেইল করব!?” “ক্যান, সমস্যা কি?” উত্তর দিলেন, “কত বড় মানুষ।“ তাহলে বুঝেন বাংলার মূর্খ সমাজে তার অবস্থান কত উচুতে! গুটি কতক বঙ্গসন্তান যারা অনলাইনে বাংলায় ভাব বিনিময় করতে চায় তারা জানে অভ্র তাদের কি দিয়েছে। দেশের ব্যাপক জনসংখ্যার মাঝে তারা অভ্র নিয়ে বিজয়ের বিপরীতে উজান শ্রোতে তরী বাইছে। তাই ব্লগ অভ্রের পক্ষে ভেসে যাবে, আর দেশের বৃহত্তর অংশকে তা স্পর্শ করবে না এটাই স্বাভাবিক।
কোন পরিস্থিতিতে যদি নতুন কোন কীবোর্ড আসে, আর তা সার্বজনীনও হয় তা যদি অভ্র সংযুক্ত করে নেয় তবে অভ্র কোনদিনই উপযোগীতা হারাবে না। কারন অভ্র একটি প্যাকেজ।
পরিশেষে মোস্তফা জব্বারের প্রতি সমবেদনা, পাঁচ কোটি টাকা হাত ছাড়া হয়ে গেলে আমিও মাথা ঠিক রাখতে পারতাম না।
ভাষা হোক উন্মুক্ত।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে এপ্রিল, ২০১০ রাত ১:৩৪
১৫টি মন্তব্য ১৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×